Home » অর্থনীতি » পাঁচতারা হোটেল দিয়ে দারিদ্র্য দূর? (শেষ পর্ব)

পাঁচতারা হোটেল দিয়ে দারিদ্র্য দূর? (শেষ পর্ব)

cheryl strauss einhornবিশ্বব্যাংক কিভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র্য কোনো কোনো দেশে বড় বড় ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ, যাদের বলা হয় বিজনেস টাইকুন এবং বিশাল বিশাল বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঋণ বিতরণ করছে এটা তেমনই এক কাহিনী।

শেরিল স্ট্রাস আইনহর্ন

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

এ ধরনের বিনিয়োগের সমালোচনাবিপুলসংখ্যক বিদ্বজ্জন এবং তদারকি গ্রুপগুলোর পাশাপাশি গরিব দেশগুলোরও স্থানীয় সংস্থাহলো এই যে, এগুলো দারিদ্র্য বিমোচনে সামান্যই অবদান রাখে এবং আইএফসি ভর্তুকি ছাড়াও খুব সহজে করা যেত। অনেক ক্ষেত্রে, সমালোচকদের মতে, উন্নয়নের রাশ টেনে ধরে এবং দারিদ্র্য বাড়িয়ে দেয়, এছাড়াও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে যে দূষণ ও অন্যান্য সমস্যার সৃষ্টি করে, সে কথা না হয় নাই উল্লেখ করা হলো।

গত জুলাইতে বিশ্বব্যাংকে নতুন নেতা হিসেবে জিম ইয়ং কিম, যোগদানের পর বিতর্ক নতুন করে দানা বেঁধে উঠে। আমেরিকান এই চিকিৎসক সম্প্রতি ডার্টমাউথ কলেজের সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। এই প্রতিবেদনের ব্যাপারে মন্তব্য করার জন্য তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে ব্যাংকটি সে সুযোগ দিতে অস্বীকার করে। এখন পর্যন্ত তিনি তার সংক্ষিপ্ত সময়ে, আইএফসির ব্যাপারে তার মনোভাব সম্পর্কে তেমন কিছু বলেননি। জুলাইতে দায়িত্ব গ্রহণের সময় এবং প্রথম বিদেশ সফরকালে, ঘানার পশ্চিম প্রতিবেশী আইভরি কোস্টে, তিনি যে দুটি বিবৃতি দিয়েছেন তার উভয়টিতেই, তিনি অল্প কথায় বিশ্বব্যাংক কাঠামোর মধ্যে আইএফসি গ্রুপ এবং বৈশ্বিক চাকরি সৃষ্টিতে প্রাইভেট সেক্টরের গুরুত্বের কথা বলেছেন।

আইএফসির নেতৃত্বেও পরিবর্তন শুরু হয়েছে। এর সাবেক প্রধান, লার্স টানেল, সম্প্রতি তার মেয়াদ পূর্ণ করেছেন, এবং চীনা নাগরিক জিনইয়ং, গোল্ডম্যান স্যাচের অংশীদার এবং প্রতিষ্ঠানটির চীনা ব্যাংকিং কার্যক্রমের দায়িত্বপ্রাপ্ত, আইএফসির ভারপ্রাপ্ত সিইও হিসেবে কাজ করছেন, অক্টোবরে তার উত্তরসূরি হয়েছেন। ওই সময়ে কালদানি, যিনি আইএফসির ভারপ্রাপ্ত সিইও হিসেবে কাজ করেছিলেন, বৈশ্বিক শিল্পবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে ফিরে গেছেন।

