Home » অর্থনীতি » দেশ কোন পথে?

দেশ কোন পথে?

হায়দার আকবর খান রনো

garments-1-বাংলাদেশের এ যাবত সকল সরকারই ছিল শ্রমিক বিদ্বেষী। বর্তমানের মহাজোট সরকারও তার ব্যতিক্রম নয়। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় বসার সঙ্গে সঙ্গেই গার্মেন্টস শিল্পে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল মজুরির দাবিতে। গার্মেন্টস শিল্পটি হচ্ছে সবচেয়ে বড় শিল্প খাত। এই শিল্পে নিয়োজিত চল্লিশ লাখ শ্রমিক সর্বাধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। যেহেতু শিল্পটি শ্রমঘন এবং অনেকটা দর্জির দোকানের মতো, যেহেতু বেমি পুঁজি বা উন্নত প্রযুক্তি লাগে না, সেহেতু এই বৈদেশিখ মুদ্রা অর্জনের পুরো কৃতিত্ব শ্রমিকেরই, মালিকের না। কিন্তু যেকোন পুঁজিবাদী দেশের মতোই এখানে ঠিক উল্টো ব্যবস্থাটি রয়েছে। এই শিল্পে মুনাফার হার সর্বাধিক। শ্রমিকরা সর্বাধিক নির্যাতিত। প্রথমত. গার্মেন্টস খাতে মজুরি সমগ্র বিশ্বেু বাংলাদেশেই সর্বনিম্ন। এত কম যে তাতে কোনমতে পেটপুরে খেয়ে বেচে থাকাই সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত. এখানে ব্যতিক্রমহীনভাবে শ্রমিকদের খাটানা হয় ১৭ থেকে ১৮ ঘন্টা পর্যন্ত, যেখানে শ্রম আইনে আট ঘন্টার বেশি শ্রম দিবস নিষিদ্ধ এবং যেখানে মাত্র দুই ঘন্টার বেশি ওভারটাইম করানোও নিষিদ্ধ। উপরন্তু ওভারটাইম কাজ হবে শ্রমিকের সম্মতির ভিত্তিতে এবঙ তার জন্য দ্বিগুণ মজুরি দিতে হবে। মালিক শ্রেণী এ সবের কিছুই মানে না। আর সরকার এর প্রতিকারের জন্য কোন ব্যবস্থা নেয় না। আইন লঙ্ঘনের জন্য আজ পর্যন্ত কোন মালিকের শাস্তি হয়নি। বরং প্রতিবাদ করতে গেলে র‌্যাবপুলিশ লেলিয়ে দিয়ে পাশবিক নির্যাতন করে, গুলি করে শ্রমিক হত্যা করেছে বর্তমান সরকার। সরকার তার শ্রমিক বিদ্বেষী চরিত্র আর গোপন রাখতে পারেনি।

এছাড়াও গার্মেন্টেসের মালিকরা হচ্ছে নব্যধনী, তারা এখনও আধূনিক বুর্জোয়া পর্যন্ত হয়ে উঠতে পারেনি। তাই কারখানার ভেতরে এদের আচরণ সামন্তদের মতো। অশ্রাব্য গালি ও দৈহিক অত্যাচার, এমনকি নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে নানাবিধ হয়রানি ও নির্যাতনের ঘটনাও আছে। সেখানে ট্রেড ইউনিয়ন করতে দেয়া হয় না। সামান্য দাবি ও অধিকারের কথা বললে মালিকের ভাড়াটিয়া গুন্ডারা রাস্তায় হামলা করে। পুলিশ প্রশাসন মালিকের পক্ষে বর্তমান সরকার গার্মেন্টস শ্রমিকদের আরো কঠোরভঅবে নিষ্পেষণ করার জন্য বিশেষ শিল্প পুলিশ বানিয়েছে। যেখানে ছাত্রলীগের তাণ্ডব দমন করার জন্য দরকার ছিল বিশেষ পুলিশ বাহিনীর সেখানে প্রধানমন্ত্রীর আদরের ধন ছাত্রলীগের ছেলেদের জন্যই রযেছে তো সুযোগ। আর সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের আরও দাবিয়ে রাখার জন্য এমনই পুলিশি ব্যবস্থা। তা তো হতেই হবে। কারণ গার্মেন্টস মালিকরাই তো টাকা দেয় পার্টি ফান্ডে, তারাই তো সংসদের শোভাবর্ধন করে আছে।

গার্মেন্টস কারখানাগুলো যেন মৃত্যুকুপ। বিগত দশ বছরে দেড় হাজারের বেশি কারখানায় আগুন লেগে মারা গেছেন মালিকের দোষেই। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন মালিকের শাস্তি হয়নি। শিল্প পুলিশ সেখানে নিরব থাকে।

