Home » শিল্প-সংস্কৃতি » অযান্ত্রিক – ঋত্বিকের সংশয়, আমাদের বয়ান

অযান্ত্রিক – ঋত্বিকের সংশয়, আমাদের বয়ান

বিধান রিবেরু

azantrik-1(ঋত্বিককুমার ঘটক ও সের্গেই আইজেনস্টাইন দুজনই মারা গিয়েছিলেন ফেব্রুয়ারি মাসে। দুজনের বয়সই তখন ৫০ ছুঁয়েছে। শুধু সালটি আলাদা। ঋত্বিক মারা গেছেন ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি আর আইজেনস্টাইন মারা গেছেন ১৯৪৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। জগদ্বিখ্যাত এই দুই চলচ্চিত্র নির্মাতা ও বোদ্ধাকে শ্রদ্ধা জানাতেই তৈরী হয়েছে বর্তমান রচনাটি।)

আইজেনস্টাইন সাহেবের মতে যে কোনো উপন্যাসকে ছবি করতে গেলে তিন রকম ভাবে এগনো যায়: . সম্পূর্ণ গ্রহণ, . আংশিক গ্রহণ, . পয়সার জন্য করে যাওয়া। পয়সার জন্য যে গল্পকে ছবি করতে হয় সেটা নিয়ে গভীর চিন্তার কোনো অবকাশ নেই। সেটা পরিষ্কার।”

ঋত্বিককুমার ঘটক

ঋত্বিককুমার ঘটকের প্রথম ছবি ‘অযান্ত্রিক’ তৈরী হয়েছিলো সুবোধ ঘোষের প্রথম ছোটগল্প ‘অযান্ত্রিক’ থেকে। আইজেনস্টাইনের ভাবশিষ্য ঋত্বিক এইক্ষেত্রে উল্লিখিত তিন উপায়ের বাইরে গিয়ে এগিয়েছেন চতুর্থ রাস্তা ধরে। তিনি এই ছবি করতে গিয়ে সুবোধ ঘোষের কাহিনী ও ভাব সম্পূর্ণ গ্রহণ করেছেন এবং কিছু যোগ করে সুবোধ ঘোষের বক্তব্যকে ছাড়িয়ে গেছেন। এই চতুর্থ পন্থাকে আমরা ‘বিনির্মাণ’ও বলতে পারি। সুবোধ ঘোষের যে টেক্সট সেখানে বহুদিনের ব্যবহৃত জিনিসপত্রের প্রতি মানুষের যে ভালোবাসা জন্মে সেটা উঠে এসেছে। গল্পে বহু পুরনো বস্তুটি একটি ফোর্ড গাড়ি। গাড়ির মালিক বিমল আদর করে গাড়ির নাম রেখেছে ‘জগদ্দল’। অনেক পুরনো সংস্কার বা বিশ্বাস যেমন মানুষের মনের ভেতর জগদ্দল পাথরের মতো গেড়ে থাকে গাড়িটিও বিমলের জীবনে জায়গা করে নিয়েছিলো শক্তভাবে। নানা ভর্ৎসনা ও ঘটনার পরও ‘জগদ্দল’কে বিদায় করতে চায়নি বিমল। কারণ ১৫ বছরের সাথী ‘জগদ্দল’কে “সেবক, বন্ধু আর অন্নদাতা” হিসেবেই দেখতো বিমল। সুবোধ ঘোষের এমন বর্ণনা থেকে আমরা যেভাবে পাঠ তৈরী করেছি, সেখানে ‘জগদ্দল‘-এর নিচে আমরা আবিষ্কার করছি ‘পুরনো সংস্কার বা বিশ্বাস’। কিন্তু ঋত্বিককুমার সেটি করেননি। সুবোধ বাবুর গল্পটি তিনি পাঠ করেছেন এবং সেলুলয়েডে সেই গল্পটিই বলেছেন ভিন্ন মাত্রায়, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। এটাকেই আমরা আদর করে ডাকছি ‘বিনির্মাণ’।

