Home » অর্থনীতি » দেশে-বিদেশে কঠিন সংকটে সরকার

দেশে-বিদেশে কঠিন সংকটে সরকার

আমীর খসরু

govt-logo-1দেশে বিদেশে সাম্প্রতিক সময়ে নানা কারণে কঠিন সঙ্কটের মুখে পড়েছে ক্ষমতাসীন সরকার। সঙ্গে সঙ্গে সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে দেশের জন্যও। পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকসহ দাতাদের সঙ্গে সম্পর্কের চরম অবনতি যেমন ঘটেছে, তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বহু প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে বর্তমান সরকারের সম্পর্ক তেমন ভালো যাচ্ছে না। এছাড়া হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ প্রভাবশালী মানবাধিকার সংগঠনগুলো ‘বাংলাদেশে মারাত্মক পর্যায়ে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে’ বলে প্রবল চাপ অব্যাহত রয়েছে। এর উপরে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট তো রয়েছেই।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পদ্মা সেতুর নির্মাণ ক্ষমতাসীনদের প্রতিশ্রুতির অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল। যথারীতি প্রকল্প কাজ শুরু হয়। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাপানি উন্নয়ন সংস্থা জাইকা, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ২৯০ কোটি ডলারের এই প্রকল্পে অর্থায়নে রাজি হয়। এর মধ্যে শুধু বিশ্বব্যাংকেরই ১২০ কোটি ডলার দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাঝ পথে গিয়ে পরামর্শক নিয়োগসহ প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করে বিশ্বব্যাংক। এর পর থেকে সরকার প্রধান শেখ হাসিনাসহ তার মন্ত্রী এবং প্রভাবশালীরা বলতে শুরু করলেন, কারো অর্থায়নের প্রয়োজন নেই, তারা নিজ উদ্যোগেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করবেন। এক পর্যায়ে এ নিয়ে সারাদেশে ব্যাপক চাঁদাবাজিও শুরু হয়। পরে অর্থমন্ত্রী আবার বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আপস মীমাংসার চেষ্টা করেন। এর পর থেকে সরকার নানা পথে বিকল্প অর্থায়নের চেষ্টা চালায়। এক পর্যায়ে মালয়েশিয়ার সঙ্গে পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে আলোচনা কিছু দূর এগিয়েও ছিল। এই প্রচেষ্টা বেশি দূর আর আগায়নি। নানাবিধ চেষ্টা অব্যাহত রাখার পরে বাংলাদেশ আবারও বিশ্বব্যাংকের কাছে ধরনা দিতে থাকে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে অনঢ় অবস্থান গ্রহণ করে। প্রথমে বাংলাদেশ সরকার এবং এর দুর্নীতি দমন কমিশন পদ্মা সেতুতে কোনো দুর্নীতি হয়নি বললেও ক্রমশ তার অবস্থান থেকে সরতে থাকে। অর্থাৎ দুর্নীতি যে হয়েছে তা প্রকারান্তরে স্বীকার করতে বাধ্য হয়। পানি ঘোলা করার যে সব উদ্যোগ ও চেষ্টা তা সবই করেছিল সরকার। এক পর্যায়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আবার কখনো ড. ইউনূসের উপরও দোষ চাপানো হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের কঠোর অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও সৈয়দ আবুল হোসেনকে নিয়ে সরকার, বিশ্বব্যাংকের প্রবল চাপের পরেও, অনঢ় অবস্থান গ্রহণ করে। তাহলে এই প্রশ্নটি জরুরি যে, সৈয়দ আবুল হোসেনকে বাঁচানোর এ প্রচেষ্টা কেন? আবুল হোসেন রোববার সংবাদ পত্রের প্রথম পাতার আধাটা জুড়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে নিজেকে সৎ, স্বচ্ছ, নির্দোষ, নিরাপরাধ দাবি করলেন। কিন্তু তাকে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় জড়ালে তো তিনি এই সব বক্তব্য দিতে পারতেন এবং তার বক্তব্য যদি সঠিক হয়, তাহলে নির্দোষ প্রমাণিত হতেন। সরকারের পক্ষ থেকে কি এমন ভয় ছিল যে, আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা দিলে ‘কেঁচো খুড়তে সাপ’ বেরিয়ে যাবে? তাহলে কি আবুল হোসেনের চাইতেও বড় কেউ এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত? সব মিলিয়ে, বিশ্বব্যাংকসহ দাতা দেশগুলো তাদের অর্থায়ন বন্ধ করার মধ্যদিয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্প যতোটা না ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার তার চেয়েও অনেক গুণে বেশি এবং চরম ক্ষতি করেছে দেশের এবং দেশের মানুষের। এই ক্ষতিটি হচ্ছে বর্হিবিশ্বে দেশের ইমেজ এবং ভাবমূর্তির। দেশের ভাবমূর্তিও এতো বড় সর্বনাশ অতীতে আর কেউ করেছে বলে মনে হয় না। বিশ্বব্যাংকসহ প্রধান প্রধান দাতা সংস্থা এবং দেশগুলোর খাতায় বাংলাদেশ এখন ‘চরম দুর্নীতির’ একটি দেশ হিসেবেই গণ্য হবে।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করতে পারার যে ক্ষতি তা তো ক্ষমতাসীনদের হয়েছেই, এখন এই ক্ষতি পোষানোর নানাবিধ কৌশল, অপকৌশল বাস্তবায়ন চলছে। প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, যোগাযোগমন্ত্রীসহ সবাই আবার একযোগে গাইতে শুরু করেছেন, নিজস্ব অর্থায়নেই এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, দুই মাসের মধ্যেই এই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। যেখানে একটি দোতলা ভবন নির্মাণও এক বছরের মধ্যে সম্ভব হয় না, সেখানে পদ্মা সেতু সরকারের বাকি কয়েক মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা বলা রাজনৈতিক ভেল্কিবাজী ছাড়া আর কিছুই নয়। বড়জোর ঘটা করে একটি নামফলক তারা স্থাপন করতে পারবেন। এই নামফলকের মধ্যেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটি প্রমাণিত হবে।

