Home » অর্থনীতি » দেশ কোন পথে?

দেশ কোন পথে?

হায়দার আকবর খান রনো

International_Monetary_Fund_logo-1-আওয়ামী লীগ যে কেবল ‘সমাজতন্ত্রে’র বুলী কপচানো বন্ধ করেছে তাইই নয় (বলাই বাহুল্য সমাজতন্ত্র বুলী ছিল জনগণকে ধোঁকা দেবার জন্যই), তারা এখন ক্রমবর্ধমান হারে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে চলেছে। বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামাতও তাই। মার্কিন প্রশাসনকে তুষ্ট করার জন্য বিএনপিআওয়ামী লীগ দুই দলের মধ্যে যেন তীব্র প্রতিযোগিতা চলে আসছে। বর্তমানের মহাজোট আমলে অর্থনীতি ও রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রে মার্কিনের প্রভাব বেড়েছে, প্রায় বিষময় ফল স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

১৯৯৮ সালে শেখ হাসিনার প্রথমবারের প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রথম দিকেই গোপনে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল যাকে সংক্ষেপে বলা হয়, সোফা (Status of Forces Agreement)। বর্তমান মহাজোট শাসনামলে আরেকটি চুক্তির প্রস্তাব করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। Acquired Contractual Services Agreement। এটা স্বাক্ষরিত হয়েছে কি না জানা যায়নি। কারণ এই সকল চুক্তির বিষয় গোপন রাখা হয়। গণতন্ত্রের নামে দেশ শাসন করা হলেও জনগণকে সকল বৈদেশিক চুক্তির ব্যাপারে অন্ধকারে রাখা হয়।

সোফা চুক্তি বলে মার্কিন সৈন্য যে কোন সময় বাংলাদেশে বিনা ভিসায় প্রবেশ করতে পারবে। সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্রও আনতে পারবে। কাস্টসম চেক করা চলবে না। এমনকি মার্কিন সৈন্যরা এই দেশে যদি কোন অপরাধ করে (যথা খুন বা ধর্ষণ) তাহলেও বাংলাদেশের কোর্টে তাদের বিচার করা যাবে না। উল্লেখ্য যে, এই চুক্তি কিন্তু এক তরফা। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী মার্কিন দেশে একই ধরনের প্রবেশাধিকার ও অন্যান্য সুবিধা পাবে না। এই রকম চুক্তি জাতির জন্য লজ্জাজনক এবং এর ফলে জাতীয় সার্বভৌমত্ব বলে কিছু থাকে না। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের সময় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার (যাদের কোন রুটিন কাজের বাইরে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ছিল না) বাংলাদেশের মাটি, আকাশ ও সমুদ্র ব্যবহারের সুবিধা দিয়েছিল। এরপর বিএনপিজামাত ক্ষমতায় এল, তারপর ফখরুদ্দিনমইনুদ্দিন দুই বছর ক্ষমতায় কাটালো, এখন আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকারে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উপরোক্ত বিশেষ অধিকার এখনো বহাল আছে।

বর্তমান শাসনামলে মার্কিনী সৈন্য ও গোয়েন্দাদের আনাগোনা আরও বেড়ে গেছে। গত বছর ১ মার্চ মার্কিন বাহিনীর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল কমান্ডার অ্যাডমিরাল রবার্ট উইলার্ড মার্কিন কংগ্রেসের সামনে শুনানি প্রদানকালে বলেছিলেন, “সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়াতে, বিশেষ করে সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা জোরদার সহযোগিতা করতে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর দলগুলো মোতায়েন করা হয়েছে। মার্কিন বাহিনীর প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ড তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে।”

মায়ানমারের সঙ্গে বিরোধ মিমাংসায় বাংলাদেশে বঙ্গোপাসাগরে তার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে বলে বলা হচ্ছে। যাকে সমুদ্র জয় বলে সরকার উল্লাস করেছে। কিন্তু বাস্তবে গোটা সমুদ্র যদি অন্য কোন দেশের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে এই বিজয় তো অর্থহীন হয়ে দাড়ায়।

