Home » অর্থনীতি » অস্ত্র ক্রয় – বিশ্লেষকের প্রতিক্রিয়া

অস্ত্র ক্রয় – বিশ্লেষকের প্রতিক্রিয়া

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

hasina-putin-1-রাশিয়া থেকে একশো কোটি ডলার বা আট হাজার কোটি টাকার অস্ত্র কেনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনাসমালোচনা চলছে। এ অস্ত্র কেনার প্রয়োজনীয়তা এবং প্রেক্ষাপট সম্পর্কে দুজন বিশ্লেষক তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আমাদের বুধবারের কাছে।

অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ

রাশিয়া থেকে অস্ত্র কেনা প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আওয়ামী লীগ হয়তো মনে করছে, বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি থাকা প্রয়োজন। এ জন্য যে সব প্রভাবশালী রাষ্ট্র আছে, তার একটি বা দুটোর উপর নির্ভরশীল না থেকে, বড় বড় যে রাষ্ট্র আছে তার সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে লাভ হবে। তবে বর্তমানে ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ‘যথেষ্ট ভাটা’ রয়েছে। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঝামেলা দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক তৈরি করলে ভারত তাকে কিভাবে নেবে, সেটাও হয়তো সরকার বিবেচনায় নিয়েছে। এর উপরে নির্বাচনের বাকি আছে মাত্র এক বছর। এছাড়া আমাদের সেনাবাহিনী যেহেতু বেশ কিছুদিন ধরে তার উন্নয়নের কথা বলছিল সে কারণেও এই আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা তারা উপলব্ধি করেছেন বলে মনে হয়। এ কারণেই রাশিয়া সফরকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখতে হবে। এই সফরকে যদি মতাদর্শের প্রচেষ্টা হিসেবে ধরা হয়, তবে তা বাংলাদেশের স্বার্থে কতোটা কাজে দিবে তা দেখার বিষয়। কারণ ১৯৭১ সালের মস্কো এবং ২০১৩ সালের মস্কো এক নয়। এখন স্নায়ু যুদ্ধ নেই। ১৯৭১ সালে যে সমর্থন তার পেছনের কারণ ছিল স্নায়ু যুদ্ধ। তখন সে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিল চমৎকার। এখন যেহেতু স্নায়ু যুদ্ধ নেই সে কারণে ১৯৭১ এর মস্কোকে ২০১৩ সালে নিয়ে এসে বাংলাদেশের কতোটা লাভ হবে, বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাংলাদেশে ব্যবসায়ীরা কতোটুকু লাভবান হবেন তা পর্যবেক্ষণের বিষয়।

একশো কোটি ডলারের অস্ত্র কেনা নিয়ে চীনের সঙ্গে কতোটা টানাপোড়েন দেখা দেবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। কারণ চীন কোন দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে অর্থনীতি, সামরিক, রাজনীতি এগুলো আলাদা ভাবে রাখতে চায়। কিন্তু সন্দেহ নেই সম্পর্ক উন্নয়নে যে চেষ্টাগুলো থাকে, সে উৎসাহে হয়তো ভাটা পড়বে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো বিষয়টি অন্যভাবে দেখবে। বিশেষ করে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের যে সম্পর্ক, সে প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সঙ্গে ঋণের যে বিষয়টি এখন যুক্ত হলো, তাতে লাভের চেয়ে যদি ক্ষতি হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে তারা নিশ্চয়ই বিষয়টিকে বিশেষ বিবেচনা নিয়ে আসবে।

আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, ভারতের সঙ্গে যেহেতু রাশিয়ার বড় ধরনের সামরিক সম্পর্ক আছে এবং বাংলাদেশও যদি এমন সম্পর্ক রাখে, তাহলে পাশ্ববর্তী দেশ বিষয়টিকে নেতিবাচক ভাবে দেখবে না সরকার হয়তো বিষয়টিকে সেভাবেই বিবেচনা করছে।

. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং অর্থনীতিবিদ ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অস্ত্র ক্রয় সম্পর্কে বলেন, অস্ত্র কিনতে হয় নিরাপত্তা ও নিরাপত্তার হুমকি আছে কিনা তা বিবেচনায়। আর এটি করতে হয় প্রতিরক্ষা নীতিমালার অধীনে। তবে অর্থনীতির দিক বিবেচনায় এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, বর্তমানে আমাদের যা প্রয়োজন তাহচ্ছে, প্রবৃদ্ধি অর্জন, দারিদ্রহার কমে যাওয়ার যে প্রবণতাটি ছিল তার হ্রাস পাওয়ার মতো যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা মোকাবেলা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা। এর জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। অস্ত্র কেনার মাধ্যমে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি হলো। এই অর্থ দিয়ে ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করলে তাতে মানুষেরই সুবিধা হতো। কিন্তু সরকার যে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। কারণ প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কোন কিছুই তো প্রকাশ্যে আলোচনা হয় না।

বর্তমানে আমরা নানা অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে আছি, যেমন একদিকে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারছি না অন্যদিকে মূলধনী যন্ত্রাংশসহ আমদানি ব্যয় কমে গেছে, যা শিল্প খাতকে দারুনভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। সুদের হার কমে যাওয়ায় বিনিয়োগযোগ্য তহবিল খরচ বেড়ে গেছে। এবং রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা গত ছয় মাসে অর্জিত হয়নি। এই সব সমস্যার আলোকে অস্ত্র কেনার বিষয়টি কোন পরিকল্পনার ভিত্তিতে কিভাবে এসেছে? সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন জরুরি তাতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের অংশগ্রহণ আছে কিনা? সংসদীয় কমিটির বৈঠকে বিষয়টি আদৌ আলোচিত হয়েছে কিনা এসব বিষয়গুলো জরুরি। অস্ত্র কেনা হয়েছে সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটে। এক্ষেত্রে সুদের হার কি, অস্ত্র কেনা নিয়ে অন্য কোন দেশের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে কিনা এবং অন্য দেশ ভালো দামে এটা বিক্রি করতে পারতো কিনা এ সব বিষয় সম্পর্কে মানুষের কাছে কোনো তথ্য নেই, অথচ এগুলো প্রকাশ্য হওয়া জরুরি ছিল।।