Home » মতামত » মানুষের বিভেদ ও ঐক্য – সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গ – ১

মানুষের বিভেদ ও ঐক্য – সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গ – ১

আনু মুহাম্মদ

Anu-Mohammad-1-মানুষ তার জীবন যাপন করে অনেকের মধ্যে, অনেকের সঙ্গে। জীবন যাপন জীবিকা অর্জন, তার ভালো লাগা মন্দ লাগা, তার ঠিকবেঠিক বোধ, নিজেকে নিয়ে অন্যকে নিয়ে তার ভাবনা, আনন্দ বেদনার অভিব্যক্তি, সৌন্দর্যবোধ, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চিন্তা, খাদ্য সবই তার জীবনের পরিচয়, তার সংস্কৃতি।

মানুষের তো অনেক রকম পরিচয় থাকে। ভাষা বা জাতিগত নৃতাত্ত্বিক পরিচয় দিয়ে তার একটি সম্প্রদায়গত অবস্থান তৈরি হয়। আবার যে ধর্মীয় পরিবারে তার জন্ম তা দিয়ে সম্প্রদায়গত আরেকটি পরিচয় তৈরি হয় তার। লিঙ্গীয় গঠন তার জৈবিক পরিচয় নির্ধারণ করে। দেশ তো বটেই অঞ্চল এমনকি গ্রামও অনেকসময় সম্প্রদায়গত পরিচয়ের একটি অবলম্বন হয়। এছাড়া গোত্র, বংশও অনেক ক্ষেত্রে সম্প্রদায়গত পরিচয়ের ক্ষেত্রে কারও কারও কাছে কখনও কখনও অনেক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আর সামাজিক শ্রেণীগত অবস্থান থেকে তার যে পরিচয় তৈরি হয় তা ভাষা জাতি ধর্ম বর্ণ লিঙ্গকে ছাপিয়ে ওঠার শক্তি ধারণ করে।

.

ধর্মীয় পরিচয় বলতে গিয়ে আমরা অনেক সময় গড়ে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান বলি বটে কিন্তু এই পরিচয় প্রায়শই একজনের ধর্মীয় পরিচয়ের শেষ কথা হয় না। মুসলমান সমাজে সুন্নীশিয়া, সুন্নীর মধ্যে আবার মাজহাবীলামাজহাবী, এর বাইরে আহমদিয়ামোহাম্মদীয়া, এছাড়াও শরিয়তীমারফতী, পীর মাজার ধরে বহুবিধ বিভাজন হতে পারে। এসব পরিচয় সাধারণভাবে কোনো জটিলতা তৈরী না করলেও কখনও কখনও এগুলোও সাম্প্রদায়িক সংঘাত দাঙ্গা তৈরি করতে পারে তার বহু দৃষ্টান্ত আমাদের সামনেই আছে। এখনও এই সম্ভাবনা সবসময়ই জারী আছে। পাকিস্তানে খুব বড় আকারে আহমদিয়া আক্রমণ হয়েছিল ৫০ দশকে। এখনও তার অবসান ঘটেনি। শিয়াদের ওপর আক্রমণ প্রায়ই হয়ে থাকে। সবগুলোতেই শুধু সম্পদ ধ্বংস নয় মানুষের খুনে ভেসে যায় মসজিদ। গত কিছুদিনেই অনেকে এসব আক্রমণে হতাহত হয়েছেন। সেকারণে পাকিস্তানে আহমদিয়া ও শিয়া সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাহীনতা, আক্রান্ত ও খুন হবার আশংকা অমুসলিমদের থেকে কোনো অংশে কম নয় বরং দৃশ্যমান ঘটনাবলীর বিচারে বেশি।

