Home » অর্থনীতি » অর্থনীতির জন্য দুঃসংবাদ – শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে

অর্থনীতির জন্য দুঃসংবাদ – শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

unstable-economy-1-উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ধারাবাহিকভাবে কমছে। কমছে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির পরিমাণও। নতুন শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা না হওয়াতেই এমনটা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিদ্যমান শিল্পকারখানা সঙ্কুচিত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তারা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। এর বাইরে গ্যাসবিদ্যুতের সঙ্কট, ব্যাংক ঋণের উচ্চসুদ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ও সর্বোপরি বিশ্বমন্দার আশঙ্কায় নতুন বিনিয়োগ করতে উদ্যোক্তরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে জাতীয় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। অর্থনীতিবিদরা জানাচ্ছেন, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ধারা অব্যাহত থাকলে কর্মসংস্থানসহ সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এটা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে না পারলে সামাজিক অস্থিরতা বেড়ে যাবে। বর্তমান পরিস্থিতির জন্য কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন তারা। প্রথমত, গ্যাস সংযোগ দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। আবার বিদ্যুৎ সংযোগ মিলছে শর্তসাপেক্ষে। এর প্রভাবে নতুন নতুন শিল্পকারখানা উৎপাদনে আসছে না। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। টাকার অবমূল্যায়ন বিষয়টিকে আরও সঙ্গীন করে তুলেছে। তৃতীয়ত, ব্যাংকঋণের সুদের হার বাড়ায় বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। রফতানি কমছে।

দেশের শ্রম বাজারে প্রতি বছর ১৮ লাখ নতুন মুখ যোগ হচ্ছে। এ কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। করতে হবে নতুন শ্রম বাজারের সন্ধান। পাশাপাশি কাজের বিনিময়ে কর্মসংস্থান কর্মসূচির সম্প্রসারণ করতে হবে। তৈরী পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমে যাবে। কেননা সরকার নতুন গ্যাস সংযোগ দিচ্ছে না, বিদ্যুৎ সংযোগের জটিলতা, উচ্চ ঋণের সুদ, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে। দ্বিতীয় দফায় বিশ্বমন্দার প্রভাবও পড়েছে। প্রথম মন্দার সময় সরকার বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেয়ায় রফতানি খাতে আশানুরূপ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। কিন্তু এবার তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এদিকে কমছে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা। এ পরিস্থিতিতে রফতানি আয়ও কমতে শুরু করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লেনদেনের ভারসাম্য সারণীতে দেখা যায়, চলতি ২০১২১৩ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে আমদানি ব্যয় ও রফতানি আয়ের মধ্যে পার্থক্য দাঁড়িয়েছে ৩৪৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার। গত বছরের এই সময়ে ঘাটতি ছিল ৪৪৮ কোটি ১০ ডলার। এ হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে ৯৮৭ কোটি ডলার, বা ২২ শতাংশ। জ্বালানি তেল ও খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি এই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানিও কমেছে, যা শিল্পায়নের জন্য নেতিবাচক বলে মনে করছেন গবেষকরা। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক জায়েদ বখত বলেন, ‘সার্বিকভাবে আমদানি ব্যয় কমা ভাল। তবে শিল্প স্থাপনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যে মূলধনী যন্ত্রপাতি, তার আমদানি কমলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তেমনটা ঘটলে চলতি অর্থবছরে সরকারের প্রত্যাশিত ৭ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন নাও হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

বেসরকারী গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আপাত দৃষ্টিতে বাণিজ্য ঘাটতি কমাকে ভাল মনে হতে পারে। আমদানি খাতে ব্যয় কমছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় এটাকে পজিটিভ বলা যাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘ক্যাপিটাল মেশিনারি (মূলধনী যন্ত্রপাতি), কাঁচামালসহ শিল্প খাতের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের পণ্যের আমদানি কমছে। এতে শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। উৎপাদন কম হবে। কাক্সিক্ষত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন নাও হতে পারে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাইনভেম্বর সময়ে মূলধনী পণ্য আমদানি ব্যয় হয়েছে ৩১০ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। গেল অর্থ বছরে একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩৪৫ কোটি ৯১ লাখ ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে নেতিবাচক (-১০.২৪ শতাংশ)। এ সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ৯ দশমিক ২৬ শতাংশ।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সাধারণত বাণিজ্য ঘাটতি প্রতিবছরই বাড়ে। তবে এবার ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে ধানের বাম্পার ফলনের কারণে চাল আমদানি করতে হচ্ছে না। জ্বালানি তেল আমদানি খাতেও ব্যয় কম হচ্ছে। গত অর্থবছরের চেয়ে এবার সার্বিক বাণিজ্য কম হবে বলেই মনে হচ্ছে। আমদানি কমায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ১৩শ’ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকলেও আমদানী বাণিজ্যে মারাত্মক স্থবিরতা বিরাজ করছে। হলমার্ক কেলেংকারীসহ বিভিন্ন জালিয়াতিতে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের কয়েক হাজার কোটি টাকা লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার পর অতিরিক্ত সতর্কতার নামে ব্যাংকগুলো এলসি খোলা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে শিল্পের মেশিনারী এবং কাঁচামাল আমদানি আগের তুলনায় দ্রুত কমছে। বাংলাদেশ আমদানি নির্ভর দেশ। কৃষি প্রধান দেশে পিঁয়াজ রসুন থেকে শুরু করে চাল ডাল পর্যন্ত সবই আমদানি করা হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালও আমদানি হয় বিদেশ থেকে। বিদেশ থেকে আমদানি করা হয় মেশিনারী। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে দেশের আমদানি বাণিজ্যে মারাত্মক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে।কারণ বিভিন্ন ব্যাংক এলসি খোলা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। এলসি খোলা ছাড়া কোন ধরনের পণ্য আমদানি সম্ভব হচ্ছে না। এই অবস্থায় ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টিরও আশংকা করা হচ্ছে। সূত্র বলেছে, দেশের শিল্পায়ন এবং আমদানি রফতানি বাণিজ্যের পুরোটাই ব্যাংকের অর্থায়নের উপর নির্ভরশীল। ব্যাংকের টাকা ছাড়া শিল্পায়ন বা বড় চালান আমদানি অসম্ভব ব্যাপার।

হলমার্ক কেলেংকারীর পর বিভিন্ন ব্যাংক বেশ সতর্ক হয়ে উঠে। দেশের সরকারি বেসরকারি সব ব্যাংকই বিভিন্ন শিল্প গ্রুপের কাছ থেকে ঋণের টাকা সমন্বয় করিয়ে নেয়। আগের ঋণ সমন্বয় করিয়ে নতুন করে ঋণ না দেয়ায় বড় গ্রুপগুলো চিন্তায় পড়ে যায়। একটি শিল্প গ্রুপ একই সঙ্গে দশটি ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা করে। একটি ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে চালান আমদানি করে। ঐ চালানের টাকা দিয়ে আরো কয়েকটি ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করে। আবার পরবর্তীতে অন্য ব্যাংকটির ঋণ দিয়ে নতুন চালান আনে। তা দিয়ে আবারো সমন্বয় করে। এভাবে একটি সার্কেলের মাধ্যমে ব্যবসা করেন বড় শিল্পপতিরা। এক ইন্ডাস্ট্রির টাকা অন্য ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ করার ঘটনাও অনেক। কোন কোন ব্যাংক আগের ঋণ সমন্বয় করলে নতুন করে ঋণপত্র দেবেন, এমন আশ্বাস দিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করেছে। নিজেদের ব্যাংক আছে এমন শিল্প গ্রুপ কোন রকমে সমন্বয় করতে পারলেও ব্যাংক নেই এমন গ্রুপগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। বিশেষ করে ভোজ্য তেল এবং নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী আমদানির সাথে জড়িত গ্রুপগুলো ব্যবসা গুটিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে, বাড়ছে দাম। বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে কাঁচামালের তীব্র সংকট বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, কিছুদিন আগেও বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপকেরা অফিসে এসে বসে থাকতেন ঋণপত্র খোলার জন্য। মাত্র কিছুদিনের মধ্যে চিত্র একেবারে উল্টো হয়ে গেছে। এখন শিল্পপতিদের ব্যাংকে গিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে।।

১টি মন্তব্য

  1. চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে আমদানি ব্যয় ও রফতানি আয়ের মধ্যে পার্থক্য দাঁড়িয়েছে ৩৪৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার। গত বছরের এই সময়ে ঘাটতি ছিল ৪৪৮ কোটি ১০ ডলার। এ হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে ৯৮৭ কোটি ডলার? i’m not clear of this statistics?