Home » আন্তর্জাতিক » সীমান্তে হত্যা বিএসএফ’র অভ্যাসে পরিণত হয়েছে

সীমান্তে হত্যা বিএসএফ’র অভ্যাসে পরিণত হয়েছে

মাহবুবুর রহমান

bsf_logo-1-ভারতবাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা চলছেই। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী এই বাহিনীর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে গুলি করে বাংলাদেশী হত্যা। গত চার বছরে ২৫৪ জন বাংলাদেশীকে তারা হত্যা করেছে। অপহরণ ও আহত হয়েছে আরও কয়েকশ’ বাংলাদেশী। বিএসএফ কর্তৃক নির্বিচারে মানুষ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোন প্রতিবাদ জানানো হয় না। অনেক সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারে উচ্চপর্যায়ের কর্তাব্যক্তি প্রতিবাদ না করে উল্টো সীমান্ত হত্যার পক্ষে সাফাই গাইছেন। চলতি বছরের প্রথম দু’দিনে চারজন বাংলাদেশী হত্যাকান্ডের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীর বলেছিলেন, ‘বিএসএফ আত্মরক্ষার স্বার্থেই এ গুলি চালিয়েছে।’ এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দিপু মনিও একই রকম মন্তব্য করেন। নিরীহ নাগরিকদের চোরাকারবারী আখ্যা দিয়ে বিএসএফ কর্তৃক এভাবে হত্যার পর সরকারের মন্ত্রীদের এসব বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন দেশের বিশিষ্টজনেরা।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ প্রধান, তার কাছে পাঠানো এসপিদের রিপোর্টের উপরে ভিত্তি করে যে প্রতিবেদন দিযেছেন তাতে দেখা গেছে, বিএসএফ মানব, অস্ত্র এবং মাদকদ্রব্য পাচারের কাজে জড়িত বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর বেরিয়েছে।

গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর মিডিয়া রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এমআরটি) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, মহাজোট সরকারের গত চার বছরে ২৫০ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে বিএসএফ। চলতি বছরের প্রথম দুই দিনেই খুন হয়েছেন চারজন। আহত হয়েছেন ১৩ জন, অপহৃত হয়েছেন আরো ১৩ জন। এর আগে ২০১২ সালে বিএসএফের হাতে খুন হয়েছেন ৪২ জন, ২০১১ সালে ৩৪ জন, ২০১০ সালে ৭৪ জন এবং ২০০৯ সালে নিহত হয়েছেন ৯৬ জন বাংলাদেশী নাগরিক।

২০১১ সালের ১৪ এপ্রিল যশোর জেলার বেনাপোলের সাদীপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হয় মুন্না (১৮) নামের এক বাংলাদেশী যুবক। এ সময় বিএসএফের গুলিতে আহত হয় মামুন (২৩) নামের অপর এক যুবক। একই দিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর নীতপুর সীমান্তে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করে সানাউল্লাহ (৩২) নামের এক বাংলাদেশীকে। ২০১২ সালের পয়লা বৈশাখ চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা সীমান্তে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করে ফারুক হোসেন (২৫) নামের এক যুবককে। গত মে দিবসে রহমত নামের এক বাংলাদেশীকে হত্যা করে বিএসএফ। ২০১১ সালের বিজয় দিবসে বাংলাদেশের বিজয়ের যখন ৪০ বছর উদযাপিত হচ্ছিল ঠিক সেই দিন বিএসএফ বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যা করে। মেহেরপুরের গাংনি সাহেববাজার সীমান্তে ওই দিন নিহত হন নাহারুল (৪০) নামের এক বাংলাদেশী। একই দিন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়িয়া সীমান্তে বোমার আঘাতে নিহত হন আনোয়ার হোসেন (২৭)। আহত হয় মোহর আলী নামের অপর এক যুবক। ওই দিন দিনাজপুরের বিরামপুর সীমান্তে মতিয়ার (২০) ও তাইজুদ্দিন (৩০) নামের দুই বাংলাদেশীকে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করে। ২০১২ সালের ২০ আগস্ট ঈদুল ফিতরের দিন লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার হাটখাতা সীমান্তে বিএসএফ সদস্যরা জাহাঙ্গীর আলম বাবলু নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ইংরেজি নববর্ষের দিন ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফ হত্যা করে মুক্তার আলম ও তরিকুল ইসলাম ওরফে নুর ইসলাম নামের দুই যুবককে। এ সময় তাদের গুলিতে আহত হয় আরো তিন যুবক। তারা হলো আমজাদ, সামাদ ও রাজু। এর ২২ ঘণ্টার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর সীমান্তে মাসুদ আহম্মেদ ও শহীদুল ইসলাম নামের দুই বাংলাদেশী যুবককে হত্যা করে বিএসএফ।

বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব) আ ল ম ফজলুর রহমান বলেন, ভারতমুখী পররাষ্ট্রনীতির কারণেই এভাবে বিএসএফ বাংলাদেশীদের হত্যার সাহস পাচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সেক্রেটারি মহাসচিব অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান খান বলেন, ভারত সরকারের আগ্রাসী নীতির শিকার বাংলাদেশ। প্রতি চার দিনে ভারত খুন করছে একজন বাংলাদেশীকে। আদিলুর রহমান বলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে রক্তাক্ত সীমান্ত হচ্ছে, বাংলাদেশ সীমান্ত। বাংলাদেশের নাগরিকেরা অরক্ষিত। বাংলাদেশের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির জন্যই এ ঘটনা ঘটছে। এখন গণপ্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। নাগরিকদেরকেই তাদের নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে।

ভারতের সাথে ছয়টি দেশের সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতপাকিস্তান সীমান্তেও কোনো নিরীহ মানুষ হত্যার ঘটনা নেই। অথচ বাংলাদেশভারত সীমান্তে গড়বে প্রতি চার দিনে একজন নিরীহ বাংলাদেশী নাগরিক নিহত হচ্ছেন।

বাংলাদেশভারত সীমান্তে আবারো বিএসএফের গুলিতে চার বাংলাদেশী নিহত এবং আরো কয়েকজনকে অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছে।

আসক বলেছে, ভারত সরকারের বারংবার আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এমতাবস্থায় তাদের দাবি দুই দেশের সরকারের শীর্ষপর্যায়ের এ ইস্যুটি নিয়ে আলোচনা হোক ও সমস্যা সমাধানে একটি বিস্তৃত রূপরেখা তৈরি করে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হোক। সরকারকে তারা অনুরোধ জানায়, এ ব্যাপারে দ্রুত উদ্যোগী হতে, কেননা সীমান্তে হত্যা বন্ধ না হওয়া প্রকৃতপক্ষে বারবার আমাদের পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতা সামনে নিয়ে আসছে।।