Home » অর্থনীতি » ড. আকবর আলি খান এবং ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের প্রতিক্রিয়া

ড. আকবর আলি খান এবং ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের প্রতিক্রিয়া

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

money-1-পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকসহ দাতাদের অর্থ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাদের বুধবারএর কাছে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দুজন বিশিষ্টজন . আকবর আলি খান এবং ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তারা দুজনই বলেছেন, দুর্নীতির অভিযোগে দাতাদেও অর্থ প্রদান না করার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। তাছাড়া নিজস্ব উদ্যোগে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিয়েও তারা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, নিজস্ব উদ্যোগে পদ্মা সেতু নির্মাণের বক্তব্যটি রাজনৈতিক।

. আকবর আলি খান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

পদ্মা সেতুতে দাতাদের অর্থ না দেয়ার কারণে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হক্ষে। অবশ্যই যখন এ ধরনের অভিযোগ উঠে, তা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে একটি বিরূপ ধারণার সৃষ্টি করে। এই বিরূপ ধারণা যাতে সৃষ্টি না হয়, সে জন্য এই ক্ষেত্রে দুর্নীতির যে মামলা চালু হয়েছে, এটা অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে সরকারকে পরিচালনা করতে হবে এবং সবাইকে এটা বোঝাতে হবে যে, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এটা যদি না করা হয়, তাহলে পরে বর্হিবিশ্বে এমন ধারণার সৃষ্টি হবে যে, বাংলাদেশে দুর্নীতির মামলা আমলে নেয়া হয় না, আর আমলে নিলেও বিচার হয় না। কাজেই যে মামলাটি এখন দুর্নীতি দমন কমিশন শুরু করেছে তার সঠিক তদন্ত করে সুষ্ঠু পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, তাতে পদ্মা সেতু প্রকল্পের দাতারা অর্থ দিক বা না দিক। কারণ মনে রাখতে হবে, অপরাধ আর অর্থায়ন এক কথা নয়। অপরাধ হয়েছে, তা দুর্নীতি দমন কমিশন নিজেই আমলে নিয়েছে, কাজেই তাদের দায়িত্ব হবে মামলাটির ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া। এটা করা না হলে দেশের আইনকেও অগ্রাহ্য করা হবে, আর বিদেশে তো ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবেই।

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ হবে কি হবে না, সে সম্পর্কে তখনই বলা যাবে যখন পুরো প্রক্রিয়াটি স্পষ্টভাবে দেখা যাবে। আসলে, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং অর্থনীতির বাস্তবতার মধ্যে তফাৎ অনেক, ব্যবধান বিস্তর। কিভাবে অর্থায়ন হবে, কি নকশা হবে, কারা এগুলো করবে এ সব বিষয় এখনো পরিষ্কার নয়। তবে আমার মনে হয় না, খুব তাড়াতাড়ি কিছূ করা যাবে। আর তাড়াহুড়ো করলে নানা ভুলভ্রান্তি দেখা দিবেই।

. সালেহউদ্দিন আহমদ, সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংকসহ দাতা দেশগুলো অর্থ না দেয়ায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যথেষ্ট পরিমাণে ক্ষুন্ন হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এতে করে এই প্রকল্পের স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বা দুর্নীতি হয়েছে এমন সন্দেহটা থেকেই যাবে। আরা দাতা সংস্থা ও দেশগুলো এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবেই। বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকারের চেয়ে বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ দাতাদের অবস্থানের প্রতি বেশি আস্থা প্রকাশ পাবে। এটি আমাদের জন্য একটি নেতিবাচক ঘটনা হয়ে রইলো। বিশ্বব্যাংক প্রথমে অভিযোগ করেছিল যে, এই প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে এবং এতে তারা তদন্ত চেয়েছিল। এক্ষেত্রে সরকার ওই সময়ই তদন্ত করতে পারতো। তদন্ত করা বা কারো নাম এফআইআরএ থাকার অর্থ এই নয় যে, কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা হলো। কারণ মামলা ও বিচারের ক্ষেত্রে নানা প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু সরকার প্রথম থেকেই সৈয়দ আবুল হোসেনের নাম দেয়া যাবে না বলে নানাবিধ কর্মকাণ্ড এবং দরকষাকষি করছিল। কিন্তু প্রথমেই যদি সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের চিহ্নিত করা হতো, তাহলে এখনকার এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। পদ্মা সেতু প্রকল্পটির এমন পরিণতি কাম্য ছিল না। সরকার পুরো পরিস্থিতিকে একদিকে যেমন সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেনি, তেমনি অন্যদিকে, পুরো বিষয়টিকে একটি ধোয়াটে অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়া হয়।

