Home » অর্থনীতি » ‘আমরা একেই বলি উন্নয়ন’

‘আমরা একেই বলি উন্নয়ন’

অরুন্ধতী রায়

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

arundhati-1ইতিহাসের কতটুকু পেছন থেকে শুরু করতে হবে জানি না, তাই সাম্প্রতিক অতীত থেকেই যাত্রা করা যাক। আমি শুরু করছি ১৯৯০এর দশকের প্রথম দিক থেকে, আফগানিস্তানের বিবর্ণ পাহাড়গুলোতে সোভিয়েত কমিউনিজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পুঁজিবাদের ওই জয়টা খুব বেশি দিন আগের ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে অবস্থান করার পর ভারত সরকার হঠাৎ করেই পুরোপুরি জোটভুক্ত দেশে পরিণত হলো, নিজেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইয়েলের সহজাত মিত্র অভিহিত করতে থাকল। এর সংরক্ষিত বাজার বৈশ্বিক পুঁজির জন্য খুলে দেওয়া হলো। বেশির ভাগ লোক কথা বলছে পরিবেশ যুদ্ধের কথা। কিন্তু আসল দুনিয়ায় পরিবেশগত যুদ্ধকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, শূন্য হয়ে আসা ইউরেনিয়াম, ক্ষেপণাস্ত্র ইত্যাদি থেকে আলাদা করে দেখা বেশ কঠিন। বাস্তবতা হলো, মহামন্দা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সত্যিকার অর্থে তুলে এনেছিল সামরিক শিল্প কমপ্লেক্স। আর তখন থেকেই আমেরিকার মতো অনেক দেশ, ইউরোপের কেউ কেউ এবং অবশ্যই ইসরাইয়েল, অস্ত্র উৎপাদনের ওপরই বাজি ধরছে। যুদ্ধে যদি ব্যবহার নাই হলো, তবে অস্ত্র কাজে লাগে কিসে? অস্ত্র অতি অবশ্যই অনিবার্য; কেবল তেল বা প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য নয়, সামরিক শিল্প কমপ্লেক্স টিকিয়ে রাখার জন্যও আমাদের অস্ত্র দরকার।

আজ আমরা বলছি, যুক্তরাষ্ট্র এবং সম্ভবত চীন ও ভারত আফ্রিকার সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। ডেথ স্কোয়াডসহ হাজার হাজার মার্কিন সৈন্য পাঠানো হচ্ছে আফ্রিকায়। ‘হ্যাঁ আমরা পারি’ বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আফগানিস্তানের যুদ্ধকে পাকিস্তানে সম্প্রসারিত করেছেন, সেখানে নিয়মিত ভিত্তিতে ড্রোন হামলা চালিয়ে শিশু হত্যা করা হয়।

ভারতের বাজার যখন ১৯৯০এর দশকে খুলে দেওয়া হয়, যখন সংরক্ষিত শ্রমসংক্রান্ত সব আইন বাতিল করা হয়, যখন প্রাকৃতিক সম্পদরাজি বেসরকারিকরণ করা হয়, যখন পুরো প্রক্রিয়াকে গতিশীল করা হয়, তখন ভারত সরকার দুটি তালা খুলে দিয়েছিল : একটি ছিল বাজারের তালা; আরেকটি ছিল ১৪ শতকের একটি পুরনো মসজিদের তালা, যা নিয়ে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিতর্ক ছিল। হিন্দুরা বিশ্বাস করত, এটা রামের জন্মস্থান, আর মুসলমানেরা এটাকে মসজিদ হিসেবে ব্যবহার করত। ওই তালা খুলে ভারত সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংঘাত বেগবান করেছে, জাতিকে সদা বিভক্ত করার পথ সৃষ্টি করেছে। ক্ষতায় থাকা যে কারো জন্যই প্রধান কৌশল হলো জাতিকে বিভক্ত রাখার পথ খোঁজা।

