Home » বিশেষ নিবন্ধ » মানুষের বিভেদ ও ঐক্য – সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গ- ২

মানুষের বিভেদ ও ঐক্য – সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গ- ২

আনু মুহাম্মদ

Anu_Mohammad-2এই সত্যটুকু অনেকে ভুলে যান যে, বাঙালি মুসলমানদের সংখ্যা বাংলাদেশে গরিষ্ঠ হলেও বাংলাদেশ কেবল বাঙালির বাসভূমি নয়, বাংলাদেশ কেবল মুসলমানেরও দেশ নয়। এখানে কোনো কোনো অবাঙালি এবং অমুসলমান জনগোষ্ঠীর বয়স বরং অনেক দীর্ঘতর। এই অঞ্চল শাসন করেছে উচ্চবর্ণ হিন্দু (যাদের আদিভূমি এই অঞ্চল নয়), বৌদ্ধ (যারা এই অঞ্চলেরই মানুষ), মুসলমান (তুর্ক, মোগল, পারসীয়; বাইরে থেকে এসেছেন রাজ্য শাসন করতে, এবং অনেকে ধর্মপ্রচার করতে এসে স্থায়ীভাবে বসতি গেড়েছেন) এবং খ্রীষ্টান (ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি এবং মিশনারী) ভারত বিভাগের সময় সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে ক্ষতবিক্ষত হয়ে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে জনস্থানান্তর ঘটেছে, যে সাম্প্রদায়িকতার রেশ এখনও কাটেনি। ভারতের বিহার সহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলমানরা তৎকালীন পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রান্তে আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমান বাংলাদেশেও তাঁদের একটি অংশ বসতি গেড়েছেন। তাঁরা প্রধানত উর্দুভাষী।

বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষদের জীবনপ্রথা, বিশ্বাস প্রথা, খাদ্যরীতি, পোষাকরীতি, এই অঞ্চলের আদি প্রথা এবং রীতিনীতির সঙ্গে মিশে গেছে। যেসব ভাষা ক্ষমতার ভাষা ছিল সেগুলো হলো সংস্কৃত, ফারসী, উর্দু এবং ইংরেজি। লিখিত ও মান বাংলা হিসেবে যে ভাষা আমরা এখন দেখছি তার মধ্যে প্রবিষ্ট হয়েছে বহুভাষার শব্দ ও ধারণা। আরব, পারস্য, মধ্য এশিয়া, উত্তর ভারতসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এখানে বসতি গেড়েছেন। দেহের গড়ন, চেহারা, দৈর্ঘ্য, চুল ইত্যাদিতেও তাই বহু জনগোষ্ঠীর স্বাক্ষর। এই অঞ্চলে বাংলাভাষাভাষী ছাড়াও অন্যান্য ভাষাভাষী জাতিগোষ্ঠীর বাসও দীর্ঘদিনের। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, সাঁওতাল, গারো প্রভৃতি। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে আছে মহাবিশ্বের বৈচিত্র। এই বৈচিত্র তার দুর্বলতা নয়, শক্তি।

বাংলাদেশে ‘বাঙালী সংস্কৃতি’ বলতে যাকে নির্দেশ করা হয়, তা প্রকৃতপক্ষে সমতলের গ্রামীণ কৃষক সংস্কৃতি। ‘মাছে ভাতে বাঙালী’ এই অঞ্চলের খাদ্যাভ্যাস ও খাদ্যপ্রাপ্তির ধরণই নির্দেশ করে। কৃষিকাজ, নদী, বন্যা, পশুপাখি, বৃক্ষ, ভূতপ্রেতজ্বীপরী, দেওদানবসাধুসন্তুপীরমুর্শিদ ইত্যাদির ওপর যে লোকজীবন দাঁড়িয়ে আছে সেখানকার লোককথা, লোকবিশ্বাস, লোকচর্চা, গান পালা বাদ্যযন্ত্র তার জীবন সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর মধ্যে ধর্মবিশ্বাস নানাভাবে উপস্থিত। কিন্তু তাকে একটি নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় কাঠামোয় বাধা যায় না। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে বিশ্বাসচর্চা বিশ্লেষণ করলে নানা ধর্মমতের সহজ সহাবস্থান দেখা যায়। বাংলাদেশের সমাজের এ এক অসাধারণ শক্তি, সন্দেহ নাই। কিন্তু ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের অনেক ঘটনায় এই শক্তি বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে।

.

বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রদায়িকতা নিয়ে কথা বলতে গেলে সময় ও স্থান অনেক বিস্তৃত হয়ে যায়। আমাদের ইতিহাস টানতে হয়। বাংলাদেশ ছাড়িয়ে পূর্ববর্তী রাষ্ট্র পাকিস্তান এমনকি তার পূর্ববর্তী রাষ্ট্র/সাম্রাজ্য ভারতকে টানতে হয়। যতদিন যাচ্ছে ততই সীমানা আরও বিস্তৃত হচ্ছে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের মতো দেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ধরণ, শেকড়, শক্তি যথাযথভাবে খুঁজতে গেলে বিশ্বব্যবস্থা, পুঁজিবাদী কেন্দ্র রাষ্ট্র এবং সাম্রাজ্যবাদী কৌশলে, যুদ্ধসহ আগ্রাসনী তৎপরতার দিকেও নজর দিতে হয়।