ঋত্বিকের বির্নিমিত ‘অযান্ত্রিকে’ প্রবেশের আগে আইজেনস্টাইনের ‘বিনির্মাণ’ নিয়ে দু’একটি কথা বললে বোধ করি অপ্রাসঙ্গিক হবে না। আইজেনস্টাইন একবার ‘এন আমেরিকান ট্র্যাজেডি’ নামে একটি ছবি করার উদ্যোগ নেন। থিয়োডর ড্রেজারের লেখা সেই উপন্যাসে ক্লিড নামে এক দরিদ্র ছেলে থাকে। সে সাধারণ শ্রমিক কিন্তু ধনী হওয়ার আকাক্সক্ষা তার প্রবল। এজন্য সে এক ধনী মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। কিন্তু তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় পুরনো গরীব প্রেমিকা রোবার্ত। ক্লিড ঠিক করে রোবার্তকে নৌকা চড়াতে নিয়ে যাবে এবং সেখানে তাকে পানিতে ফেলে দেবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্লিড নৌকায় ওঠায় রোবার্তকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্লিডের মন আর সায় দেয় না। এরমধ্যে ক্লিড দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, অনিচ্ছাকৃতভাবে দুলে ওঠে নৌকা, এরপর তাল সামলাতে না পেরে পানিতে পড়ে যায় রোবার্ত। ক্লিডের ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও সফল হয় পূর্ব পরিকল্পনা। উপন্যাসে এই ঘটনার জন্য পাপস্বীকার করে ক্লিড, যাজক ম্যাক মিলানের কাছে। কিন্তু ছবিতে আইজেনস্টাইন এই পাপস্বীকারটি করান ক্লিডের মায়ের কাছে। এখানেই আইজেনস্টাইনের বিনির্মাণ। লেখকের কাছ থেকে আংশিক গ্রহণ করেছেন তিনি। এরপর সেই টেক্সটকে মুক্তি দিয়েছেন লগোসেন্ট্রিজম বা পরমার্থকেন্দ্রিকতা থেকে।

চলচ্চিত্র ‘অযান্ত্রিকে’ ঋত্বিককুমার আংশিক যে গ্রহণ করেননি সেটা আগেই বলেছি। তিনি প্রথমে কাহিনীটিকে নিয়েছেন এরপর তা ভেঙে নতুন নানা উপাদান মিশিয়ে আরো উপাদেয় করে নির্মাণ করেছেন নিজস্ব ‘অযান্ত্রিক’। কেমন সেই নির্মাণ? গল্পে রয়েছে শুধু বিমল আর ফোর্ড গাড়িটি। কিন্তু চলচ্চিত্রে এসেছে একটি ছোট বালক, যে বিমলের অন্ধ ভক্ত এবং পুত্রের মতো। ছবিতে আনা হয়েছে একটি নারী চরিত্র, যিনি নববিবাহিতা ও পরবর্তীকালে স্বামীর দ্বারা প্রতারিত। বিমলই পরে তাকে সাহায্য করে। এরমধ্যে একটা অব্যক্ত ভালো লাগাও জন্ম হয় বিমলের ঐ ভাগ্য বিড়ম্বিত নারীর প্রতি। কিন্তু সেটা অপ্রকাশিতই রয়ে যায় যেহেতু নারীটির সঙ্গে আর দেখা হয় না তার। আরো একটা সম্পর্কের দিক উন্মোচিত এই চলচ্চিত্রে। সেটা হলো সন্তান ও মায়ের সম্পর্ক। সংলাপ থেকে জানতে পারি, মা মারা যাওয়ার পরপরই ‘জগদ্দল’ প্রবেশ করে বিমলের জীবনে। অন্যদিকে লক্ষ্য করি, প্রতিবেশীদের অনেকেই ‘বুড়ি’ বলে সম্বোধন করে গাড়িটিকে। অতএব ‘জগদ্দল’ যে এখানে মায়ের রূপক হয়ে ধরা দেয় সেটা স্পষ্ট। ইয়ুঙ প্রভাবিত ঋত্বিক এভাবে আর্কিটাইপাল ইমেজ আঁকার চেষ্টা করেছেন পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোতেও।

