Home » আন্তর্জাতিক » রাশিয়ার মিগ জঙ্গি বিমান – বিধবা বানানোর মেশিন

রাশিয়ার মিগ জঙ্গি বিমান – বিধবা বানানোর মেশিন

mig29_indian-airforce-1-রাশিয়ার মিগ জঙ্গি বিমান এখন ভারতীয় বিমান বাহিনীর জন্য পরিণত হয়েছে ‘ফ্লাইং কফিন’বা উড়ন্ত শবাধার ও ‘বিধবা বানানোর মেশিন’এ। অন্য কেউ নয়, ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি ২০১২ সালের প্রথমভাগে পার্লামেন্টে মিগ নিয়ে যে তথ্য দিয়েছেন, যা এককথায় ভয়াবহ। রাজ্যসভাকে তিনি অবহিত করেন, গত ৪০ বছরে ভারত তার বিমান বহরের ৮৭২টি জঙ্গি বিমানের অর্ধেকের বেশি খুইয়েছে। তিনি জানান, ‘২০১২ সালের ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত ৪৮২টি মিগ বিমান দুর্ঘটনায় পড়েছে।’ এসব দুর্ঘটনায় মূল্যবান প্রাণহানির ঘটনাও অনেক বেশি।

অ্যান্টনি আরো প্রকাশ করেন, এসব দুর্ঘটনায় ১৭১ জন পাইলট, ৩৯ জন বেসামরিক লোক এবং অন্যান্য সার্ভিসের আটজন নিহত হয়েছে। তিনি বলেন, মানবিক ভুল এবং যান্ত্রিক ক্রুটিউভয়টাই এসব দুর্ঘটনার কারণ।

পার্লামেন্টে মন্ত্রীর এই বক্তব্য সঙ্গে সঙ্গে মারাত্মক সমালোচনার মুখে পড়ে। জনৈক অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার পুনে থেকে বলেন, ‘মিগ নামের ফ্লাইং কফিনগুলোর কারণে ভারতীয় বিমান বাহিনী বেশ কয়েকজন প্রতিভাধর পাইলট, সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারকে হারিয়েছে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর পাইলটদের দোষারোপ এবং মানবিক ভুলকে দায়ী করা গ্রাউন্ড অফিসারদের জন্য খুবই সহজ কাজ। অথচ বাস্তবে প্রতিটি পাইলটই প্রথম দিন থেকেই তার জীবনকে বাজি রাখেন।’কেবল ভারতে নয়, মিগ নিয়ে সমস্যায় রয়েছে এর প্রস্তুতকারী দেশ রাশিয়াও । ওয়েবসাইটের অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাশিয়া তার জঙ্গি বিমান বহরের প্রায় ৩০০ মিগ২৯ বিমানের ৩০ শতাংশ বসিয়ে রেখেছে। রুশ বিমান বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল ভøাদিমির দির্ক বার্তা সংস্থা ইন্টাফ্যাক্সকে জানান, একটি দুর্ঘটনার পর যে ২০০টি মিগ২৯ বিমান পরীক্ষাা করা হয়, তার প্রায় ৯০টিই বসিয়ে রাখা হয়। আর পুরো অনুসন্ধান প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর আরো অনেক বিমানকে বসিয়ে রাখা হবে।

অন্যদিকে মান সন্তোষজনক না হওয়ায় আলজেরিয়া ১৫টি মিগ২৯ বিমান ফেরত দিয়েছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করে ভারতীয় বিমান বাহিনীর আরেক অফিসার বলেন, প্রতিবেশী দেশটি আধুনিক বিমান ব্যবহার করায় তাদের তরুণ অফিসার নিহতের হওয়ার সংখ্যা অনেক কম। তিনি জানান, যখনই কোনো মিগ ভূপাতিত হয়, লোকজন বিলিয়ন আর মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হওয়ার কথা বলেন। কিন্তু পাইলটের জীবনের কোনো দামই নেই।

অবশ্য, মিগের পক্ষেও অনেকে কথা বলেন। কারো কারো মতে, মিগগুলো বেশি উড়ানো হয় বলেই সেগুলো দুর্ঘটনায় পড়ে। সাবেক বিমান বাহিনী কর্মকর্তা প্রণব কুমার বারবোরা বলেন, মিগে যত দুর্ঘটনা ঘটে, প্রাণহানির সংখ্যা তার চেয়ে কম। তিনিও মনে করেন, উড্ডয়ন ঘণ্টা কমিয়ে দুর্ঘটনা অনেক কমিয়ে আনা যায়। তার মতে, চালানো একটি কঠিন হলেও মিগ বিমান দুর্দান্ত।

