Home » রাজনীতি » মানুষের বিভেদ ও ঐক্য – সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গ – ৩

মানুষের বিভেদ ও ঐক্য – সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গ – ৩

আনু মুহাম্মদ

Anu_Mohammad-2বাংলাদেশ এবং বর্তমান ভারত বিভিন্ন দিক থেকে দীর্ঘকাল এক অভিন্ন ইতিহাসের অংশ ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পূর্ব পর্যন্ত বাংলা ছিল অভিন্ন। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ করেছিল, প্রশাসনিকভাবে পূর্ববঙ্গকে আলাদা একটি ইউনিট ঘোষণা করা হয়েছিল। এর সঙ্গে ছিল যুক্ত করা হয়েছিল আসাম। রাজধানী করা হয়েছিল ঢাকা। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যা মিলে যে ইউনিট করা হয়েছিল তার রাজধানী করা হয়েছিল কলকাতা। সেসময় এর পক্ষে বিপক্ষে বিতর্ক হয়েছিল অনেক। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন পুরো বঙ্গ জুড়ে কমবেশি ঘটলেও কলকাতাতেই ছিল তা সবচাইতে জোরদার। এর কারণ বঙ্গভঙ্গের কারণে কলকাতাকেন্দ্রিক ব্যবসা, বাণিজ্য, ওকালতি প্রকাশনা এবং বিদ্যাচর্চা সবই হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে ঢাকা বঙ্গভঙ্গের ফলে নতুন করে দীর্ঘদিন পর চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল। ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটে, আইন আদালত প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটে।

শহর হিসেবে কলকাতার তুলনায় ঢাকা অনেক পুরনো হলেও প্রথমে কোম্পানি শাসন ও পরে ব্রিটিশ শাসনকালে ক্রমে কলকাতা শুধু বাংলার নয় পুরো ভারতেরই কেন্দ্র হয়ে ওঠে। পরিকল্পিতভাবে মসলিন ধ্বংস প্রথমে ঢাকাকে ম্লান করে দেয়, প্রশাসনিক গুরুত্বহানি তাকে একেবারেই নি¯প্রভ করে তোলে। বঙ্গভঙ্গ সেই ঢাকাকে আবার একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত হবার সুযোগ এনে দেয়। সেকারণে ঢাকা থেকে এই বঙ্গভঙ্গ সমর্থনও পায়। এই সমর্থন আসে ঢাকাকেন্দ্রিক নবাব, ব্যবসায়ী এবং পেশাজীবীদের মধ্য থেকে। কলকাতা থেকে এর বিরোধিতা করেন ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ছাড়াও বিদ্বৎসমাজ। রবীন্দ্রনাথ এক্ষেত্রে খুবই সক্রিয় ভুমিকা নিয়েছিলেন। তাঁর দেশাত্মবোধক গানগুলি প্রধানত এসময়েই লিখিত।

