Home » আন্তর্জাতিক » ভারত-ইসরাইল সামরিক ও গোয়েন্দা সম্পর্কের উন্নয়ন

ভারত-ইসরাইল সামরিক ও গোয়েন্দা সম্পর্কের উন্নয়ন

নিনান কোশি

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

israel-india-1-ফিলিস্তিনের সঙ্গে কাশ্মীর ও পাকিস্তানকে মিশিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ভারত ও ইসরাইল তাদের নিজ নিজ সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের লক্ষ্যবস্তু বানাতে অভিন্ন শত্রু পেয়েছে।

সন্ত্রাসবাদের হুমকি কার্যকরভাবে মোকাবিলা করার লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ভারতের উচিত সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা,’ নয়া দিল্লিতে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে এই পরামর্শটি দিয়েছেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম।

কিন্তু আবদুল কালাম ভুলে গেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রভারতইসরাইল জোট আরো অনেক আগেই গঠিত হয়ে গেছে।

২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়াল শ্যারনের নয়াদিল্লি সফরকালে তার ডেপুটি ইউসেফ ল্যাপিদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করতে ভারত, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘অলিখিত ও বিমূর্ত’ জোট গঠন করা হয়েছে।

তিনি তাদের জানিয়েছিলেন, ‘ত্রিপক্ষীয় কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি না হলেও এই পৃথিবীকে আমাদের সবার জন্য আরো নিরাপদ করে গড়ে তোলার প্রতি এই তিন দেশেরই পারস্পরিক আগ্রহ রয়েছে। ফলে তাত্ত্বিকভাবে আমরা এ ধরনের একটি জোট গড়ছি।’

ইসরাইলি উপপ্রধানমন্ত্রীর জোট করার কথা ঘোষণা করার মাত্র চার মাস আগে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রিজেশ মিশ্র এ ধরনের একটি জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। আমেরিকান জুইশ (ইহুদি) কমিটিতে ২০০৩ সালের ৮ মে বক্তৃতাকালে মিশ্র বলেছিলেন, “কেবল ভারত, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো ‘খাঁটি’ গণতান্ত্রিক দেশই সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করতে পারে। সন্ত্রাসী প্ররোচণার ক্ষেত্রে এ ধরনের জোটেরই সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে রাজনৈতিক ইচ্ছা ও নৈতিক অধিকার রয়েছে।”

তিনি আরো বলেন, দেশ তিনটির সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং এর লক্ষ্য নিয়ে বিতর্ক করে সময় নষ্ট করা উচিত হবে না। মিশ্র সুনির্দিষ্টভাবে বলেন, ‘স্বাধীনতা যোদ্ধা ও সন্ত্রাসীর মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করার উদ্যোগ একটি উদ্ভট যুক্তি। আরেকটি মিথ্যা প্রচারণা হলো এই যে, মূল কারণ দূর করা হলে সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করা সম্ভব। ফালতু কথা।’ তারপর তিনি তার প্রিয় বিষয়বস্তুটির পুনরাবৃত্তি করেন ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হলো সন্ত্রাসবাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু।’ তাদের ‘অভিন্ন শত্রু’ আছে এবং এর জন্য প্রয়োজন ‘যৌথ ব্যবস্থা।’

মিশ্রের বক্তব্য আসলে ওই সময়ের ভারতীয় উপপ্রধানমন্ত্রী এল কে আদভানির কথারই প্রতিধ্বনি ও ব্যাখ্যা। ২০০২ সালের জুলাইতে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাতকারে আদভানি বলেছিলেন, ‘১১ সেপ্টেম্বর [২০০১ সালে, নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে] বা ১৩ ডিসেম্বরের [২০০১ সালে, ভারতীয় পার্লামেন্টে] সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, এর উৎস একই। ওই অভিন্ন উৎসই যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ভারতকে তাদের প্রধান শত্রু ঘোষণা করেছে।’

এই জোটের দীর্ঘ ইতিহাস থাকায় সাবেক রাষ্ট্রপতির দেশ তিনটির মধ্যে সন্ত্রাস প্রতিরোধে সহযোগিতার আহ্বান নতুন করে জানানোর প্রয়োজন ছিল না।

