Home » আন্তর্জাতিক » এক দেশমুখী পররাষ্ট্রনীতি

এক দেশমুখী পররাষ্ট্রনীতি

মাসুদ করিম

hasina-manmohan-প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান মহাজোট সরকারের বিগত চার বছরে পররাষ্ট্রনীতি ছিল মূলত প্রতিবেশি ভারতমুখী। অবশিষ্ট দুনিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে ছিল বিপর্যস্ত অবস্থা। ভারতের কাছ থেকেও যে কিছু আদায় করতে পেরেছে তেমনও নয়। বরং ভারতকে দিয়েছে অনেক বেশি। আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে পররাষ্ট্রনীতিকে খুব সামান্য স্থান দিয়েছে। এই বিষয়ে অনেকটাই দায়সারা কথাবার্তা ছিল নির্বাচনী ইশতেহারে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে সেটুকুও বাস্তবায়নে সফল হয়নি। পররাষ্ট্রনীতিতে এই ব্যর্থতার নেপথ্যে ক্ষমতাসীন দলের নীতি এবং পররাষ্ট্রনীতির অবস্থানকে দায়ী করা যায়। তার প্রেক্ষাপটের দিকে দৃষ্টি দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে; যেখান থেকে একে একে বেরিয়ে আসবে কেন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বেশিরভাগ নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ করা গেল না।

সাধারনত পররাষ্ট্র মন্ত্রী পদে ক্ষমতাসীন দলের জেষ্ঠ্য নেতা, দলের ওপর যার প্রভাব অনেক বেশি, এমন কাউকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী পদে নিযুক্ত করা হয়। আওয়ামী লীগ আগের আমলে প্রবীন রাজনীতিবিদ আব্দুস সামাদ আজাদকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী করেছিল। বিএনপি সরকার দলের সবচেয়ে সিনিয়র নেতা ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী নিয়োগ করে। বি চৌধুরীকে পরে রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ দেয়া হয়। বয়োজেষ্ঠ্য রাজনীতিবিদকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী নিয়োগ দেয়ার পক্ষে বড় যুক্তি হলো, তাঁর অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরালো করতে সহায়ক হয়। এই ক্ষেত্রে নিজের রাজনৈতিক দলের কোনও প্রকার সহায়তার প্রয়োজন হলে তিনি সহজেই তা আদায় করতে পারেন।

আওয়ামী লীগ বর্তমান আমলে রাজনীতিতে ও মন্ত্রিসভায় অন্যতম নবীন নেত্রী ডা. দীপু মনিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী নিয়োগ দিয়ে চমক দেখায়। পেশায় চিকিৎসক ও আইনজীবি ডা. মনি যখন পররাষ্ট্রনীতির হাতেখড়ি গ্রহ করছেন; তখন প্রবাসী অধ্যাপক ড. গওহর রিজভিকে মন্ত্রী পদ মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা নিয়োগ করে বৈদেশিক সম্পর্কের মূল বিষয়গুলো দেখভালের দায়িত্ব তার ওপর অর্পন করা হয়। সদ্য ছুটিতে যাওয়া প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান নিজের দায়িত্বের সীমানা ছাড়িয়ে বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। সাবেক কূটনীতিক এম জিয়াউদ্দিনকে ‘অ্যাম্বাসেডর এট লার্জ’ নিয়োগ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দফতর খুলে দেয়া হয়। দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাবেক কূটনীতিক তারেক আহমেদ করিমকেও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে অনেক ক্ষমতা দেয়া হয়। এভাবে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হতে থাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাইরে থেকে। বিগত চার বছরে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন অনেক সিদ্ধান্ত হয়েছে, (যেমন ভারতের সঙ্গে ২০১০ সালে ঘোষিত ৫০ দফার যৌথ ইশতেহার) যা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানতে পেরেছে তা বাস্তবায়নের মূহুর্তে। পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উপেক্ষা করার মানে হলো, প্রাতিষ্ঠানিকতাকে উপেক্ষা করা। ফলে উচ্চতর রাজনৈতিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অপর্যাপ্ত তথ্যের কারণে অতীতের ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটেছে। রাজনৈতিক পর্যায়ে অনেক সিদ্ধান্ত হয়েছে বাংলাদেশের স্বার্থকে ছাড় দিয়ে, ভিন্ন দেশের স্বার্থ রক্ষা করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পেশাদার কূটনীতিকরা অসহায়ের মতো তা বাস্তবায়ন করে গেছে। এইভাবে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যার মাধ্যমে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয়েছে তিনি চলে যান। ফলে ভবিষ্যতেও ধারাবাহিকতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এই রকম একটা পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার যা ‘দিনবদলের সনদ’ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে, তার বৈদেশিক সম্পর্কের অংশের কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে তার মূল্যায়ন করা যায়। ইশতেহারের প্রথম লাইন হলো : ‘বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা রাখবে’। এই ক্ষেত্রে গত চার বছরে ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। বাংলাদেশ জাতিসংঘের আওতায় শান্তিরক্ষী পাঠানো অব্যাহত রেখেছে। শান্তিরক্ষীরাও অতীতের মতোই সুনামের সঙ্গে বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তিরক্ষা কিংবা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশী সৈন্যদের এই ভূমিকার কারণে নির্বাচনী ইশতেহারের এই ওয়াদাটি পূরণ হয়েছে। শান্তির বিষয়ে নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণ হলেও ইশতেহারের পরের লাইনটি ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও কারো সঙ্গে বৈরিতা নয় এই নীতির আলোকে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা হবে’ বলে যে প্রতিশ্র“তি দেয়া হয়েছে তা মোটেও প্রতিপালিত হয়নি।

