Home » অর্থনীতি » জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি – বিরূপ প্রভাব পড়েছে মানুষের উপরে

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি – বিরূপ প্রভাব পড়েছে মানুষের উপরে

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Fuel-1-জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। এতে বেড়েছে চালডাল ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। এর কারণ হিসেবে বিক্রেতারা যুক্তি দিয়েছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বেড়েছে পরিবহন ব্যয়, তাই নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি হবে এটাই স্বাভাবিক। রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বেশ কিছু বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিনিকেট ও পাইজাম চালের দাম কেজিতে একদেড় টাকা বেড়েছে। আর ভোজ্যতেলের লিটারে বেড়েছে দুতিন টাকা। বোতলজাত ভোজ্যতেলের ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতি লিটার ১৩৫ থেকে ১৩৮ এবং পাঁচ লিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছে ৬৬০ থেকে ৬৬৫ টাকা। কারওয়ান বাজারে প্রকারভেদে প্রতি কেজি মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৪২৪৫, লতা ৩৫৩৬, পাইজাম ৩০, টেপা ৪৬ ও আতপ ৩০ টাকা। এদিকে নতুন বছরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে বেড়ে যাচ্ছে পরিবহন ভাড়া। এর প্রভাবে বাড়ছে পণ্যমূল্য। এছাড়া ভবিষ্যতে পণ্য পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। ফলে কোম্পানিগুলোও তাদের পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। যার সম্মিলিত নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মূল্যস্ফীতির ওপর। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার চার বছরের মধ্যে পাঁচবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। নতুন বছরের শুরু এবং বোরো আবাদের সময় ডিজেলের দাম বাড়ানোয় বিপাকে পড়েছে কৃষক। পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে ব্যাপক হারে। কৃষিপণ্য উৎপাদন ও পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে অনেক। যানবাহনের ভাড়া নিয়ে পরিবহনে চলছে যাত্রীশ্রমিকের বিরোধ। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে আদায় করা হচ্ছে অধিক, দেখার কেউ নেই। ব্যবসায়ীরা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিক্রিয়ায় জানান এর ফলে বাজারে চাল, ভোজ্য তেল, কাঁচাতরকারিসহ যাবতীয় নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে। কারণ পণ্য পরিবহনে তাদের বাড়তি টাকা গুনতে হবে। যার প্রভাব পড়বে খুচরা বাজারে। তারা বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে পণ্য পরিবহনসহ বাস ভাড়া বাড়বে। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানান, বর্ধিত দামের কারনে কৃষির ওপরও প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে আগামী বোরো মৌসুমে ডিজেলের এ বর্ধিত দাম ধান উৎপাদনের খরচ বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন তারা। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন সরকারকে তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে বলেছেন, জ্বালানি তেলসহ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদ ব্যবসায়ীরা সবসময় করে আসছে। নতুন করে দাম বাড়ানোর ফলে পোশাক শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশ্লেষকদের মতে, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানোর ফলে কৃষক ও গরিব মানুষের ওপর বেশি চাপ পড়বে। কারণ গ্রামীন জনগোষ্ঠী কৃষি সেচ কাজে ডিজেল ও কেরোসিন বেশি ব্যবহার করেন। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৭ টাকা বাড়ায় কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে ৪৭০ কোটি টাকা। আর কোরোসিনের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় জনগণকে বাড়তি গুনতে হবে অন্তত ৪৪২ কোটি টাকা। এর ফলে শুধু গ্রামের সাধারণ মানুষেরই নয় শহরের মানুষেরও জীবন ধারণের ব্যয় বাড়বে। তাই সরকারের এ সিদ্ধান্তকে ভালোভাবে দেখছেন না অর্থনীতিবিদরা। এতে সরকারের সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা আরো কঠিন হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি)’র তথ্যানুযায়ী নতুন বছরে ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য বৃদ্ধির ফলে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি বাড়বে। জ্বালানির মূল্য বাড়ানোর ফলে জিডিপির দশমিক ২ থেকে দশমিক ৩ শতাংশ কমবে, রফতানি আয় দশমিক ৪ থেকে ১ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত, আমদানি দশমিক ৮ শতাংশ, কর্মসংস্থান দশমিক ৫ থেকে দশমিক ৭ শতাংশ, কৃষকের আয় দশমিক ৭ শতাংশ কমবে।