হিন্দু সমাজে একটি বড় বিভাজন হল বর্ণপ্রথা। বর্ণ বলতে রং বোঝায় আবার বর্ণ বলতে বোঝায় বর্গ। এর একটি ইংরেজিতে কালার বা রেস এবং অন্যটি কাস্ট। মানুষের শরীরের চামড়ার রং এর ওপর ভিত্তি করে যে বৈষম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গী ও ব্যবস্থা সেটাই বর্ণবাদ (রেসিজম) নামে সমধিক পরিচিত। এর সূত্রপাত ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক দখল ও আধিপত্যের মধ্য দিয়ে। ‘ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গরা জন্মগতভাবেই উৎকৃষ্ট’ এই মতাদর্শ তৈরি করা হয়েছে ইউরোপের বাইরে ঔপনিবেশিক দখল, অশ্বেতাঙ্গদের শৃঙ্খলিতকরণ এবং শোষণশাসন নিশ্চিত করবার জন্য। পঞ্চদশ শতকের শেষ থেকে ক্রমান্বয়ে আমেরিকা, আফ্রিকা এবং এশিয়া ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে আসে। আমেরিকায় এই দখল নিশ্চিত করবার জন্য সেখানকার উচ্চ সভ্যতার নির্মাতা আদিবাসীদের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ মানুষকে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে আফ্রিকার কালো মানুষদের দাসে রূপান্তর করা হয় এবং তাদের নিয়ে যাওয়া হয় আমেরিকায়। ইউরোপীয় বণিকদের জন্য দাসবাণিজ্য খুবই লাভজনক হয়ে ওঠে। বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গীও সেসময় থেকে তার ডালপালা ছড়িয়েছে।

কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের ‘নিকৃষ্ট মানুষ’ কিংবা সবাক জীব হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গীও সেসময় থেকেই ইউরোপীয় মননে দৃঢ়ভিত্তি লাভ করে। কালো মানুষদের ওপর সবরকমের নৃশংসতা এই দৃষ্টিভঙ্গী দ্বারাই সমর্থিত হয়। কয়েকশো বছরে এটি বহু বহু বর্বরতার জন্ম দেয়। এই দৃষ্টিভঙ্গীর শেকড় এতটাই গভীরে প্রোথিত যে, এখনও এর অবসান হয়নি। উনিশ শতকে দাসপ্রথা রদ হলেও কয়েকদশক আগে পর্যন্তও যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের প্রতি বিদ্বেষ ও বৈষম্যমূলক বিধিব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই কার্যকর ছিল। বহু জায়গায় লেখা থাকতো ‘কুকুর ও কৃষ্ণাঙ্গ প্রবেশ নিষেধ’। বর্ণবাদী নির্যাতনের ইতিহাস ভয়াবহ। এর অর্থ এটা নয় সকল শ্বেতাঙ্গ এর সহযোগী কিংবা এই ব্যবস্থার সুবিধাভোগী। বৈষম্য ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের আন্দোলন সবরকম বৈষম্যনিপীড়ন বিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্রে এক বড় অনুপ্রেরণা। সেই আন্দোলন নতুন ঐক্য ও পরিচয় তৈরি করেছিল যার সাথে মুক্ত শ্বেতাঙ্গরাও ছিলেন।

শরীরের রংভিত্তিক এই বর্ণবাদের বহু আগে থেকে ভারতবর্ষে জারি ছিল ঐশ্বরিক বিধানের নামে পেশাভিত্তিক বর্ণবাদ বা কাস্ট সিস্টেম। এই বর্ণপ্রথা অনুযায়ী মানুষকে কয়েকটি বর্গে বা বর্ণে ভাগ করা হয়। এদের মধ্যে সবার ওপরে ব্রাহ্মণ, সবার শেষে শুদ্র। মানুষের শরীরের সঙ্গে এই তুলনা করে বলা হয়, ব্রাহ্মণ হল মাথা আর শুদ্র হল পা। শুদ্র যারা তারা কায়িক শ্রম করবে, পদতলে থাকবে উচ্চবর্ণের মানুষদের, তাদের সবরকম সেবাযত্ন করবে। এটাই ঐশ্বরিক বিধান। আর এই বিধান বলেই আর একটি বড় জনগোষ্ঠীকে সকল বর্ণের বাইরে রাখা হয়, তার মানে তারা আরও নিকৃষ্ট। তারা অচ্ছুৎ, অস্পৃশ্য এবং অভিশপ্ত। এম. কে. গান্ধী এদের নাম দিয়েছিলেন ‘হরিজন’। কিন্তু নাম পাল্টালেও অবস্থানের কোন পরিবর্তন হয়নি তাদের। শুদ্র এবং হরিজন মিলেই এই অঞ্চলের হিন্দু সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। দাসের জীবনের মতোই যারা হাজার হাজার বছর ধরে ভয়াবহ বৈষম্য, নিপীড়ন এবং অপমানের মধ্য দিয়ে জীবন পার করেছেন। দাসপ্রথার অবসান হয়েছে কিন্তু ধর্মীয় বিধানের নামে প্রতিষ্ঠিত এই বর্ণপ্রথা দুর্বল হলেও বিলুপ্ত হয়নি, এখনও একটি ভয়ংকর ব্যবস্থা হিসেবে টিকে আছে। সেকারণে ভারতে এই বিশাল জনগোষ্ঠী অহিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তুলনায় কম আক্রান্ত বা নিপীড়িত নন। বরং তাদের ওপর যে বৈষম্য ও নিপীড়নের ব্যবস্থা তা এমনভাবে ধর্মীয় আবরণে বৈধতা ও সম্মতি লাভ করেছে যে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বিদ্রোহও কঠিন।

