Home » মতামত » আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

মনির হোসেন

mk-alomgir-1-ভারতের সাথে বন্দি বিনিময় চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন ধরেই এই চুক্তিটি করার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল ভারত। মূল উদ্দেশ্য: বাংলাদেশে আটক উলফা আনূপ চেটিয়াসহ ঐসব নেতাদের ফিরিয়ে নেয়া। কিন্তু অনেকটা অবাক করেই এক পক্ষীয় ভাবে এক তত্ত্ব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীর।

তত্ত্বটি হছে এই চুক্তিতে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশই নাকি বেশি লাভবান হবে!

. মহীউদ্দিন খান আলমগীর ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ আমলে চাকরি ছাড়ার পর আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করলেন। গেল চারদলীয় জোট আর তার পরে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জেল খেটেছেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে মন্ত্রীত্ব তিনি পাননি। এসময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেপথ্য নায়ক সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কিছুদিন জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিলেও পরে আর এনিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। পরে অবশ্য আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীতেও স্থান পেয়ে গেলেন। শুধু দলীয় পদবীই নয়পেয়েছেন ব্যাংকও পেয়েছেন। সবশেষে গত বছর পূর্ণ মন্ত্রীত্বের পুরস্কারও পেয়ে গেছেন।

অনেকের হয়তো ধারণা হয়ে ছিল যে, উচ্চ শিক্ষিত ও জনপ্রশাসনে দীর্ঘদিনের দক্ষ মহীউদ্দিন খান আলমগীর পুলিশ প্রশাসনে অর্থাৎ পুরো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দক্ষতার পরিচয় দেবেন। কথাবার্তায় থাকবে উচ্চ শিক্ষার ছাপ। কিন্তু হাহতোষ্মি!

মন্ত্রী হয়েই যেন কথার ফুলঝুরি ছোটাতে শুরু করলেন তিনি। সাগররুনি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ধরে ফেলা থেকে শুরু। কিছুদিন আগেই বিরোধী দলের হরতালের সময় পুরনো ঢাকায় ছাত্রলীগ কর্মীদের হাতে বিশ্বজিত খুন হওয়ার পর বলেছিলেন: খুনীদের পরিবারের সদস্যরা জামাতে ইসলামী করতো। ফলে খুনীরাও সেই দলেরই লোক।  স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে: তাহলে এখন পুলিশ কেন বিশ্বজিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আসামীদের বাঁচানোর মত সুরতহাল রিপোর্ট দেয়? যেখানে দিনের আলোতে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে বিশ্বজিতকে কোপানো হলো সেখানে চিকিৎসক কেন ময়না তদন্তের রিপোর্টে একটি মাত্র আঘাতের কথা লিখেলেন? তার উপর কি কোন দিক থেকে চাপ এসেছে? এসব প্রশ্নের কোন উত্তর কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কখনো দেননি।

অবশ্য সাংবাদিকদের একটি প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীর। গেল পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চাকুরিতে ‘দক্ষতা’র জন্য রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক পেয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার হারুন অর রশিদ। গেল ২০১১ সালে বিএনপি’র ডাকা হরতালের সময় সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া এভিনিউতে বিরোধী দলের চীফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে পিটিয়ে ‘বিখ্যাত’ হয়েছিলেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। পুরনো ঢাকায় ছাত্রলীগের কর্মীরা যখন বিশ্বজিতকে কোপায় তখনো সেখানে ছিলেন এই হারুন অর রশিদ। বিশ্বজিতকে বাঁচাতে তিনি কিংবা তার পুলিশ বাহিনী কোন ব্যবস্থা নেয়নি।

এহেন কর্মকর্তা কোন্ বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক দেয়া হলো তা জানতে চেয়েছিলেন সাংবাদিকরা। প্রতিটি শব্দে জোর দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীর জবাব দিলেন: এই পুলিশ কর্মকর্তাকে পদক দেয়ার বেলায় বিরোধী দলের চীফ হুইপকে পেটানোর ঘটনাটি বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের পদক দেয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনাও কাজ করেছে বলে স্বীকার করেছেন তিনি।

অথচ পুলিশ সপ্তাহ উদ্বোধনের অনুষ্ঠানেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে বর্তমান সরকার পুলিশকে রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যবহার করেনা বলে জানিয়েছেন। তাহলে সত্য কথা বললেন কে? একই সাথে বিপরীতমুখী দুটি কথাতো সত্য হতে পারে না!

রাষ্ট্র বিজ্ঞানী আর সমাজ বিজ্ঞানীরা ‘পুলিশী রাষ্ট্র’ নামে একরকম রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা বলেন। তেমন কোন ‘পুলিশী রাষ্ট্রে’র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীও এমনটি বলতে পারেন কিনা সন্দেহ আছে।

কিছুদিন আগে অতি গোপনে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে কুখ্যাত সন্ত্রাসী বিকাশ। তার মুক্তির পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন: আইনী প্রক্রিয়াতেই মুক্তি পেয়েছে সে।

বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম কথা বলে ক্ষমতাসীনদেরকেই বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার ফলেই কিনা কে জানে, কয়েক দিন আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলে দলের সভাপতিমণ্ডলীর পদ হারিয়েছেন ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীর। এরপরই তিনি রাজনীতিবিদ পেটানোর জন্য পুলিশ কর্মকর্তাকে রাষ্ট্রপতির পদক দেয়ার কথা জানিয়েছেন। হয়তো তিনি ভেবেছেন, এতদিন যা বলেছেন তা কম হয়ে গেছে বলেই আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলী থেকে বাদ পড়তে হয়েছে। তাই আরো জোরেসোরে ‘কথা’ বলা শুরু করেছেন ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীর।

হয়তো একারণেই কাউকে আারো বেশি ‘খুশী’ করতে বাংলাদেশভারত বন্দি বিনিময় চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য বেশি লাভজনক বলেছেন তিনি!

ইদানিং রাজনীতিবিদদের মধ্যে অনেকেই ইন্টারনেটে সামাজিক নেটওয়ার্ক ফেসবুকসহ বিভিন্ন ব্লগে লেখালেখি করেন। ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীর হয়তো সেটি করেন না। করলে তিনি গত চার পাঁচ মাস ধরে কিছু আলোকচিত্র দেখতে পেতেন।।

(মনির হোসেন: সাংবাদিক, monir121267@gmail.com)