Home » শিল্প-সংস্কৃতি » ইতর থেকে সামান্য – ভারতীয় নাচাগানা অগ্রগণ্য

ইতর থেকে সামান্য – ভারতীয় নাচাগানা অগ্রগণ্য

বিধান রিবেরু

cultural-aggression-1-বিয়ে, গায়ে হলুদ, জন্মদিন অথবা কোনো ছাত্র সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন এমনকি ঈদের আনন্দে গলির মোড়ে মোড়ে যা দেখা যায়, যা শোনা যায়, ডালভাতের মত, তা হলো হিন্দি গান বা হিন্দি চলচ্চিত্রের অনুকরণে নাচ। এ হচ্ছে হরলিকসের মত, যা ছাড়া ‘আমাদের চলেই না’। এই বিজ্ঞাপনটিও ভারতীয়। সামাজিক, রাজনৈতি এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান সয়লাব হিন্দি গানে, যেহেতু ইতর (Individual)থেকে সামান্যে (Universal)এর বিরাজ ঘটেছে, হিন্দি সংস্কৃতি তাই আজ বিশেষ রূপে হাজির আমাদের সামনে। ছোট পর্দায় নিত্যসাবান মাখার মত হিন্দি ধারাবাহিক যেমন আছে তেমনি আছে হিন্দি চলচ্চিত্র, এমনকি দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের হিন্দি ডাবিং, জাপানি কার্টুন ছবি ডোরেমনের চরিত্ররাও কথা বলে হিন্দি ভাষায়। ঘরের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় ক্রিকেট লীগেও হিন্দি সংস্কৃতির দাপট দেখার মত বৈকি। বাড়ির বাচ্চার মুখে আধো আধো বোলে হিন্দি, তরুণদের বুকে ও মুখে গুনগুনিয়ে হিন্দি গান এবং চলচ্চিত্র নির্মাতারা বানিয়ে চলছেন হিন্দি ছবির নকল সব সিনেমা। বাংলাদেশের কণ্ঠশিল্পীরা বলিউডে একটু চান্স পাওয়ার আশায় বাধতে শুরু করেছেন হিন্দি গান। ভারতের পেঁয়াজ রসুন তো রসুই ঘরে ঢুকেছে বহুদিন আগেই, এবার চেইন শপের মত ভারতীয় চেইন স্কুলও আসন গাড়ছে ঢাকার অলিতে গলিতে, শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কে ঢোকান হচ্ছে ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি। তেল পাউডার টুথপেস্ট থেকে চপ্পল, আটপৌড়ে জীবনের নিত্য প্রয়োজনীয় সব পণ্যেরই ফেরি করে ফিরছেন হিন্দি চলচ্চিত্রের নামজাদা খানেরা, নায়িকারাও পিছিয়ে নেই। টিভি থেকে চোখ সরালেও রেহাই নেই, পত্রিকা কিংবা রাজপথের পাশে বিলবোর্ডেও দেখা মিলবে বলিউড নায়ক নায়িকারা বিক্রি করছেন কোনো না কোনো পণ্য। অতএব অবস্থা যে ভাল নয় সেটা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু টিভি সিরিয়াল এবং বিজ্ঞাপন বাদ দিলে যে হাতিয়াড় দিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি ব্যাপক আগ্রাসন জারি রেখেছে তা হল হিন্দি চলচ্চিত্র। এবং তার থেকেও ভয়ঙ্কর বিষয় হল ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের একটি গোষ্ঠী আদাজল খেয়ে নিজেদের বলিউড সিনেমার বন্দনায় নেমেছেন। সেই বন্দনার একটাই মূল সুর ‘মেরা ভারত মহান হ্যায়’। ইতিহাসের ছাত্র মাত্রই জানেন জাতীয়তাবাদের পথ এক সময় না এক সময় গিয়ে ওঠে ফ্যাসিবাদের মহাসড়কে। তো কারা কোন ভঙ্গিতে এই বলিউড বন্দনা করছেন?

সম্প্রতি রাজিন্দার দুদরাহ ও জিগনা দেসাই সম্পাদিত একটি বই হাতে এসেছে। নাম দ্য বলিউড রিডার। যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত ম্যাকগ্র হিলের এই বইতে বলা হচ্ছে বলিউড ফিল্ম এক নতুন গ্লোবালাইজেশনের যুগে প্রবেশ করেছে। আগে যেখানে গ্লোবালাইজেশন বলতে বুঝানো হত ‘আমেরিকানাইজেশন’ সেখানে বলিউড সৃষ্টি করেছে এক নতুন ইতিহাস, এখন বিশ্বে জুড়ে চলছে ‘বলিউডাইজেশন’। এবং এটা নিয়ে বইয়ে সংকলিত লেখার লেখকরা একধরনের শ্লাঘা বোধ করছেন। যেমন আশিষ রাজাধ্যক্ষ। রোজি থমাস, যিনি ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টমিনিস্টারের শিক্ষক তিনি পক্ষ নেন বাজারি বলিউড সিনেমার। বাণিজ্যিক এসব ছবি যে ফর্মুলা ছবি সেটা মানতে তিনি রাজি নন। অন্যদিকে, সঙ্গীতা গোপাল ও বিশ্বরূপ সেন, দুজনই ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনের শিক্ষক, প্রমাণ করার চেষ্টা করেন হিন্দি চলচ্চিত্রের নাচাগানা অপরিহার্য জিনিস, এটা যে শুধু ছবির কাহিনী বয়ানের একটি মাধ্যম, তাই নয় এর সঙ্গে রামায়ন, মহাভারত এমন ধর্মীয় পুরাণেরও নাড়ির সম্পর্ক খুঁজে পান তাঁরা। হিন্দি ছবির নাচাগানার বিরুদ্ধে যৌনতা ও বাস্তব বিবর্জিত ইত্যাদি যে অভিযোগ দাঁড় করান হয় সেগুলোর বিপরীতে তাঁরা মনে করেন এই নাচাগানাই হিন্দি জনপ্রিয় ছবিকে এনে দিয়েছে এক অনন্য স্বাতন্ত্র। হিন্দি ছবির ন্যারেশনে এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ এই নাচাগানা। আর এর ক্ষমতা এমনই যে আমাদের সেটি মোহাবিষ্ট করে রাখতে পারে।

এসব বুদ্ধিজীবীদের কথা একদিকে সরিয়ে চলুন সাম্প্রতিক ঘটনার দিকে চোখ রাখি। নয়াদিল্লিতে ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে বাসের ভেতর মেডিকেল ছাত্রীকে গণধর্ষণের সূত্র ধরে ভারতীয় গণমাধ্যমে উঠে আসে দেশের বিভিন্ন জায়গার ধর্ষণের ঘটনা। নয়াদিল্লিকে না কি বলাই হয় ‘ধর্ষণের নগরী’। নারীর প্রতি অবমাননা আর সহিংসতা কি তাহলে একদিনে হুট করেই শুরু হল? আমার মত অর্বাচিনের মনে প্রশ্ন জাগে, এসব ঘটনার পেছনে কি ‘শিলা কি জওয়ানি’ কিংবা ‘মুন্নি বদনাম হুয়ি’ গানের কোনো ভূমিকা নাই? হিন্দি ছবিতে এই আইটেম গান কি ইদানিং কালের? পুরনো হিন্দি সিনেমাতেও এর নিদর্শন এন্তার মেলে। শুদ্ধ গানে কেন ‘সত্যম শুভম সুন্দরম’ থেকে হালের ‘জিসম’ ছবিতে কি নারীর শরীরকে পুঁজি করা হয় নি? বলিউড ফিল্মে নায়ক ও নায়িকার প্রেমপর্ব শুরু হয় ইভ টিজিং দিয়ে। নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণ একটা সময় হিন্দি ফিল্মের নিয়মিত দৃশ্যে পরিণত হয়েছিল, বিশেষ করে আশি নব্বইয়ের দশকে। এখন নিয়মিত দেয়া হচ্ছে আইটেম গান। এসব গানে কোন ধরনের মুদ্রা আর কথা থাকে? সেটা নিয়ে সাফাই গাওয়া বুদ্ধিজীবীরা নিশ্চুপ। ভোগবাদী এই সমাজে নারীকে প্রত্যেক দিন, প্রতি মুহুর্তে তুলে ধরা হচ্ছে ভোগের সামগ্রী হিসেবে, সেই সমাজে ধর্ষণ বাড়বে সেটাই তো স্বাভাবিক। ভারতের এই বাস্তবতা থেকে বাংলাদেশও বাইরে নয়।

