Home » অর্থনীতি » পাঁচতারা হোটেল দিয়ে দারিদ্র্য দূর?

পাঁচতারা হোটেল দিয়ে দারিদ্র্য দূর?

 

triillion-dollar-economy-1-বিশ্বব্যাংক কিভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র্য কোনো কোনো দেশে বড় বড় ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ, যাদের বলা হয় বিজনেস টাইকুন এবং বিশাল বিশাল বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঋণ বিতরণ করছে এটা তেমনই এক কাহিনী।

 

শেরিল স্ট্রাস আইনহর্ন

 অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

 

আক্রান্ত হলো দম বন্ধ করা লাল ধূলার নগরী। এখানে তিন মাস বৃষ্টি বলতে গেলে হয়ই না, রোদে মাত্র ১৫ মিনিটেই কাপড় শুকিয়ে যায়। এ কারণে ঘানার জনাকীর্ণ রাজধানীর নতুন পাঁচতারা মোভেনপিক হোটেলে ছিমছাম লন, অঢেল পানিতে সিক্ত গাছপালার বিপুল সমারোহ ঘটানো হয়েছে, সুইমিংপুলের পাশে রোলার স্কেট পরা ইউনিফর্মধারী ওয়েটারদের দিয়ে অতিথিদের বরফশীতল পানীয় পরিবেশন করা হয়। এর চারপাশ উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরানগরীর উপচেপড়া দরিদ্র লোক, ফুটপাতের হকার আর রাতে ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা গৃহহীনদের থেকে আড়াল রাখতে।

 

মোভেনপিকের উদ্বোধন হয় ২০১১ সালে। ২৬০ কক্ষ, সাতটি ফ্লোর, ১৩,৫০০ বর্গফুটের শপিংমলে দুই হাজার ডলারের ইতালিয়ান হাতব্যাগ আর অন্যান্য জিনিস বিক্রি হয় সব মিলিয়ে আদর্শ আধুনিক আন্তর্জাতিক বিলাসবহুল হোটেল। তবে অন্তত একটা ব্যাপারে এটা ব্যতিক্রম : এতে অর্থায়ন করেছে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান : জনৈক সৌদি প্রিন্সের বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত একটি মাল্টিবিলিয়নডলার বিনিয়োগ কোম্পানি এবং দারিদ্র্যদূরীকরণে নিয়োজিত বিশ্বব্যাংক।

 

বিনিয়োগ কোম্পানি কিংডম হোল্ডিং কোম্পানির বাজার মূল্য ১২ বিলিয়ন ডলার, এর প্রধান মালিক প্রিন্স আলওয়ালিদ বিন তালালকে ফোর্বস বিশ্বের ২৯তম ধনী ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করেছে, তার নিট সম্পদের পরিমাণ ১৮ বিলিয়ন ডলার। আর বিশ্বকে উন্নত করার বিশ্বব্যাংকের ম্যান্ডেটে অবদান রাখতে প্রাইভেট ব্যবসায় সস্তা ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক সহায়তার বন্দোবস্ত করার জন্য ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক হোটেলটির আংশিক ব্যয় বহন করেছে। ‘বিশ্বব্যাংকে, আমরা বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন উন্নয়ন ইস্যুকে বৈশ্বিক দারিদ্র হ্রাস করাআমাদের মিশন হিসেবে গ্রহণ করেছি,’ ঘোষণা আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির।

 

তাহলে, কেন, মোভেনপিক বানাতে আইএফসি সৌদি প্রিন্সের কোম্পানিকে ২৬ মিলিয়ন ডলারের মতো বিপুল পরিমাণ ঋণ প্রদান করল, যেখানে প্রিন্স একাই এ ধরনের একটি হোটেলের পুরো অর্থায়ন করতে সক্ষম? এর জবাব হলো, আইএফসির বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রদানের হিসাবপত্রের প্রধান লক্ষ্য আসলে দরিদ্রদের সহায়তা করা নয়। অন্তত তা বিশ্বব্যাংকের জন্য মুনাফা করার লক্ষ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ নয়।

 