এদিকে, আন্তর্জাতিক বাজার দর অনুযায়ী পরিশোধিত তেলের দাম এখন ব্যারেল প্রতি ৯৫ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। গত এক বছর যাবৎ এ দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ থেকে ১২০ ডলারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এটি দীর্ঘদিন ১০০ ডলারের নিচেই ছিল। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী এক বছর ব্যারেল প্রতি দাম গড়ে ১০৭ ডলার থাকবে বলে আশা করছে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলো। এমন পরিস্থিতিতে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি যৌক্তিক হয়নি বলে উল্লেখ করছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে বাংলাদেশে আসন্ন গরমের সময় উচ্চমূল্যের ভাড়ায় আনা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে যে বাড়তি তেলে লাগবে তা জোগাড় করতেই দাম বাড়ানো হয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর চাপ রয়েছে সরকারের উপর। দুই মিলিয়ে নির্বাচনী বছরে বাজেটে চাপ কমাতে দাম বাড়ানো হয়েছে।

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক হয়েছে এমন প্রশ্ন করা হলে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে পরিবহনসহ সব খাতেই এর প্রভাব পড়বে। এ মুহূর্তে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়লেও হতো। অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে সরকার ভর্তুকির চাপ কমাতে পারতো। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখত বলেছেন, চলতি বছর নির্বাচনী বছর হওয়ায় বাজেটে চাপ কমাতে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ধারণা। জ্বালানির দাম বাড়াতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপও রয়েছে। তবে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসলেও জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে এটি বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে অনেক বেড়ে যাবে। ধান উৎপাদনে কৃষকরা চলতি বছর ভালো দাম পায়নি। ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে কৃষকের ব্যয় আরো বেড়ে যাবে। ফলে কৃষকরা বোরো উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। ফলে কৃষি পণ্যের দাম বাড়তে পারে।

২০১০ ও ২০১১ বছরে রফতানির চেয়ে আমদানি অধিক হারে বাড়তে থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, দাতাসংস্থার কাছ থেকে নেয়া ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের দায়Ñ সব মিলিয়ে সরকার অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় সংকটে পড়ে কঠিন শর্তে আইএমএফের কাছে ঋণের জন্য হাত পাতে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে চার দফা সংস্কারের শর্তে আইএমএফ অবশেষে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয়। আইএমএফের শর্তানুযায়ী প্রথম কিস্তির অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ রিপোর্টের সন্তুষ্টির ওপরই নির্ভর করবে দ্বিতীয়সহ পরবর্তী কিস্তির অর্থ ছাড়। এ ঋণের প্রথম কিস্তি হিসেবে ২৫ এপ্রিল ২০১২, বাংলাদেশ সরকার আইএমএফ এর কাছ থেকে ১৪ দশমিক ১ কোটি ডলার পায়। কিন্তু শর্তানুযায়ী কাজ না করায় সরকারের ওপর নাখোশ আইএমএফ দ্বিতীয় কিস্তির ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। যা গত নভেম্বর ২০১২এ দেয়ার কথা ছিল। দ্বিতীয় কিস্তি পেতে সরকার দাতাসংস্থার সঙ্গে আবারও দেনদরবার শুরু করে। অবশেষে, আইএমএফ দ্বিতীয় কিস্তির ১৪ কোটি ১০ লাখ ডলার জানুয়ারিতে দিতে সম্মত হয়।