এখন আমরা এই জোটের কাঠামোর মধ্যে সন্ত্রাসপ্রতিরোধে ভারতইসরাইল সহযোগিতার বিষয়টি দেখব।

রাজ্যসভার (ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ) সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মণি শঙ্কর আয়ার ২০১০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছিলেন

আমরা ইসরাইল থেকে আসা প্রতিরক্ষা সরবরাহের ওপর এত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি যে, আমি যখন রাজ্যসভায় গাজা উপত্যাকায় ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় বিপুলসংখ্যক লোক নিহত (গোল্ডস্টোন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী) হওয়ার ব্যাপারে সরকারের কাছ থেকে উত্তর চেয়েছিলাম, তখন পররাষ্ট্র দফতর আমার প্রশ্নটি রাষ্ট্রীয়ভাবে গোপন বিষয় হিসেবে অভিহিত করে বাতিল করে দিল। ভারতফিলিস্তিন সম্পর্ক যখন গোপন বিষয়ে পরিণত হয়, তখন এটাই কি প্রতীয়মান হয় না , ফিলিস্তিনি সংগ্রামে আমরা [ভারত] পুরোভাগে আছি?’

ভারতফিলিস্তিন সম্পর্ক দীর্ঘ দিন ধরেই ভারতইসরাইল সম্পর্কের আলোকে হচ্ছে। ২০০৩ সালে নয়াদিল্লিতে শ্যারনের ঐতিহাসিক সফরের ঠিক আগে দিয়ে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানায়, ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ‘বিশ্বের সবচেয়ে গোপন সম্পর্কগুলোর অন্যতম।’

ভারতে নিযুক্ত ইসরাইলি সাবেক রাষ্ট্রদূত মার্ক সোফারের কণ্ঠে ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় একই সুর ধ্বনিত হয়। তিনি বলেন, ভারতের সাথে আমাদের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক থাকার বিষয়টি গোপন কিছু নয়। যা গোপন, তা হলো প্রতিরক্ষা সম্পর্কের প্রকৃতি। গোপন অংশের সবকিছু গোপনই থাকবে।’

তার এই মন্তব্যের পর রেহনুমা আহমদ তার বিশ্লেষণে প্রশ্ন রাখেন

এটা কি কারণে করা হলো? ওই প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার মধ্যে রয়েছে উচ্চ প্রযুক্তির অস্ত্র বিক্রি এবং সামরিক স্থাপনা ও প্রশিক্ষণে পারস্পরিক প্রবেশাধিকার কি কেবলই খোলস? এর ভেতরে কি আছে? বিষয়টা কি এতই গোপনীয় যে, মান্যবর রাষ্ট্রদূতকে চারবার ‘গোপনীয়’ শব্দটি উচ্চারণ করতে হলো?”

এরপর ইসরাইলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিমন পেরেস ২০০২ সালের জানুয়ারিতে নয়াদিল্লি এলে ভারত ও ইসরাইলের মধ্যে কৌশলগত বন্ধন জোরদার করার উপলক্ষ তৈরি হয়। পেরেসের সফরকালে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছিলেন, ‘ইসরাইলের দীর্ঘ দিন ধরে সীমান্তের বাইরে থেকে আসা সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করার অভিজ্ঞতা থাকায় ভারত মনে করছে, এই দেশটি থেকে শিক্ষা নেওয়া হবে বেশ কল্যাণকর।’ ওই মুখপাত্র ফিলিস্তিনি সংগ্রামকে সীমান্তের বাইরের সন্ত্রাসবাদের সমতুল্য বলে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।

ভারত ও ইসরাইল কেবল তাদের কথিত ‘ইসলামি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো’ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করেনি, ইসরাইল বিশেষায়িত নজরদারি, সরঞ্জাম, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ বা প্রদান এবং যৌথ মহড়ার মতো তাৎপর্যপূর্ণ কৌশলগত সহায়তা দিয়েও ‘কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায়’ ভারতকে ‘সাহায্য’ করছে।

ভারত ও ইসরাইলের মধ্যকার গোয়েন্দা সহযোগিতার মাত্রাটি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক ব্যাপক ও গভীর। হাজার হাজার বিশেষ সৈন্য ইসরাইলে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। ভারত প্রধানত পাকিস্তান থেকে কাশ্মীরে সীমান্ত স্বাধীনতাকামীদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এবং সেইসঙ্গে চীনের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে ইসরাইলের সহায়তা কামনা করেছে।