বিশ্বব্যাংক ঋণদাতারা যে দায়িত্ব পালন করছে বলে ধারণা করা হয়ে থাকে, তাতে তারা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে ,সেগুলো সম্পর্কে সরাসরি জানতে এবং তাদের প্রয়াস সত্যি কাজে লাগছে কি না তা দেখতে আমি ঘানা সফর করেছিলামআইএফসি যে শতাধিক দেশে কাজ করে, অনেক দিক দিয়েই তা একই রকমএবং এর পর আমি এই উপসংহারে পৌঁছেছি। আমি হাতের কাছে পাওয়া ব্যাংকটির প্রচার বিভাগের হাজার হাজার পৃষ্ঠার প্রতিবেদন ও আর্থিক বিবরণী খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি এবং ঘানা ও অন্যান্য দেশে এর কর্মসম্পাদনের সঙ্গে জড়িত সুপরিচিত বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলেছি।

 

প্রতিটি ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত ফলাফল একই : আইএফসি বিশাল বিশাল করপোরেশনের সঙ্গে কাজ করতে পছন্দ করে; এসব কোম্পানি নিজেরাই অর্থায়ন করতে পারেএমন প্রকল্পগুলোতে ঋণ দেয়। এর অংশীদারেরা বিলিয়নিয়ার এবং বিশাল বিশাল বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, এক্সোন মবিলের মতো বৃহৎ তেল কোম্পানি থেকে আর্জেন্টাইন ক্যান্ডিপ্রস্তুতকারী গ্র“প অ্যারকোর। এর প্রকল্পগুলোর মধ্যে কেবল চাকচিক্যময় হোটেল আর উঁচু তলার শপিং মলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং কাঁকরময় স্বর্ণ ও তামা খনি, তেল পাইপলাইনেও, যার অনেকগুলো শেষ পর্যন্ত এমন অনেক অত্যন্ত দুর্নীতিবাজ, স্বৈরশাসকের পকেট ভারী করছে, যাদের পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছে বিশ্বব্যাংকের অন্য অংশ। সদস্য দেশগুলোর চাঁদায় গঠিত আইএফসির মূলধনের প্রায় এক চতুর্থাংশযার বর্তমান পরিমাণ ২.৪ বিলিয়ন ডলারআসে যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের কাছ থেকে এবং বিশ্বব্যাংকের ৬৯ বছরের ইতিহাসে কেবল আমেরিকানরাই এর প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। এমনকি এ নিয়ে জনমনে বিতর্কের সৃষ্টি হলেও যুক্তরাষ্ট্র এসব কাজকর্মে সামান্যই অভিযোগ তুলেছে ।

 

বেশি দিন হবে না, বিশ্বব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদারকি প্রতিষ্ঠান আইএফসির দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, ব্যাংকের দরিদ্রবিমোচন মিশনে এটা আন্তরিকতাশূন্য প্রতিশ্রুতি প্রদানের চেয়ে বেশিকিছু করেনি। প্রতিবেদনে, ব্যাংকের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইভাল্যুশন গ্র“পের পর্যালোচনা করা ২০১১ সালের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেখা গেছে যে, তাদের খতিয়ে দেখা আইএফসির বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর মধ্যে অর্ধেকেরও কম দারিদ্রবিমোচনের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আইএফসি প্রকল্পগুলোর বেশির ভাগই সন্তোষজনক মুনাফা সৃষ্টি করে; তবে এমন কোনো শনাক্তযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, এগুলো দরিদ্রদের অংশগ্রহণ ও অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি করে বা এসব প্রকল্পের মাধ্যমে যেসব অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সৃষ্টি হয়যা তাদের জন্য কল্যাণকর।’ বস্তুত, এতে বলা হয়, সমীক্ষা চালানো ৫০০ প্রকল্পের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশের ‘দরিদ্র লোকদের প্রতি সুস্পষ্ট নজর দেওয়ার লক্ষ্য ছিল,’ তবে এমনকি ওগুলোরও, প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ছিল ‘সীমিত’ প্রভাব। আইএফসি এই উপসংহারের ব্যাপারে আপত্তি জানায়নি।

 

