Home » অর্থনীতি » ভাল নেই কৃষক

ভাল নেই কৃষক

রাজিব সাহা (যশোর থেকে)

krishok-1-আওয়ামী লীগের নের্তৃত্বে গঠিত মহাজোট সরকারের ৪ বছরে সরকারের সাফল্য ব্যর্থতা নিয়ে সাধারন মানুষের মধ্যে হিসাব কষা চলছে। দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষ কৃষক। দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের কৃষক ভাল নেই।

কৃষকের উৎপাদিত পণ্য ধান, পাট ও তুলার দর পতন হয়েছে। উৎপাদন খরচ উঠছে না। তাদের হাতে বর্তমানে নগদ টাকার অভাব দেখা দিয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে মন্দা চলছে।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল, সবার জন্য খাদ্য নিশ্চিত করা হবে। ২০১৩ সালের মধ্যে দেশ খাদ্যে সয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে। এ সাথে কৃষি উপকরণের ভর্তুকি বৃদ্ধি, কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করা ও কৃষি ঋণের আওতা বৃদ্ধি এবং সহজিকরণ করা হবে। সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ ও সুলভ করা হবে। উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সব ধরণের কৃষিজাত পণ্যের ন্যার্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হবে।

/১১ পর সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের সময় সারের জন্য জন্য রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হয় কৃষককে। ক্ষমতায় আসার পর কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরি ঘোষনা দেনএখন সারের পিছনে কৃষককে দৌড়াতে হবে না। সার কৃষকের পিছনে দৌড়াবে। ক্ষমতা গ্রহনের ১৪ দিনের মাথায় সব ধরনের সারে দাম কমানো হয়। তখন চাষি স্বস্তি পায়। দু’ দফায় টিএসপি’র দাম ৮৫ টাকা থেকে ২২ টাকায়, এমওপি’র দাম ৭৫ টাকা থেকে ১৫ টাকা ও ফসফেটের দাম ৮৫ টাকা থেকে কমিয়ে ২৬ টাকা করা হয়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ইউরিয়া সারের দাম ১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ টাকা করা হয়েছে। ফসল আবাদে ইউরিয়া সারের বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে।

দেশে বছরে সেচ কাজে ২০ লাখ টন ডিজেল ব্যবহার হয়ে থাকে। সরকার ক্ষমতা গ্রহনের সময় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল ৪০ টাকা। দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে ৬১ টাকা করা হয়। ফের বাড়ানোর কথা শোনা যাচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, প্রতি বছর কৃষি খাতে সরকারি ভর্তুকির পরিমান বাড়ছে। ২০০৮ ২০০৯ অর্থ বছরে কৃষি খাতে ভর্তুকির পরিমান বাড়িয়ে ৪ হাজার ২শ’ ৮৫ কোট টাকা করা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বৃদ্ধি পাওয়াতে শেষ পর্যন্ত ভর্তুকির পরিমান বেড়ে যাওয়ায় তা বেড়ে ৫ হাজার ৭শ’ ৮৫ কোটিতে পৌঁছে। ২০০৯ ২০১০ অর্খ বছরে কৃষি খাতে ভর্তুকির পরিমান ছিল চার হাজার ৮শ ৮৮ কোট টাকা, ২০১০ ২০১১ অর্থ বছরে বাড়িয়ে ছয় হাজার ৯শ ৫২ কোটি টাকা এবং চলতি বছরে আরো বাড়িয়ে সাত হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। ১০ টাকা দিয়ে কৃষকদের ব্যাংকে হিসাব খুলতে বলা হয়। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বিজুলিয়া গ্রামের কৃষক আবুল কালাম জানান, একবার ১০৭৯ টাকা পেয়েছিলেন। তারপর আর ভর্তুকির টাকা পাননি। কৃষি ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুবার কৃষকদের ব্যংকের মাধ্যমে ভর্তুকির টাকা দেওয়া হয়েছে। একজন উপ সহকারি কৃষি অফিসার জানান, বর্তমানে প্রান্তিক চাষিদের বিনা মূল্যে বীজ দেওয়া হয়। তাও সকলে পান না।

বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহনের সময় প্রতি মন মোটা ধানের দাম ছিল ৭শ’ থেকে সাড়ে ৭শ’ টাকা। সরু ধানের দাম হাজার টাকার উপর ছিল। প্রতি কেজি সরু চাল মিনিকেটের দাম ছিল ৪৫ টাকা থেকে ৪৮ টাকা। মোটা চালের দাম ছিল ৩৫ টাকা থেকে ৪২ টাকা পর্যন্ত। ধানের দাম বেশি থাকায় উৎপাদনকারি কৃষি খুশি ছিল। অপর দিকে ভোক্তা ছিল অখুশি। গত দু’ বছর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। ২০১১ সালে আমন ধান উঠার পর দর পতন শুরু হয়। মোটা ধানের দাম কমে প্রতি মন সাড়ে ৪শ’ টাকা থেকে সাড়ে ৫শ টাকা হয়। সরু ধানের দাম ৬শ’ টাকা থেকে সাড়ে ৬শ’ টাকা হয়।