সরকার রাশিয়া থেকে যে একশ কোটি ডলারের অস্ত্র ক্রয়ের চূড়ান্ত চুক্তি করেছে ,তার ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়েও অস্বচ্ছতার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞগণ। অস্বচ্ছতার বিষয়টিই যে প্রধান হিসেবে এসেছে তা নয়, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে যাদের সঙ্গে সামরিক সরঞ্জামাদি ক্রয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেই চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান সরকার পররাষ্ট্রনীতির দিক দিয়ে এমনিতেই ভারতমুখী। এখন প্রশ্ন উঠছে, তাহলে বাংলাদেশ কি আন্তর্জাতিক রাজনীতির অক্ষ বা এক্সিস পরিবর্তন করছে? এ সব নানা প্রশ্নের জন্ম নিচ্ছে, বর্হিবিশ্বের সঙ্গে নানা কারণে সম্পর্কের শীতলতা চলার কারণে। সম্পর্কের শীতলতা চলছে মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক দেশের সঙ্গে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গন বাদ দিলেও দেশের মধ্যেও সরকার নানাবিধ সংকটের মধ্যে রয়েছে। ছাত্রলীগ এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের খুন, চাঁদাবাজিসহ নানা সংকট তো রয়েছেই। পুলিশসহ যাবতীয় সংস্থাগুলোকে বিরোধী দল, পক্ষ এবং ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া হয়েছে। গুম, খুন, তথাকথিত ক্রসফায়ার নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বার বার প্রশ্ন উত্থাপন করছে। তথ্যমন্ত্রী চার বছরের সাফল্যের সংবাদ সম্মেলনে তো বলেই ফেললেন, পদ্মা এবং ছাত্রলীগ সরকারের সাফল্যেকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে।

রাজপথে সংঘাত ক্রমশই বাড়ছে। বাড়ছে ক্ষমতাসীন এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মধ্যেকার সাংর্ঘষিক পরিস্থিতি। এ সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এমন দৃঢ় অবস্থানে সরকার অনঢ় রয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, এর মহাজোট এবং তাদের বুদ্ধিজীবীদের অনেকে সংলাপের পক্ষে কথা বললেও, সরকার প্রধান কোনো ধরনের সংলাপের পক্ষপাতি নন। অথচ দেশীবিদেশী সবাই বলছেন, সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সংলাপের বিপক্ষে নির্যাতন, নিপীড়ন, নিধনযজ্ঞকে পথ হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে, যা সংঘাতকে বহুমাত্রায় বাড়িয়ে দেবে। এ সংঘাত আগামী মাসগুলোতে আরো বাড়বে বলেই শংকিত দেশের আপামর জনসাধারণ। এমন রাজনৈতিক সংকট সাম্প্রতিককালে আর দেখা যায়নি। রাজপথেই যদি এই সমস্যার সমাধানের শেষ পন্থা হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়, তবে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। সংকট সমাধানের রাজনৈতিক পথ যদি খোলা না থাকে, তাহলে বিকল্প কি হবে সে প্রশ্নটিও এখন মানুষের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু সরকারের এদিকে দৃষ্টি নেই।

কাজেই আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ দিক দিয়ে সরকার এখন কঠিন এক সংকটের মুখে পড়েছে। যতদিন যাচ্ছে সরকার ততোই একা হয়ে পড়ছে।।