সরকার ‘ডাবল ভর্তুকি’র ফাঁদে পড়েছে হিসাবের বড় ভুলে। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোর মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে সমস্যার সমাধান করতে চাইলেও ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল নির্ভর এসব প্ল্যান্ট পূর্ণ ক্যাপাসিটিতে চালাতে চাইলে জ্বালানিতেল আমদানি কতগুণ বাড়াতে হবে সে হিসাবটায় বড় ভুল হয়ে গেছে। ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের দামে প্রদত্ত ভর্তুকি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকেও যেহেতু দিতে হচ্ছে, তাই ভর্তুকির পরিমাণও গত অর্থবছরের বাজেটে চাপের তৈরি করেছিল। আবারো ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ঐ প্ল্যান্টগুলো থেকে বিদ্যুৎ কিনতে। কারণ, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল দিয়ে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল প্ল্যান্টগুলোতে এক ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ছে ১৪১৬ টাকা। বিদ্যুৎ বিক্রয়ের সময় গড়ে দাম পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬ দশমিক ৫০ টাকা। এহেন ‘ডাবল ভর্তুকি’র ফলে এখন দেখা যাচ্ছে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্যাপাসিটি প্রায় ৮৫২৫ মেগাওয়াটে পৌঁছে গেলেও প্রকৃত ‘পিক আওয়ার’ উৎপাদন ৬৩০০ মেগাওয়াটের নিচেই রাখতে হচ্ছে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বেশির ভাগই বন্ধ রাখার তাগিদে। এই তাগিদটা সৃষ্টি হচ্ছে জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয় ও জ্বালানি তেলে ভর্তুকি কমিয়ে রাখার প্রয়াসের কারণে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, বিদ্যুতের প্রায় ২২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্যাপাসিটি অব্যবহৃতই থেকে যাচ্ছে। অথচ, এসব রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোর লাইসেন্স প্রদান থেকে শুরু করে নির্মাণ ও উৎপাদন পর্যায় পর্যন্ত বাস্তবায়নের বিভিন্ন প্রক্রিয়াই সম্পন্ন হয়েছে অস্বচ্ছ ও শর্টকাট পদ্ধতিতে, যেখানে দুর্নীতির আশংকাকে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই। সেজন্যে, এক ধরনের ‘ইনডেমনিটি’ প্রদান করতে হয়েছে এ ব্যাপারটাতে। এমনকি, বিদ্যুৎ কেনার শর্তগুলোকেও ন্যায্য বলা যাচ্ছে না। যেমন, বিদ্যুৎ না কিনলেও ঐসব প্রতিষ্ঠানের লোকসানের কোন সুযোগ রাখা হয়নি। আবার, ‘স্বল্প মেয়াদ’ উত্তীর্ণ হওয়ার পরও বিভিন্ন প্ল্যান্টের সাথে পিডিবি’র চুক্তি নবায়িত হচ্ছে লবিংএর মাধ্যমে।

গত অর্থ বছরে ৫৫ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়েছিল। এ বাবত সরকার শুল্ক ও বিভিন্ন কর রাজস্ব সংগ্রহ করেছে ৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বিদ্যুৎ উপাদনের জন্য বর্তমানে ৩০ লাখ ব্যারেল তেল বেশি আমদানি করতে হচ্ছে বলে জানা যায়। অন্যদিকে, সরকারকে জ্বালানি তেলের পেছনে বিপুল ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে, জ্বালানির দামে ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। রাজস্ব আয়ও ভর্তুকি ব্যয়ের যোগবিয়োগে প্রকৃতপক্ষে সরকারের ওপর ব্যয়ের বোঝা কত বর্তাচ্ছে,সে তথ্যটা সরকার জনসাধারণকে জানাচ্ছে না। সত্যিকার হিসেবটা বিবেচনা করলে প্রমাণ পাওয়া যাবে যে, জ্বালানি খাতে ‘নীট সরকারি ব্যয়ের’ বোঝাটা কত। জ্বালানি তেলের ওপর শুল্ক ভ্যাট ও শুল্কারোপের বিষয়টি বরাবরই এড়িয়ে যায় সরকার। দাম বৃদ্ধির আগেও পেট্রল ও অকটেনে সরকার মুনাফাই করছে, এটি স্বীকারও করছে কর্তৃপক্ষ। দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি কাটিয়ে ওঠা কঠিন নয়।

বাংলাদেশের একমাত্র অয়েল রিফাইনারীর উৎপাদন ক্যাপাসিটির মারাত্মক সীমাবদ্ধতার কারণে ডিজেল ও কোরোসিনের বর্ধিত চাহিদা মেটাতে হচ্ছে সরাসরি ‘রিফাইন্ড ডিজেল ও কেরোসিন’ আমদানির মাধ্যমে, যে গুলোর আন্তর্জাতিক বাজার দাম অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাইতে বেশি পড়ছে। ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের চার বছরেও দেশের রিফাইনারীর ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি ও প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ইস্যুটি অগ্রাধিকার পায়নি।।