তার এই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়, বিমান বাহিনীতে বিমানের সংখ্যা কম হওয়াতে মিগ বেশি উড়ানো হয় এবং এর ফলে দুর্ঘটনা ঘটে। বর্তমানে ভারতীয় বিমানবাহিনীতে ৩৪টি স্কোয়াড্রন রয়েছে। বিমান বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, আগামী বছরগুলোতে ওই সংখ্যা ৩১এ নেমে যাবে এবং ২০১৭ সালের আগে ৪২এ পৌঁছাবে না। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, পুরনো বিমানগুলো বদলানো বিলম্বিত হবে এবং মিগগুলো অতিরিক্ত ব্যবহার হতেই থাকবে।

ভারতে প্রথম মিগ আনা হয় ১৯৬৬ সালে। তারপর থেকে ভারতীয় বিমান বাহিনী বিভিন্ন ধরনের মিগ পেয়েছে। বিভিন্ন সংস্করণের মিগ ২১ বিমান এখনো সার্ভিসে আছে এবং টি৬৯/৬৯বি (প্রশিক্ষণ), টি৭৫ (বিআইএস) ও বাইসন, টি৭৭ (বাদল) ও টি৯৬ (ত্রিশূল) ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে উড়ছে। আর বিমান বাহিনী মিগ২৩এমএফ, মিগ২৩বিএন এবং মিগ২৭ ও ২৯ বসিয়ে রেখেছে, যদিও এগুলোর আয়ু আরো ২৯ বছর আছে।

বিমান বাহিনী ইতোমধ্যে মিগ২১ বিমানগুলোকে ব্যাচ ব্যাচ ধরে বাতিল করে দেওয়া শুরু করেছে। ফলে এই দশকের শেষ নাগাদ সেগুলোর একটাও আর সক্রিয় থাকবে না। এরপর বাতিল করা হবে মিগ২৭গুলো আর উন্নত করা হবে মিগ২৯গুলোকে। এসব বিমানের সবগুলোই পূর্বাঞ্চলের হামিমারা থেকে পশ্চিমাঞ্চলের যোধপুর ও জয়সালমারসহ সীমান্তবর্তী ঘাঁটিগুলোতে মোতায়েন রাখা হয়েছে।

উচ্চগতির অবতরণগত জটিলতার কারণে মিগ২১ চালানো বিশেষভাবে কঠিন। তাছাড়া এগুলো একক ইঞ্জিনের বিমান হওয়ায় পাখির আঘাতে এর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।

অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার জানান, ‘সিনিয়র পাইলট হিসেবে আমি মিগ দিয়ে অনেক জুনিয়রকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি এবং অনেক সমস্যায় পড়েছি। কিন্তু সশস্ত্র বাহিনীর অলিখিত আচরণবিধির কারণে আমাকে ওইসব বিমানের ত্রুটিগুলো দেখিয়ে দিতে পারিনি।’

আরেক অফিসার খেদোক্তি করে বললেন, ইঞ্জিনে আগুন ধরার পরও অনেক তরুণ পাইলট বের হতে না চাওয়ায় মারা গেছে, এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য। কিন্তু কেউ এসব বিষয়ের পরোয়া করে না। কারণ ‘মিগগুলো খুবই নিরাপদ এবং উড্ডয়নমুখ’সুপার বসদের এক কথা।

গত ৪০ বছরে বিভিন্ন ধরনের বিমান আমদানি করায় পুরো মিগ বহরের জন্য কত খরচ হয়েছে, তা হিসাব করা কঠিন। তবে বাইসন নামের সর্বশেষ যে সংস্কারণ আনা হচ্ছে, তাতে ব্যয় হচ্ছে ২০ কোটি রুপি। ভারতীয় বিমান বাহিনীর শতাধিক সক্রিয় বাইসন রয়েছে। আর মিগ২৯গুলো আপগ্রেড করতেই লাগবে প্রায় ৯৪০ মিলিয়ন ডলার।।

(ভারত থেকে প্রকাশিত মেইল টুডেএ ২০১২ সালের ৩ মে প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ)