Home » অর্থনীতি » পদ্মা এখন একটি রাজনৈতিক সেতুর নাম

পদ্মা এখন একটি রাজনৈতিক সেতুর নাম

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

padma bridge-1এখন আর দুই পক্ষ নেই। বাংলাদেশ বেছে নিয়েছে এক পক্ষ। আর সেটা হল নিজেদের উদ্যোগে পদ্মা সেতু নির্মাণ। কিভাবে করবে তা পরিস্কার করে বলেনি সরকার। কারণ, সম্ভবত সরকার নিজেই জানে না।

এটা ঠিক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজস্ব উদ্যোগে পদ্মা সেতু নির্মাণ কখনোই চাননি, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আলোচনা চালিয়ে গেছেন। এ কারণে দেশীয় উদ্যোগ নিয়ে সরকারের পদ্মা সেতু নিয়ে ভাল কোনো আলোচনা বা বিশ্লেষণ সরকারের কাছে নেই। কিন্তু এখন আর বিকল্প নেই। কারণ বিশ্বব্যাংককে না করে দেওয়ার পর পদ্মা এখন রাজনৈতিক সেতুতে পরিণত হয়েছে।

দেশীয় অর্থে পদ্মা সেতু তৈরির একটা জোরালো মত আছে বাংলাদেশে। এর স্বপক্ষে একটি শক্তিশালী দলও আছে। তারা বিভিন্ন সময়ে বলার চেষ্টা করেছে যে, দাতারা সহায়তা না দিলেও সমস্যা নেই। নিজেদের অর্থেই একটা কেন, একাধিক পদ্মা সেতু করা যাবে। সরকার পক্ষের অনেকেই নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু তৈরির কথা বলা শুরু করেছিল ২০১২ সালের জুলাই থেকে।

তবে সমস্যা টাকার না, সমস্যা ডলারের। পদ্মা সেতু করতে ডলার লাগে, টাকা দিয়ে অন্তত পদ্মা সেতু হবে না। পদ্মা সেতু তৈরি করতে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থে প্রয়োজন হবে। এর প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই ব্যয় হবে বৈদেশিক মুদ্রায়। ফলে পুরোপুরি দেশের অর্থে পদ্মা সেতু করলে অর্থনীতির উপর দায় অনেকটাই বাড়বে।

দেশীয় অর্থে একটি কেন, একাধিক পদ্মা সেতু করা সম্ভব। তবে তা উচিত কিনা সেই প্রশ্নটিই মুখ্য। সরকারও পদ্মা সেতুর অর্থায়নের জন্য একাধিক বিকল্পের কথা ভেবেছিল। এর মধ্যে ছিল, বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বা রিজার্ভ থেকে অর্থ নেওয়া, সার্বভৌম বা সভারিন বন্ড এবং প্রবাসীদের জন্য বন্ড ছাড়া। এরমধ্যে সার্বভৌম বন্ডই বেশি সমর্থন পায়। যদিও বাংলাদেশ এর আগে কখনো সার্বভৌম বন্ড ছাড়েনি।

প্রায় একই ধরনের অর্থনীতির মধ্যে শ্রীলংকা প্রথম সভারিন বন্ড ছাড়ে ২০০৭ সালে। ৫ বছর মেয়াদি ওই বন্ডের মাধ্যমে দেশটি সংগ্রহ করেছিল ৫০ কোটি ডলার। এর জন্য সুদ দিতে হয়েছে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ। যখন বন্ড ছাড়ে তখন শ্রীলংকার ঋণমান (ক্রেডিট রেটিং) ছিল ‘বি প্লাস পজিটিভ আউটলুক’। তবে স্টান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস (এস অ্যান্ড পি) সম্প্রতি ঋণমান এক ধাপ কমিয়ে ‘বি প্লাস স্টাবল আউটলুক’ করেছে।

বাংলাদেশের ঋণমান এখন ‘বিবি মাইনাস, স্টাবল আউটলুক’। অর্থাৎ ঋণমানে বাংলাদেশের অবস্থান শ্রীলংকার তুলনায় খারাপ। এ অবস্থায় সভারিন বন্ড ছাড়তে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই বেশি হারে সুদ দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১২ সালের জুলাই মাসে সংসদে বলেছিলেন, ৭৫ কোটি ডলার সংগ্রহে বন্ড ছাড়া হবে। বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৫ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদ যদি ৮ শতাংশ হয় তাহলে প্রতি বছর পরিশোধ করতে হবে ১৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। বন্ড ৭ বছর মেয়াদি করা হলে পরিশোধ করতে হবে ১৪ কোটি ৪০ ডলার। তবে সুদ ১০ শতাংশ হলে পাঁচ বছর মেয়াদের ক্ষেত্রে পরিশোধ করতে হবে প্রতিবছর প্রায় ২০ কোটি ডলার এবং ৭ বছরের ক্ষেত্রে সাড়ে ১৫ কোটি ডলার।