এই যে তিনটি সম্পর্ক, পুত্রের মতো বালক, প্রেমিকার মতো ভাগ্যবঞ্চিত নারী ও মৃত মা; এই প্রত্যেকটি সম্পর্কই গাড়িটির সঙ্গে সম্পর্কিত। মনে করে দেখুন, গাড়িটির প্রতি বালকের পক্ষপাত। নিয়ন্ত্রণহীন গাড়িটি ঠিক নারীটির সামনে এসে থেমে যায়, নারী গাড়ির হুড ছিঁড়ে দেয়, সেটা আবার বিমল সেলাই করে নেয়। আর মার চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির আগমন। তিন ধরণের সম্পর্কের সঙ্গে গাড়ির প্রতি বিমলের মায়াকে সমান্তরালে দেখানোর মধ্য দিয়ে ঋত্বিককুমার বলতে চান, গাড়িটির সঙ্গে বিমলের যোগ মানবিক সম্পর্কের মতোই। কখনো পুত্রের মতো, কখনো প্রেয়সীর মতো আবার কখনো বা মায়ের মতো। চলচ্চিত্রে ঋত্বিককুমার গল্পের মতো একমুখী থাকতে চাইলেন না। মানবিক সম্পর্কের নানাদিক তুলে ধরলেন যন্ত্রের সঙ্গে অযান্ত্রিক সম্পর্কের সামনে।

জগদ্দল’ অক্কা পাওয়ার পর পুরনো লোহা হিসেবে গাড়িটি কিনে নেয় এক মারোয়াড়ি ব্যবসায়ী। বিমলের সামনেই গাড়িটিকে ভাঙা হয় কর্কশ ধাতব শব্দ তুলে। সুবোধ ঘোষ সেখানে বলছেন, “ঠং ঠং ঠকাং ঠকাং ছিন্নভিন্ন ও মৃত জগদ্দলের জন্য কারা যেন কবর খুঁড়ছে।” শাবলের ধাতব শব্দ দিয়ে গল্পটি শেষ করেন সুবোধ বাবু। সেখানে ঋত্বিককুমার ছবিটি শেষ করেন একটি ছেলের হাতে ভেঁপু বাজানোর শব্দ দিয়ে। সুবোধ ঘোষ যেখানে কফিনে পেরেক ঠোকার দৃশ্যকল্প আঁকতে চাইছেন সেখানে ঋত্বিককুমার জানান দিচ্ছেন মৃত্যু নয় জীবনই সত্য। এখানে আইজেনস্টাইনের মতো ঋত্বিককুমারও গল্পের বয়ানকে মুক্তি দিলেন লগোসেন্ট্রিজম বা পরমার্থকেন্দ্রিকতা থেকে। একে বিনির্মাণ বলবো না তো কি!

চলচ্চিত্র সাহিত্য ও আমার ছবি’ নিবন্ধে ঋত্বিককুমার ঘটক ‘অযান্ত্রিক’ সম্পর্কে বলেছিলেন – “কতখানি সার্থক হয়েছি সেটা আপনারা বলবেন তবে আমি চেষ্টার ত্রুটি করিনি। সুবোধ বাবুর মূল বক্তব্যের প্রতি আমি চেষ্টা করেছি বিশ্বস্ত থাকতে। জানি না কতখানি কৃতকার্য হয়েছি।” আমরা বলতে চাই গল্পের বক্তব্যকে হুবহু চলচ্চিত্রে আনাটাই কৃতকার্যতা নয় বরং গল্পের বক্তব্যকে পুঁজি করে নতুন কথা বলার মধ্যেই রয়েছে স্বার্থকতা। নয় তো লোকজন গল্প পাঠ করেও চলচ্চিত্র দেখতে আসবে কিসের টানে? যাহোক, ঋত্বিককুমার ঘটক সেই টান জারি রেখেছিলেন ‘অযান্ত্রিক’এ।।