আইএফসি’র কার্যক্রম নিয়ে কেবল বাইরেই সমালোচনা হচ্ছে না, ২০১১ সালের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন এবং বিশ্বব্যাংকের ভেতরেও তার সমালোচনা হয়েছে। ২০১১ সালের নথিটিতে, যাতে ব্যাংকটির ইন্ডিপেনডেন্ট ইভাল্যুয়েশন গ্রুপ আগের দশকে আইএফসির কার্যক্রম খতিয়ে দেখেছে, প্রতিষ্ঠানটিকে চিত্রিত করা হয়েছে মুনাফাখোর, চুক্তিচালিত সংস্থা যে প্রায়ই গরিব মানুষের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, এবং মাঝে মাঝেই নিজের বিনিয়োগ থেকে মোটা অঙ্কের মুনাফার জন্য এমনকি গরিবদের বলি পর্যন্ত দেয়এমন প্রতিষ্ঠান হিসেবে : ‘আইএফসির দারিদ্র্য দূরিকরণমুখী কার্যক্রম বাড়ানোর জন্য এর বিনিয়োগ কার্যক্রম এবং উপদেষ্টা সার্ভিসে কৌশলগত অভিপ্রায় পরিবর্তন করতে বৃহত্তর প্রয়াস প্রয়োজন।’

তবে আইএফসির টাকা বানানোর কৌশলে অন্তত একটি ভালো দিক রয়েছে : প্রতিষ্ঠানটি যাদের জন্য কাজ করছে, তাদের চাকরি টিকিয়ে রাখতে পেরেছে। ‘আইএফসি যত বেশি টাকা বানাবে, ব্যাংককে তত বেশি বিনিয়োগ করতে হবে, জানান গ্রিফিথস, ইউরোদাদের পরিচালক। ‘অর্থ বানানোর জন্য স্টাফদের উৎসাহ দেওয়া হয়।’

সাবেক আইএফসি কর্মী ফ্রান্সিস ক্যালিৎসিও, তিনি এখন আক্রার প্রাইভেটইক্যুইটি প্রতিষ্ঠান সেরেনগেটি ক্যাপিটালের ব্যবস্থাপনা অংশীদার, একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। ‘সফল হতে হলে তোমাকে বড় বড় লেনদেন করতে হবে,’ আইএফসিতে কাজ করার সময়ের স্মৃতিচারণ করেন তিনি। ‘আইএফসি অত্যন্ত মুনাফামুখী। আইএফসি দারিদ্র বিমোচন করে না, এর বিনিয়োগ দরিদ্রদের স্পর্শ করে খুব সামান্যই।’

আইএফসি বার্ষিকভিত্তিতে সংখ্যা, আকার এবং কর্মীরা কটি চুক্তি সম্পন্ন করবে তা স্থির করে দেয়। আইএফসির বর্তমান ও সাবেক বেশ কয়েকজন স্টাফ জানিয়েছে, এসব টার্গেট পূরণ করার ওপর নির্ভর করে এর কর্মসম্পাদনা বোনাস। ‘তুমি টার্গেট পূরণ করতে না পারলে তোমার বোনাস হবে না,’ জানান অ্যালেন মুডি, আইএফসির সাবেক ব্যবস্থাপক যিনি এখন বিশ্বব্যাংকের অন্য কোথাও কাজ করেন। প্রায়ই বেসরকারি কোম্পানি থেকে আইএফসির কাছেই চুক্তির প্রস্তাব আসে, বিপরীতটি কখনো হয় না। ‘আমরা প্রধান প্রধান ক্লায়েন্টদের চিহ্নিত করা প্রকল্পগুলোতে অংশ নেই এবং তাদের কাছে জানতে চাই, তাদের প্রয়োজন কী,’ জানান আইএফসির মোয়ো। অর্থাৎ, তারা বেসরকারি কোম্পানিগুলোর অগ্রাধিকার অনুসরণ করে, আইএফসির বিনিয়োগগুলো সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

