Home » অর্থনীতি » দেশ কোন পথে?

দেশ কোন পথে?

হায়দার আকবর খান রনো

crossfire-1-বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের একটা মুদ্রাদোষ দাঁড়িয়েছে যে, জনগণের যে কোন দাবি নিয়ে আন্দোলনকেই তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে নস্যাৎ করার প্রচেষ্টা বলে আখ্যায়িত করে। আসলে যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ কতো অমনোযোগী ও ননসিরিয়াস। অতো সিরিয়াস হলে তারা তো ১৯৯৬২০০১ এই মেয়াদকালেও বিচার শুরু করতে পারতো, করেনি। বরং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করেছিল। যুদ্ধাপরাধীর বিচার ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যেও সম্পন্ন হয়নি।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করে জামায়াতকে সামাজিক স্বীকৃতি দিয়েছিল। ২০০১ সালে বিএনপি জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে মন্ত্রিসভা পর্যন্ত গঠন করলো। ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ জামায়াতের মতোই আরেকটি প্রতিক্রিযাশীল মৌলবাদী দলের সঙ্গে যে পাঁচ দফা চুক্তি করেছিল তা ছিল, এ যাবতকালের সকল গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার সম্পুর্ণ বিপরীতে চরম প্রতিক্রিয়াশীল কর্মসূচি। উভয় দলই কমবেশি মৌলবাদের সঙ্গে আপোস করছে।

সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ৫ম সংশোধনী বাতিল হয়ে গিয়েছিল। সংবিধান ৪র্থ সংশোধনীর পূর্বাবস্থায ফিরে গিয়েছিল। ’৭২এর সংবিধানের ৩৮ ধারা মতে, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ছিল। জিয়াউর রহমান ৫ম সংশোধনী দ্বারা একদিকে চতুর্থ সংশোধনী অর্থাৎ একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা বাতিল করে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, অপরদিকে, সংবিধান থেকে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা কথা দুটো কেটে দিয়ে এবং ৩৮ ধারা বাতিল করে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ৫ম সংশোধনী যখন বাতিল হয়ে গেল, তখন আপনা থেকেই ’৭২এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলো। ৩৮ ধারাও ফিরে এলো। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বললেন যে, ‘জামায়াত এখন আইনত নিষিদ্ধ দল।’ কিন্তু বাস্তবে জামায়াত নিষিদ্ধ হয়নি। এখানেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জামায়াতের সঙ্গে আপোস করলেন, যদিও জামায়াতের প্রধান নেতারা এখন জেলে।

আওয়ামী লীগ জামায়াতকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে না। কারণ আওয়ামী লীগ কোন আদর্শভিত্তিক দল নয়। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। বিএনপি থেকে জামায়াতকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যা ভোটের রাজনীতির লাভজনক হবে বলে তারা মনে করেন।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সুযোগ শেখ হাসিনা গ্রহণ করলেন না। তিনি পঞ্চাদশ সংশোধনী আনলেন। এই সংশোধনী দ্বারা তিনি জামায়াতকে আবার আইনসিদ্ধ দলে পরিণত করলেন। এরশাদ যে সংশোধনী দ্বারা ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম বানিয়েছিলেন, সেটাও বহাল রাখা হলো। জিয়া প্রবর্তিত ‘বিসমিল্লাহ’ অপরিবর্তিত থাকলো। অর্থাৎ শেখ হাসিনা আবারও মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক ধারণার সঙ্গে আপোস করলেন। পাক হানাদার বাহিনীর সহযোগী নিষিদ্ধ জামায়াতকে একবার আইনি করলেন জিয়াউর রহমান, দ্বিতীয়বার তাকে আইনি পোশাক পরালেন শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুটি ঘৃণ্য রাজনৈতিক অপশক্তি আছে। যদিও তারা কিন্তু ভোট পায় এবং সে ভোট অনেক নিষ্ঠাবান রাজনৈতিক দল এবং বামদলের চেয়ে বেশি। তবু তাদের রাজনীতি করার অধিকার থাকতে পারে না। ঠিক যে কারণে জার্মানিতে নাৎসী পার্টির রাজনৈতিক অধিকার নেই, সেই একই কারণে জামায়াতের কোন অধিকার থাকতে পারে না। নাৎসীদের এখনও কিন্তু বেশ সমর্থক আছে। তবু বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নাৎসী পার্টি জার্মানিতে বৈধতা পায় না এবং সেটাই গণতান্ত্রিক। একই ভাবে, জামায়াতও বৈধতা পেতে পারে না। কিন্তু আওযামী লীগ সেই অবস্থান নিতে রাজি নয়। অন্যদিকে, বিএনপি তো জামায়াতকে নিয়ে ঘর করছে। সাধারণের ভাষায় জামায়াতকে বলা হয় রাজাকার, আর এরশাদের দলকে বলা হয় স্বৈরাচার। দুই বড় শাসক বুর্জোয়া দলের একজনের কাঁধে ভর করেছে রাজাকার, আরেকজনের কাঁধে স্বৈরাচার। নীতি নৈতিকতা সততা, আদর্শবোধ, দেশপ্রেম কোনকিছূরই বালাই নেই, এই দুই দলের। দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের যে, এখনও এই দুইয়ের কোন দৃশ্যমাণ শক্তিশালী রাজনৈতিক তৃতীয় শক্তি নাই। যদিও সেটাই অধিকাংশ মানুষের কাম্য।

