Home » মতামত » আগামীর রাজনীতিতে শাহবাগের আন্দোলন

আগামীর রাজনীতিতে শাহবাগের আন্দোলন

তারিক মাহমুদ

shahbagh-movement-1শাহবাগ এখন বাংলার ব্যাপক সম্ভাবনার কেন্দ্রে। কারণ অনেক বছর যাবৎ আমরা কুকুরবেড়ালের মত গৃহপালিত প্রাণী সদৃশ্য জীবনযাপন করছি। নানা মাত্রিক নিপিড়ন মুখ বুঝে সয়ে সয়ে আমাদের গায়ের চামড়া গন্ডারের মত মোটা হয়ে গেছে; চামড়ার নিচে জমেছে থলথলে চর্বির মোটা স্তর। এই উত্তাপে যদি সেই চর্বি গলে আর চামড়া পুড়ে যন্ত্রনার অনুভূতি সতেজ হয় এই ভরসা!

শাহাবাগে মানুষের এই যে উত্তাপ, তারুন্যের শক্তির এই যে প্রকাশ তার কেন্দ্রবিন্দুকে সঠিক লক্ষ্যে চালিত করতে না পারলে নতুনকিছু অর্জিত হওয়ার সম্ভবনা উন্মুক্ত হবে না। বরং যেটি হবে তাকে সহজ বাংলায় বলে, ‘নতুন বোতলে পুরানা মদ’। ফলে আমাদের এই আন্দোলনকে পরিচালিত করতে হবে বাস্তবের মাটিতে দাড়িয়ে, একে বিচারবিশ্লেষণ করে। কারণ ৫ ফেব্রুয়ারী থেকে শাহবাগের প্রজন্ম চত্ত্বরে সূত্রপাত ঘটা তরুণদের এই আন্দোলন আমাদেরকে ইতিহাসের এমনই এক মুহূর্তের মুখোমুখি দাড় করিয়ে দিয়েছে,যখন পুরানো কিন্তু অমীমাংসিত প্রশ্নটি অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি এবং তার প্রক্রিয়া ও প্রত্যাশার উদ্ভোধন ঘটেছে। ভুলে যাওয়ার অবকাশই নেই, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্ন খোদ রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের ন্যায্যতার নৈতিক ভিত্তির প্রশ্ন। গোড়াতেই যেমন আওয়ামী লীগ এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে ব্যর্থ হয়েছে, আজও ব্যর্থ এবং বিনা প্রশ্নে, বিনা জবাবদিহীতায় তাদের হাতে এই দ্বায়িত্ব অর্পণ করলে তারা আবারো জাতিকে ব্যর্থতাই উপহার দিবে।

শাষকশ্রেনীর এই যে ব্যর্থতা, তার মূলে রয়েছে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং যেটি তারা গড়ে তুলেছে ১৯৭১ সালের পর থেকে দেশের ও জনগণের সম্পদ দ্রুত লুটপাট করাকে কেন্দ্র করে। এর সাথে যুক্ত ভিনদেশী শক্তি বা কোম্পানির হাতে সম্পদ তুলে দেয়া। এভাবে এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেশের নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বকে বিঘ্নিত করে আসছে ধারাবাহিক ভাবে। এরই বৈশিষ্ট্য হিসাবে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, রাজনীতির সামরিকীকরণ সহ আমলাতন্ত্রায়ণ ও সাম্প্রদায়িকতার বিকাশের প্রবনতা। এটি সরাসরি বিশ্বব্যাংকআইএমএফ সহ তাদের দাসত্বের কাছে দেশবিকানো লেনদেনের ভেতর দিয়েই গড়ে উঠেছে। ফলে এখানে ‘সুবিচার’ আশা করা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়! ফলে ‘সুবিচারে’র প্রত্যাশা বিদ্যামান এই রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই বৈধতান্যায্যতা দানের সামিল। আর এই ন্যায্যতার সুযোগ নিয়েই আওয়ামিলীগবিএনপি সহ অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদের লেজুর দলগুলো এই ভূখন্ডের মানুষের আন্দোলসংগ্রামের সফলতা সুযোগ সন্ধানীর মত হাতিয়ে নিছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ফলাফল এই অর্থে বেহাত হয়েছে। কারণ মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে জনগণের আকাঙ্খার যে রাজনৈক সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছিলো,তা ক্ষমতা দখলকারী আওয়ামী লীগ ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে নিজেদের শ্রেনী সুবিধা ও দখল উপযোগী সংস্কৃতি বিকশিত করেছে।