গত বছর ৩১ মার্চ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছিলেন যে, “মার্কিনের সঙ্গে টিকফা চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।” টিকফা চুক্তি হচ্ছে বহুল আলোচিত সেই টিফা চুক্তি যা এক যুগ আগে থেকেই মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশকে সম্মত করানোর জন্য চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে বাংলাদেশ বাণিজ্যিকভাবে মার্কিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব হারাবে।

আমাদের খনিজ সম্পদ গ্যাস ও কয়লা খনির ওপর লোভী দৃষ্টি ছিল বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর। আর বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সরকারগুলো নব্বইয়ের দশকেই পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানীকে যেভাবে উৎপাদন বন্টনচুক্তির ভিত্তিতে দিয়েছিল তা ছিল চরমভাবে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। এইবার ক্ষমতায় আসার পরপরই আওয়ামী লীগ তথা মহাজোটের সরকার সমুদ্রতলের গ্যাস ক্ষেত্রগুলোও বিদেশী কোম্পানিকে দেবার জন্য পায়তারা শুরু করে। জাতীয় স্বার্থকে এই ভাবে বিসর্জন দিয়ে বহুজাতিক কোম্পানিকে খনিজ সম্পদ পাইয়ে দেবার বিবিধ কারণ রয়েছে পশ্চিমাদের তুষ্ট রাখা এবং বিনিময়ে স্বীয় দল বা ঘনিষ্ঠ কোন কোন ব্যক্তির মোটা অংকের আর্থিক সুবিধা লাভ। বর্তমান সরকার বঙ্গোপসাগরের একটি গ্যাস ক্ষেত্র যে ধরনের উৎপাদন বন্টনচুক্তির ভিত্তিতে কনোকো ফিলিপস নামের এক মার্কিন কোম্পানিকে দিয়েছে, তাতে উক্ত কোম্পানিই মজুত গ্যাসের কমপক্ষে ৮০ শতাংশ নিয়ে যাবে, যা তারা বিদেশে রফতানিও করতে পারবে। বর্তমান সরকারের আমলেই সরকারের পক্ষের মহাজোটের অন্তর্ভুক্ত ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন গ্যাস কয়লা সম্পদ রফতানি করা যাবে না মর্মে যে বেসরকারি বিল সংসদে পেশ করেছিলেন তা কখণই সংসদে আলোচনার জন্য উত্থাপিত পর্যন্ত হয়নি।

ফুলবাড়ী কয়লা খনির পুরোটাই বৃটিশ কোম্পানি এশিয়ান এনার্জির হাতে তুলে দেয়ার জন্য সকল প্রস্তুতি প্রায়ই পাকা হয়েছিল। শেখ হাসিনার এবং খালেদা জিয়ার বিগত শাসনামলের দুই আমলেই বিভিন্ন চুক্তির দ্বারা এশিয়া এনার্জি কর্তৃক ফুলবাড়ী কয়লা খনি লুটের প্রক্রিয়া প্রায় সমাপ্ত হয়ে এসেছিল। চুক্তিটি সম্পন্ন হলে এশিয়া এনার্জি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনন করে মাত্র ছয় শতাংশ রয়ালটির বিনিময়ে পুরো খনিটির মালিক হয়ে বসতো এবং তারা উত্তোলিত কয়লা বিদেশে রফতানিও করতে পারতো। আড়াই শতবর্ষ পরে এশিয়া এনার্জি নামে যেন এসেছিল সেই ইস্ট ইনডিয়া কোম্পানি। আর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই যেন তাদের তোষণ করার ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু চরমভাবে জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতামূলক ষড়যন্ত্রকে রুখে দিয়েছিল ফুলবাড়ীর জনগণ বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে। ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট তদানীন্তন বিএনপি সরকার বাধ্য হয়েছিল আন্দোলনকারীদের সঙ্গে চুক্তি করতে। সরকারের পক্ষ থেকে মন্ত্রী পর্যায়ের দুইজন এতে সাক্ষর করে। সরকার মেনে নিল যে, এশিয়া এনার্জিকে বিতাড়িত করা হবে এবং উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনন করা হবে না। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনন করলে একটা উপজেলার সমান গোটা এলাকার জনবসতি, উর্বর কৃষি জমি, গবাদিপশু, মাছ, জলাশয় ধ্বংস হবে, শুধু তাইই নয়, ভূগর্ভস্থ পানি সরানোর কারণে উত্তরবঙ্গ জুড়ে মরু প্রক্রিয়া দেখা দেবার আশঙ্কা পর্যন্ত ছিল। সেদিনের বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী জনতাকে অভিনন্দন পর্যন্ত জানিয়েছিলেন। কিন্তু ২০০৯ সালে ক্ষমতায় বসে তিনি সে সব কথা ভুলে গেছেন। এখনও এশিয়া এনার্জি বাংলাদেশে অফিস খুলে বসে আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেলা প্রশাসকের কাছে নির্দেশ পাঠিয়েছেন, এশিয়া এনার্জি যাতে নির্বিঘেœ কাজ করতে পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি এক তথাকথিত বিশেষজ্ঞ কমিটি বসিয়ে ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনন করার সুপারিশ করানো হয়েছে। দেশপ্রেম অপেক্ষা বিদেশীদের স্বার্থ রক্ষাই এদের প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