২০১০ সালে শ্রমিকরা পাঁচ হাজার টাকার নিম্নতম মজুরি দাবি করেছিলেন। দ্রব্যমুল্য হিসেবে নিলে এবং আইএলও’র কনভেনশন মানলে (অর্থাৎ প্রতি শ্রমিকের কি পরিমাণ পুষ্টি, সাবান, ওষুধ ইত্যাদি লাগবে) একজন শ্রমিকের নিম্নতম বেতন হওয়া উচিত কম করে হলেও মাসিক পনেরো হাজার টাকা। সেখানে শ্রমিকরা দাবি করেছিল মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। তাতেও রাজি ছিল না মালিক শ্রেণী ও তাদের রক্ষক আওয়ামী লীগের সরকার। তারা অনেক টালবাহানা করে ঘোষণা করলো, শ্রমিকের নিম্নতম মাসিক মজুরি হবে মাত্র দুই হাজার টাকা। চিকিৎসা ভাতা ধরা হয়েছে মাত্র দুইশত টাকা এবং বাড়ি ভাড়া বাবদ ভাতা মাত্র আটশত টাকা। ঢাকা শহরের বস্তিতেও ৮০০ টাকায় বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায় না। দুইশত টাকা চিকিৎসা ভাতার কথা শুনেমনে হয় শেখ হাসিনা সরকার এবং বড়লোকের দল যেন গার্মেন্টস শ্রমিকদের দারিদ্র নিয়ে মশকরা করছে।

ওরা আসলে মসকরাই করে। কিন্তু এই অপমান, এই নির্যাতন ও দারিদ্র মেনে নিতে রাজি নয় গার্মেন্টস শ্রমিকরা। তারা বার বার বিদ্রোহে ফেটে পড়েছেন। অভ্যুত্থানের ইতিহাস। এই সকল মহান অভ্যুত্থান নারী শ্রমিকরা যেভাবে বীরত্বসহকারে অংশগ্রহণ করেছে তা তাকে মহত্তর করে তুলেছে।

তবে দুর্বলতাও আছে। শ্রমিকরা এখনও অসংগঠিত। বহু সংগঠন রয়েছে। তার মধ্যে মালিকদের বেতনভুক্ত সংগঠনও আছে, বিদেশি অর্থপুষ্ট এনজিও সংগঠনও আছে। কিন্তু সেই সকল সংগঠনের কোন ভিত্তি বা প্রভাব নেই। সত্যিকারের ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন করতে দেয়া হয় না। কিন্তু ক্ষোভ ও ক্রোধের বাষ্প তো চেপে রাখা যায় না। তাই বিস্ফোরণ ঘটে বার বার। বাংলাদেশে আইনসিদ্ধ ট্রেড ইউনিয়নের ক্ষেত্র খুবই সীমিত। তাই শ্রমিক আন্দোলন অভ্যুত্থানেরও রূপ নেবে। ইতোমধ্যেই শ্রমিক শ্রেণী বিশেষ করে গার্মেন্টসের অল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত নারী শ্রমিকরা যে ধরনের শ্রেণী সংহতি বোধ, একতা, সংগ্রামী চেতনা, জঙ্গীত্ব, সাহস ও শৃঙ্খলার পরিচয় দিয়েছেন, তাতে আমি খুবই আশাবাদী।

সরকার ও মালিকশ্রেণী শ্রমিক আন্দোলনকে দমন করার জন্য যে ধরনের নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে তাতে এই সরকারকে ফ্যাসিবাদী বলাই সঙ্গত। ২০১০ সালের শ্রমিক অভ্যুত্থানের সময় র‌্যাবপুলিশ কেবল গুলিই চালায়নি, থানায় নিয়ে গিয়ে শত শত নারী শ্রমিকের ওপর নিষ্ঠুর অত্যাচার চালিয়েছে। মিথ্যাচার হচ্ছে যে কোন ফ্যাসিবাদী সরকার ও রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্র্য। নারায়ণগঞ্জের এক সাধারণ কিশোরী গার্মেন্টস কর্মী বিবিসি’র প্রতিনিধির কাছে সাক্ষাতাকারে গার্মেন্টস শিল্পে নির্যাতনের কথা বলেছিলো। এই অপরাধে র‌্যাব তাকে গ্রেফতার করতে গিয়েছিল। তাকে না পেয়ে তার ছোট বোনকে ধরে নিযে যেতে চেয়েছিল। ছোট মেয়েটিকে গ্রেফতার থেকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে গিয়েছিল বস্তিবাসী। র‌্যাব এই গণপ্রতিরোধের মুখে পিছূ হটতে বাধ্য হয়।