বর্তমান সরকারের আমলে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বৈরী সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এতটা খারাপ অতীতে আর কখনও হয়নি। চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবিশ্বাস ডালপালা মেলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দুনিয়ার কোনও দেশের সঙ্গে এই সরকারের ভাল সম্পর্ক নেই। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশ সফর করেছেন। তার সফরকে পুঁজি করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বর্হিবিশ্বে যতটা উজ্জ্বল করা সম্ভব ছিল; হিলারি চলে যাওয়ার পর পরই তার সম্পর্কে সরকারের মন্ত্রীদের তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্যে ভাবমূর্তি ততটাই খারাপ হয়েছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে হিলারি ক্লিনটনের একটা দুর্বলতা আছে। তিনি এর আগেও এই দেশ সফর করেছেন। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশ সম্পর্কে হিলারির প্রবল আগ্রহ আগে থেকেই ছিল। সে জন্যেই অনেক চেষ্টা তদবির করে রাষ্ট্রদূত মজীনা হিলারিকে এদেশে নিয়ে এসেছেন। সেখান থেকে ফল পাওয়ার বদলে তার সফরের ওপর কালিমা লেপনে প্রতিযোগিতায় নামেন সরকাররের অনেক দায়িত্বশীল ব্যাক্তিবর্গ। একইভাবে, অনেক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করা হয়েছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে গিয়ে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেমন প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা হোসেন পুতুলের উদ্যোগে ঢাকায় অটিজম সম্মেলনে আমন্ত্রন জানিয়ে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে অতিরিক্ত সম্মান দেয়ায় পাকিস্তান কথা দিয়েও সম্মেলনে তাদের স্পীকারকে পাঠায়নি। চীনারাও গভীর সমুদ্র বন্দরসহ প্রায় সব প্রকল্প ঝুলিয়ে রেখেছে ভারতের সঙ্গে অতিরিক্ত মাখামাখির কারণে। এই ধরনের বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষন করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ‘স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ’ করবে বলে যে অঙ্গীকার করেছে, বাস্তবে তা ছিল নতজানু পররাষ্ট্রনীতি।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারসহ প্রতিবেশি দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সুসম্পর্ক বজায় রেখে বহুমুখী সহযোগিতা জোরদার করা হবে’। বাস্তবে গত চার বছরে এমন বহুমুখী সহযোগিতা গড়ে ওঠেনি। ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার ধরণ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বৃহৎ এই প্রতিবেশি দেশটির বড় দুই উদ্বেগ, যথা বিচ্ছিন্নতাবাদিদের দমন এবং ট্রানজিট প্রদানের বিষয়ে বাংলাদেশ অগ্রসর হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের পক্ষে তিস্তার পানিবন্টন চুক্তি এবং সীমান্তে হত্যা বন্ধ করতে ১৯৭৪ সালের সীমান্ত চুক্তি প্রটোকলসহ বাস্তবায়নে কোনও অগ্রগতি হয়নি। ফলে ভারতের সঙ্গে কথিত ‘বহুমুখী’ সম্পর্ক আদতে একমুখী হবার সম্পর্ক, এটা কোনও ভাবেই আদানপ্রদানমূলক নয়। নেপাল ও ভুটানের সঙ্গেও বহুমুখী সম্পর্ক হয়নি। কারণ, এই দু’টি দেশে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে ভারত একতরফাভাবে যে প্রকল্প গ্রহ করেছে, বাংলাদেশকে তার অংশিদার করতে দেশটির ইচ্ছা নেই। আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারন শেখ হাসিনার বর্তমান সরকারের আমলে একমাত্র বড় ধরনের সাফল্য এবং অর্জন বলে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু পাশাপাশি, ভারতের পর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশি এই দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য, সড়ক যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ধরনের সহযোগিতা হতে পারতো সেটা হয়ে ওঠেনি। বিশেষ করে মিয়ানমার যখন নিজেকে উন্মুক্ত করছে তখন দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশ বহুক্ষেত্রে সখ্য গড়ে তোলতে পারত। যদিও রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে রোহিঙ্গা ইস্যূতে মিয়ানমারের নাগরিকদের অনুপ্রবেশ করতে না দিয়ে বাংলাদেশ সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহ করেছে।

নির্বাচনী ইশতেহার মোতাবেক সার্ক, বিমসটেক, ডি৮সহ আঞ্চলিক ও উপআঞ্চলিক সহযোগিতা সুদৃঢ় করার অঙ্গীকার পূরণ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডি৮ সম্মেলনে যোগ দেননি। রাশিয়ার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে অস্ত্র কেনা ও পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এখন অনেক বেশি বৈরীতায় পরিপূর্ণ। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় আঞ্চলিক টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগও ভারতের আপত্তিতে শুরুতেই মাঠে মারা গেছে। এ সকল কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকারও অপূর্ণ থেকে গেছে।

তবে এতো কিছুর পরও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপুমনির ঘন ঘন বিদেশ সফর সকলের নজর কেড়েছে।।

১টি মন্তব্য

  1. An objective and true picture of Bangladesh foreign relations.