এমনকি আইএফসি যদি তার সম্পদরাজি দারিদ্র্য দূরিকরণের দিকে নিবদ্ধ করে, তবুও তারা এর প্রভাব কতটুকু হবে তা নির্ধারণ করতে পারে না। ২০১১ সালের প্রতিবেদনেযাতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল যে আইএফসির ‘অত্যন্ত সতর্কভাবে জানা উচিত কারা গরিব, তারা কোথায় থাকে এবং তাদের কাছে কিভাবে যাওয়া যায়’আইএফসির বিনিয়োগের ব্যাপারে তার অজ্ঞতার বিষয়টি সমালোচিত হয়। এতে আরো বলা হয়, সংস্থাটি ‘প্রকল্পগুলোর জন্য দরিদ্র্য অবস্থার সংজ্ঞা, তদারকি এবং ও প্রতিবেদন’ দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

আইএফসি এসব সমালোচনার প্রতিবাদ করেনি। ইভালুশন গ্রুপের প্রতিবেদনের ব্যাপারে আইএফসির ম্যানেজমেন্ট এটুকুই কেবল বলেছে, ‘আমরা সাধারণভাবে প্রতিবেদনের শিক্ষণীয় বিষয় ও সুপারিশমালার সঙ্গে একমত’ এবং স্বীকার করছি যে, ‘আইএফসি শুরু থেকেপ্রকল্পের দারিদ্র্য বিমোচন প্রভাব অনুধাবনের রীতি অনুসরণ করেনি।’ আইএফসি উল্লেখ করে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচন ত্বরান্বিত করতে এর প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা নিরূপণের জন্য তারা কয়েক বছর আগে ডেভেলপমেন্ট আউটকাম ট্র্যাকিং সিস্টেম (ডিওটিএস) ব্যবহার শুরু করেছে। অবশ্য এই ব্যবস্থাটি আইএফসির অনেক ক্লায়েন্টের নাক সিঁটকানোর শিকার হয়েছে। তারা উল্লেখ করে, ডিওটিএস রেটিং গ্রাহক কোম্পানিগুলোর নিজস্ব প্রতিবেদনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং পুরো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক উপাত্তের ব্যাপারে অনেকাংশে ভরসা করে থাকে, প্রায়ই আইএফসির তহবিলপুষ্ট প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট এলাকার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ না থেকে বিশ্বজুড়ে বহুমুখী বিভক্ত হয়ে থাকে। অবশ্য তবুও কালদানি তাদের প্রয়াসের ব্যাপারে আশাবাদ প্রকাশ করে বলেছেন, এটা যুগান্তকারী এবং ক্রমাগত ভালো হচ্ছে।

এদিকে, পরিস্থিতি পরিবর্তনের প্রমাণ সামান্যই দেখা গেছে। যেখানেই আমি গেছি ঘানা, পশ্চিমা আফ্রিকার কাছে এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে আইএফসি এখনো মনে হচ্ছে দারিদ্র্য বিমোচনের ম্যান্ডেটটিকে পুরোপুরি দায়সারাভাবে নিচ্ছে।

আর্থিক ব্যাপারে ঘানার অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক ডাটাব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আর. ইউফি গ্র্যান্ট আমাকে বলেছেন, আইএফসির আকর্ষণীয় শর্তে ঋণ প্রদান করার কারণে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ‘সবচেয়ে লোভনীয় বিনিয়োগ গ্রহণ করে এবং ব্যাপক মুনাফা লাভ ব্যাগে ভরে স্থানীয় ব্যাংক ও প্রাইভেটইক্যুইটি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেকায়দায় ফেলে দেয়।’