ইসরাইলে ২০০৪ সালের জুনে ভারতের তদানিন্তন উপসেনাপ্রধান জেনারেল শান্তনু চৌধুরীর সফরকালে তাকে গোলান মালভূমি ও ন্যাগেভ মরুভূমির সীমান্তজুড়ে অনুপ্রবেশনিরোধক ব্যবস্থা দেখানো হয়। ২০০৭ সালে মেজর জেনারেল ক্যাপলিনস্কির ভারত সফরকালে ইসরাইলি প্রতিনিধি দল এবং ভারতে অবস্থানরত তাদের সদস্যরা জম্মু ও কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর ইসরাইলি সরঞ্জামের কর্মসম্পাদন দক্ষতা পর্যালোচনা করে।

মুম্বাইয়ে ২০০৮ সালের হামলার পর ভারতে সন্ত্রাস প্রতিরোধ পদ্ধতির ব্যাপারে ক্রমবর্ধমান আগ্রহের ফলে নতুন করে দহরম মহরম শুরু হয়। ‘ডিফেন্স নিউজ’ ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে জানায়, ভারত ও ইসরাইল ইসরাইলি কমান্ডো বাহিনী ও ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে যৌথ মহড়ার পরিকল্পনা করছে।

এই সমঝোতার অংশ হিসেবে ইসরাইলি কমান্ডোরা ভারতের বনেজঙ্গলে, পাহাড় এবং অত্যন্ত ঘন বসতিপূর্ণ এলাকার বিভিন্ন স্থানে ভারতীয় সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। বেসামরিক হতাহত হ্রাস করে কিভাবে সন্ত্রাসী লক্ষ্যবস্তুকে পরাজিত করা সম্ভবইসরাইলিরা সেটাও ভারতীয়দের শেখাচ্ছে।

২০০৯ সালে ইসরাইল যখন ভারতীয় হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এবং সন্ত্রাস প্রতিরোধ কৌশল প্রদানের প্রস্তাব দেয়, তখন মহারাষ্ট্র সরকার এর জবাবে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভের জন্য একটি ভারতীয় প্রতিনিধি দলকে ইসরাইলে পাঠায়।

ইসরাইলের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ব্যবস্থা অনেক উন্নত এবং ভারত ওই অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হতে পারে। আমরা স্পষ্ট মৌলিক নীতিমালার আলোকে বন্ধুপ্রতীম দেশ এবং কৌশলগত অংশীদার। সন্ত্রাসবাদের আতঙ্ক প্রতিরোধ করতে আমাদেরকে পূর্ণতম মাত্রায় সহযোগিতা করতে হবে,’ বলেছিলেন ভারতের সাবেক বাণিজ্য ও শিল্পবিষয়ক উপমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া, ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তেল আবিবে ব্যবসায়ী নেতাদের।

ওই সময়ের ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট পেরেসের সঙ্গে একান্ত বৈঠকে মন্ত্রী ‘সময়ে সময়ে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ সহায়তার জন্য ইসরাইলকে ধন্যবাদ জানান।

সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ভারত ও ইসরাইলের মধ্যকার সহযোগিতার ধরণটি কেবল সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিই নয়, বরং ফিলিস্তিনি সংগ্রামের প্রকৃতি দেশটি কিভাবে মূল্যায়ন করে সেই মৌলিক প্রশ্নও সৃষ্টি করে।

আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ’ নিয়ে কূটনৈতিক মন্তব্য ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকেও সুস্পষ্টভাবে সন্ত্রাসের সঙ্গে গুলিয়ে দেয়। ফিলিস্তিনের সঙ্গে কাশ্মীর ও পাকিস্তানকে মিশিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ভারত ও ইসরাইল তাদের নিজ নিজ সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের লক্ষ্যবস্তু বানাতে অভিন্ন শত্রু পেয়েছে।

(এশিয়া টাইমস থেকে, লেখক কেরালার ত্রিবানদ্রমভিত্তিক ভাষ্যকার।)