ঘানার মতো দেশগুলোতে অবশ্যই অভাবঅনটন আছে। দেশটির মাথাপিছু জিডিপি বিশ্বে নিচ থেকে তৃতীয় স্থানে, গড় আয়ু নিচ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে এবং শিশু মৃত্যু হার নিচ থেকে চতুর্থ। কেবল ২০১২ অর্থবছরেই আইএফসি ঘানায় ঋণ ও ইক্যুইটি আকারে প্রায় ১৪৫ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। অবশ্য, ঘানা সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়নবিষয়ক উপদেষ্টা, তিনি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা কমিশনেরও সদস্য, তাকিওয়া ম্যানু আমাকে জানিয়েছেন, তিনি মনে করেন না যে, আইএফসির বিনিয়োগের লক্ষ্য ‘দারিদ্র্য বিমোচন, বরং স্রেফ কিছু লোককে চাকরি দেওয়া। এর মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন হবে, এমনটা বলা শক্ত।’

 

তবে ওই নীতি অব্যাহত রয়েছে। কেন? টাইকুন আর মেগা কোম্পানিগুলো আইএফসিকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে এবং সাধারণভাবে নিশ্চিত মুনাফার নিশ্চয়তা দেওয়ায় প্রাপ্ত আয়ে এ ধরনের প্রকল্পগুলোতে ফের বিনিয়োগ করার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এই অর্থের মাত্র একটি অংশ স্থানীয় শ্রমিকদের জন্য কল্যাণকর হয়েছে এবং সমালোচকেরা বলছেন, আইএফসির বিনিয়োগ প্রায়ই স্থানীয় উন্নয়ন প্রয়োজনীয়তার প্রতিকূলে হয়ে থাকে। ‘আইএফসি’র মডেল নিজেই একটা সমস্যা,’ বলেছেন জেসে গ্রিফিতস, বেলজিয়ামভিত্তিক অমুনাফামূলক ইউরোপিয়ান নেটওয়ার্ক অন ডেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ইউরোদাদ) পরিচালক। তিনি বলেন, ‘আইএফসি তার বিচ্ছিন্ন, বেসরকারি কোম্পানিগুলোর প্রতি অগ্রাধিকারমূলক উপরনিচ উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’

 

আইএফসির বর্ষিয়ান নির্বাহী এবং বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক শিল্পবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট রাশাদ কালদানি বলেছেন, ‘আমরা বলছি না যে, আমরা নিখুঁত।’ তিনি বলেন, আইএফসি ‘সব সীমান্তে’ সক্রিয়। ‘আমরা জানি, সব প্রকল্প কাজ করে না। চেষ্টা থাকে দরিদ্রদের মধ্যে পার্থক্য গড়া এবং আর্থিক সক্ষমতা অর্জন’ করাজোড়া লক্ষ্যটি একসঙ্গে হয়ে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।

 

আক্রার কেন্দ্রস্থলে মোভেনপিকের মতো বিলাসবহুল হোটের প্রশ্ন এলে আইএফসি অবশ্য তার বিনিয়োগ নিয়ে কোনো ধরনের অনুতাপ প্রকাশ করে না, বরং এটাকে দরিদ্র দেশগুলোর অর্থনৈতিক আশীর্বাদমূলক ঘটনা হিসেবে অভিহিত করে। বিশ্বব্যাংকের ২০১২ সালের জানুয়ারির প্রতিবেদনে শানগ্রিলা, হিলটন, ম্যারিয়ট, ইন্টারকন্টিনেন্টাল এবং অতি অবশ্যই মোভেনপিকের মতো বিলাসবহুল চেইন হোটেলগুলোকে এর ‘শীর্ষস্থানীয়’ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, হোটেলগুলো ‘পর্যটন এবং বাণিজ্যিক অবকাঠামো ত্বরান্বিত করবে এবং এর ফলে উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে ’ ।

 

আক্রায়, মেরিজ্যাঁ মোয়ো, আইএফসির ঘানাবিষয়ক কাউন্টি ম্যানেজার বলেন, নতুন হোটেলটি চাকরি সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন করছে। বিষয়টি পরিষ্কার করতে তিনি উল্লেখ করলেন, মোভেনপিক ম্যানেজারের ‘রোববার হোটেলের বাইরে কয়েকটি বালককে রোলারস্কেট করতে দেখেছিলেন। তখন ম্যানেজার পুলে কাজ করতে তাদেরকে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এটা উন্নয়ন এবং স্থানীয় মানুষকে সহায়তা করা হয়।’ কতজনকে চাকরি দেওয়া হয়েছে, আমি জানতে চাইলাম। ছয়জনকে, মোয়োর জবাব।

