Home » অর্থনীতি » অস্ত্র ক্রয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

অস্ত্র ক্রয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

আমীর খসরু

arms-deal-1-রাশিয়া থেকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কেনা এবং তা স্থাপনের বিষয়ে আলাপ আলোচনা হয়েছে দীর্ঘদিন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সংবাদ মাধ্যমকে এ খবরাখবর প্রায় নিয়মিতই দিতেন। এ নিয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরসহ কয়েক দফায় নানা ধরনের চুক্তি ও মতৈক্যের বিবরণী উভয় পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। মন্ত্রী সভার বৈঠকেও এ সংক্রান্ত বিষয় অনুমোদন দেয়া হয়।

অর্থাৎ, জনগণ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাশিয়া সফরকালে একশো কোটি ডলার বা আট হাজার কোটি টাকার অস্ত্র কেনা হবে এ খবরটি প্রথম ভাসা ভাসা ভাবে জানা গেল, তিনি যেদিন মস্কো যাবেন তার একদিন দুই আগে। সফরের একদিন আগে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডাঃ দীপু মনির কাছে সাংবাদিকরা যখন জানতে চাইলেন অস্ত্র ক্রয় সম্পর্কে, তখন তিনি অস্পষ্ট জবাব দিয়ে বললেন, হ্যা, এধরণের একটি চুক্তি হতে পারে। তবে এ সম্পর্কে ইআরডি সবকিছু জানে।

ইআরডি সচিবের কাছে জানতে চাইলে তিনি এ সম্পর্কিত কোন প্রশ্নের জবাব দেননি। অস্ত্র ক্রয় নিয়ে এভাবেই চরম গোপনীয়তা রক্ষা করা হলো। মন্ত্রিসভা জানলো না, সংসদীয় কমিটি জানলো না আর জাতীয় সংসদকে অবগত করার তো কোন রীতি তাদের মধ্যে নেই। সব মিলিয়ে জানলো না দেশবাসী আট হাজার কোটি টাকার অস্ত্র কেনার চুক্তি সম্পর্কে। এই অস্ত্র কেনা হলো সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটে, সাড়ে চার শতাংশ হারে সুদে।

যখন অস্ত্র ক্রয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে কয়েকদিন ধরে বিতর্ক চললো, প্রশ্ন তোলা হলো, তারপরে সোমবার সশস্ত্রবাহিনীর পক্ষ থেকে এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হলো, রাশিয়া থেকে অস্ত্র কেনায় কোন অস্বচ্ছতা নেই।

দেশের অর্থনীতির অবস্থা এমনই যে, আন্তর্জাতিক মূদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর কাছ থেকে একশো কোটি ডলার ঋণ সুবিধা লাভের জন্য সরকার শর্ত হিসেবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে। ঠিক একই পরিমাণ অর্থ ঋণ নিয়ে অস্ত্র কেনা হলো। কিন্তু এর অগ্রাধিকার, প্রয়োজনীয়তা কি ছিল, স্বচ্ছতা কতটুকু বজায় রাখা হয়েছে তা প্রশ্ন সাপেক্ষ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অস্ত্র কেনা হয় টেন্ডারের ভিত্তিতে বা বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে তুলনামূলক দর কষাকষির মাধ্যমে। কারণ, জাতীয় স্বার্থই হচ্ছে বড় কথা। কিন্তু দুই সরকারের মধ্যে দরকষাকষিবিহীন অবস্থায় যখন অস্ত্র কেনা হয় তখন এমন বাধ্যবাধকতার বেড়াজালে আবদ্ধ হতে হয় যে, কোন উপায় থাকে না বা উপায় রাখা হয় না। আর সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটে কোনকিছু কেনার বিষয়টিকে আমাদের দেশে নিরুৎসাহিত করা হয়। কিন্তু অস্ত্র কেনা হলো সেই সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটেই।

১৯৭৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে কোন অস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জামাদি বলতে গেলে কেনেইনি। ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার অস্ত্র কেনার বিষয়টি দীর্ঘকাল ধরে অব্যাহত আছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টার পরেও। কিন্তু বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালের পর থেকে নিজস্ব ভূরাজনৈতিক, কৌশলগত এবং বৈশ্ব্যিকসহ সামগ্রিক পরিস্থিতির বিবেচনায় রাশিয়া থেকে অস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জামাদি আর কেনেনি। বাংলাদেশের অস্ত্র ক্রয়ের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়ায় চীন। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কিছু অস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জামাদি বাংলাদেশকে সরবরাহ করেছে। এ বিষয়টি মনে রাখতে হবে যে, আমাদের সশস্ত্রবাহিনী ঐসব অস্ত্র ও সরঞ্জামাদি ব্যবহারের দিক দিয়ে এবং মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে এর ওপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে রাশিয়া থেকে নতুন সামরিক সরঞ্জামাদি কেনার ক্ষেত্রে একধরণের জটিলতা এবং ঝামেলার সৃষ্টি হতে পারে।