এই দুই তালা খোলার মাধ্যমে ভারতে দুই ধরণের সর্বগ্রাসতন্ত্রের সৃষ্টি হয় একটি অর্থনৈতিক সর্বগ্রাসতন্ত্র এবং অপরটি হিন্দু মৌলবাদতন্ত্র। উদ্ভুত পরিস্থিতিকে সরকার অভিহিত করে ‘সন্ত্রাসবাদ’। ইসলামী সন্ত্রাসাবাদীরা আগেই ছিল, এবার সরকার বলতে লাগল ‘মাওবাদী’দের কথা। যারাই, তাদের ভাষায়, সভ্যতা, অগ্রগতি, উন্নয়নের বিরোধিতা করবে তারাই মাওবাদী। যে লোক আজ তাদের ভূমি জবর দখল, নদী, বনজঙ্গল ধ্বংসের প্রতিরোধ করবে, তাকেই বলা হবে মাওবাদী। প্রতিরোধ আন্দোলনের ব্যান্ডউইথে মাওবাদীরা সবচেয়ে জঙ্গি প্রান্তে, আর গান্ধীবাদীরা রয়েছে স্পেকটামের অন্য প্রান্তেÍ। বৈশ্বিক পুঁজির প্রচণ্ড আক্রমণ প্রতিরোধে জনগণ কোন কৌশল গ্রহণ করবে, তা প্রায়ই আদর্শগত ব্যাপারে সীমিত থাকে না, বরং যেখানে যুদ্ধটি হয়, সেখানকার ভৌগোলিক অবস্থার অপর কৌশলগত বিকল্প নির্ভর করে।

ভারত ১৯৪৭ সালে সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র হওয়ার পর থেকে তার নিজের জনগণের বিরুদ্ধেই তার সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। এখন, ক্রমান্বয়ে, যেসব রাজ্যে সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছিল, সেইসব রাজ্যের জনগণ আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের জন্য লড়াই করছে। ঔপনিবেশমুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্র এসব রাজ্যকে অল্প সময়ের মধ্যেই ঔপনিবেশে পরিণত করেছিল। এখন ওইসব সৈন্য আসলে বড় বড় ড্যাম নির্মাণ, বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ, বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়া পরিচালনার মতো সরকারের অধিকার রক্ষার কাজ করছে। গত ৫০ বছরে কেবল ভারতেই বড় বড় ড্যাম নির্মাণের কারণে তিন কোটি মানুষ বাস্তুহারা হয়েছে। আর বাস্তুহারাদের বেশির ভাগই আদিবাসী মানুষ বা সেইসব মানুষ যাদের জীবন পুরোপুরি ভূমির ওপর নির্ভরশীল।

এ ধরণের মুক্তবাজার এবং সন্ত্রাসবাদের এই জুজু গণতন্ত্রের ভেতরটা প্রকাশ করে দিচ্ছে। আমি লক্ষ্য করেছি, আজকাল অনেক লোকই গণতন্ত্রকে ভালো শব্দ হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু একটু চিন্তা করলে বোঝা যাবে, গণতন্ত্র যেভাবে ব্যবহৃত হওয়া উচিত, আজকের গণতন্ত্র তা নয়। একটা সময়ে আমেরিকান সরকার ল্যাতিন আমেরিকা ও অন্যান্য স্থানে গণতান্ত্রিক সরকারগুলোকে উৎখাত করেছে। আর এখন সে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধে মেতে আছে। দেশটি গণতন্ত্রকে ওয়ার্কশপে নিয়ে গিয়ে এখন আবার হাজির করছে। ভারতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানযেটা আদালত, কিংবা পার্লামেন্ট বা সংবাদমাধ্যম যেই হোক না কেনবের হয়ে মুক্তবাজারের জোয়াল বইতে শুরু করেছে। ফাঁকা শাস্ত্রাচার থেকে মুখোস পরেসব পন্থায় ভারতে যা হচ্ছে, তা হলো এটা পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া অব্যাহত রয়েছে। আমরা মুক্তবাজারনীতি গ্রহণ করার পর গত ২০ বছরে ঋণের জালে জড়িয়ে আড়াই লাখ কৃষক আত্মহত্যা করেছে। মানব ইতিহাসে এ ধরণের ঘটনা আগে কখনোই ঘটেনি।