সম্প্রতি সরকারের এই অপতৎপরতার বিরুদ্ধে তেল গ্যাস বিদ্যুৎ খনিজ সম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটি যখন ফুলবাড়ীতে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেছিল, তখন এশিয়া এনার্জিকে রক্ষা করার প্রয়াসে সরকার ১৪৪ ধারা জারি করেছিল। কিন্তু ২০০৬ সালের মতো এবারও ফুলবাড়ীর জনগণ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ফুসে উঠলো। তারা জানিয়ে দিল জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোন ষড়যন্ত্রকেই তারা কার্যকরি হতে দেবে না।

এই ভাবে যারা দেশজ সম্পদকে বিদেশী কোম্পানির দ্বারা লুণ্ঠিত হতে দেয় এবং লুটের টাকার উচ্ছিষ্ট পেয়েই যারা সন্তুষ্ট থাকে, তারা দেশপ্রেমিক নয়।

স্বাধীন স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ার কোন সদিচ্ছাই ছিল না বর্তমান সরকারসহ অতীতের কোন সরকারের। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফএর উপর তারা নির্ভরশীল। কিছুদিন আগেও পদ্মা সেতু নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে যতেষ্ট কথা বললেও পরে তিনি চুপ করে গেছেন। বস্তুত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ হচ্ছে শোষণের হাতিয়ার। এক সময় ছিল যখন আমাদের পুরো উন্নয়ন বাজেটাই ছিল বিদেশী ঋণের উপর নির্ভরশীল। এখন তা নয়। এর আমাদের শাসকরা বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফএর টাকা নেয়। কারণ ঐ টাকার একটা বড় অংশ আত্মসাত করে কিন্তু দেশীয় ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ আমরা ও রাজনীতিবিদ। সরকার তো তাদের স্বার্থই দেখে। আইএমএফএর ঋণ নেয়ার কোন প্রয়োজনও নাই। তবু তারা ঋণ নিচ্ছে। এবং আইএমএফ এর শর্ত মেনে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। বর্তমান সরকার গত চার বছরে পাঁচ বার জ্বালানি তেল ও সাতবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছৈ। প্রায় সকল অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা এবং শাসক দল বাদে সকলেই এই মূল্যবৃদ্ধির তীব্র বিরোধিতা করেছেন। মাত্র ১৪ কোটি ডলার ঋণের জন্য তারা যেভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে কৃষি ও শিল্প উৎপাদন, পরিবজন ও সমগ্র অর্থনীতিকে ঝুকির মধ্যে ফেলেছে, সেই ঋণ গ্রহণের কোন প্রয়োজনই নেই। এই বছর আমরা রেমিটেন্স পেয়েছি চোদ্দশত কোটি ডলার। তারই মাত্র এক শতাংশ চোদ্দ কোটি ডলারের জন্য এত বড় সর্বনাশ যারা করতে পারে তাদের বুদ্ধিমত্তা অথবা দেশাত্মবোধ নিয়েই প্রশ্ন করা চলে।