এখন আরেকটি সমস্যা দেখা দেবে, প্রকল্প ভালো হলেও নানা সন্দেহের উদ্রেক হবে, এমন একটা ভাবমূর্তি বা ইমেজ সংকটের সৃষ্টি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে।

ভারতেও একটি স্বাস্থ্য প্রকল্প নিয়ে বিশ্বব্যাংক প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। ওই প্রকল্প বাতিলের পরে ভারত সরকার পুনরায় বিশ্বব্যাংককে জানালো যে, কি কি অভিযোগ আছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে, তদন্ত শেষে ব্যবস্থা নেয়া হবে। পরে প্রকল্পটি পুনরায় আবার চালু হলো। কিন্তু বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের বড় শর্তটি পালন করলো না। এখন বাংলাদেশ আবার বলছে, আমরা ঋণ চাই না। এটা হয়েছে তখনই, যখন সরকার বুঝে ফেলেছে যে, বিশ্বব্যাংক ঋণ দেবে না।

নিজস্ব অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন অত্যন্ত সমস্যাসংকুল একটি বিষয়। দেশীয় মুদ্রায় হয়তো কিছুটা সম্পদ আহরণ করা যাবে, কিন্তু এতে অর্থনীতির উপরে প্রচণ্ড চাপ পড়বে। কারণ আমাদের বিনিয়োগ, সঞ্চয় অনেক কম। এমন একটি প্রকল্পের জন্য সম্পদ আহরণ খুবই কঠিন কাজ। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে, নানা অর্থনৈতিক সমস্যায় তারা জর্জরিত। কাজেই স্বাভাবিক ভাবেই সঞ্চয়ের হারও কমে গেছে। তাছাড়া সরকার যদি মনে করে যে, অন্য যে সব প্রকল্পগুলো রয়েছে তা থেকে অর্থ কাটছাট করে অর্থ সংস্থান করা হবে, কিন্তু এতে মূল সেতুর নির্মাণ কাজের কিছূই হবে না। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, শুধু পদ্মা সেতুই আমাদের একমাত্র প্রকল্প নয়, অন্যান্য নানা প্রকল্প রয়েছে। এছাড়া যদি পদ্মা সেতুর কারণে সরকার রাজস্ব বাড়াতে চায় তবে তার প্রতিক্রিয়াও হবে নানাবিধ।

বন্ড ছাড়াও কোন কার্যকর উপায় নয়। স্পেন, ইতালিতেও এই বন্ড কার্যকরি হয়নি। পদ্মায় বিরাট একটি অংশ ব্যয় হবে বৈদেশিক মুদ্রায়। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যয়ের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু রিজার্ভ কখনই প্রকল্প প্রণয়নের জন্য নয়, ব্যাপারটা দুরূহ। সরকার ইচ্ছা করলে জোর করে করতে পারে, কিন্তু এটা যুক্তিসঙ্গত হবে না।

সব শেষে বলা প্রয়োজন যে, পদ্মা সেতু প্রকল্পটি যে রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে তা স্পষ্ট। সরকারি দল আর বিরোধী দল নানামুখী কথাবার্তা বলছে। সরকারের হাতে এখন যে সময় আছে তাতে যদি নামফলক দেয়া হয়, তাও হবে এক অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত।।