গণতন্ত্র না ফ্যাসিবাদ

১৫তম সংশোধনীর একটি দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এই সংশোধনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। তাহলো ১৯৯৬ সাল থেকে চলে আসা নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অক্ষসান। এই সংশোধনী নতুন করে রাজনৈতিক সঙ্কটের জন্ম দিয়েছে। ১৫তম সংশোধনীর আরও একটি দিক আলোচনায আনা আবশ্যক।

১৫তম সংশোধণীর পরবর্তী সংবিধানের ৭ () এর ৭ () উপধারার প্রতি দৃষ্টিপাত করার জন্য পাঠককে অনুরোধ করবো। এই ধারা বলে সংবিধানের প্রায় অর্ধশত ধারা উপধারাকে চিরস্থায়ীভাবে অপরিবর্তনীয় করা হয়েছে। এ যেন বাকশালী ব্যবস্থারই একটু ভিন্ন সংস্করণ। এই অপরিবর্তনীয় ধারাসমূহের মধ্যে ‘ইসলাম রাষ্ট্র ধর্মের’ ধারাটিও আছে। বর্তমানের সংবিধান মতে, সংসদের সকল সদস্য চাইলেও, এমনকি গণভোটের দ্বারাও ঐ সকল ধারা বাতিল, সংশোধন, পরিবর্তন করা যাবে না। অবশ্য জনগণ চাইলে যে সবকিছুই সম্ভব এ কথা ১৫তম সংশোধনীর প্রণেতাদের ধারণার মধ্যে নেই। আরও বলা আছে যে, ঐ সকল ধারা পরিবর্তনের চেষ্টা করা হলে, এমনকি মৌখিকভাবে বিরোধিতা করা হলেও তা হবে রাষ্ট্রদ্রোহিতা। একমাত্র ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের সংবিধানই এই রকম হতে পারে। বস্তুত এটি ফ্যাসিবাদি প্রবণতারই একটি চিহ্ন বহন করছে।

সরকারের অন্যান্য আচরণেও ফ্যাসিবাদি প্রবণতা খুবই স্পষ্ট। গুপ্ত হত্যা ও প্রকাশ্যে হত্যা, গুম ইত্যাদি ফ্যাসিবাদেরই লক্ষণ। বিগত বিএনপি আমলে শুরু হয়েছিল ক্লিনহার্ট অপারেশন। পুলিশ হেফাজতে নিয়ে নির্যাতন ও হত্যা সম্পর্কে বলা হতো হার্টফেলে মারা গেছে। সম্ভবত সেই কারণেই ক্লিনহার্ট অপারেশন নামটি প্রাসঙ্গিকই ছিল।

বর্তমান আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট আমলে চলছে ক্রসফায়ার। দুই পক্ষের গোলাগুলির মাঝে কোন তৃতীয় ব্যক্তি দুর্ঘটনাক্রমে মারা গেলে, তাকে বলা হয় ক্রসফাযার। আসলে সরকার কোন ব্যক্তিকে যখন গ্রেফতার করে ঠান্ডা মাথায় খুন করে ক্রসফায়ার বলে চালিয়ে দেয, তখন এটাকে বলা উচিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচার। এটাই হয়ে আসছে। শুধু এখন নয়, ১৯৭২৭৩ সাল থেকেই। গ্রেফতার করে বিনা বিচারে হত্যার যে কৌশল তা হচ্ছে, হিটলার মুসোলিনীয় কৌশল। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের নেতা ও পরবর্তীতে সমাজতান্ত্রিক বুলগেরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা দিমিএভ একবার বলেছিলেন, ‘কমবেশি সকল পুজিবাদী দেশেই ফ্যাসিবাদ রয়েছে।’ একথা বাংলাদেশ প্রসঙ্গে খুব বেশি করে খাটে এবং তা স্বাধীনতা পরবর্তী সকল আমল প্রসঙ্গেই প্রযোজ্য।

