Home » বিশেষ নিবন্ধ » তৃতীয় শক্তি প্রসঙ্গে – প্রফেসর তালুকদার মনিরুজ্জামানের বিশ্লেষণ

তৃতীয় শক্তি প্রসঙ্গে – প্রফেসর তালুকদার মনিরুজ্জামানের বিশ্লেষণ

prof.-talukder-maniruzzaman-1সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশে কোন তৃতীয় শক্তির উত্থান ঘটবে কিনা এ নিয়ে নানা জল্পনাকল্পনা চলছে। তবে আমার ধারণা, এ মূহুর্তে বাংলাদেশে কোনো তৃতীয় শক্তির উত্থানে, তেমন কোন রাজনৈতিক বা সামরিক অথবা সিভিল সোসাইটি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশে এখন দুটি বড় রাজনৈতিক শক্তি বিদ্যমান বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। সুশীল সমাজের যারা কথা বলেন,তাদের রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার সম্ভাবনা নেই এবং তাদের ইচ্ছাও সেটি নয়। এদের বলা যেতে পারে গণতন্ত্র ও দেশের শুভানুধ্যায়ী। অনেকে তৃতীয় শক্তি বলতে সিভিল সোসাইটিকে বোঝালেও এটি আসলে কার্যকর কোনো শক্তি নয়। তবে এটি সত্য, তারা এখন সরকার ও বিরোধী দলের কার্যক্রমের আলোচনা ও সমালোচনায় মুখর। এদের তৃতীয় শক্তি বলা যায় না। রাজনীতির অভিধানেও এমন কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যাবে না। তারা রাজনৈতিক কার্যক্রমের সমালোচনা এবং সরকার ও বিরোধী দলকে পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু সেটি আমলে নেয়া বা না নেয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরই। বর্তমান বিশ্ব রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত এবং বাংলাদেশের বিদ্যমান অবস্থায় এখানকার সশস্ত্র বাহিনী রাজনৈতিক ফ্যাক্টর নয়। তারা আগের মতো ক্ষমতা নিতে চেষ্টা করবে বলে আমার মনে হয় না। যদি দেশে সে রকম কিছু ঘটে, সেক্ষেত্রে একএগারোর মতো সেনাবাহিনী পেছন থেকে সমর্থন জোগাবে সরকারকে। সরাসরি তারা ক্ষমতায় আসবে না, পরিস্থিতি তাদের অনুকূলেও নয়।

রাজনৈতিক তৃতীয় পক্ষের কথা যদি ধরা হয়, তাহলে এক্ষেত্রেও সফল হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। রাজনৈতিক দল থেকে বেরিয়ে কিছু নেতা তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি গঠনের চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু সেটি সফল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ তাদের জনসমর্থন নেই বললেই চলে। এটি বোঝা যায় ভোটের সময়। ড. কামাল হোসেন, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, অলি আহমদ, কাদের সিদ্দিকীর মতো নেতা শক্তিশালী কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারেননি। বিষয়টি বলা যত সহজ, বাস্তবতা ততটাই কঠিন। অনেকেই বলছেন, তারা ৩০০ আসনে এবার প্রার্থী দেবেন। এটি হয়তো সম্ভব, সৎ মানুষও হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে; কিন্তু মানুষ তাদের গ্রহণ করবে না। ২০০৭০৮ সালেও এমন প্রচেষ্টা লক্ষ্য করেছি এবং তার ফলাফলও আমাদের সবার জানা। এবারের নির্বাচনেও তারা কোনো আসন পাবে বলে মনে হয় না। জেনারেল এরশাদ যত বাগাড়ম্বর করুন না কেন, তিনিও রংপুর ছাড়া অন্য কোথাও আসন পাবেন বলে মনে হয় না। নির্বাচনে মূলত লড়াই হবে দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির।