কৃষকের আত্মহত্যা এবং আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীর মধ্যে কোনো একজনকে বেছে নিতে বললে সরকার নিশ্চিতভাবেই কোনটাকে গ্রহণ করবে সেটা সবাই জানে। ওই পরিসংখ্যান নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। কারণ তারা জানে, এতে তাদেরই লাভ, তারা দুঃখ অনুভব করে, তারা কিছু গোলমাল করে, কিন্তু তারা যা করছিল, তাই করা অব্যাহত রাখে।

আফ্রিকার দরিদ্রতম দেশগুলোর সব মানুষের চেয়ে আজ ভারতে লোকসংখ্যা অনেক বেশি। ভারতের ৮০ ভাগ লোক দিনে ২০ রুপি (৫০ সেন্টের চেয়েও কম) বা এর চেয়ে কম অর্থে বেঁচে আছে। এমন এক পরিবেশেই প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো সক্রিয়।

আর অবশ্যই এর আছে মিডিয়া। অন্য কোনো দেশের এত সংবাদ চ্যানেল আছে কিনা আমার জানা নেই। আবার এসব চ্যানেলের স্পন্সর বা প্রত্যন্ত মালিক করপোরেশনগুলো, এগুলোর অনেকে আবার খনি করপোরেশন ও অবকাঠামো করপোরেশন। সব খবরের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের তহবিল সংস্থান করে করপোরেট বিজ্ঞাপন। ফলে কী ঘটছে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, যাতে কমবেশি গদিনশীন করেছে আইএমএফ, জীবনে কোনো নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি। তিনি একবারই নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন এবং হেরেছিলেন। কিন্তু এর পর তাকে সেখানে স্থাপন করা হয়েছে। তিনি এমন এক ব্যক্তি, যিনি অর্থমন্ত্রী থাকার সময়, সব আইন গুঁড়িয়ে দিয়ে বৈশ্বিক পুঁজিকে ভারতে আগমনের পথ খুলে দিয়েছিলেন।

একবার আমি লোহা খনিশ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠক করছিলাম, তখন আজকের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ছিলেন পার্লামেন্টে বিরোধী দলের নেতা। এক হিন্দি কবি একটি কবিতা পাঠ করলেন, শিরোনাম : ‘আজকাল মনমোহন সিং কি করছেন?’ কবিতাটির প্রথম কয়েকটি লাইন ছিল এমন : ‘আজকাল মনমোহন সিং কি করছেন? রক্তস্রোতে ঢুকে বিষ কি করছে?’ তারা জানত, তার যা করার, তিনি করে ফেলেছেন, এখন কেবল একটার পর একটা ঘটনা ঘটার অপেক্ষা।

বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে, ২০০৫ সালে, ভারত সরকার মধ্য ভারতের বনভূমি এলাকার উন্নয়নের লক্ষ্যে খনি কোম্পানি, অবকাঠামো কোম্পানি, ইত্যাদি আরো অনেক কোম্পানির সঙ্গে শত শত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। ভারতে আদিবাসী জনসংখ্যা প্রায় ১০ কোটি। আপনি ভারতের মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখবেন বনবনানি, খনিজ সম্পদ আর আদিবাসী লোকজন একই জায়গায় একে অন্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ২০০৫ সালে এসব খনি কোম্পানির সঙ্গেই সমঝোতা স্মারকগুলো বেশ কয়েকটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ওই সময়ে ছত্তিশগড় রাজ্যে, এখন যেখানে মহা গৃহযুদ্ধ লেগেছে, সরকার উপজাতীয় মিলিশিয়া গঠন করে। আর এর তহবিলের সংস্থান করে এসব করপোরেশন। এই বাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল বনজঙ্গলে গিয়ে সেখানকার লোকজনকে সরিয়ে দেওয়া, যাতে সমঝোতা স্মারক বাস্তবে রূপ লাভ করে। মিডিয়া পুরো বনভূমিকে ‘মাওবাদী করিডোর’ হিসেবে অভিহিত করতে শুরু করে। অবশ্য আমাদের কেউ কেউ বলছিল, ‘মউসবাদী করিডোর’ (এমওইউবাদী, তথা সমঝোতা স্মারকবাদী)। ওই সময়ের দিকেই তারা ‘অপারেশন গ্রিন হান্ট’ নামের একটি যুদ্ধের ডাক দেয়। সরকারের কথিত মাওবাদীদের সরিয়ে দিতে দুই লাখ আধা সামরিক সৈন্য বনগুলোতে ঢুকতে শুরু করে, উপজাতীয় মিলিশিয়ারা তো সঙ্গে ছিলই।

