Home » অর্থনীতি » ‘আমরা একেই বলি উন্নয়ন’ – শেষ পর্ব

‘আমরা একেই বলি উন্নয়ন’ – শেষ পর্ব

আমি কেন লিখি’………..

অরুন্ধতী রায়

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

arundhati-1আপনি যদি ভারতে ভূমি রক্ষা আন্দোলনের ইতিহাসের দিকে তাকান, দেখা যাবে, ভারত স্বাধীনতা লাভের পর নতুন সরকারের সামনে অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল ভূমি সংস্কার। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, রাজনীতিবিদেরাযারা ছিল উচ্চবিত্তের লোক, ভূস্বামীতারা সেটা নস্যাৎ করে দিয়েছে। তারা আইনি ব্যবস্থায় এতসব শর্ত জুড়ে দিয়েছিল যে, কার্যত কোনো ধরনের পুনঃবণ্টন হয়নি। তারপর, ১৯৭০এর দশকে, নক্সালি আন্দোলন শুরুর পরপরই, যখন জনগণ প্রথমবারের মতো জেগে ওঠে, আন্দোলনের কথা ছিল ‘লাঙল যার, জমি তার।’ সেনাবাহিনী তলব করে আন্দোলন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। যে ভারত সরকার নিজেকে গণতান্ত্রিক হিসেবে অভিহিত করে, তারা সেনাবাহিনী তলব করতে কখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে না। এখন জনগণ ভূমির পুনঃবণ্টনের ধারণাটি পুরোপুরি ভুলে গেছে। এখান তারা কেবল তাদের হাতে সামান্য যতটুকু আছে, সেটাই ধরে রাখার সংগ্রাম করছে। আমরা একে বলি ‘উন্নতি’। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকি বলেছেন, তিনি চান ভারতের ৭০ শতাংশ মানুষ নগরে বাস করুক। এর অর্থ হলো ৬০ কোটি লোককে সরিয়ে নিতে হবে। এটা যদি সামরিক রাষ্ট্রে পরিণত না হয়, তবে তা কিভাবে হবে? আপনি কিভাবে সেটা করবেন, যদি না আপনি বড় বড় ড্যাম, বড় বড় জলবিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি না করেন বা পরমাণু শক্তি না থাকে?

অসংখ্য ক্ষেত্রে আমরা পিছু হঠেছি। এমনকি সবচেয়ে চরমপন্থী রাজনীতিই পরিচালিত হয় এমন লোকজনের মাধ্যমে যাদের প্রচুর ভূমি রয়েছে। অথচ কোটি কোটি মানুষের জমি নেই, তারা বর্তমানে ভারতের তৈরি বিশাল বিশাল নগরীর প্রান্তে অতি সামান্য মজুরির শ্রমিক হিসেবে কোনোমতে বেঁচে আছে। ভূমি নিয়ে রাজনীতি এক দিক দিয়ে মৌলিক বিষয়, অন্য দিক দিয়ে এটা দরিদ্রতমদের পরিত্যাগ করেছে, কারণ তারা সমীকরণের বাইরে। আমরা আর ন্যায়বিচার নিয়ে কথা বলছি না। আমাদের কেউ নয়, আমরা কেবল মানবাধিকার বা বেঁচে থাকা নিয়ে কথা বলছি। আমরা ভূমির পুনঃবণ্টন নিয়ে কথা বলছি না। আমেরিকায় অর্ধেক মানুষের মোট যে সম্পদের মালিক, সেখানকার চার শ’ লোক এর চেয়েও ধনী।

আমাদের ধনীদের ওপর করারোপের কথা বলা উচিত নয়, বরং আমাদের বলা উচিত তাদের অর্থ পুনঃবণ্টন করা, তাদের সম্পত্তি নিয়ে সেগুলো পুনঃবণ্টন করতে হবে।

ভারতে আজ সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হচ্ছে বক্সাইট উত্তোলন নিয়ে। অ্যালুমিনিয়াম তৈরিতে ব্যবহৃত এই আকরিকটি সামরিকশিল্প কমপ্লেক্সের বিষয়। উড়িষ্যা ও ছত্তিশগড়ের পর্বতগুলোতে প্রায় চার ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যমানের বক্সাইট রয়েছে। বক্সাইটসমৃদ্ধ পর্বতগুলো খুবই সুন্দর, এগুলোর উপরিভাগ সমতল। বক্সাইট সুরঙ্গযুক্ত পাথর। বৃষ্টির সময় পর্বতগুলো পানি ধারণ করে পুকুরের মতো হয়ে যায়। সেখানকার অধিবাসীরা গোড়ালি দিয়ে পানি জমে থাকা স্থানগুলো কেটে দিয়ে নিচে সেচকাজে ব্যবহার করে। খনি কোম্পানিগুলো সামান্য অর্থ দিয়ে ভারত সরকারের কাছ থেকে বক্সাইট কিনে ইতোমধ্যেই ভবিষ্যতের বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। স্থানীয় লোকজনের কাছে পর্বতের বক্সাইট তাদের জীবন, তাদের ভবিষ্যত, তাদের ধর্মসবকিছু। আর অ্যালুমিনিয়াম কোম্পানির কাছে পর্বত হলো সস্তা মজুত ভাণ্ডার। তারা আগেই বক্সাইট বিক্রি করে দিয়েছে, ফলে এগুলো টেনে বের করতেই হবে, বলপূর্বক হোক কিংবা শান্তিপূর্ণভাবে।