তবে মাত্র ৭৫ কোটি ডলারের বন্ড ছেড়ে পদ্মা সেতু করা যাবে না। এ জন্য কম করে হলেও ২শ কোটি ডলার লাগবে। যদি সরকার বন্ড ছেড়ে ১৮০ কোটি ডলার (এই পরিমাণ অর্থ বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবি দেওয়ার কথা) সংগ্রহ করে তাহলে প্রতি বছর ৪৫ কোটি ডলার থেকে ৪৮ কোটি ডলার পর্যন্ত অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কখনো ব্যর্থ হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ মূলত সহজ শর্তে ঋণ নিয়েছে। এর জন্য সামান্য হারে সার্ভিস চার্জ দিতে হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশকে বৈদেশিক ঋণ বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৭৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার। ২০১২ সালে তা ৭৫ কোটি ডলার হয়েছে। সার্বভৌম বন্ড ছাড়লে এই দায় ১শ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। সুতরাং বাংলাদেশকে এসময় অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে হবে। তা না হলে বড় ধরনের সংকটে পড়তে হবে দেশকে।

২০০৪ সালে ভারতে সেসময়ের অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) কাছে মাত্র ৫ বিলিয়ন ডলার চেয়েছিলেন। কারণ সে সময়ে রিজার্ভ কেবলই বেড়ে যাচ্ছিল। অথচ দেশের ভেতরকার অবকাঠামো তৈরির পর্যাপ্ত তহবিল ছিল না। ওই সময়ে ভারতের রিজার্ভ ছিল ২১২ বিলিয়ন ডলার। এ নিয়ে ৩ বছর ধরে দীর্ঘ আলোচনা হয়। আরবিআই শেষ পর্যন্ত রিজার্ভ ভেঙে কোনো ডলার সরকারকে দেয়নি। যুক্তি ছিল, রিজার্ভ কেবল আমদানি অর্থায়নের জন্য। দেশের ভেতরে এভাবে অর্থ খরচ করলে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতির উপর চাপ তৈরি হবে। আবার বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলে আমদানি অর্থায়ন নিয়ে সংকট বাড়বে। এখন ভারতের বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, আরবিআইর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। মূলত কোনো দেশই রিজার্ভ ভেঙে অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনে কোনো সময়েই অর্থ খরচ করে না।

পদ্মা সেতু নির্মাণে বাংলাদেশেও মজুদ থেকে অর্থ দেওয়ার কথা আলোচনা হচ্ছে। অথচ রিজার্ভ কমে যাওয়ায় অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে পড়েছিল ২০১১ সালেই। ওই বছরের জানুয়ারি মাসে প্রায় ১১ বিলিয়ন বা ১১শ’ কোটি ডলার থেকে বাংলাদেশের রিজার্ভ নেমে এসেছিল সাড়ে নয়শো’ কোটি ডলারে। তাতে ডলারের দর ৭১ টাকা থেকে লাফ দিয়েছিল ৮৬ টাকায়। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তেল আমদানির ব্যয় বাড়ায় রিজার্ভের উপর টান পড়ে। ফলে সরকারকে তেল আমদানি কমিয়ে দিতে হয়েছিল। এ অবস্থায় রিজার্ভ থেকে অর্থ নেওয়া হলে সেই চাপ সামলানো যাবে কিনা সে প্রশ্নও রয়েছে। মূলত, লেনদেনের এই চাপ সামলাতেই অর্থমন্ত্রী বাধ্য হয়ে সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে এসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে প্রায় ১০০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছেন। এজন্য জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি এবং মুদ্রা সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার মতো শর্ত মানতে হচ্ছে।