মাওবাদী আন্দোলন, বিভিন্ন অবতারে, ১৯৬৭ সাল থেকেই ছিল, ওই সময়ে প্রথমবারের মতো একটি অভ্যুত্থান দেখা গিয়েছিল। নক্সালবাড়ি নামে পশ্চিমবঙ্গের একটি গ্রামে সেটা সংঘটিত হয়েছিল। এ কারণে মাওবাদীদের অনেক সময় নক্সালি নামেও ডাকা হয়। এটি তখন অবশ্যই আন্ডারগ্রাউন্ড, নিষিদ্ধ দল ছিল। এর এখন ‘পিপলস লিবারেশন গেরিলা আর্মি’ আছে।

এই সঙ্ঘাতে হাজার হাজার লোক নিহত হয়েছে। আজ, হাজার হাজার লোক কারাগারে রয়েছে, আর তাদের সবাইকে বলা হচ্ছে মাওবাদী, যদিও তাদের সবাই সত্যিকার অর্থে মাওবাদী নয়, কারণ আমি বলি, যেই প্রতিরোধ করে, তাকে এখন বলা হয় সন্ত্রাসী। দারিদ্র ও সন্ত্রাসবাদ একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে। উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে আমর্ড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার্সের মতো আইন আছে, যার মাধ্যমে সৈন্যরা সন্দেহের বশেই গুলি চালাতে পারে। ভারতজুড়ে আমাদের রয়েছে আনল’ফুল অ্যাকটিভিটিস প্রিভেনশন অ্যাক্ট, যার ফলে এমনকি সরকারবিরোধী চিন্তা করাটাও ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং এ কারণে আপনার সাত বছরের পর্যন্ত জেল হতে পারে।

এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল, এবং ‘মাওবাদীসন্ত্রাসবাদীদের’ এই নিধন মচ্ছবে মিডিয়াও ছিল। তারা তাদেরকে লস্করতৈয়বার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছিল। এ কারণেই স্কি মাস্ক আর একে৪৭ হাতে টিভিতে তাদের দেখা যাচ্ছিল আর মধ্যবিত্ত শ্রেণী তাদের রক্তের জন্য আক্ষরিক অর্থেই চিৎকার করছিল। এই সময়ে আমি পুরো বিষয়টি নিয়ে কয়েকটি প্রতিবেদন লিখেছিলাম। আমি যখন খনির বিষয়টি উল্লেখ করি, তখন টিভি অ্যাংকরেরা আমাকে খুঁজছিল, যেন আমি পাগল। পুরোপুরি বদমাস গেরিলা এবং ভালো খনি করপোরেশনের মধ্যে যোগসূত্র কি? আমি আমার ফিল্ড নোটস অন ডেমোক্র্যাসি গ্রন্থে বলেছিলাম, কিভাবে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এমন এক রায় দিয়েছিল যাতে বলা হয়েছিল, অসদাচরণের জন্য কোনো করপোরেশনকে সম্ভবত তুমি অভিযুক্ত করতে পারো না। অনেক কথার আড়ালে ওটাই বলা হয়েছিল।।

(চলবে)