সম্প্রতি তাজরিন ফ্যাশন ফ্যাক্টরিতে ১১২ জন শ্রমিক আগুনে পুড়ে দগ্ধ হয়েছিল। এটি নিছক দুর্ঘটনা নয় বরং এটি ছিল হত্যাকান্ড। এই রকম হত্যাকাণ্ড আরও অনেকবার হয়েছে। গত এক দশকে আগুনে পুড়ে মৃত্যু বা পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দেড় সহস্রাধিক। সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে ২০১৩ সালের ২৬ জানুয়ারি মোহাম্মদপুর স্মার্ট গার্মেন্টে, যাতে ৭ জন পোশাক শ্রমিক অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায়। আমি ধরে নিলাম যে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের কারণে আগুন লেগেছে। তবু মালিকের নির্লিপ্ততা তো গুরুতর অপরাধ বলে গণ্য করতে হবে। উপরন্তু প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বাহির হওয়ার গেট বন্ধ থাকে, যা বেআইনি। ফলে আগুন লাগলেও কেউ বের হতে পারছেন না। এর জন্য কি শাস্তি পাওয়া উচিত নয়? এত বড় অপরাধ, গেট বন্ধ রেখে পুড়িয়ে মারার মতো অপরাধের জন্য আজ পর্যন্ত কোন মালিকের শাস্তি হয়নি। তার মানে, এটা প্রমাণ হয় যে, , আওয়ামী লীগ বিএনপিসহ এ যাবত ক্ষমতাসীন সকল দলই শ্রমিক বিদ্বেষী ও মালিকের দল। তাছাড়া মালিক শ্রেণী এতটাই মুনাফালোভী যে তারা টাকা বাচাতে সিড়ি ও করিডোরকে করেছে অপ্রসস্থ, তাতে পাশাপাশি দুইজন যেতে পারে না। এমতাবস্থায় পায়ের তলায় পিষ্ট হয়েও মারা গেছেন অনেকে।

ঠিক এই ঘটনাটি ঘটেছে এইবার আশুলিয়ার নিশ্চিতপুরের তাজরিন ফ্যাশন ফ্যাক্টরিতে। আগুন লাগার সময় গেট বন্ধ ছিল। আগুন নির্বাপনের কোন ব্যবস্থা ছিল না। সিড়ি বা করিডোর ছিল খুবই সংকীর্ণ। এছাড়া বিভিন্ন তদন্ত থেকে জানা গেছে, ঐ কারখানার জন্য তিনতলা পর্যন্ত অনুমতি থাকলেও মালিক নয় তলা পর্যন্ত বানিযেছে। আরও নানা ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে। বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া গেছে। তাই সঙ্গতকারণেই দাবি উঠছে মালিককে গ্রেফতার করা হোক, হত্যাকাণ্ডের জন্য বিচার হোক। শ্রম সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে শ্রমমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি উঠেছে। ফ্যাক্টরি ইন্সপেক্টরসহ শ্রম মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হোক, এ দাবিও করা হয়েছে।

মৃত শ্রমিকদের জন্য দশ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের দাবি করা হয়েছে। আইএলও কনভেনশন এবং আমাদের দেশের আইনকে বিবেচনায নিলেও ক্ষতিপূরণ আরও অনেক বেশি হয়। কিন্তু সরকার কতিপয় বিদেশী সংস্থা, বিজিএমই ও ফ্যাক্টরি মালিক সবাই মিলে দিচ্ছে মাত্র ছয় লাখ টাকা। জীবনের মুল্য মাত্র ছয় লাখ টাকা? তাও আবার সকলে পাচ্ছে না। কারণ অনেকের শরীর পুড়ে ছাই হযে গেছে। এতোগুলো মানুষ মারার পরেও মালিক নির্বিকার, নির্বিকার সরকারও। প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিন এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র খূজে পেলেন। আরও বললেন, এক শ্রেণীর শ্রমিক নেতারা নাকি এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত। বিএনপি যেমন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার জন্য এক জজ মিয়াকে দাড় করিয়েছিল, এখানেও তেমনি এক মহিলাকে দাড় করিযেছেন আওয়ামী লীগ সরকার। সে নাকি বিশ হাজার টাকার বিনিময়ে আগুন লাগিয়েছিল। ধরে নিলাম কথাটা সত্য। কিন্তু গেটে তালাবদ্ধ করেছিল কে? অতি অপ্রসস্থ সিড়ি ও করিডোরের ব্যবস্থা করেছিল কে? মালিককে রক্ষা করা এবং শ্রমিককে ঠকানোর জন্য কত ধরনের অপপ্রচার ও অপকৌশল। প্রধানমন্ত্রী নিজেও এই অপপ্রচারে নেমেছেন।।

(চলবে…)