গ্র্যান্ট জানান, ঘানায় বৈশ্বিক টেলিকম জায়ান্ট ভোডাফোনের কার্যক্রম বাড়ানোর জন্য আইএফসি সম্প্রতি কোম্পানিটির জন্য ১১৫ মিলিয়ন ডলার আর্থিক প্যাকেজের ব্যবস্থা করে দিয়েছে, যদিও দেশটিতে আগে থেকেই ছয়টি টেলিকম কোম্পানি কাজ করছিল। এ ধরনের বিশাল প্রাইভেট বিনিয়োগ সত্ত্বেও ভোডাফোনের জন্য আইএফসির ঋণের ব্যবস্থাটি ছিল দুই বছরের মধ্যে এর দ্বিতীয় প্যাকেজ। ‘এটা দারিদ্র্য বিমোচন নয়, এবং এগুলো সীমান্তবর্তী বিনিয়োগও নয়,’ বলেন গ্র্যান্ট। অন্যরা অর্থ লগ্নিকারকেরা যেখানে বিনিয়োগ করবে না, সেখানে আইএফসি এগিয়ে আসবেএমন ব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে ছিল তার এই মন্তব্য। তিনি বলেন, ‘আইএফসির কথাগুলো হয় খুবই ভালো ভালো, তবে করে কেবল খারাপ কাজগুলোই।’

ঘানার হাজার মাইল পূবে ক্যামেরুন ও শাদের অবস্থান। সেখানেই আইএফসি বিনিয়োগের একটি বৃহৎ ও অত্যন্ত বিতর্কিত খাতের উদাহরণ বিরাজমান। এ ধরনের বিনিয়োগে হোটেল ও শপিং মলের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকি থাকে। এটা হলো জ্বালানি খাত।

জানা যায়, ২০১১ সালের শেষ দিকে আইএফসি ২৩টি দেশের ৩০টি কোম্পানির সঙ্গে মিলে ২ বিলিয়ন ডলারের তেলগ্যাস খাতে বিনিয়োগ করে। আইএফসি গর্বের সঙ্গে একে ‘বাজার থেকে পুরস্কারজয়ী স্বীকৃতি’ অর্জন হিসেবে অভিহিত করে। কিন্তু সমালোচকেরা, পরিবেশবাদীরা এবং ব্রেটন উডস প্রজেক্ট ও ক্রিস্টিয়ান এইডের মতো অমুনাফামূলক গ্র“পগুলোসহ, বলেন এ ধরনের প্রকল্প দারিদ্র্য আরো বাড়িয়ে দেয়, যদিও ধরা হয়ে থাকে দারিদ্র্য বিমোচন করবে। তাদের মতে, এসব প্রকল্প প্রায়ই স্থানীয় সঙ্ঘাত ও দুর্নীতি বাড়ায়, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে বাস্তুহারা করে, জীবিকা নষ্ট করে এবং গ্রিনহাউজ গ্যাস ও অন্যান্য ধরনের দূষণ বিস্তারে অবদান রাখে।

বিশ্বব্যাংকের অভ্যন্তরীণ একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্যানেল ২০০৩ সালে এমন সুপারিশও করেছিল, আইএফসিসহ ব্যাংকের উচিত হবে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা খনির মতো প্রকল্পগুলো থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে সরে আসা। প্যানেলটির মতে, এ ধরনের ঋণ প্রাকৃতিক সম্পদপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী দরিদ্রদের জন্য কল্যাণকর হয় না। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের বোর্ড এসব সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করে। ব্যাংকটি চূড়ান্তভাবে ‘প্রান্তিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ব্যবসা’ করার দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে সম্মত হয়, ২০০৪ সালে ব্লুমবার্গকে জানিয়েছেন ইমিল সেলিম। এই ইন্দোনেশীয় কর্মকর্তা বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ওই সময়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক কনফারেন্স কলে আইএফসি নির্বাহী কালদানি বলেছিলেন, ‘এই মর্মে সাধারণ ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, আমরা কাজ চালিয়ে যাব; মূল্য সংযোজন করব।’

অবশ্য শাদ ও ক্যামেরুনের উদাহরণটি আরো বেশি জটিল ছবি উপস্থাপন করে। ২০০০ সালে শাদ ও ক্যামেরুন সরকারের পাশাপাশি এক্সনমবিল, শেভরন ও অন্য আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের তেল পাইপলাইন প্রকল্পে আইএফসি প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন, ভূবেষ্টিত শাদ থেকে ক্যামেরুনের বন্দরে তেল পরিবহণের ২৫ বছর মেয়াদি ওই প্রকল্পটি বছরে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রাজস্ব আয় করবে।