পূর্ববঙ্গ মুসলিম প্রধান হওয়ায় বঙ্গভঙ্গ সমর্থনকারিরা প্রধানত ছিলেন মুসলমান আর কলকাতা হিন্দু প্রধান হওয়ায় বিরোধীরা ছিলেন হিন্দু ও ব্রাম্মসমাজের সদস্য। এই বিরোধিতার সময়ই হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যেকার বিরোধ অনেক সামনে আসে। হিন্দু নেতাদের অনেকেই বলেন যে, ইংরেজ শাসকেরা মুসলমানদের ব্যবহার করছে। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ১৯০৭ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘ব্যাধি ও প্রতিকার’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘….আমাদের মধ্যে যেখানে পাপ আছে শত্রু সেখানে জোর করিবেইআজ যদি না করে তো কাল করিবে, এক শত্রু যদি না করে তবে অন্য শত্র“ করিবে অতএব শত্র“কে দোষ না দিয়া পাপকেই ধিক্কার দিতে হইবে।হিন্দু মুসলমান সম্মন্ধ লইয়া আমাদের দেশে একটা পাপ আছে; এ পাপ অনেক দিন হইতেই চলিয়া আসিতেছে। ইহার যে ফল তাহা না ভোগ করিয়া আমাদের কোনমতেই নিষ্কৃতি নাই।এবার আমাদিগকে স্বীকার করিতেই হইবে হিন্দুমুসলমানের মাঝখানে একটা বিরোধ আছে।..আমরা বহুশত বৎসর পাশে পাশে থাকিয়া এক খেতের ফল, এক নদীর জল, এক সূর্যের আলোক ভোগ করিয়া আসিয়াছি; আমরা এক ভাষায় কথা কই, আমরা এক সুখে দুখে মানুষ; তবু প্রতিবেশীর সাথে প্রতিবেশীর যে সম্মন্ধ মনুষ্যচিত, যাহা ধর্মবিহিত, তাহা আমাদের মধ্যে হয় নাই।আমরা জানি, বাংলাদেশের অনেক স্থানে এক ফরাশে হিন্দু মুসলমানে বসে না ঘরে মুসলমান আসিলে জাজিমের একাংশ তুলিয়া দেওয়া হয়, হুঁকার জল ফেলিয়া দেওয়া হয়।….মানুষকে ঘৃণা করা যে দেশে ধর্মের নিয়ম, প্রতিবেশীর হাতে জল খাইলে যাহাদের পরকাল নষ্ট হয়, পরকে অপমান করিয়া যাহাদিগকে জাতি রক্ষা করিতে হইবে পরের হাতে চিরদিন অপমানিত না হইয়া তাহাদের গতি নাই, তাহারা যাহাদিগকে ম্লেচ্ছ বলিয়া অপমান করিতেছে সেই ম্লেচ্ছের অবজ্ঞা তাহাদিগকে সহ্য করিতে হইবে।’ (রবীন্দ্র রচনাবলী, ৫ম খন্ড, বিশ্বভারতী)

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের প্রবল চাপে বঙ্গভঙ্গ রদ হয় ১৯১১ সালে। কিন্তু একবার ভঙ্গ একবার রদ এই ঘটনাবলীর মধ্যে বাংলার মানুষের মধ্যেকার চাপা থাকা বিরোধ প্রকাশ্য হয়ে পড়ে। এই বিরোধ একদিকে হিন্দু ও মুসলমান এবং অন্যদিকে পূর্ব বাঙলা ও পশ্চিম বাঙলার মানুষ অর্থাৎ বাঙাল ও বাঙালীর মধ্যে। হিন্দু মুসলমানের বিরোধ নিয়ে আলোচনা পর্যালোচনা অনেকেই করেছেন কেননা সেটা অনেক স্পষ্ট। কিন্তু বাঙাল ও বাঙালীর মধ্যেকার বিরোধ, পরিচয়ের টানাপেড়েন নিয়ে তুলনায় আলোচনা হয়েছে কম। অনেকসময় এই বিরোধও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার আকারে হাজির হয়েছে।

.