নারীকে পাওয়াই যেন হিন্দি চলচ্চিত্রের মূখ্য বিষয়। নায়ক কিংবা খলনায়ক, উভয়েরই লক্ষ্য কামনার নারীকে নিজের করে পাওয়া। সেটা উত্তক্ত করে হোক, নানা ছলকলা দিয়ে হোক, ফাপা হাল্কা বুলি দিয়ে হোক আর জোর জবরদস্তি করে হোক, যেমন সালমান খানের ‘তেরে নাম’। নায়িকা চলে গেলে নায়ক দুঃখে মদ গিলছেন এত বেশ পরিচিত দৃশ্য হিন্দি ফিল্মে। রোজি থমাসের মত লেখক ‘নসিব’ ছবির উদাহরণ টেনে আনেন বলিউড সিনেমার পক্ষে নিজের যুক্তি তুলে ধরতে, তিনি নানা জনের স্বাক্ষ্য মেনে বলেন, এমন ছবির চিত্রনাট্য লেখা পশ্চিমা ‘আর্ট’ ফিল্মের চিত্রনাট্য লেখার চেয়ে কঠিন কাজ। কিন্তু এই ‘নসিব’ চলচ্চিত্রেই তো দেখা যায় নায়িকাকে না পেয়ে নায়ক মদ গিলছে। অমিতাভ বচ্চনকে তো ঐরকম চরিত্রেই অভিনয় করতে দেখেছি। এসব বাজে দৃষ্টান্তের কথা উল্লিখিত বুদ্ধিজীবীদের আলোচনায় অনুপস্থিত।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাত্রা কোন পর্যায়ে গেলে হিন্দি চলচ্চিত্রে দেখানো অর্ধনগ্ন আইটেম গানের আইটেম গার্লদের চাক্ষুষ করার প্রয়োজন হয়? সেটার প্রদর্শনীই তো চলছে এদেশের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে। মানুষ সেগুলো দেখতেও যাচ্ছে নাওয়াখাওয়া ভুলে। এদেশের মানুষ এখন নাকি হিন্দি গানের সঙ্গে নাচার মুদ্রাও শিখছে কোচিংএর মাধ্যমে! ভারতের এইসব হিন্দি ছবি নির্ভর নাচাগানা বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত সবাই আফিমের মত গিলছে। মানুষের ভেতরকার অমর অজর বাসনার ক্ষুধা নিবৃত্ত করার মোহ তৈরী করে যে পিচ্ছিল পথে মানুষদের ঠেলে দেয়া হচ্ছে সেই পথের ঠিকানাই মিলছে নয়াদিল্লির মত রাজধানীতে, বাসের ভেতর গণধর্ষণে কিংবা অজো পাড়া গায়ে নাম না জানা কোনো মেয়ের ভাগ্যে। একদিকে ভোগসর্বস্ব সংস্কৃতি অন্যদিকে প্রযুক্তির প্রসার। কাজেই এই সমাজে পর্ণো কন্যা হয়ে ওঠে তারকা, হয়ে ওঠে বলিউড নায়িকা: সানি লিওন। ঘরে ঘরে কম্পিউটার, হাতে হাতে থ্রিজি মোবাইল। কাজেই সানি লিওন এখন হাতের মুঠোয়। তবে যৌন বাসনা চরিতার্থ করতে তাই বেপরোয়া পুরুষ হয়ে ওঠে ধর্ষক।