এই দেশ দুটি এমনকি তাদের পশ্চিম প্রতিবেশী ঘানার চেয়েও গরিব। শাদের জাতীয় আয় বিশ্বে ১৯৩তম স্থানে, আর ক্যামেরুন ১৮৫তম। অন্যদিকে ঘানার অবস্থান ১৭২তম স্থানে। শাদের গড় আয়ু ৪৮., যা বিশ্বে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে খারাপ এবং দেশটি গত দুই দশক শাসিত হয়েছে ইদ্রিস ডেবির কঠোর স্বৈরাচারী হাতে।

পরিস্থিতি আগেও ছিল কঠিন ও ভয়াবহ এবং তেমনই রয়ে গেছে,’ বলেছেন পিটার রোসেনবাম। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউটের সহপরিচালক এই ভদ্রলোক বলেছিলেন, পাইপলাইন প্রকল্পটিকে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর হাত থেকে রক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে। ধরা হয়েছিল, তেল রাজস্ব থেকে পাওয়া অর্থের বড় অংশ ব্যয় করা হবে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও অবকাঠামো খাতে। কিন্তু প্রতিবেশী সুদানের সমর্থনপুষ্ট বিদ্রোহী গ্র“পগুলোর আক্রমণের মুখে এবং পাইপলাইন সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে ডেবি খাদ্য আর শিক্ষার ব্যবস্থা না করে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে লাগলেন অস্ত্র কেনার কাজে, যার সমালোচনা কেবল মানবাধিকার গ্র“পগুলোই নয়, বিশ্বব্যাংকও করেছে। সমালোচকেরা যেমনটি আশঙ্কা করেছিলেন, তেমনভাবেই তেল সৌভাগ্য দেশটি নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, গৃহযুদ্ধের উস্কানি সৃষ্টি করে।

শাদে যা কিছু ঘটেছে, তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জ্বালানি ও খনি প্রকল্প নিয়ে স্থায়ী বিতর্ক ছাড়াও এর পরিবেশগত প্রভাব থেকে শুরু করে স্বৈরাচারী জান্তার ক্ষমতা বাড়ানো পর্যন্ত সম্পর্কিত সব বিষয় নিয়ে তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও আইএফসি এখনো এগুলোতে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। কেবল ২০১২ সালেই আইএফসি ঘোষণা করেছে, তারা মঙ্গোলিয়া, লাইবেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার স্বর্ণ, তামা ও হীরার খনিতে এবং কলম্বিয়া, আইভরি কোস্ট, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার তেল ও গ্যাস প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে।

অধিকন্তু, শাদের ডেবির মতো সিরিয়া (বাশার আলআসাদ) ও ভেনিজুয়েলার (হুগো চাভেজ) কঠোর শাসকদের দেশেও আইএফসি ঋণ প্রদান ও বিনিয়োগ করা অব্যাহত রেখেছে। কালদানি আমাকে জানিয়েছেন, আরো ডজনখানেক স্বৈরাচার আছে, যাদের নাম তিনি প্রকাশ করেননি, যাদের সঙ্গে আইএফসি ব্যবসা করতে আগ্রহী নয়। অবশ্য একটি দ্বিতীয় স্তর আছে এবং সেখানে তিনি কাজ করতে ইচ্ছুক। ‘এখানে স্বার্থসিদ্ধির ব্যাপার আছে। আমরা ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারি,’ তিনি বলেন, বর্তমানে গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত সিরিয়ায় সাম্প্রতিক ক্ষুদ্রঋণে তহবিল সংস্থানের আইএফসির চুক্তির কথা উল্লেখ করে। তিনি বলেন, এসব দেশের প্রকল্পগুলো স্বৈরাচারীদের আরো শক্তভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার কাজে ব্যবহৃত না হয়ে সরাসরি দরিদ্রদের জন্য কল্যাণকর হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য আইএফসি ক্রমবর্ধমান হারে কঠোর আর্থিক নিয়ন্ত্রণ আরোপে জোর দেয়। তিনি স্বীকার করেন, শাদের প্রকল্পটির নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট শক্ত ছিল না এবং এ কারণে আইএফসি সেখানে থেকে সরে এসেছে।

