Home » আন্তর্জাতিক » ভারতীয় নৌবাহিনী কি চীনের সঙ্গে পাল্লা দিতে যাচ্ছে?

ভারতীয় নৌবাহিনী কি চীনের সঙ্গে পাল্লা দিতে যাচ্ছে?

ধ্রুব জয়শঙ্কর

Indian-Navy-Logo-বেশ কয়েক বছর ধরে চীনের নৌবাহিনী আধুনিকীকরণের প্রক্রিয়া চলছে। এর ফলে ভারতীয় রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে কেমন প্রভাব পড়বে তা নিয়ে ভারতের কৌশলপ্রণেতারা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী কৌশলপ্রণয়ন চিন্তাবিদ সি. রাজা মোহনএর একটি বইয়ে দেখানো হয়েছে কীভাবে হিমালয় থেকে ভারতীয় এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় চীনভারতের প্রতিযোগিতা বেড়ে গিয়েছে। যার প্রভাব পড়বে মহাসাগরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে আমেরিকা, চীন ও ভারতের সম্পর্কের ওপর।

এ সময়টায় ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ডি কে যোশী একটি ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রয়োজনে দক্ষিণ চীন সাগরের কাছে ভিয়েতনামের তেল অনুসন্ধান কাজে চীনের আগ্রাসন প্রতিহত করবে ভারতীয় নৌবাহিনী। ভারতীয় রাষ্ট্রীয় তেল কম্পানি ওএনজিসি বিদেশ ২০০৬ সাল থেকে ভিয়েতনামের সঙ্গে এই অঞ্চলে তেল অনুসন্ধানের কাজ করছে। চীন সব সময় দাবি করছে, তেল অধ্যুষিত সামুদ্রিক এলাকাটি তাদের অধিকারভুক্ত।

তবে এক অর্থে অ্যাডমিরাল ডি কে যোশীর বক্তব্য খুব বেশি চাঞ্চল্যকর মনে করছেন না অনেকে। তারা মনে করছেন, এই ঘোষণার মাধ্যমে ভারতীয় নৌবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির ও উন্নতির একটি সংকেত দিয়েছেন ভারতীয় নৌপ্রধান। যাতে বোঝা যায়, চীনের নৌবাহিনীর উন্নতি ও আধুনিকীকরণের বিষয়টি ভারতের জানা আছে। অন্যান্য নৌশক্তির মতো ভারতও তাদের নিজেদের শক্তিকে সংহত করছে।

অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামরিক প্রযুক্তির উন্নতি এবং জ্বালানী শক্তির প্রতি আগ্রহের কারণে আগের তুলনায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের নৌবাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং পাকিস্তান ও চীনের মতো সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বী দুটো দেশের সীমানা পাহারাকে গুরুত্ব দেয়ার কারণে ঐতিহাসিকভাবেই ভারতের নৌবাহিনী সামরিক বাহিনীর অন্য দুটো বাহিনীর তুলনায় সব সময়ই ছোট এবং সুবিধাবঞ্চিত। এর মাত্র ষাট হাজার নিয়মিত সদস্য আছে। নৌবাহিনীর জন্য ভারতের বার্ষিক বাজেট সাত বিলিয়ন ডলার। যা চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির শক্তি ও বাজেটের চার ভাগের এক ভাগও নয়। ভারতের নৌবাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী যোগ্যতা ধরে রাখার মধ্যে আছে একটি বিমানবাহী জাহাজ, যানবাহন পরিবাহী একটি সেকেন্ড হ্যান্ড জাহাজ, চৌদ্দটি জার্মান অথবা রাশিয়ায় তৈরি ডিজেলচালিত সাবমেরিন এবং বিশটির মতো ডেস্ট্রয়ার এবং ফ্রিগেট।

কিন্তু এর মধ্যেও দেখা যাচ্ছে ভারতের নৌশক্তির নিয়মতি উপস্থিতি ঘটছে ভারতীয় মহাসাগরে। উপস্থিতির দিক দিয়ে যা আমেরিকার নৌশক্তির পরেই অবস্থান করছে। আমেরিকা এবং চীনের পর কেবল জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ানের ক্ষমতা আছে ভারতীয় মহাসাগরে নৌশক্তির উপস্থিত ঘটানোর। যদিও তাদের নৌবাহিনী সেভাবে আলোচিত নয়।

ভারতের নৌবাহিনীর উপস্থিতি চীনকে চিন্তিত করছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের উপস্থিতি নিয়ে। চীনের দুই শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম এবং ফিলিপাইন এরই মধ্যে তিনটি ফ্রিগেট সেই এলাকায় সক্রিয় রেখেছে। এই অবস্থায় ভারতের ছোট উপস্থিতিও এই অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্যে নতুন হিসাব করতে বাধ্য করবে।

ভারতের ক্রমাগত আগ্রহ বেড়ে যাওয়া, সম্পদ ও প্রযুক্তিগত উন্নতি পূর্বে মালাক্কা পর্যন্ত নৌশক্তির প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা প্রশান্ত এবং ভারতীয় মহাসাগরের মিলন কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত। সমুদ্রের এই পথ দিয়ে বিশ্বের শতকরা চল্লিশ ভাগ বাণিজ্য পণ্য এবং অধিকাংশ পূর্ব এশীয় দেশের জ্বালানী তেল পরিবাহিত হয়।