তবে বর্তমান যে সংঘাতময় পরিস্থিতি আছে তা নিয়ে আমি চিন্তিত। এ মূহুর্তে একটি সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা বড় বেশিভাবে অনুভূত হচ্ছে। কিছু দিন আগে এক টিভি চ্যানেলে আলোচনায় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী একটি ভালো ও সময়োপযোগী মন্তব্য করেছেন। আওয়ামীপন্থী হিসেবে তার সুখ্যাতিও রয়েছে। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এত কঠিন হয়ে থাকা উচিত নয়। তার নমনীয় হওয়া উচিত এবং বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করে একটা কিছু করা প্রয়োজন। নইলে দেশে সহিংসতা ও সংঘাত হবে। তার কথা শুনে আমি খুশি হয়েছি। তার মতো ব্যক্তি যখন সমঝোতার কথা বলেন, তখন বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে সরকারি দল, বিশেষত প্রধানমন্ত্রীকে। গাফ্ফার চৌধুরীর এ মন্তব্যে মনে হয় আওয়ামী লীগের মধ্যেও কিছু ব্যক্তি আছেন, যারা সংলাপের পক্ষে। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, প্রধানমন্ত্রী যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি না মানেন, তাহলে বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে যাবে না, তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে না গেলে সেটি দেশে এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না।

কিন্তু সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতায় আসার সম্ভাবনা সম্পর্কে আমি সন্ধিহান। সংলাপ না হলে সমাধান রাজপথেই হবে। আপাতদৃষ্টে এটি অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। সরকার একবারে অনঢ় অবস্থানে রয়েছে। মাঝেমধ্যে আলোচনার কথা বললেও সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এমনকি সংবিধান সংশোধনে মতামত প্রদানকারী অধিকাংশ ব্যক্তি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাখার পক্ষে জোরালো বক্তব্য দিলেও সেটি বাতিল করা হয়েছে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে। এক্ষেত্রে কোর্টের রায়কে উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র। কারণ পুরো রায় প্রকাশের আগেই সংবিধান সংশোধন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। সরকার বলছে, ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন আর বিএনপি বলছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। এমন অবস্থায় সংলাপ ছাড়া সহিংসতার পথ এড়ানোর সুযোগ নেই। সরকার যদি কোনো ফর্মুলা দেয় বা বিএনপি দেয়, সেটি হতে পারে রাজনীতিতে টার্নিং পয়েন্ট। বিএনপি আরও বলছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদস্য নিয়ে আলোচনা হতে পারে। আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে বিএনপি তার সমস্ত উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। তবে আলোচনার উদ্যোগটা আসতে হবে সরকারের দিক থেকেই। এক্ষেত্রে বিএনপি আলোচনার উদ্যোগ নিলে সেটি ফলপ্রসূ হবে না, কারণ ক্ষমতাসীনরা তাতে সাড়া নাও দিতে পারে।

তাহলে বিদ্যমান যে পরিস্থিতি রয়েছে তা থেকে উত্তরণের উপায়টি কি সে নিয়েও আমার মতো দেশবাসী উদ্বিগ্ন। দুই নেত্রীর মতবিরোধ এমন মারাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে, তাতে আগামীতেও এর চেয়ে মারাত্মক সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি যে হবে না, তার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না। বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা একে অপরের পথ মাড়াতেই চান না। এমন পরিস্থিতিতে একদল প্রস্তাব দিলে অন্য দল সেটি মানবে, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। যেখানে একজন আরেকজনের চেহারাই দেখতে চান না, সেখানে সমঝোতায় উপনীত হওয়া শুধু কঠিনই নয়, সুদূর পরাহত। অথচ হাসিনা বা খালেদাকে বাদ দিয়ে দেশের রাজনীতি চলছে না। জনগণ তাদেরই চায়। তাদের সরানো অসম্ভব। পার্টি বা এর বাইরে যদি কেউ বিদ্রোহও করে, তার পরিণতি যে ভালো হয় না, তার বহু প্রমাণ আমাদের সামনে রয়েছে। যেমনটি রয়েছে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। এক্ষেত্রে আলোচনার বিষয় হতে পারে, কী করে দুই নেত্রীকে তাদের অবস্থান থেকে নমনীয় করা যায়, সেটি চেষ্টা করা। এর অর্থ এই নয় যে, তাদের তোষামোদ করতে হবে। ইতিবাচক সমালোচনাই এক্ষেত্রে উপায় হতে পারে। যার যতটুকু ক্ষমতা আছে, তার নিজ নিজ অবস্থান থেকে দুই দল, বিশেষত দুই নেত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করা। দুই নেত্রী রাজনীতিতে তাদের অবস্থান এত সুদৃঢ় করেছেন যে, তাদের বাদ দিয়ে দেশের রাজনীতি কল্পনা করা যাবে না। এটি আমাদের বুদ্ধিজীব, রাজনীতিক, দেশের মানুষের দুর্বলতা হতে পারে। বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের জনগণ দুই নেত্রীকেই ক্ষমতায় দেখতে চায়। মাইনাস টু ফর্মুলা কোনো দিন বাস্তবায়ন করা যাবে না।