একবার একটি ক্রসফায়ারের ঘটনার বিরুদ্ধে হাইকোর্টের এক বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে (সুয়োমোটো) মামলা করেছিল এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নোটিশ প্রদান পর্যন্ত করেছিল। সম্ভবত সরকার বিব্রতবোধ করেছিল। এটা বর্তমান আমলের ঘটনা। ঐ মামলা আর অগ্রসর হলো না।

র‌্যাবপুলিশ যে ভাড়াটিয়া খূনে বাহিনীতে পরিণত হয়েছে তারও অনেক দৃষ্টান্ত আছে। সর্বোপরি ছাত্রলীগ নামক সরকারদলীয় সংগঠন যে পূর্বের সংগ্রামী অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক চরিত্র হারিযে সন্ত্রাস, জবরদস্তি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিতে পরিণত হয়েছে এবং তার ফলে শুধু যে বাইরের লোক খুন হচ্ছে তাই নয়, টাকাপয়সার ভাগবাটোয়ারা ও ঠিকাদারী ব্যবসার দ্বন্দ্ব নিয়ে ছাত্রনামধারী ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যেকার কোন্দলে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হচ্ছে অনেক তরুণ। এক পক্ষ অপর পক্ষকে আবাসিক হলের তিনতলা, চার তলা ছাদ থেকে ফেলে দিচ্ছে। এক ভয়াবহ পরিস্থিতি।

পাঠকের হয়তো মনে আছে, ১৯৯৬২০০১ সালে শেখ হাসিনার প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলে মানিক নামে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা তার শততম ধর্ষণের ঘটনাটি ঘটা করে উদযাপন করেছিল। এই রকম পরিস্থিতি এখনো চলছে।

এখন আবার ক্রসফাযার অথবা প্রকাশ্যে খুনের বদলে শুরু হয়েছে গুম। ইলিয়াস আলীর গুম হবার ঘটনাই একমাত্র ঘটনা নয। সাংবাদিক দম্পতির খুন হবার ঘটনা এখনও রহস্যাবৃত্ত রয়ে গেছে। এই সবই ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের সাধারণ চিত্র।

ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে ১৯২৮ সালে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের এক প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, ‘ওদের চরিত্রগত লক্ষণ হলো বাগাড়ম্বর, নীতিহীনতা এবং সন্ত্রাসের সমন্বয়।’

বর্তমান সরকারের বাড়াম্বর হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলা। অথচ ধর্মনিরপেক্ষতা ক্ষুন্ন করে এবং সমাজতন্ত্রকে বাতিল করে বর্তমান সরকার নিজেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচারের দুই একটি মাত্র দৃষ্টান্ত ইতিপূর্বে দেয়া হয়েছে। আরেকটি সাম্প্রতিক উদহারণ দেয়া যাক। গত ১৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জোরের সঙ্গে বললেন, ‘এক হিন্দু ছেলে বিশ্বজিৎ তাকে কুপিয়ে হত্যা করলো কে?’ ‘হিন্দু ছেলে’ কথাটি বিশেষভাবে উচ্চারণ করে তিনি হত্যাকাণ্ডের জন্য বিএনপিজামায়াতকে দায়ী করতেই চেয়েছিলেন, যা ছিল সত্যের অপলাপ। মিডিযায় প্রচার ও ছবি দ্বারা একথা আর কোনভাবেই গোপন করা গেল না, আসলে কে হত্যা করেছে বিশ্বজিতকে। হত্যাকারী আর কেউ নয়। হত্যাকারী হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর প্রিয় সংগঠন ছাত্রলীগের স্থানীয় মাস্তান। বাগাড়ম্বও, মিথ্যাভাষণ ও সন্ত্রাস তিনটি মিলিয়ে যে ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য, তা পুরোমাত্রায় বর্তমানে রয়েছে। নির্বাচিত সরকারের মানেই গণতান্ত্রিক সরকার নয়। আর পাঁচ বছর পর পর নির্বাচন হলেই দেশটি গণতান্ত্রিক হয়ে যায় না।।

(চলবে)