Home » রাজনীতি » বিএনপি কি শক্তি হারিয়ে ফেলেছে?

বিএনপি কি শক্তি হারিয়ে ফেলেছে?

মনির হোসেন

BNP-logo-বাংলাদেশের দুই প্রধান দলের শীর্ষ দুই নেত্রীর মধ্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ধরেই লেখালেখি করেন। ইতিমধ্যে তাঁর একাধিক গ্রন্থও প্রকাশ হয়েছে। সেই তুলনায় লেখালেখিতে নবীন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছে গেল ৩০শে জানুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন টাইমস পত্রিকায়। বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম লেখাটিও প্রকাশ হয়েছে বিদেশী পত্রিকায়। ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে ওই নিবন্ধটি প্রকাশ হয়েছিল লন্ডনের একটি পত্রিকায়, তাঁর ভারত সফরের কয়েকদিন আগে।

ভারতবাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নিবন্ধটি বেশ প্রশংসিতই হয়েছিল। এতে নিজেদের মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে প্রতিবেশী দেশটির সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের নিজস্ব নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছিলেন তিনি।

কিন্তু ওয়াশিংটন টাইমসে লেখা বেগম জিয়ার নিবন্ধটি পড়েই হতচকিত হয়ে যাবেন বাংলাদেশের যে কোন নাগরিক। শিরোণাম বাদ দিলে ১১ প্যারায় ৮৫১ শব্দের এই নিবন্ধটি একজন বাংলাদেশীকে ক্ষুব্দ, অপমানিত ও হতাশ করবে, শুধু যারা বেগম খালেদা জিয়ার যেকোন কাজকে অন্ধভাবে সমর্থন করেন তারা ছাড়া।

বেগম জিয়ার নিবন্ধে কেন বাংলাদেশের একজন নাগরিক ‘ক্ষুব্দ’, ‘অপমানিত’ ‘হতাশ’ হবেন ? সেটি তাঁর নিবন্ধটি বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে।

ওয়াশিংটন টাইমসে প্রকাশিত নিবন্ধটির শিরোণাম হচ্ছে ‘দি থ্যাংকলেস রোল ইন সেভিং ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ; করাপশন এন্ড স্টিলিং থ্রেটেন এ ওয়ান্সভাইব্রেন্ট নেশন’। শিরোণামের প্রথম অংশটিতেই রয়েছে বাংলাদেশের ‘গণতন্ত্র রক্ষা’র কাজে কারো ভূমিকায় বেগম খালেদা জিয়ার হতাশা। এই ‘কারো’টি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ বাংলাদেশে গণতন্ত্র রক্ষার কাজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাতে তিনি সন্তুষ্ট নন। বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব তো বাংলাদেশের মানুষের, বেগম জিয়া এখানে যুক্তরাষ্ট্রকে টেনে আনছেন কেন? তাহলে কি বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের জনগনের উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন?

বেগম জিয়া নিবন্ধের প্রথম প্যারাটি শুরু করেছেন একটি প্রশ্ন দিয়ে: ‘২০১৩ সাল কি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবসানের বছর হবে?’ এরপরই দিয়েছেন ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা। যুক্তরাষ্ট্র নাকি বাংলাদেশের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রন অধিকারের স্বীকৃতিদানকারী প্রথম দেশগুলোর একটি! এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাঁর অনুযোগ: গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে গণতন্ত্রদমন এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভরকেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে অন্য উদীয়মান পরাশক্তির দিকে সরিয়ে নেয়া সম্পর্কে ,যুক্তরাষ্ট্র কিছুই করছেনা, অলস হয়ে বসে আছে।