১৯৪৭ সালে এই এলাকায় ভারতীয় উপনিবেশ থেকে ভারত এবং পাকিস্তান নামে দুই রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। এর মধ্য দিয়ে পাঞ্জাব ও কাশ্মীরের পাশাপাশি বাংলাও বিভক্ত হয়। বর্তমান বাংলাদেশের মানুষ ইতিহাসের নতুন পর্বে প্রবেশ করেন। তাদের স্বপ্ন, সমস্যা, ভাষা, লড়াই সবই এরপর আলাদাভাবে গড়ে উঠে। মুসলমানদের জন্য ভিন্ন রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে যে মুসলমানদের সমস্যার সমাধান হয় তা নয়, বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের জীবন নতুন মুসলমান শাসকদের দাপটে প্রায় অপরিবর্তিতই থাকে। তাছাড়া যত মুসলমান পাকিস্তানে ছিলেন তার থেকে বেশি সংখ্যক মুসলমান ভারতেই থেকে যান। তাছাড়া পাকিস্তানের দুই প্রান্তেই অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বী নিজ বাসভূমি ত্যাগ না করে থেকে যান এখানেই। সাম্প্রদায়িকতার কারণে দেশভাগ হলেও দুই দেশেই হিন্দু মুসলমান সাম্প্রদায়িক সংঘাতও অব্যাহত থাকে। ১৯৪৭ সালে যারা নিজেদের মুসলমান পরিচয়কে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন তাদের অনেকে জাতিগত নিপীড়নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ১৯৭১ সালে বাঙালী পরিচয়কেই মুখ্য ধরেছিলেন। সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে এদেশের মানুষ মুক্ত হল অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার অঙ্গীকার করে। সেই অঙ্গীকার থেকে বাংলাদেশ এখন অনেক দূরে।

বাংলাদেশে গত ৪১ বছরে বহুরকম সরকার ক্ষমতায় থেকেছে, সামরিক বেসামরিক, রাষ্ট্রপতি কেন্দ্রিক বা সংসদীয়। তবে এসব শাসনের মধ্য দিয়ে দেশে লুটেরা ধনিক শ্রেণীর সম্পদ কেন্দ্রীভবন বেড়েছে। দেশে চোরাই টাকার মালিক কোটিপতিদের সংখ্যা, তাদের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ক্ষমতা সম্প্রসারিত হয়েছে। সম্পদ সংবর্ধনের প্রধান উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে সর্বজনের সম্পদজমি, পাহাড়, জঙ্গল, খাল, জলাশয়, নদী দখল। বিশ্বব্যাংক আইএমএফ নির্দেশিত ‘ওয়াশিংটন ঐকমত্য’ অনুযায়ী ‘অর্থনৈতিক সংস্কার’ এবং ব্যক্তির আওতায় সর্বজনের সম্পদ নিয়ে আসার জন্য লুন্ঠন দখল খুবই সঙ্গতিপূর্ণ। এসবের মধ্য দিয়েই শাসক শ্রেণী দল নির্বিশেষে লুটেরা দখলদার শ্রেণী হিসেবে এখন অনেক সংহত। বিভিন্ন দল বা জোটের নামেই তারা দেশের শাসন ক্ষমতার অংশীদার। এই সময়কালেই নিপীড়ন, শোষণ ও আধিপত্য বৈধ করতে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বেড়েছে, সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে বাঙালী মুসলমানের রাষ্ট্রে। তারপরও সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলমান নারীপুরুষ শ্রেণীগত ও লিঙ্গীয় নিপীড়ন বৈষম্যের শিকার। আর জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জীবন ও সম্পদ হয়ে দাঁড়িয়েছে দখল ও লুন্ঠনের আরও সহজ ক্ষেত্র।।

১টি মন্তব্য

  1. শীলব্রত বড়ুয়া (Shilabrata Barua)

    এটি একটি সুচিন্তিত নিবন্ধ । দুই সম্প্রদায়ের বেনিয়া ও শোষক চক্র সব সময় সাধারণ হিন্দু-মুসলমাসকে ব্যবহার করেছে নিজেদের স্বার্থে । এর ফলেই বঙ্গভং্গ, আবার যুক্ত বাংলা ও ভারতবর্ষ বিভাগের সাথে বাংলা দিখন্ডিত হয় । ভারত বিভাগে সবচেয়ে বেশি মূর‌্য দিয়েছৈ বঙালি ও পাঞ্জাবীরা । এর মাশুল এখনও আমরা ঘুনছি । এটা ঠিক ইতিহাসের চাকা আর ঘোরানো যাবেনা । তবে বাংলাদেশ কি ভারত যে যেখানেই থাকি সাধারণ হিন্দু-মুসলমানকে এক থেকে কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্রকে ব্যর্র করে দিতে হবে ।