আইএফসির সমালোচকেরা এক্ষেত্রে মাত্র দুটি পথই দেখতে পাচ্ছেন নাটকীয়ভাবে এর অগ্রাধিকারগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন কিংবা এর তহবিল প্রবলভাবে হ্রাস করে সেগুলোর সম্পদ বিশ্বব্যাংকের ওইসব প্রকল্পে সরিয়ে নেওয়া, যেগুলো দারিদ্র্য বিমোচন মিশনের সঙ্গে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত।

কালদানি বলেন, আইএফসি চাচ্ছে ছোট ছোট প্রকল্পের সংখ্যা বাড়াতে, ৫ মিলিয়ন ডলারের কম এবং কঠোরভাবে দরিদ্রমুখী, এবং দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে যেসব দেশ সবচেয়ে দরিদ্র সেদিকে আরো বেশি নজর দিতে। সাম্প্রতিকতম অর্থবছরে, প্রতিষ্ঠানটি ছোট ছোট ১০৫টি প্রকল্প প্রণয়ন করেছে, যা মোট চুক্তির ২০ শতাংশ, যদিও তা এর সার্বিক ব্যয়ের অত্যন্ত ক্ষুদ্র অংশমাত্র।

তবে নতুন দিগন্তের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। এর নতুন নেতৃত্ব প্রকাশ্যভাবে নীরব থাকলেও আইএফসির নতুন প্রধান কাই বলেছেন, তিনি এর বর্তমান কৌশল দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন।

আক্রায়, নতুন মোভেনপিক থেকে দূরে নয়, আইএফসির লন, বাগান ও প্রাইভেট পার্কিংসজ্জিত অভিজাত অফিসটির কংক্রিট দেয়ালের ওপরিভাগ কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া, এর চারপাশেই আছে বস্তি। আইএফসিগামী সড়কটির অল্প কিছু অংশে ছিমছাম ফুটপাত রয়েছে, সেটা ঠিক সুরক্ষিত কমপ্লেক্সটির সামনের অংশটুকুতে, অবশ্য ভবনটিতে কোনো পরিচিতি ফলক নেই। সড়কটির বাকি অংশের কোনো যত্ন নেই, ধূলা ধূসরিত, আবর্জনা আর খানাখন্দকে ভর্তি।

এর মধ্যেই ছাগল আর মুরগিগুলো চড়ে বেড়াচ্ছে, একদল শিশু খালি পায়ে ময়লা আর নোংরা গায়ে মেখে বসে আছে। প্রায় ১০০ ডিগ্রি তাপমাত্রা উপেক্ষা করে নারীদের কেউ কেউ খোলা চুলায় ছোট ছোট মাছ রান্না করছে। আমি জুলাইয়ের কোনো একদিন তাদের কাছে গিয়েছিলাম। তাদের একজন বলল, তারা সেখানে ১৫ বছর ধরে বাস করছে। আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, তারা বিশ্বব্যাংক কী জানে কি না, তখন তারা বলল, না। যখন বললাম, এই ব্যাংক গরিবি হঠাওয়ের কাজ করছে, তখন তাদের কেউ কেউ হাসল।

আমাদের দরকার সাহায্য, এবং আমরা জানি, সাহায্য করার জায়গাও আছে,’ এক নারী বলল। সে রান্না করছিল, দুটি শিশু তার পায়ের সঙ্গে সেঁটে ছিল। ‘তবে আমরা তাদের কথা কখনো শুনিনি।’

১টি মন্তব্য

  1. darun darun lekha…
    apnader ovinandan na diye parchi na…