Home » বিশেষ নিবন্ধ » মানুষের বিভেদ ও ঐক্য – সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গ – ৪

মানুষের বিভেদ ও ঐক্য – সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গ – ৪

আনু মুহাম্মদ

Anu_Mohammad-2তাছাড়া মার্কিনীদের নেতৃত্বে সন্ত্রাসী সাম্প্রদায়িক দখলদার ফ্যাসিবাদী বিশ্বব্যবস্থা চলছে এখন। আমরা তার মধ্যেই আছি। বাংলাদেশে সমুদ্র ও স্থলভাগে তাদের যে আগ্রাসী তৎপরতা, সেখানে সম্পদ ও ভৌগোলিক গুরুত্ব ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চল বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ইতিহাসের এই পর্বে ইসলামপন্থী সন্ত্রাসী তাদের আধিপত্য বিস্তারের মডেলে অত্যন্ত সুবিধাজনক। যুক্তরাষ্ট্রচীনভারত ঐক্য ও বিবাদ দুটোই বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য বড় ঝুঁকির বিষয়। বন্দর ও ট্রানজিট ঘিরে ভারতের আঞ্চলিক কৌশলও বিশেষ মনোযোগের দাবিদার। এর সাথে মায়ানমার নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী নতুন মনোযোগ, সেখানে জাতিগত দাঙ্গা, উদ্বাস্তু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ‘রিজার্ভ আর্মি’ হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্র প্রস্তুত হওয়া এগুলোও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

.

রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলার ঘটনার কথা যখন প্রথম জানি, আরও অসংখ্য মানুষের মতো তা আমার কাছেও অবিশ্বাস্য ঠেকেছিল। এটা ঠিক যে, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার নানা বহি:প্রকাশ ও উস্কানির নানা ঘটনার সাথে আমরা পরিচিত। সাংস্কৃতিকভাবে সাম্প্রদায়িকতার নানা উপাদান সমাজে বিভিন্ন মাত্রায় এখনও শক্তিশালী তো বটেই, তা সহিংস আকারে প্রকাশিতও হচ্ছে নানাসময়।

হিন্দু জনগোষ্ঠী, বাঙালী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন সংখ্যালঘু বিশেষত আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, সম্পদ লুন্ঠন, খুন ও ধর্ষণের কিছু কিছু ঘটনা আমরা জানি, হয়তো অনেকগুলো জানাই হয় না। সমাজের মধ্যে থেকে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধও আছে। কিন্তু নির্বাচনের সময় চাপে রাখা ছাড়া বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর এরকম হামলার কোনো ঘটনা কখনও ঘটেনি। রামুর এই হামলা সেইকারণে সারাদেশকে হতবুদ্ধি করেছে। আর এর মধ্য দিয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ও সম্প্রদায়গতভাবে ভীতি, নিরাপত্তাহীনতা ও আতংকের মধ্যে প্রবেশ করেছেন যা তাদের কাছে এই মাত্রায় পরিচিত ছিলো না। অনেক তথ্য প্রমাণই জানাচ্ছে যে, স্বতস্ফূর্ত বা অপরিকল্পিতভাবে এই হামলার ঘটনা ঘটেনি। এর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে নানাভাবে প্রতিবাদও হয়েছে। ফেসবুকে ও রাজপথে দিনের পর দিন এই ঘটনায় তরুণদের ক্ষোভ, নিন্দা আর ধিক্কার দেখে ভরসা পেয়েছি।

সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গ্রুপ, সাংবাদিক, গবেষক এলাকা সফর করেছেন, কথা বলেছেন, সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করেছেন। তাঁদের অনেক রিপোর্ট প্রকাশিতও হয়েছে। এগুলো থেকে যে তথ্যগুলো পরিষ্কারভাবে পাওয়া যায় সেগুলো হল:

. উত্তম বড়ুয়ার ফেসবুকে কোরান অবমাননার একটি ছবি লাগানো হয় এবং সেটি হাজার হাজার মুদ্রণ করে এলাকায় ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। ঘটনার ধরন, প্রচারের আয়োজন ও ত্বড়িৎগতি থেকে এটা বুঝতে কারও বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয় যে, মুসলিম ধর্মানুভূতিতে প্রবল খোঁচা দিয়ে তাদের আক্রমণাত্মক ভূমিকায় টানার জন্য এটা উদ্দেশ্যমূলকভাবেই করা হয়েছিল।

