Home » আন্তর্জাতিক » অস্কার ২০১৩ – লিঙ্কন লাদেন না ওবামার

অস্কার ২০১৩ – লিঙ্কন লাদেন না ওবামার

বিধান রিবেরু

Lincolnফিল্ম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড অর্থাৎ অস্কার, ঐতিহ্য মোতাবেক ১০ জানুয়ারি ঘোষণা করা হয় মনোনয়নের তালিকা। হলিউডের ডলবি থিয়েটারে ২৪ ফেব্রুয়ারি এই মনোনয়ন থেকেই ঘোষিত হবে চূড়ান্ত বিজয়ীর নাম। এ পর্যন্ত সবকিছুই কমবেশী আগের ৮৪ বছরের মত। ফারাকের নিশানা খাড়া হয় লিঙ্কন আর লাদেনে এসে। আকলমন্দ পাঠক এরইমধ্যে ঠাওর করতে পারছেন আমি স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘লিঙ্কন’ ও ক্যাথরিন বিগেলোর ‘জিরো ডার্ক থার্টি’র কথা বলছি। প্রথম ছবিটি যুক্তরাষ্ট্রের উনবিংশ শতাব্দির পটভূমিতে, যখন সামাজিক প্রগতির জন্য, বর্ণবৈষম্য দূর করতে লড়াই সংগ্রাম করছেন একদল মানুষ, যাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আব্রাহাম লিঙ্কন, যাঁকে বাদ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতির ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়। আর দ্বিতীয় ছবির ভিত্তিভূমি একবিংশ শতাব্দী, যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াই এবং সেই লড়াইতে মার্কিন প্রশাসনের এক নম্বর শত্রু আলকায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে অনুসন্ধান ও খুন।

এই দুই চলচ্চিত্রই এবার দাপট দেখাচ্ছে অস্কারে, মানে মনোনয়নের হিসাবে। স্পিলবার্গের ‘লিঙ্কন’ মনোনয়ন পেয়েছে বারোটি শাখায়, যা এবারের আসরে সর্বোচ্চ: শ্রেষ্ঠ ছবি, শ্রেষ্ঠ অভিনেতা (ডানিয়েল ডে লুইস), শ্রেষ্ঠ সহ অভিনেতা (টমি লি জোনস), শ্রেষ্ঠ সহ অভিনেত্রী (স্যালি ফিল্ড), শ্রেষ্ঠ পরিচালক (স্পিলবার্গ), সাহিত্য থেকে উপযোগী করে নেয়া শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য (টনি কুশনার), শ্রেষ্ঠ সিনেমাটোগ্রাফি (জ্যানুস ক্যামিনিস্কি), শ্রেষ্ঠ পোশাক পরিকল্পনা (জোয়ানা জনস্টন), শ্রেষ্ঠ সম্পাদনা (মাইকেল কান) এবং শ্রেষ্ঠ মৌলিক সঙ্গীত (জন উইলিয়ামস) সহ মোট বারোটি শাখায়।

অন্যদিকে, বিগেলোর ‘জিরো ডার্ক থার্টি’ ৮৫তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডে মনোনয়ন পেয়েছে শ্রেষ্ঠ ছবি, শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী (জেসিকা চেসটেইন) এবং শ্রেষ্ঠ মৌলিক চিত্রনাট্য (মার্ক বোল) এই তিন শাখায়। আমরা জানি, ২০১১ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিকল্পনা মাফিক রাতের অন্ধকারে নিরবে ইউএস নেভি সিলের একটি দল পাকিস্তানে খুন করতে যায় ওসামা বিন লাদেনকে। নাইন ইলেভেনের ঘটনার পর থেকেই লাদেনকে আদাজল খেয়ে খুঁজতে থাকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সিআইএর কথা যেহেতু এল, আরেকটি ছবির নাম না বললেই নয়, সেটি হল বেন অ্যাফ্লেকের ‘আরগো’। এই ছবিতেও সিআইএর গুণকীর্তণ। ১৯৭৯৮০ সালে ইরানের জিম্মি নাটক নিয়ে তৈরী হয়েছে এই ছবি। এখানে দেখান হয় কৌশলে জিম্মি মার্কিনীদের নিজেদের দেশে ফিরিয়ে আনে সিআইএর গুপ্তচরেরা। ৮৫তম অস্কারে এই ছবিখানাও মনোনয়ন পেয়েছে, শ্রেষ্ঠ ছবিসহ সাতটি শাখায়।