চার. দুর্নীতি ও পদ্মা সেতু

একজন রাজনীতিবিদ বিশেষ করে দেশের প্রধান শাসনকর্তার রাজনৈতিক আচরণ তার শ্রেণী চরিত্র দ্বারাই নির্ধারিত হয়। তবে ব্যক্তিবিশেষের স্বাতন্ত্র বৈশিষ্ট্যও থাকে। শেখ হাসিনা যে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সেই দল যাদের টাকায় চলে, তাদের স্বার্থেল বাইরে তার কোন অবস্থান থাকতে পারে না। তবু শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংক প্রসঙ্গে যে ধরনের মন্তব্য করেছিলেন তা আমাদেরকে বিস্মিত করেছিল। বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতু নিয়ে সরকারের মন্ত্রী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনলো তখন রাগের মাথায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে সকল কথা বলেছিলেন, তা একেবারে খাটি কথা, সত্য কথা ছিল। যেমন তিনি বলেছিলেন, ‘ওদের (বিশ্বব্যাংক) কি অডিট হয়? এরা কত কমিশন খেয়েছে?’ আমার মনে হয় পৃথিবীর কোন রাষ্ট্রনায়ক এই ভাষায় এখনও কথা বলেননি। বিশ্বব্যাংক সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছে। হাসিনাও পাল্টা বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনলেন। বস্তুত দুই পক্ষই দুর্নীতিতে ভরা। বিশ্বব্যাংকের এককালীন অর্থনীতিবিদ এবং নোবেল বিজয়ী যোসেফ স্টিগলিৎস বিশ্বব্যাংকের ভেতরে থেকে অন্দরমহলের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন ‘দি ইনসাইডার’ শীর্ষক প্রবন্ধে এবং পরবর্তীতে আরও অন্যান্য গ্রন্থে ও রচনায়। তিনি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফএর গোমর ফাক করে দিয়েছিলেন। আমরা সবাই জানি বিশ্বব্যাংক মার্কিন প্রশাসন দ্বারা এবং বহুজাতিক কর্পোরেশনসমূহের স্বার্থের দ্বারা পরিচালিত হয়। ক্ষিশ্বব্যাংক যখন বাংলাদেশ সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি বিশেষ করে মন্তী সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে তখন আবার আমাদের মনে খটকা সৃষ্টি হয়।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এই যে, পুরো বিষয়টাই সরকার জনগণের চোখের আড়ালে রেখে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে কি, সরকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের কি চিঠিপত্র আদান প্রদান হয়েছে তা জনগণকে জানতে দেয়া হয়নি। গণতন্ত্র নামধারী দেশে এত অস্বচ্ছতা কেন? তাতেই সন্দেহ হয় যে বাংলাদেশের দিক থেকেও দুর্নীতির বিষয়টি ছিল।

এই সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারো কারো বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। হল মার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, শেয়ারবাজারের কেলেঙ্কারি, ব্যাংক কেলেঙ্কারি, বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তিকে ধসিয়ে দিয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন নামে যে নখদন্তহীন সংস্থাটি রয়েছে তার একমাত্র কাজ হয়েছে সরকারের আজ্ঞাবাহী হয়ে সরকারদলীয় লোকদের রক্ষা করা এবং বিরোধী দলীয় নেতানেত্রীকে ফাসানো। দুদকের নিরপেক্ষতা আজ দারুনভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ।