মনে রাখতে হবে, নতুন অস্ত্র এবং সরঞ্জামাদি কিনলে তার জন্য নতুন করেই কারিগরি দক্ষতা তৈরি করতে হয়। দক্ষ কৌশলী, প্রকৌশলী থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষ পর্যন্ত একটি বিরাট ব্যয়ও বাড়তি এসে পড়ে। যেমনটি হবে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও।

তাছাড়া, রাশিয়ার সামরিক সরঞ্জামাদির মান নিয়েও বিশ্বব্যাপী প্রশ্ন আছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ মিগ২৯। বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময় যে আটটি মিগ রাশিয়া থেকে কেনা হয়েছিল তার চারটি এখন উড্ডয়নের সক্ষম। বাকিগুলোকে ইউক্রেনে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে মেরামতির জন্য। রাশিয়ার মিগ নিয়ে এর বড় বাজার ভারত যে কত জটিল সমস্যার মধ্যে আছে তা ২০১২ সালের মাঝামাঝি তাদের পার্লামেন্টের বিতর্ক থেকেই জানা যায়।

কূটনীতির সঙ্গে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত ক্রয়ের একটি বিরাট সম্পর্ক আছে। বাংলাদেশ হঠাৎ করে রাশিয়া থেকে অস্ত্র কেনায় বাংলাদেশের অস্ত্র ও সামরিক সরজ্ঞামাদির ক্রয়ের দুই উৎস চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বাভাবিকভাবেই যে বিষয়টিকে সহজভাবে নেবেনা, তা বুঝতে নিরাপত্তা বিশ্লেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই।

১৯৭৫ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ তৎকালিন বিশ্ব ব্যবস্থায় রাশিয়া ভারত ‘অক্ষে’ অবস্থান করত। কিন্তু এরপরে বাংলাদেশের সঙ্গে চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ক্রমাগত উন্নতি হতে থাকে। তবে বর্তমানে এই দুই দেশের সঙ্গেই ক্ষমতাসীন সরকারের সম্পর্ক ভাল যাচ্ছে না। এ অবস্থায় বাংলাদেশ তার অক্ষপরিবর্তন করেছে কিনা এমন একটি ইঙ্গিত ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ অন্যান্য ক্ষমতাধর দেশগুলোর কাছে পৌঁছে গেছে। অক্ষ পরিবর্তনে বাংলাদেশ ভারত মহাসাগর সহ ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোন ক্রমেই লাভবান হবে না, বরং বড় একটি ঝুঁকির মধ্যে আমরা যে পড়ে গেছি, তা সন্দেহাতীত ভাবে বলা যায়। একশো কোটি ডলারের অস্ত্রকেনা যদি পার্শ্ববর্তী ভারতকে সামরিক কৌশলগত দিক দিয়ে ছাড় দেয়ার জন্য হয়, তবে তা ভিন্ন কথা।

এতবড় একটি অস্ত্র ক্রয় চুক্তি হলো, ‘নিজেরা নিজেরা’ বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে, তাহলে তাতে নানাবিধ সন্দেহ থেকেই যায় এবং জনগণ এ নিয়ে নানামূখী আলাপ আলোচনা করতেই থাকবে। বরং সরকারের উচিত ছিল একটি প্রতিরক্ষা নীতিমালা তৈরি করে এর আলোকে এ ধরণের বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত নেয়া। কিন্তু তা হয়নি। আগেই বলা হয়েছে, যে জাতীয় সংসদসহ কাউকেই এ বিষয়টি জানতে দেওয়া হয়নি।

সমরাস্ত্র কেনার বিষয়টি গোপনীয় বলে যে তত্ত্ব ক্ষমতাসীনরা দিচ্ছে তা ভুল। আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও সমরকৌশল কি আছে বা থাকবে তাই হচ্ছে আসলে গোপনীয় বিষয়টি। গোপনীয়তার কথা বলে, সঙ্গোপনে, কাউকে কিছু না জানিয়ে, অস্ত্র ক্রয়ের মত বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ থাকা এ কারণে অমূলক কিছু নয়। বরং সরকারের উচিত হবে চুক্তির বিষয়টিকে আমজনতাকে না হলেও, এটি সংসদে পেশ করা।।

(বাংলাদেশফার্স্ট.কম)