১৯৯৮ সালে পারমাণবিক পরীক্ষা চালানোর জন্য অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় বিপাকে পড়েছিল ভারত। রিজার্ভ নেমে হয়েছিল মাত্র ২৯ বিলিয়ন ডলার। পরিস্থিতি সামলাতে প্রবাসীদের জন্য ‘রিসারজেন্ট ইন্ডিয়া’ নামে একটি বন্ড ছেড়েছিল দেশটি। এজন্য ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। নিষেধাজ্ঞার বিপক্ষে দেশের পারমাণবিক শক্তি অর্জন নিয়ে দেশের পক্ষে এক ধরনের জাতীয়তাবাদী চেতনা উদ্বুদ্ধ করা হয়। ফলে তুলনামূলক স্বল্প সুদে চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণ অর্থ পায় ভারত। সেবার ৪২০ কোটি ডলার এবং ২০০০ সালে ‘ইন্ডিয়া মিলেনিয়াম ডিপোজিটস’ নামের আরেক বন্ডের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয় ৫২০ কোটি ডলার।

ভারত তিনভাবে এই অর্থ ব্যয় করেছিল। যেমন, এর ৪০ শতাংশ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা হয়। ৫০ শতাংশ দেওয়া হয় ব্যাংকগুলোকে, যারা সম্পদ আহরণ ও সমাবেশ ঘটায় এবং বাকি মাত্র ১০ শতাংশ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা হয়।

বাংলাদেশেও প্রবাসীদের জন্য এখন তিন ধরনের বন্ড চালু আছে। যেমন, প্রিমিয়াম, ইনভেস্টমেন্ট এবং ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ড। এসব বন্ড থেকে খুব সামান্য অর্থই সংগ্রহ করা হয়। ২০১০ সালে সংগ্রহ হয়েছিল ৯৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা, আর ২০১১ সালে এর চেয়ে সামান্য বেশি। অর্থাৎ মাত্র ১৩ কোটি ডলার। এ দিয়ে পদ্মা সেতুর সামান্যই নির্মাণ করা যাবে। তবে ভারতের মতো করে ব্যাপক প্রচার এবং দেশপ্রেমের চেতনা ছড়িয়ে দিতে পারলে প্রবাসীরা এগিয়ে আসতে পারেন বলেও অনেকে মনে করেন।

পদ্মা সেতুর জন্য বিশ্বব্যাংকের প্রতিশ্রুতি ছিল ১২০ কোটি ডলার, এডিবির ৬০ কোটি ডলার, জাপানের জাইকার ৪১ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং আইডিবির দেওয়ার কথা ১৪ কোটি ডলার। এসব ঋণের সুদের হার কম। বিশ্বব্যাংকের শর্ত ছিল এর জন্য বাংলাদেশকে সার্ভিস চার্জ দিতে হবে দশমিক ৭৫ শতাংশ। প্রথম ১০ বছর কোনো অর্থ পরিশোধ করতে হবে না। নিয়ম হচ্ছে ১১ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত সময়ে মোট নেওয়া ঋণের ২ শতাংশ হারে পরিশোধ করতে হয়, পরবর্তী ২০ বছরে দিতে হবে ৪ শতাংশ হারে। এই হিসেবে ১১ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত সময়ে প্রতিবছর পরিশোধ করতে হতো, ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এর মধ্যে মূল ঋণ ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার এবং সার্ভিস চার্জ ৯০ লাখ ডলার। পরবর্তী বছরগুলোতে দিতে হবে ৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এরমধ্যে মূল ঋণ ৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং সার্ভিস চার্জ ৯০ লাখ ডলার। সবমিলিয়ে মোট সার্ভিস চার্জ দিতে হবে ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

এর বাইরে রয়েছে মালয়েশিয়ার প্রস্তাব। এমনকি চীন ও ভারতের কথাও বলা হচ্ছে। তবে প্রস্তাবগুলো কি এবং অর্থ কোথা থেকে আসবে তা পরিস্কার নয়। একমাত্র মালয়েশিয়া দুবাই থেকে অর্থ সংগ্রহরের কথা বলেছিল। সমালোচনা হচ্ছে, দুবাইয়ে পাচার করা অর্থই সাদা করার পদ্ধতি এটি। তবে এ ধরণের বাণিজ্যিক প্রস্তাব অর্থনীতির উপর দায় আরও বাড়াবে। কেননা, এই সেতু থেকে আয় হবে দেশীয় মুদ্রায়, কিন্তু দায় পরিশোধ করতে হবে ডলারে।

তবে সবচেয়ে বড় সংকট যেটি তৈরি হলো সেটি হচ্ছে ভাবমূর্তি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার একটি দেশের তালিকায় চলে গেল বাংলাদেশের নাম। উদাহরণ হিসাবে থাকবে বাংলাদেশ। সবচেয়ে বড় সংকট এটিও।।