উন্নতঅনুন্নতউন্নয়নশীল সব দেশেই পরিবারতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে। গণতন্ত্রের ভালো চর্চা হয় বলে যারা দাবি করেন, সেই ভারতের রাজনীতিতে প্রবলভাবে পরিবারতন্ত্র বিদ্যমান। সোনিয়া গান্ধীর ছেলে রাহুল গান্ধী পার্টির কর্ণধার হচ্ছেন। পুরো ভারত শাসন করছে ইন্দিরা গান্ধীর পরিবার। শ্রীলংকায়ও একই অবস্থা। পাকিস্তানে বেনজীর ভুট্টোর ছোট ছেলেও এখন নেতা। এটা শুধু অনুন্নত নয়, যুক্তরাষ্ট্রেও দেখা যায়। বুশের ছেলে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। ক্লিনটনের স্ত্রী হিলারি ক্লিনটন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। জাপানেও তাই। যুক্তরাজ্যের অবস্থাও একই। রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র থাকবেই। যত দিন পর্যন্ত দলের কর্ণধাররা সরে না দাঁড়াবে, তত দিন তাদের সরানো যাবে না এবং তা কঠিন। বাংলাদেশেও এ সম্ভাবনা নেই।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা অনেক বেশি এবং তারা চায় আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকুক। বিএনপি বা জাতীয় পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার যত কথাই তারা বলুক না কেন, আওয়ামী লীগকেই তারা ক্ষমতায় দেখতে চায়। এজন্য তারা সর্বতোভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে। গেল নির্বাচনেও তারা আওয়ামী লীগকে সহায়তা করেছিল বলে বিদেশী পত্রপত্রিকায় বিষয়টি প্রচার হয়েছে।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও দেশের রাজনীতি সহিংসতার দিকে যাচ্ছে বলে মনে হয়। প্রার্থনা করি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর শুভবুদ্ধি উদয় হোক। বেগম খালেদা জিয়া বলছেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেয়া হলে তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় রাজি আছেন। সবাই প্রত্যাশা করে, শেখ হাসিনা একটু এগিয়ে আসুক না। তিনিই তো একসময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করেছেন। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন হয়নি। তাহলে কেন এ পদ্ধতি বাতিল করা হলো? আসলে ক্ষমতায় যে যায়, সে একগুঁয়ে হয়ে যায়। হাসিনার ক্ষেত্রে বিষয়টি যেমন সত্য, খালেদার ক্ষেত্রেও। সমাধান একটি। শেখ হাসিনা পদক্ষেপ নেবেন এবং খালেদা জিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় আসবেন। এক্ষেত্রেও সম্ভাবনা খুবই কম দেখা যাচ্ছে। যেখানে দুই নেত্রী কারো চেহারা দেখেন না, সেখানে সমঝোতায় উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। এটির সমাধান রাজপথেই হবে বলে মনে হচ্ছে। যে দল প্রভাব দেখাতে পারবে তাদের দাবি টিকবে। এক্ষেত্রে জনগণের ক্ষতি হবে মারাত্মক। তবে এটা আমি চাই না।।

১টি মন্তব্য

  1. Both party leaders are corrupted people still can see and remember.3rd power is essential.hasina and khaleda can not destroy country they must settle election issue.