বর্ণপ্রথার প্রভাব অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও দেখা যায়। মুসলমানদের মধ্যে শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী কোন বর্ণপ্রথা থাকার কথা নয়। কিন্তু দেখা যায় পেশা, সামাজিক অবস্থান, সম্পত্তি মালিকানার পার্থক্যে যারা নিম্নবর্গের মুসলমান তারাও মুসলমান সমাজে প্রায় নিম্নবর্ণ হিসেবে পরিগণিত হন। মুসলিম সমাজে আশরাফ (অভিজাত) ও আতরাফ (অনভিজাত সাধারণ) বিভাজন এভাবেই তৈরি হয়েছিল। শ্রেণীবৈষম্য এখানে অন্যরূপে বৈধতা লাভের চেষ্টা করে।

খ্রীস্টান ধর্মের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বিভাজন আছে। ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্ট পরিচয়েই এই বিভাজন শেষ হয় না। এর মধ্যে ও এর বাইরেও আছে তার অনেক শাখা প্রশাখা। এই বিভাজন শুধু বিশ্বাসের বা কিছু আচারের তফাৎ নয়, এই বিরোধ এতদূর তীব্র ও স্থায়ী রূপ লাভ করে যে তা পরস্পরের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক নিষিদ্ধ করে। ইউরোপের বহু স্থানে এই পরিচয়ের তফাৎ ভিত্তি করে চাপা বিরোধ ছাড়াও যুদ্ধ সংঘাতের ঘটনাও ইতিহাসে অনেক পাওয়া যাবে।।

5 টি মন্তব্য

  1. সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আলোচনা করে তেমন একটা লাভ হবে না। আমাদের উচিত ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র নিয়ে ক্রমাগত আলোচনা ও লেখালেখি করা।

  2. সোহেল মনির

    ঢালাও ভাবে না লিখে মানুষের সভ্যতায় সমাজ বিকাশের ধারায় যে সময়টিতে উৎপাদন চরিত্রের  ভিত্তিতে ধর্মীয় , ঐশ্বরিক বিধান,বর্ণ বৈষম্য কেন্দ্রিক শাষন তথা সমাজ ব্যবস্হার প্রচলন ছিল তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সামনে রেখে  সাম্প্রদায়িক প্রসঙ্গ ব্যাখা করা প্রয়োজন কেননা উৎপাদন চরিত্রের উপরই তার সামগ্রিক সাংস্কৃতি অবকাঠামো।

  3. nice writting

  4. ফিয়োনা

    ঢালাও ভাবে না  লিখে মানব  সমাজ বিকাশের ধারায় উৎপাদন চরিত্রের ভিত্তিতে যে সময়টিতে ধর্মীয়, ঐশ্বরিক বিধান, বর্ণবৈষম্য কেন্দ্রিক শাসন তথা সমাজ ব্যবস্হা প্রতিষ্ঠিত হয় তা উল্লেখ করে সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে লিখলে ভাল হয় । কেননা উৎপাদন কাঠামোর উপরই নির্ভর করে সেই সমাজ ব্যবস্হার সামগ্রিক সাংস্কৃতিক অবকাঠমো।
     

  5. ঢালাও ভাবে না  লিখে মানব  সমাজ বিকাশের ধারায় উৎপাদন চরিত্রের ভিত্তিতে যে সময়টিতে ধর্মীয়, ঐশ্বরিক বিধান, বর্ণবৈষম্য কেন্দ্রিক শাসন তথা সমাজ ব্যবস্হা প্রতিষ্ঠিত হয় তা উল্লেখ করে সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে লিখলে ভাল হয় । কেননা উৎপাদন কাঠামোর উপরই নির্ভর করে সেই সমাজ ব্যবস্হার সামগ্রিক সাংস্কৃতিক অবকাঠমো।