চলতি আমন মৌসুমে খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় ৬ লাখ ৭ হাজার হেক্টরে রোপা আমনের চাষ হয়েছে। কৃষককে প্রতিকুল আবহাওয়া মোকাবেলা করে আমন চাষ করতে হয়েছে বীজতলা তৈরির সময় জুন মাসে পরিমান মত বৃষ্টি না হওয়ায় সেচ দিয়ে বীজতলা তৈরি করতে হয়। চারা রোপনের সময় জুলাই মাসেও বৃষ্টিপাত কম হয়। অবস্থাপন্ন চাষিরা সেচ দিয়ে চারা রোপন করে। দরিদ্র চাষিরা বৃষ্টির জন্য আকাশ পানে চেয়ে থাকে। এতে চাষ নাবি হয়। আবার ধানের শীষ বের হওয়ার সময় বৃষ্টি টান দেয়। নাবি চাষ করা এ অঞ্চলে প্রায় ৭৫ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ধানে শীষ বের হয়নি। চাষিরা জানান, এবার রোপা আমনের ফলন কম হয়েছে। ফলে চাষির ধান চাষ করে লোকসান হচ্ছে। কিন্তু লোকসান হলেও তাদের চাষ ছাড়া অন্য কোন পেশা নেই। বোরো ও আউশ ধান চাষেও লোকসান হয়েছে। এ কারনে অনেক চাষি বোরোর বদলে মসুর ও অন্য রবি শস্য চাষে ঝুঁকছে। গত বছর নতুন গম উঠার পর প্রতি মন ( ৪০ কেজি ) ৭শ’ টাকা থেকে ৮শ’ টাকা দরে বিক্রি হয়। চাষির হাতের গম ফুরিয়ে গেলে দাম চড়তে থাকে। বর্তমানে প্রতি মন সাড়ে ১১শ’ টাকা থেকে ১২শ’ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি আটা বিক্রি হচ্ছে ৩৫ ৩৬ টাকা দরে। ২০১১ ও ২০১২ সালে কৃষক পাটের দাম পায় না। ২০১১ সালে নতুন পাট উঠার পর দাম কিছুটা চড়া ছিল। তারপর বাজারে আমদানি বাড়তে থাকলে দাম পড়তে থাকে। এক সময় প্রতি মনের দাম ৫শ’ টাকায় নেমে এসেছিল। কৃষকের ঘরের পাট ফুরিয়ে গেলে দাম চড়ে যায়। চাষি দাম না পেলেও ব্যবসায়ীরা বাম্পার লাভ করে। ২০১২ সালে পাট চাষ থেকে শুরু করে পাট ধোয়া পর্যন্ত চাষির দুভোগের শেষ ছিল না। বীজ বপন করতে হয় সেচ দিয়ে। তারপরও বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় মাঝে মাঝে সেচ দিত হয়। পানির অভাবে পাট জাগ দিতে চরম ভোগান্তি হয় কৃষকের। পুকুর ভাড়া নিয়ে পাট জাগ দিতে হয়েছে অনেক স্থানে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। প্রতি মনের দাম পায় সাড়ে ৬শ’ টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত। পাট চাষেও তাদের লোকসান হয়। দেশের অন্যতম প্রধান তুলা উৎপাদনকারি এলাকা হচ্ছে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর ও মাগুরা জেলা। তুলা এ অঞ্চলে একটি অর্থকরি ফসল। ধান পাটের পর এবার তুলার দর পতন হয়েছে। তুলার ফলন ও দাম কম হওয়ায় চাষির মাথায় হাত। চলতি মৌসুমে (২০১২ ২০১৩) এ অঞ্চলে ১৫ হাজার ১২২ হেক্টরে তুলার চাষ হয়েছে। বৈরি আবহাওয়ার কারনে ফলন কম হচ্ছে। গত বছর বিঘা প্রতি ১৫ ১৬ মন করে গড় ফলন হয়েছিল। এবার ৭ ৮ মান ফলন হচ্ছে বলে চাষিরা জানান। দামেও চাষি মার খাচ্ছে। গত বছর প্রতি মন বীজ তুলার দাম প্রথমে ২৫শ’ ২০ টাকা ধার্য করে সরকার। পরে দাম বাড়িয়ে ২৮শ’ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছিল। এবার প্রতি মন তুলার দাম ধার্য করা করা হয়েছে ২২শ’ ৪০ টাকা। তাও ক্রেতা মিলছে না। তুলার ক্রেতা হচ্ছে বেসরকারি জিনাররা। তারা তুলা কিনে বীজ ছড়িয়ে বস্ত্রকল গুলোতে বিক্রি করে থাকে। চাষির ঘরে প্রচুর তুলা মজুত হয়েছে। বিক্রি করতে পারছে না । জিনাররা সবে ক্রয়ে হাত দিয়েছে বলে তুলা উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা যায়। চাষি শুধু এবার সবজির ভাল দাম পাচ্ছে। তবে সবজি চাষ করে থাকে স্বল্প সংখ্যক চাষি।

বিঘাতে ধান চাষে ব্যয় দ্বিগুন হয়েছে।চার বছরের ব্যবধানে বিঘা প্রতি ধান চাষের ব্যয় দ্বিগুন হয়েছে। চাষিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০০৯ সালে এক বিঘা জমিতে আমন ধান চাষে ব্যয় হত প্রায় ৫ হাজার টাকা। তা বেড়ে ২০১২ সালে ১০ হাজা একশ টাকা হয়। আবার বোরো চাষে ব্যয় বেড়ে যাবে। এর সাথে সেচের ব্যয় হবে আরো ৪ হাজার টাকা। চাষির কথা এক মন ধান চাষে ব্যয় হয় ৭শ’ টাকা।

চাষির হাতে বর্তমানে নগদ টাকার অভাব চলছে। যার কারনে কৃষি জমির দাম কমেছে। মেহেরপুর সদর উপজেলার উজলপুর গ্রামের বড় চাষি বাবলূ মিয়া জানান, তাদের এলাকার চাষিরা সবজির উপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন। তাদের অঞ্চলে যে জমির দাম প্রতি বিঘা ৮ লাখ পর্যন্ত চড়েছিল। তার দাম কমে ৫ লাখ টাকাতে নেমেছে।।