বিষয় এখানে দুটি। এক: গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ক্ষমতাসীনদের পায়ে দলিত হচ্ছে। দুই: বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গণে তার অর্থনৈতিক মিত্র পরিবর্তন করতে যাচ্ছে।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা এই উপমহাদেশ থেকে চলে যাওয়ার পর নবসৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রেও গণতন্ত্র ক্ষমতাসীনদের পায়ে দলিত হয়েছিল। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল বাঙালী। এদেশের মানুষ তখন নিজেদের স্বাধীনতার জন্য অন্যকোন দেশের মুখাপেক্ষি হয়ে বসে থাকেনি, যুক্তরাষ্ট্রের মুখাপেক্ষি তো নয়ই। বাঙালী নিজেরাই গণতন্ত্রের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। জনগনের আন্দোলনে বিদায় নিয়েছিল ‘লৌহমানব’ আইয়ুব খান, বিদায় নিয়েছিল ইয়াহিয়া খান। স্বাধীনতা যুদ্ধেও অন্য কোন দেশের মুখাপেক্ষি না হয়েই পাকিস্তানীদের রুখে দাঁড়িয়েছিল এদেশের মানুষ, পরে সমর্থন দিয়েছিল ভারতসহ সোভিয়েত ব্লকের দেশগুলো। এমনকি গত শতাব্দির প্রায় পুরো নব্বই দশক জুড়ে এই বেগম খালেদা জিয়া আর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আন্দোলন করে স্বৈরাচার এরশাদকে হটিয়েছে জনগন।

এদেশে এযাবতকালে যত নির্বাচন হয়েছে তার মধ্যে প্রায়বিতর্কহীন দুটি নির্বাচনে জনগনের ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন বেগম জিয়া। ওয়াশিংটন টাইমসের নিবন্ধ অনুযায়ী তিনি এখন তার এই ভোটার ও জনগনের উপর আস্থা হারিয়েছেন। এতে কি বাংলাদেশের মানুষ অপমানিত বোধ করবেনা ?

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম বন্ধু রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র। এখনো দেশের তৈরি পোশাকের প্রধান গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজার। এই বাজার ধরে রাখার পাশাপাশি সম্প্রসারণের জন্য নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পোশাক শিল্প মালিকরা। সম্প্রতি অস্ত্র ক্রয় আর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য রাশিয়ার সাথে চুক্তি করেছে সরকার। বেগম জিয়া কি একেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভরকেন্দ্র বদল হয়ে যাচ্ছে বলতে চাইছেন? অথচ যুক্তরাষ্ট্র তো কখনোই বাংলাদেশের কাছে প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ ছিলনা, ছিল চীন!

একটি স্বাধীন দেশ তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য যতবেশি সম্ভব দেশের সাথে ব্যবসা বাণিজ্য বাড়াবেএটাই স্বাভাবিক, এবং এমনটাই হওয়া উচিত। কিন্তু বেগম জিয়া তার নিবন্ধে বোঝাতে চেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়া যাবেনা। তাঁর এমন যুক্তিতে স্বাধীন বাংলাদেশের একজন নাগরিক হতাশ হওয়াই স্বাভাবিক।

বেগম জিয়া তার ১১ প্যারার নিবন্ধে ৩য় থেকে ৭ম প্যারা পর্যন্ত বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে অপসারণের কারণ, শ্রমিক নেতা আমিনুল হত্যাসহ র্যাাবের হাতে খুনগুম, শ্রমিক অধিকার নিয়ে সোচ্চার নেতা ও রাজনৈতিক ভিন্ন মতাবলম্বীদের উপর দমননিপীড়ন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, দেশের গণতন্ত্র দমন করে এক পরিবারের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার অভিযোগ এবং সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তা বর্ণণা করেছেন। বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসাবে হরহামেশাই তিনি এসব অভিযোগ করেন। দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে তার এই বর্ণনার সাথে একমত হওয়ার মানুষের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়।

নিবন্ধের প্রথম প্যারাতেই বেগম জিয়া বাংলাদেশের ‘গণতন্ত্র রক্ষায়’ যুক্তরাষ্ট্র ‘অলসভাবে’ বসে থাকার অনুযোগ করেছেন। আবার পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটকংগ্রেস ও ওবামা প্রশাসন বিভিন্ন ইস্যুতে বংলাদেশ সরকারকে নানারকম কথা বলেছেসেটিও মনে করে দিয়েছেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের এধরণের কথাবার্তায় সন্তুষ্ট নন বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত দালিলিক প্রমাণ রেখে, বাংলাদেশের বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি!

এই সরাসরি হস্তক্ষেপটি কেমন হবে সেটিও তিনি বর্ণনা করেছেন নিবন্ধের ৯ম ও ১০ম প্যারায়। তিনি বলেছেন: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য শেখ হাসিনার উপর যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যকে চাপ দিতে হবে। এই চাপ ‘কথা ও কাজে’ ‘অনেক বেশি শক্ত’ হতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের অগ্রাধিকার সুবিধা (জিএসপি) প্রত্যাহারের হুমকি দিতে হবে। ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের ভ্রমণের উপর অবরোধ আরোপ করতে হবে। আর এসবই প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে করতে হবে, যাতে বাংলাদেশের মানুষ শুনতে ও দেখতে পায়!

একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানে অন্য দেশ শুধু মধ্যস্থতার মাধ্যমে সহযোগিতা করতে পারে। যেমনটি করেছিল কমনওয়েলথ, ১৯৯৫ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে অচলাবস্থার সময়। অবশ্য সেবারও কমনওয়েলথএর পাঠানো দুই প্রতিনিধি বাংলাদেশের সমস্যা সমাধান করতে পারেননি।

কিন্তু তাই বলে নানারকম অবরোধ আরোপের মত হস্তক্ষেপের আহবান? বিশেষ করে জিএসপি সুবিধা বাতিল হলে দেশের অর্থনীতিতে কেমন প্রভাব পড়বে সেটি তো দুই বারের প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার চেয়ে ভালো কারো জানার কথা নয়! বেগম জিয়ার এমন আহবানে দেশের ব্যবসায়ী সমাজ ক্ষুব্দ হবেন, যেখানে তার দল বিএনপি’র সমর্থকরাও আছেন।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে বিদেশীদের ‘নাক গলানো’ নতুন কোন বিষয় নয়। এদেশের নেতানেত্রীরাও যখনতখন যেকোন বিষয় নিয়ে বিদেশীদের কাছে ‘নালিশ’ জানান। তবে এসবই হয় অনানুষ্ঠানিকভাবে। আমাদের নেতানেত্রীরা বিদেশে গিয়েও ‘তদবির’ করেন। বেগম খালেদা জিয়া নিজেই এমনি এক সফরে গতবছরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র গিয়েছিলেন। তখন সরকারি মহল থেকে প্রচার করা হয়েছিল যে, বেগম জিয়াকে ওবামা প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তারা সাক্ষাতই দেননি। অর্থাৎ ‘তদবিরে’ গিয়ে সফল হননি বেগম জিয়া। গত বছর অক্টোবরে বেগম জিয়ার ভারত সফর নিয়েও তার পক্ষেবিপক্ষে আলোচনা হয়েছিল।

ওয়াশিংটন টাইমসের নিবন্ধ দেখে বেগম জিয়ার এসব সফরের সফলতা সম্পর্কে সন্দেহ জাগাই স্বাভাবিক। সন্দেহ জাগতে পারে বিএনপি’র শক্তি আর কর্মকান্ড নিয়ে। তবে কি সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির কোন ক্ষমতা বিএনপি’র নেই? বিএনপি কি সরকারের ‘অন্যায়অনিয়ম’ আর ‘গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার’ আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে? বিএনপি’র জাঁদরেল নেতা আর আন্তর্জাতিক বিষয়ক বেগম জিয়ার উপদেষ্টারা কি ‘বিদেশীদের কনভিন্স’ করার কাজে সফল হতে পারেন নি? বেগম জিয়ার এই নিবন্ধ সম্পর্কে তাঁর দলের বেশিরভাগ নেতাই আগেভাগে কিছু জানতেন না। তাহলে কি তিনি নিজ দলের সকল নেতাকেও বিশ্বাস করতে পারছেন না? একারণেই তিনি সম্পূর্নভাবে যুক্তরাস্ট্রের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন?

বেগম জিয়ার নিবন্ধটি পড়লে এর পেছনের অর্থ এসব প্রশ্নের ‘হা’ বোধক উত্তর দেয়। আর তা হতাশ করে দেশের সাধারণ মানুষকে। কারণ দেশের মানুষ সবসময় শক্তিশালী বিরোধী দল দেখতে চায়, যারা নিজের শক্তিতে সরকারের যেকোন অন্যায় কর্মকান্ড মোকাবেলা করতে পারে। তাহলেই সরকার স্বেচ্ছাচারিতা করতে ভয় পায়। বেগম জিয়ার নিবন্ধ শুধু তাঁর দলের এসব দুর্বলতাকেই প্রকাশ করেছে। আর শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে বেপরোয়া সাহসী হয়ে স্বৈরাচার হয়ে উঠতে পারে সরকারি দল।।

(মনির হোসেন, সাংবাদিক। monir121267@gmail.com)