ভারতীয় চলচ্চিত্র যে শক্তি ও ক্ষমতা নিয়ে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে উঠেছে, সেই ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে ঠেকাবে কে? যারা এই দানবের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, তাদের মুখভাঙা জবাব কে দেবে? আফিমের নেশা কাটাতে এগিয়ে আসবে কারা? হিন্দি চলচ্চিত্র ও গান নির্ভর ভারতীয় সংস্কৃতির যে জোয়ার বইছে এদেশে, সেই জোয়ারে উল্টো বৈঠা বাওয়া কঠিন। কিন্তু তারপরও প্রতিকূলে যেতে হবে। ভারতীয় সংস্কৃতি শ্রেষ্ঠ, হিন্দি চলচ্চিত্র এখন আন্তর্জাতিক চেহারা লাভ করেছে, শুধু তাই নয়, হলিউডকেও চিন্তায় ফেলে দিচ্ছে বলিউড এবং হিন্দি ফিল্মকে ভাল করে লক্ষ্য করলে প্রাচীন মহাভারত ও রামায়নকে পাওয়া যাবে: এ জাতীয় বক্তব্য যাঁরা দিচ্ছেন তাঁদের থেকে সাবধান। কারণ জাতীয়তাবাদ এমনিতেই ভয়ানক, তার উপর যদি যোগ হয় হিন্দুত্ব তাহলে বিষয়টা হয়ে ওঠে ভয়াবহ ভয়ানক। এই ভয়াল কিন্তু সুশ্রী দর্শন দানব আরো কৌশলী ও সুচারু হয়ে উঠছে। চিন্তার মধ্যে এমনভাবে বাসা গাড়ছে যে আপনার মনে হবে চোস্ত বিনোদন মানে হিন্দি সিনেমা, মন সজীব করা বিনোদন মানে হিন্দি চলচ্চিত্রের গান, যে গানের সঙ্গে থাকে এক্সোটিক, ইরোটিক ব্যাপারস্যাপার। গায়কীর মধ্যেও এখন যৌনতা।

কাপড় ধোয়ার পাউডারের বিজ্ঞাপন, সেখানেও সালমান খানকে অভিনয় করতে হয় স্ত্রীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহুর্তের। ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম মেখে নারীদের ঝাপিয়ে পড়া উপভোগ করেন শাহরুখ খান। আমের রস খেতে খেতেও ক্যাটরিনা কাইফকে বলতে হয় ‘আমসূত্র’, যা মনে করিয়ে দেয় কামসূত্রের কথা। শুধু শব্দবন্ধটি দিয়ে নয়, ভাবভঙ্গি দিয়েও কাইফ আমন্ত্রণ জানান, আসুন এই আমের রস খেয়ে আপনি ডুবে যান আদিরসে।

হিন্দি সিরিয়াল কি এসবের বাইরে? পরকীয়া, কূটনামি আর প্রেম নিয়ে অহেতুক নেকামি। এসব ধারাবাহিকের কবলে যেহেতু বাংলাদেশী দর্শক পড়ছেন স্বেচ্ছায় তাই এদেশেও তৈরী হচ্ছে হিন্দি ডেইলিসোপ মার্কা ধারাবাহিক।

এখন প্রশ্ন জাগতে পারে পরিত্রাণ কিসে? জবাবে বলব গণমাধ্যমের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে হবে। কোনো কিছুকেই বিনা প্রশ্নে ছেড়ে দেয়া চলবে না। উদ্দেশ্য বিধেয় বিচার বিশ্লেষণ করে, ধরে ধরে এগুতে হবে। নেতিবাচক ক্রিয়াকর্মের বিরুদ্ধে হয়ে উঠতে হবে সরব ও ক্রিয়াশীল। যেহেতু গণমাধ্যম এখন জীবনের অনেকটা জুড়ে তাই একে আর হেলাফেলা করলে চলবে না। এর কোনো কুপ্রভাব যেন জীবনকে আচ্ছন্ন না করে, ভীন দেশের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সেটার সুবাদে দেশীয় বাজার দখল, এদেশের পরবর্তী প্রজন্মকে ভোগবাদী মানসিকতার অধিকারী করে তুলতে না পারে সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে, মনযোগ দিতে হবে গণমাধ্যমের ভূমিকায়।।