 

আমি যখন মোভেনপিক ম্যানেজার স্টুয়ার্ট চেজের সঙ্গে কথা বললাম, তিনি আমাকে জানালেন, নতুন হোটেল ছাড়াও অন্যান্য ধরনের বিনিয়োগ ঘানার অর্থনীতি চাঙ্গা এবং দারিদ্র্য দূর করতে আরো বেশি ভূমিকা রাখবে বলে তিনি নিশ্চিত। তিনি কয়েক বছর ধরে ঘানায় কাজ করছেন। জানালেন, দেশটি জনাকীর্ণ, রাস্তাগুলো খানাখন্দকে ভরা, বৈদ্যুতিকব্যবস্থা জঘন্য, খাদ্য সরবরাহ সীমিত, ট্রেড স্কুলের সংখ্যা কম। তিনি অভিযোগ করলেন, ‘এখানে কোনো হোটেল স্কুল, ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারও নেই।’ ফলে তার শীর্ষ ৩০০ স্টাফের সবাই বিদেশী।

 

অধিকন্তু, আক্রায় বিলাসবহুল হোটেলের সংখ্যা আগেই প্রায় ডজনে উন্নীত হয়েছিল। মোভেনপিকের দায়িত্ব গ্রহণের আগে চেজ ছিলেন কাছের একটি পাঁচতারা হোটেলের ম্যানেজার। সেটার মালিক ঘানার পেনশন ব্যবস্থা পরিচালনাকারী সোস্যাল সিকিউরিটি অ্যান্ড ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স ট্রাস্ট্রি। ফলে আইএফসি যখন প্রিন্স আল ওয়ালিদের হোটেলে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন সে এমন লোকদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামে, যাদেরকে দারিদ্র্য থেকে উদ্ধার করতে চায় বলে সে দাবি করে থাকে। মোয়ো স্বীকার করেছেন, এই বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তারা স্থানীয় হোটেল অবস্থা তারা সমীক্ষা করে দেখেননি, যা সাধারণত করা হয়ে থাকে। ‘আমরা কোম্পানিকে চিনতাম এবং তারা সৌদি আরবে আরেকটি সফল বিনিয়োগ প্রকল্প পরিচালনা করেছিল। এ কারণেই আমরা ঘানার ব্যাপারে আকৃষ্ট হয়েছিলাম’, বলেন তিনি।

 

আরেকটি বিনিয়োগ? ২০ মিলিয়ন ডলারের ওই চুক্তিতে কেনিয়ার পাঁচটি বিলাসবহুল ভেন্যু উন্নয়নে সহায়ক হয়েছিল, যাতে সুইমিং পুল উষ্ণ করা, গলফ কোর্স বানানো এবং সুসঙ্ঘবদ্ধ সাফারির ব্যবস্থা ছিল।

 

মার্কিন সিনেটর প্যাট্রিক লেহি, ভারমন্টের এই ডেমোক্র্যাট বিশ্বব্যাংকে মার্কিন অংশগ্রহণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন সিনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস সাবকমিটির সঙ্গে যুক্ত। ঘানা ঋণকে ‘সরকারি তহবিলের যথাযথ ব্যবহার নয়’ বলে তিনি অভিহিত করেছিলেন, যখন ২০১১ সালে ওয়াশিংটন টাইমসের একটি প্রতিবেদনে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়, বিশ্বব্যাংকে আমেরিকান অংশগ্রহণ পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত, এই ঋণকে সমর্থন করে সংবাদপত্রে জানায়, বাজার পরিস্থিতি অবনতি ঘটলে বেসরকারি ব্যাংকগুলো প্রত্যাশিত বিনিয়োগ থেকে সরে গিয়েছিল। ফলে ১০৩ মিলিয়ন ডলারের পুরো প্রকল্পটি হুমকির মুখে পড়ে যায়। এমন প্রেক্ষাপটে আইএফসি তাতে অংশ নেয়। তবে জুলাইতে আমি যখন আক্রায় ছিলাম, তখন একই সময়ে প্রাপ্ত বেসরকারি অর্থায়নে দুটি প্রধান হোটেল প্রকল্প নির্মাণাধীন ছিল। এ ব্যাপারে মন্তব্য করার অনুরোধে প্রিন্সের প্রতিনিধিরা সাড়া দেননি।