ভারত এখন তার নিজ দেশে পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন একটি সাবমেরিন তৈরি করে ভারতীয় সাগরে পরীক্ষামূলক যাত্রা করাচ্ছে। যা তাদের এই অঞ্চলে নৌশক্তি বৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো অবস্থানে নিয়ে আসবে। আগামী দুই বছরের মধ্যে ভারতের নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করতে যুক্ত হচ্ছে দ্বিতীয় বিমানবাহী জাহাজ এবং ফ্রান্সে তৈরি অত্যাধুনিক সাবমেরিন। নৌবাহিনীর বাজেটও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০০ সালে মোট সামরিক বাজেটের শতকরা পনের ভাগের কম নৌবাহিনীর জন্য বরাদ্দ হলেও ২০১২ সালে তা দাঁড়িয়েছে শতকরা ঊনিশ ভাগে।

২০০৯ সালে আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে পিএইট যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে। ফলে আধুনিক জাহাজ, বিমান এবং সাবমেরিন কেনার মধ্য দিয়ে আগামী বছরগুলোতে ভারত এই অঞ্চলে গভীর সমুদ্রের শক্তিশালী একটি পক্ষ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূণ বিষয় হলো, ভারত এখন আঞ্চলিক নৌবাহিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে। ২০০০ সালে আমেরিকান নৌবাহিনীর প্যাসিফিক কমান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে তাদের এক ধরনের প্রশিক্ষণের কাজ করেছে। ২০০৪ সালে ভারতীয় মহাসাগরে সুনামী পরবর্তী সময়ে আমেরিকা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে মানবিক সহায়তা করার সময় ভারত তার নৌবাহিনীর শক্তি সম্পর্কে ধারণা নিতে চেষ্টা করেছে।

মালাবার সিরিজ নৌ মহড়ার সময় আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং সিঙ্গাপুরের সঙ্গে কাজ করেছে ভারতের নৌবাহিনী। তারা সবার সঙ্গে মিশে গিয়েছে, যা তাদের কাছের এবং দূরের নৌশক্তির সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি বুঝতে সহায়তা করেছে। চীনের সঙ্গে এখানেই তাদের পার্থক্য। চীন ২০১০ সালে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করায় আমেরিকার সঙ্গে সামরিক মৈত্রী বাতিল করতে সময় নেয়নি। জাপানের সঙ্গেও তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে।

তবে এসবের মধ্য দিয়ে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে, ভারত তার নৌশক্তির ব্যবহার করে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। কেননা হিমালয়ের ভঙ্গুর সীমান্ত সম্পর্ক সত্ত্বেও ভারতের সঙ্গে চীনের যৌথ বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে সত্তর বিলিয়ন ডলার যা ক্রমাগত বাড়ছে। এই বিষয়টি দিল্লি সবসময় মাথায় রাখবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ভিয়েতনামে তেলের ওপর ভারতের অধিকারের ঘোষণার ফলে চীনের চাপ ভারতকে আঞ্চলিক এবং আর্ন্তজাতিকভাবে সামাল দিতে হবে। এর আগে ২০০৯ সালে দালাই লামার সফর এবং ভারতীয় কিছু পাসপোর্টে চীন ভিসা দিয়ে অস্বীকার করার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছিল। যা সীমান্তে গোলাগুলির জন্ম দিয়েছিল।

ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ডি কে যোশী যখন তার ঘোষণা দিচ্ছিলেন ঠিক সে সময় ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন চীনে অবস্থান করছিলেন চীনভারত সীমান্তের সংঘাত বন্ধের আলোচনায়। শিবশঙ্কর মেনন সেখানে এক প্রতিক্রিয়ায় অ্যাডমিরাল ডি কে যোশীর বক্তব্যকে মিডিয়া ‘অতিরঞ্জিত’ করেছে বলে বর্ণনা করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন ভিয়েতনাম এবং ফিলিপাইন সামুদ্রিক উপস্থিতির পাশাপাশি ভারতের নৌবাহিনীর উপস্থিতি চীন ভালো ভাবে নেবে।

গত নভেম্বরে চীন যে পাসপোর্ট ইস্যু করেছে তাতে তাদের ম্যাপে ভারতভিয়েতনামের দাবিকৃত অংশসহ বেশ কিছু এলাকা তাদের নিজেদের এলাকা হিসাবে চিহ্নিত করেছে। যার মধ্যে ফিলিপাইন ও তাইওয়ানের দাবিকৃত এলাকাও আছে। এই ম্যাপের মাধ্যমে আঞ্চলিক সামুদ্রিক শক্তি হিসাবে চীন তাদের অবস্থানকে আরো বেশি জোরদার করার চেষ্টা করেছে।

প্রশান্ত মহাসাগরে ভারত পর্যায়ক্রমে তার নৌশক্তি বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের মাধ্যমে এই অঞ্চলে তার নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করে চলেছে। যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাণিজ্যসহ সব কিছুতেই প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। অনেক দেশই এসব অঞ্চলে বিনিয়োগ করেছে। সেই কারণে ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ হযে উঠবে। আমেরিকা, এমনকি চীনও এর বাইরে থাকবে না।

ফরেন পলিসি অবলম্বনে

মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান

১টি মন্তব্য

  1. INDIA is new super power in the WORLD. Becarefull CHINA.