কেন ইতিহাসে এ রকমটি ঘটে? ঘটে, কারণ জনগণের আন্দোলনসংগ্রামপ্রচেষ্টা আওয়ামীলীগবিএনপিজামায়তজাতীয় পার্টির মত শাসকশ্রেনীর অনুগামী রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতির খপ্পরে পড়েছে এবং এখনও পড়ছে। ফলে আন্দোলনসংগ্রামের সফলতার মধ্যে দিয়ে যে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জিত হয়, তা দখল করে এই দলগুলো। ক্ষমতা কুক্ষিগত করে তারা দলব্যাক্তিশ্রেনীর ফয়দা হাসিল করে। সেই দিক থেকে আন্দোলনসংগ্রাম যতই তুঙ্গে উঠুক না কেন, রাজনীতি হচ্ছে আন্দোলনের আসল নির্যাস, চালিকা শক্তি। তাই রাজনীতির কর্তৃত্ব যদি জনগণের হাতে না থেকে, আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি অথবা এই ধরনের মেরুদন্ডহীন দলের হাতে যায়, তাহলে আন্দোলনসংগ্রাম পথ হারায়; বলা যায় আন্দোলনসংগ্রামের ফলাফল বেহাত হয়।

নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে দেশব্যাপি যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো, তখন আওয়ামী লীগ বিশ্বাসঘাতকতা করে জামায়াতের সাথে একজোট হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করে ক্ষমতার মসনদ হাসিল করে। এরপরের নির্বাচনে ব্যার্থ হয়ে ২০০১ সালের পর থেকে ১৯৭১এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুতে নির্বাচনের মাঠ গরম করে ক্ষমতা দখল করে। এখন তারা বিচার করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়া ফেলেছে। তারা যে বিচার করতে চায় না বরং বিচার নিয়ে রাজনীতি করতে চায়, সেটা আজ দেশের তরুণবৃদ্ধ সকলের কাছেই পরিস্কার। তরুণরা এই রাজনীতি প্রত্যক্ষ করে, ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে।

জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে শাহবাগের আন্দোলন দাউদাউ আগুনের শিখার মতো। সারা পৃথিবী জুড়ে বাসকরা বাংলাদেশের অনেক মানুষও এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তরুণদের সাথে যুক্ত হয়েছে নানা বয়সি মানুষও। এসব কিছুই বর্তমান মুহূর্তকে করছে তাৎপর্যপূর্ণ। এখন এই গনগনে মুহূর্তকে ব্যবহার করে ভবিষ্যত নির্মাণ করাই হবে আসল কাজ। তাই বর্তমান মুহূর্তের দানাবেঁধেওঠা আন্দোলেনের প্রধান চ্যালেঞ্জ এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করে, একে শাসকশ্রেণী বা ‘মূলধারা’র রাজনীতিক এবং তাদের তল্পিবাহকদের এবং ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীদের হাত থেকে রক্ষা করা। কোনো ভাবেই যেন তারা এই আন্দোলনের ফল আত্মসাৎ করতে না পারে।

শাহাবাগে আন্দোলনকে আওয়ামী লীগের দলীয় রাজনীতি বিপরীতে জনগণের আন্দোলনসংগ্রাম এই দুইয়ের ভেদ রেখা অভেদস্পষ্ট করে, তাকে শিকড় বানিয়ে, জনগণের পক্ষের নয়া রাজনীতির স্বপক্ষে নিতে হবে।

আমরা তরুণ সমাজ আন্দোলনের সাথে যুক্ত আছি তাদের কাজে হবে, আন্দোলনদাবীসংগ্রামের সাথে জনগণের রাজনীতিকে যুক্ত করা। এখন এটি পুরোপুরি অর্জন করতে না পারলেও আগামী দিনের বাংলাদেশের গনতান্ত্রিক রাজনীতিতে এর গভীর প্রভাব পরবে। এই জবাবদিহীতাহীন ব্যাক্তিমুখি দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আগামী দিনে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে এই আন্দোলনের উত্তাপ। আমাদের পারতে হবে সেই উত্তাপে পুরোন শিকড় উপরে ফেলার হিম্মত অর্জন করতে।।