 

দারিদ্র্য বিমোচন ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে আইএফসি বিনিয়োগ কেবল বিলাসবহুল হোটেল ও রিসোর্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাত্র এক যুগ পর গঠিত আইএফসি সাম্প্রতিক সময়ে এর দ্রুততমবর্ধিষ্ণু ইউনিটে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ১০৩টি দেশে এর স্টাফ সংখ্যা প্রায় ৩,৪০০। ২০১২ সালে প্রায় ৫৮০টি প্রকল্পে ১৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যা তার ২০০৬ সালের মোট পরিমাণের দ্বিগুণের চেয়েও বেশি এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তা বেড়ে ২০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

প্রাথমিক ধারণাটি এমন ছিল যে, বিশ্বব্যাংক যেহেতু সরাসরি দরিদ্র দেশগুলোকে ঋণ দিয়ে থাকে, তাই আইএফসি এসব দেশের কোথাও কোথাও মুনাফামুখী করপোরেশনগুলোতে বিনিয়োগ করে ও ঋণ দিয়ে বেসরকারি ব্যবসা, উদ্যেক্তা ও অর্থবাজারের প্রবৃদ্ধি গতিশীল করবে। প্রতিষ্ঠাতারা, এদের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য ছিলেন জেনারেল ফুডস নির্বাহী রবার্ট গার্নার, জোর দিয়েছিলেন যে, আইএফসি কেবল ওইসব প্রকল্পে অংশ নেবে, যেখানে ‘সুবিধাজনক শর্তে পর্যাপ্ত বেসরকারি মূলধন পাওয়া যায় না।’

 

ওই ধারণাটি সময়ের পরিক্রমায় নষ্ট হয়ে যায়, সুবেশধারী পুঁজিপতিরা আইএফসির তুলনামূলক আকর্ষণীয় ঋণ এবং অন্যান্য বিনিয়োগ সুবিধা এবং সেইসঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় যুক্ত থাকার প্রশংসাপত্র লাভে আগ্রহী হয়ে উঠে। ১৯৮০এর দশকে প্রথমবারের মতো আইএফসিকে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বৈশ্বিক মূলধন বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হলে এর প্রবৃদ্ধি ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে যায়। আরো সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ট্রেড ফিন্যান্স, ডেরিভেটিভস, প্রাইভেট ইক্যুইটি, অনেক সময় বেসরকারি ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সেগুলোকে বিরক্ত করাসহ বিভিন্ন ধরনের নতুন ব্যবসায় প্রবেশ করে তার প্রবৃদ্ধির চাকা অতিমাত্রায় সচল করেছে।

 

বর্তমানে আইএফসির ব্যবসায়ী অংশীদার তালিকায় বিশাল বিশাল বহুজাতিক করপোরেশনের নাম রয়েছে : ডো ক্যামিকেল, ডুপন্ট, মিৎসুবিশি, ভোডাফোন, ইত্যাদি ইত্যাদি। তারা দক্ষিণ আফ্রিকার ডোমিনোস পিৎজা এবং জ্যামাইকার কেন্টাকি ফ্রাইড চিকেনের মতো ফাস্ট ফুড চেইনশপেত্ত বিনিয়োগ করেছে। মিসর, ঘানা, সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলো, পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার উচ্চবিত্তদের শপিংমলে এর বিনিয়োগ রয়েছে। তারা আর্জেন্টিনা ও বাংলাদেশে ক্যান্ডিশপ চেনে, স্যাবমিলারের মতো বৈশ্বিক বিয়ার এবং চেক প্রজতন্ত্র, লাওস, রোমানিয়া, রাশিয়া ও তানজানিয়ার মদ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে, কোকা কোলা, পেপসিকোর মতো কোমল পানীয় বিপণন এবং কম্বোডিয়া, ইথিওপিয়া, মালি, রাশিয়া, দক্ষিণ সুদান, উজবেকিস্তান প্রভৃতি দেশে এসব পানীয়ের প্রতিযোগীদের অর্থ জোগান দিয়েছে।

 

(চলবে)