. এই উদ্দেশ্য সফল হয়েছিলো, কিছু মানুষ পূর্বাপর না জেনে উত্তেজিত হয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন। কিন্তু তাদের সংখ্যা এতো ছিল না যে, তা ভয়ংকর কোনো ঘটনা ঘটাতে পারে। বিশেষত যেখানে আলেমসহ গণ্যমান্য অনেক ব্যক্তি এর প্রতিরোধে দাঁড়িয়েছিলেন।

. যেভাবে এলাকার বাইরে থেকে কয়েক ঘন্টার মধ্যে ট্রাকে বাসে করে মানুষ আনা হয় তা মোটেই স্বতস্ফূর্ত ছিলো না। এটা যে যথেষ্ট পরিকল্পিত ছিলো সেটাই বরং স্পষ্ট হয়। আর যারা এই উদ্যোগ গ্রহণ করে তাদের প্রভাব ও অর্থব্যয়ের ক্ষমতা আছে এটাও বোঝা যায়।

. হামলার উদ্দেশ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টিতে যেসব দলের নেতাদের সক্রিয় ভূমিকা দেখা গেছে সেগুলো হল: সরকারি দল আওয়ামী লীগ, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। একটি প্রভাবশালী পরিবারের অন্তর্কলহ এখানে রাজনৈতিক মেরুকরণে উপাদান হিসেবে কাজ করেছে।

. হামলার সময়ে অনেকগুলো বহুমূল্য বুদ্ধমূর্তি চুরি গেছে।

. পুরো ঘটনার সময় পুলিশ ও প্রশাসন নিষ্ক্রিয় ছিলো। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, যেকোনো ঘটনা বোঝার জন্য পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও সক্রিয়তা দুটোই খুব গুরুত্বপূর্ণ।

.

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে যেসব সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে সবচাইতে বেশি ঘটেছে বৃহত্তম ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর। ঐতিহাসিক বিভিন্ন উপাদান ও ভারতে মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িকতা এর পেছনে শক্তি যুগিয়েছে। এরশাদ আমলের শেষদিকে কিছু ঘটনা ঘটে যেগুলোতে সরকারের হাত ছিলো বলে প্রমাণিত হয়েছে। ব্যাপক আন্দোলনে পতনের মুখে এটাকে এরশাদ সরকারের একটা চাল বলেই সবাই ধারণা করেছেন। প্রতিরোধের শক্তির কারণে এটা ছড়াতে পারেনি। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি ও অন্যান্য সংগঠনের নেতৃত্বে অযোধ্যায় কথিত রামমন্দিরের স্থানে নির্মিত বাবরী মসজিদ ভাঙার পর ‘প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটে। ১৯৯২ সালের শুরু থেকেই ৭১ এর ঘাতক দালাল যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়েছিল। এই বছরের মার্চ মাসে ঘাতক দালালদের বিরুদ্ধে গণআদালত হয় এবং তাতে গোলাম আজমের মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। বাবরী মসজিদ ভাঙার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামী নতুন প্রাণ ফিরে পায়, রাস্তায় নেমে আসে। পুরো যুদ্ধাপরাধী বিরোধী আন্দোলনটিকে দুর্বল করবার সুযোগ হিসেবে এটিকে ব্যবহার করতে চেষ্টা করে। আন্দোলনের মধ্য থেকে তখন নতুন শ্লোগান তৈরি হয়েছিল, ‘গোলাম আজম আদভানী, দুই দেশের দুই খুনী’। আদভানী ছিলেন বিজেপির নেতা।

২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচনের পর বেশকিছু হিন্দু প্রধান অঞ্চলে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটানো হয়। এটা ছিল বিএনপি জামায়াতের প্রতিহিংসামূলক আক্রমণের ঘটনা। সাধারণভাবে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ধারণা সকলক্ষেত্রে ঠিক না হলেও আক্রমণ ও নৃশংসতা সেকারণেই ঘটানো হয়েছিল। আওয়ামী লীগের ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে পরিচিত বলে কি ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘুরা আওয়ামী লীগের সরকার বা দলীয় ক্ষমতাবানদের কাছ থেকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা পান? ‘অর্পিত সম্পত্তি আইন’ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, কিংবা ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘুদের সামাজিক অবস্থানের নাজুকতা কাজে লাগিয়ে জমি বা সম্পদ দখলের ঘটনা পর্যালোচনা করলে আক্রমণকারী বা দখলদার ভূমিকায় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী লোকজনদেরও একইভাবে সনাক্ত করা যায়।।