সেন আমলে বৌদ্ধদের ওপর ব্রাহ্মণ্যবাদী নৃশংস আক্রমণের কাহিনী প্রাকব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের ঘটনা। এর ফলাফল ছিল ভারতের বহু অঞ্চলে বৌদ্ধদের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া এবং ভারতের বহু প্রান্তে কিংবা ভারত সীমানা পার হয়ে গিয়ে বসতি স্থাপন। অনেক বৌদ্ধ পরে হিন্দু ধর্মে ফিরে আসেন কিন্তু তাদের অনেক প্রায়শ্চিত্ত করে নিম্ন বর্ণে স্থান নিতে হয়। একসময় পাল ছিলেন বৌদ্ধ শাসক, পরে পাল হয়ে যায় গালি, হিন্দুসমাজের নিম্নবর্ণের মানুষ। পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর লেখায় এই ইতিহাস উদ্ধারের চেষ্টা আছে।

এই অঞ্চলে মুসলিম আগমনের দুটো প্রধান ধরণ আছে। একটি যোদ্ধা ও আক্রমণকারী হিসেবে অন্যটি ধর্ম প্রচারক হিসেবে। প্রথম ধারা এই অঞ্চলে হিন্দু মন্দির ধ্বংস দখল ও তার ওপর মসজিদ নির্মাণ করেছে। মোগল আমলে অবশ্য সাম্প্রদায়িক সমাঝোতার চেষ্টা দীর্ঘসময় বলবত ছিল। তার সাফল্যের দিকটিও উল্লেখযোগ্য। তবে সম্রাট আওরঙ্গজেরের আমলে শাসনের সাম্প্রদায়িক প্রবণতা স্পষ্ট আকার নেয়।

কয়েকশো বছর মুসলিম শাসন ও ইসলাম ধর্ম প্রচার সত্ত্বেও তা সমাজে বর্ণহিন্দুদের আধিপত্য খর্ব করেনি। মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটলেও সামাজিক ক্ষমতা, আচার অনুশাসন, প্রথা ইত্যাদিতে বর্ণ হিন্দুদের কর্তৃত্বই বহাল থাকে। এমনকি মুসলিম শাসকদের দরবারেও হিন্দুদের অবস্থান ছিল শক্তিশালী। দিল্লিতে ও বাংলার মুসলিম শাসকেরা ক্ষমতাবান হিন্দুদের সঙ্গে একধরনের সমাঝেতার মাধ্যমেই স্থিতিশীলতা তৈরি করেছিলেন।

মুসলিম শাসনের সঙ্গে মানিয়ে চললেও অভিজাত প্রভাবশালী হিন্দু মহলে মুসলমানদের প্রধানত বিদেশী আগ্রাসী হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে। চিন্তার এই ধারাটি উচ্চকিত না থাকলেও এই কালেও তা প্রভাবশালী। মুসলমান শাসনকে ‘ঔপনিবেশিক শাসন’ হিসেবে অভিহিত করবার তাত্ত্বিক বয়ানও তাই দুর্লভ নয়। উনিশ শতকে অনেকের মধ্যে এই বিষয়ে তাত্ত্বিক নেতৃত্ব দান করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। বর্তমানে হিন্দুত্ববাদী দর্শনের মুখ্য সুর তাই।

১৭৮৭ থেকে ১৮৫৭ সময়কালে ইংরেজ উপনিবেশিক শাসন বিস্তৃত করার মধ্য দিয়ে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। এর মধ্য দিয়ে হিন্দু অধিপতি গোষ্ঠী নিজেদের ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস করতে সক্ষম হয়। ইংরেজ শাসকদের ক্ষমতার অংশীদারে পরিণত হয়। অন্যদিকে, মুসলমানদের মধ্যে সাধারণভাবে ক্ষমতা হারা অভিমানী মনস্তত্ত্ব তাদেরকে ক্ষমতা থেকে আরও দূরে ঠেলে দেয়।

উনিশ শতকের শেষ থেকে মুসলমানদের শিক্ষা ও কর্মজীবনে প্রবেশের চেষ্টা শুরু হয়। এবং ক্রমে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে মুসলমানরা হিন্দুদের প্রতিদ্বন্দী হয়ে ওঠে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নতুন পর্বের সম্প্রদায়িক বিভেদের সূচনা ঘটায়। কারণ ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ ও সেই অনুযায়ী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র আগে ছিল এককভাবে হিন্দুদের হাতে, সেখানে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীর আবির্ভাব হয়। মুসলিম মধ্যবিত্তের উদ্ভব ঘটে, নিজেদের অবস্থান ও পরিচয় সনাক্ত করা ও সেই জায়গা তৈরিতে তার মনোযোগী হতে হয়। মুখোমুখি দাঁড়ায় হিন্দু ও মুসলমান মধ্যবিত্ত। ভারত বিভাগ বা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা যার অন্যতম পরিণতি। তবে বলাই বাহুল্য তা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার অবসান ঘটায়নি বরং দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে তার বিস্তার ঘটিয়েছে।

যাইহোক, সুমিত সরকার তাঁর মডার্ন ইন্ডিয়া গ্রন্থে হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার বিকাশ আলোচনা করতে গিয়ে বিশ শতকের বিশ দশকে কয়েকটি দাঙ্গার উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯২৩ থেকে ১৯২৭ সালে উত্তর প্রদেশে ৯১টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গরু কোরবাণী কিংবা মসজিদের সামনে বাজনা বাজানো নিয়ে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। ১৯২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কোহাটে দাঙ্গা হয়, মৃত্যুবরণ করেন ১৫৫ জন। ১৯২৬ সালের এপ্রিলজুলাই মাসে মারা যান ১৩৮ জন। ১৯২৬ সালে ঢাকা, পাটনা, রাওয়ালপিন্ডি এবং দিল্লীতে দাঙ্গার ঘটনা ঘটে।।