একদিকে নিজেদের দেশে গৃহযুদ্ধ ও সেই যুদ্ধের মাধ্যমে দাসত্ব ঘোচানোর ইতিহাসকে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরা (‘লিঙ্কন’) অন্যদিকে সন্ত্রাস দমনের নামে সার্বভৌম পাকিস্তানে গোপনে হামলা পরিকল্পনা ও হত্যা করা (‘জিরো ডার্ক থার্টি’) কিংবা অধুনা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের চক্ষুশূল ইরানের মাটি থেকে জিম্মিদের কৌশলে ছিনিয়ে আনা (‘আরগো’)। তিনটি ছবিতেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সাফাই গাওয়ার অভিন্ন সুরটি চোখ এড়ায় না। কিন্তু উল্টো সুর কিন্তু ঠিকই বেজে ওঠে, মানবতার প্রশ্নে। এক ছবিতে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ লড়াই করছেন দাসত্ব ও বর্ণবৈষম্য দূর করতে, আরেক ছবিতে অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া দূরে থাক, ‘গ্যাঞ্জামে’র ভয়ে ভাসিয়ে দেয়া হয় সাগরে। কেউ কেউ অবশ্য বিশ্বাস করছে না মার্কিনীদের দেয়া এই সলিল সমাধি দেয়ার কথা। যাহোক, ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা মিশনের গোপন সাংকেতিক নাম ছিল ‘জেরোনিমো’। কে এই জেরোনিমো? তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসী নেতা, তাঁর গোষ্ঠীর নাম ছিল চিরিকাহুয়া অ্যাপাচে। ১৮২৯ সালে বর্তমানের নিউ ম্যাক্সিকোতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সেসময় আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় চলছে শ্বেতাঙ্গদের দখলদারিত্ব। তাদের ঠেকাতে ভূমিপুত্র রেডইন্ডিয়ানরাও লড়াই করছে প্রাণপণ। ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১৮৫৮ সালে মারা যান জেরোনিমোর বাবা মা। প্রতিশোধ নিতে শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেন জেরোনিমো। উপনিবেশবিরোধী এই নেতার সশস্ত্র সংগ্রাম চলে টানা ত্রিশ বছর। আজকের শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানরা তখন উপনিবেশ বিস্তার করছে রেডইন্ডিয়ানদের ভূমিতে, আজকের আমেরিকাতে। নিজ ভূমি রক্ষায় জান বাজি রাখে জেরোনিমোর মত আরো অনেকে। সেসব নেতা ও বীরদের নাম এখানে আর উল্লেখ করলাম না। যেটা বলতে চাই সেটা হল, জেরোনিমো আমেরিকার আদিবাসীদের কাছে এক কিংবদন্তীতুল্য নেতা। কিন্তু ওসামা বিন লাদেনের মত ধর্মব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীকে ধরতে জেরোনিমোর নাম ব্যবহার এটাই প্রমাণ করে বর্ণবিদ্বেষ কমেনি আমেরিকানদের, হোক না তাদের প্রেসিডেন্ট অশ্বেতাঙ্গ কিংবা সাবেক মুসলমান। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে রেড ইন্ডিয়ান ‘খেদাও’ পর্বে যে চরিত্র আমরা দেখেছি, সেই চরিত্র আজো দেখি আফগানিস্তানে, পাকিস্তানে অথবা ইরাকে, লিবিয়ায়। অর্থাৎ অন্যের ভূমি দখল কর, ভূমির নীচের খনিজ সম্পদ কব্জা কর। নতুবা প্রতিবেশী দেশে (পাকিস্তান) আস্তানা গেড়ে প্রতিদ্বন্দী দেশকে (চীন) চাপের মুখে রাখা । শুধু চাপ সৃষ্টি নয় সন্ত্রাস দমনের নামে পাকিস্তানের উত্তর ওয়াজিরিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলা চালিয়ে প্রায় প্রতিদিন খুন করা হচ্ছে শিশুসহ অসংখ্য নিরীহ মানুষ। হলিউডের রূপালি পর্দায় লাদেন হত্যার আস্ফালন তুলে ধরা হলেও এসব নিরস্ত্র মানুষের রক্তে রঞ্জিত মার্কিন সেনাদের কথা উহ্য থাকে। ক্যাথরিন বিগেলোর মতো পরিচালকদের ছবিতে এ ধরনের লুকোছাপা এই আধুনিক বিশ্বে হাস্যকরই ঠেকে বৈকি। তাঁর ‘হার্ট লকার’ ছবিতেও আমরা দেখি ইরাকে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী মার্কিন বাহিনীর সুখ দুঃখ তিনি ভাল বোঝেন। কিন্তু ইরাকের মত খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দেশকে লুণ্ঠনের বিষয়ে তিনি অন্ধ। ইরাকের কুখ্যাত আবুগারিব কারাগারে মার্কিন সেনাবাহিনীর অসভ্যতা ও বর্বরতা তাঁকে স্পর্শ করে না। উনি যেভাবে মার্কিন সামরিক অভিযানকে, বলা ভালো নয়া উপনিবেশ বিস্তারকে গ্লোরিফাই করেন তাতে যদি তাঁকে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রপাগান্ডাযন্ত্র বলি, ভুল বলা হবে কি?