ফিরে আসি পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক পর্যায়ে বললেন, আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করবো। খুব ভালো কথা। স্বনির্ভর অর্থনীতি তো ভালো কথা। তবে মজার ব্যাপার হলো এই যে, প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তার দলীয় ক্যাডাররা, বিশেষ করে ছাত্রলীগ থেকে জবরদস্তী চাঁদা সংগ্রহ ও লুটপাটের কাজে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ চাঁদা সংগ্রহ অভিযান শূরু করলো খুব ঢাকঢোল পিটিয়ে। পদ্মা সেতুর জন্য এই রকম বেসরকারিভাবে চাঁদা তোলা সম্পূর্ণরূপে বেআইনি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো এই যে, ছাত্রলীগের সেই চাঁদা তোলার অনুষ্ঠানে উদ্বোধক ছিলেন স্বয়ং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। দলবাজির মানসিকতা শিক্ষাঙ্গনকে কতোটা কলুষিত করেছে। আমরা কত নিচে নেমে গেছি। পরবর্তীতে ছাত্রলীগের সেই সংগৃহীত চাঁদার ভাগ নিয়ে ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যেই সশস্ত্র সংঘর্ষ এবং তারই পরিণতিতে এক তরুণের অকাল মৃত্যু ঘটলো। ছাত্রলীগের কারবার সম্পর্কে পরে আরও কিছূ কথা বলতেই হবে। অন্যথায় বর্তমান সরকারের চার বছরের প্রকৃত চিত্রায়ন সম্পূর্ণ হবে না।

স্বনির্ভর হয়ে পদ্মা সেতু করা হবে এমন ঘোষণা দিলেন প্রধানমন্ত্রী। আমরা প্রধানমন্ত্রীকে সাবাস দিয়েছিলাম। অনেক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন যে, এটা করা খুবই সম্ভব। অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী জিডিপির শতকরা ৫০ থেকে ৮০ ভাগ হচ্ছে কালো টাকা। এই টাকার খানিকটা উদ্ধার করতে পারলে একটা নয়, একাধিক পদ্মা সেতুর নির্মাণ করা সম্ভব। আমরা আরও বলেছিলাম, জনগণ অবশ্যই খুশী মনে পদ্মা সেতুর জন্য টাকা দেবে, কর দেবে, কিন্তু তার আগে জনগণকে নিশ্চিত হতে হবে যে, তাদের দেয়া অর্থ নিয়ে দুর্নীতি হবে না। তাছাড়া পদ্মা সেতুর জন্য বাড়তির করের ভার কর ভারে জর্জরিত গরিব মধ্যবিত্ত জনগণের ওপর না চাপিয়ে ধনীদের উপর বেশি বেশি করে ধরা হোক।

হায়! আমাদের প্রত্যাশা ব্যর্থ হয়েছে। কার কাছ থেকে কি প্রত্যাশা করেছিলাম। আওয়ামী লীগের মতো দল ও সরকারের কাছ থেকে এই ধরনের নীতি আশা করাই মুর্খতা। ফলে শেষ পর্যন্ত যেখানে যাবার সেখানেই গেছে সরকার। জাতীয় মর্যাদাবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে তারা আবার বিশ্বব্রাংকের সব শর্তই একে একে মেনে নিল।

শর্ত অনুসারে সৈয়দ আবুল হোসেনকে মন্ত্রীত্ব থেকে সরানো হলো। বাধ্যতামূলক ছূটি দেয়া হলো সরকারের উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমানকে। এবার দুদক বললো, হ্যা, দুর্নীতি হয়েছে। তদন্ত হলো। বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতি বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের ঠিক এলো দুইবার। শেখ হাসিনা অবশ্য দুই নৌকায় পা রাখার চেষ্টা করেছেন। তিনি তার প্রিয় আবুল হোসেনকে মন্ত্রীত্ব থেকে সরালেও ‘সৎ ও দেশপ্রেমিক’ বলে সার্টিফিকেট দিলেন। তাকে দুর্নীতির মামলার অভিযুক্ত করা হলো না। বিশ্বব্যাংক এতে সন্তুষ্ট হতে পারলো না। আবার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে পদ্মা সেতু নির্মাণের সম্ভাবনা। এই প্রসঙ্গে প্রবীণ সাংবাদিক এ বি এম মূসার মন্তব্যটিই প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, “সরকার ফেঁসে গেছে।” অর্থাৎ বড় ধরনের দুর্নীতি রয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, ‘কেঁচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে পড়বে’।।