স্টিভেন স্পিলবার্গের অন্ধত্বও কিন্তু বিগেলোর সমপর্যায়ের। স্পিলবার্গ ‘সিন্ডলার্স লিস্ট’ ছবিতে ইহুদি নিধন দেখান আবেগী হয়ে, এখনো তিনি সমব্যথী ইহুদি তথা ইসরাইলের প্রতি। কিন্তু তিনি দেখেন না গাজায় অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিরা কি দুর্বিসহ জীবন যাপন করছে। তিনি দেখেন না ইসরাইল যখন তখন অসহায় ফিলিস্তিনিদের উপর বিমান হামলা চালাচ্ছে, রকেট হামলার ধোয়া তুলে। স্পিলবার্গ ২০১১ সালে এসে বানালেন ‘লিঙ্কন’। বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কাছে আব্রাহাম লিঙ্কন, মার্টিন লুথার কিং বড় আইকন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিতে তাই লিঙ্কনের বাইবেলই ভরসা ওবামার কাছে। ওবামা নিজে যেহেতু অশ্বেতাঙ্গ তাই লিঙ্কন ও লুথার কিং অনেকটা ঢাল হিসেবে কাজ করেন তাঁর জন্য। কারণ তাঁরা বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়েছেন। নির্বাচনী বৈতরণী পেরুতে এখনো এঁদের প্রয়োজন হয় আমেরিকায়। এখনো অশ্বেতাঙ্গ প্রেসিডেন্টকে হত্যা করার হুমকি দেয়া হয় প্রকাশ্যে। তাই লুথার কিঙের বিখ্যাত বক্তৃতা আওড়ান ওবামা, লিঙ্কনের বাইবেলকে স্বাক্ষী রাখেন প্রেসিডেন্ট শপথ অনুষ্ঠানে।

এদিকে ওবামার আইকন আব্রাহাম লিঙ্কনকে নিয়ে নির্মিত ছবি ‘লিঙ্কন’ মুক্তি দেয়া হয় কখন? ৮ অক্টোবর। অতয়েব হসিাব মেলাতে কষ্ট হয় কি? কষ্ট হলে বলি স্পিলবার্গকে তাঁর দেশের অনেকেই, অগোচরে, ডেমোক্রেট অথবা আরো নির্দিষ্ট করে বললে বারাক ওবামার ‘অনুগত’বলে সম্বোধন করে থাকেন।

উদ্দেশ্য ছাড়া যে কোন কিছু হয় না, তার বড় প্রমাণ স্পিলবার্গ ও বিগেলোর ছবি দুটি। একজন অশ্বেতাঙ্গ প্রেসিডেন্টের নির্বাচনী বৈতরণী পারের মাঝি, অন্যজন ওবামা প্রচারযন্ত্রের যন্ত্রী, কারণ লাদেনকে হত্যার পর থেকেই বিষয়টি বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে হোয়াইট হাউজ। আর ‘আরগো’ সম্পর্কে এতকিছু ভেঙে বলার কিছু নেই। আজকালকার সচেতন মানুষ জানেন, তেহরান পরমানু অস্ত্র তৈরী করছে এমন অভিযোগ তুলে একের পর এক অর্থনৈতিক অবরোধ চাপান হচ্ছে ইরানের ঘাড়ে। অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক চাপ দুইই বাড়ান হচ্ছে, এবার সাংস্কৃতিক চাপ, হলিউডি ছবি দিয়ে। এমন চাপ অবশ্য বন্ড মুভি দিয়ে প্রায়ই তৈরী করতে দেখা যায় হলিউডকে।

যাহোক, আলোচিত তিনটি ছবিই রয়েছে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হওয়ার সম্ভাবনায়। আসছে ২৫ ফেব্রুয়ারি কার ঘরে যাবে ‘অস্কার’, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পালক নিয়ে? রশি টানাটানিতে অবশ্য মৃত লাদেন ও ইরানের জিম্মিদের চেয়ে লিঙ্কনই এগিয়ে। যেহেতু এরইমধ্যে বারোটি শাখায় মনোনয়ন পেয়ে বসে আছেন তিনি। কিন্তু আমার মনে হয়, ‘অস্কার’ যার ঘরেই যাক না কেন শেষ বিচারে ‘তিনি’ ওবামার। কারণ তিনখানা ছবিই তো মার্কিন সরকারের ‘মঙ্গলকাব্য’। আর মার্কিন সরকারের শীর্ষব্যক্তি কে, ওবামাই তো, না কি??