এখন ভারত সরকারবিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রবিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে মধ্য ভারতে সেনাবাহিনী তলব করার পরিকল্পনা করছে। ভারত সরকারের সহিংসতা ও নির্যাতনের অনেকটাই দুর্বৃত্তদের দিয়ে করানো হয়; সরকার অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে না। টেলিভিশনে প্রায়ই শিক্ষাবিদ বা সাংবাদিক কিংবা অপরিণতবুদ্ধির অ্যাংনকরেরা ‘সহিংসতা নৈতিক কি অনৈতিক?’- এমন প্রশ্নের ভিত্তিতে বিতর্কের সূচনা করেন (আর বলা হয়, আপনার জবাব স্টুডিওতে এসএমএস করুন)

জনগণের কোনো অবস্থাতেই এভাবে কাজ করার দরকার নেই। আপনি বনভূমিতে মাওবাদী আর রাজপথে গান্ধীবাদীযেই হোন না কেন। আপনি আপনার পরিচিতি বদলাতে পারেন আপনার কৌশলের সঙ্গে মিল রেখে। এটা বা ওটা কিংবা অন্যটা নিয়ে শপথ গ্রহণের মতো কোনো ব্যাপার নয়। অনেক লোক করে, অনেকে করে না। আমার মনে হয়, ভারতে যা ঘটছে তা হলো এই বিতর্ক অনেকটাই ভ্রান্ত, কারণ এটাকে ভ্রান্ত নৈতিকতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। সর্বোপরি, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষকে যদি ওই যুদ্ধকে সমর্থন দিতে হয়তবে এটা দ্ব্যর্থবোধক হওয়ায় তারা জড়াবে নাতাহলে আমি বুঝে শুনে বলতে পারি, আমাদের একত্রিত হয়ে অনশন ধর্মঘটে যাওয়া উচিত। কিন্তু, শত শত পুলিশ কোনো গ্রাম ঘিরে সবকিছু জ্বালিয়ে দিতে থাকে এবং আপনি যদি ওই ঘটনা থেকে নিজেকে দূরে রাখেন, তবে গ্রামবাসীর কিভাবে নিজেদের রক্ষা করা উচিত ছিল তা নিয়ে আপনার বক্তৃতাবাজি করাটা অনৈতিক হয়ে পড়ে।

প্রায়ই দেখা যায়, জনগণের ওপর কিছু ঘটলে আপনার মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং আপনি চুপ থাকলে আপনার নিজেকে অবমানিত মনে হয়। মানুষজন আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি কেন লিখি, আমি বলি নিজেকে যাতে অবমানিত মনে না হয়। অবমানিত না হওয়া অনুভব করা থেকে বিরত থাকা ছাড়া অন্য কোনো কারণে আমি লিখি না। যখনই আমি লিখি, নিজেকে বলতে থাকি, আমি আর একাজ করব না। কিন্তু অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, আমি বিষয়টা নিজের মধ্যে আটকে রাখতে পারি না। আমি লিখি এবং হাঁফ ছেড়ে বাঁচি।

লেখক হিসেবে, যদি আপনি কিছু জানেন এবং তারপরও চুপ থাকেন, মনে হবে মরে যাচ্ছেন। নানা ধরনের শঙ্কার মধ্যেও আমি এখনো না লেখার চেয়ে লেখাকেই বেছে নেই।

অনেক বছর ধরে আমি লিখছি আর প্রতিরোধ আন্দোলন এবং নতুন নতুন অর্থনৈতিক নীতি লক্ষ্য করছি। সবসময়ই লক্ষ্য করেছি, লোকজন সত্যিকারভাবে যেখানে লড়াই করছে, সেখানকার চাইতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বাসাবাড়িতে হতাশা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে বেশি। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকজনই আশায় বুক বাঁধবে, নাকি নিরাশায় ভেঙে পড়বেসেই সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খেতে থাকে। তারা এমনভাবে দোলাচলে দোলে ঠিক যেমন তারা চুল শুকানোর জন্য শ্যাম্পু ব্যবহার করবে নাকি, তৈলাক্ত চুল রাখবে তা নিয়ে ভাবে; রাজনীতিতে ব্যস্ত থাকবে নাকি ইনটেরিয়র ডিজাইন নিয়ে ভাববে, সেই চিন্তায় বিভোর থাকে। কিন্তু যারা লড়াই করে, তাদের কাছে অন্য কোনো বিকল্প থাকে না। তারা লড়াই করছে, তাদের ওপর আলো থাকে এবং তারা জানে তারা কী করছে।

তারা একে অন্যের সঙ্গে অবশ্যই অনেক তর্ক করে, তবে সেটাই ঠিক। আমি যখন নিউ ইয়র্কে পৌঁছি, প্রথম যে কাজটি করি, সেটা হলো ওয়াল স্ট্রিট দখলকারীদের কাছে যাই। কারণ আমি জানতে চেয়েছিলাম তারা কারা, ঘটনাটা কী এবং আমরা যে লড়াই করছি এবং যা নিয়ে লিখছি, তার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী। নানামুখী প্রবণতা, আন্দোলনটির কোনো দাবিদাওয়া না থাকা এবং এমনকি এর স্বীকৃত নেতৃবৃন্দ না থাকা সত্ত্বেও ওকুপাই মুভমেন্টে যা হচ্ছে এবং ভারতে যা ঘটছে, তার মধ্যে স্পষ্ট সম্পর্ক দেখা যাচ্ছিল। ওই সম্পর্কটা হলো ‘বাদ’ পড়াবিষয়ক। তারাও বাদ পড়া লোক।

তারা নিশ্চিতভাবেই ওই চার শ’ পরিবারের মধ্যে নেই, যারা আমেরিকার অর্ধেকের বেশি সম্পদের মালিক। তারা ভারতের এক শ’ লোকের মধ্যে নেই, যারা ভারতের জিডিপির মাত্র ১৫ শতাংশের অধিকারী। আমরা অনেকে বিপ্লবে বিশ্বাস করি এবং বর্তমান ব্যবস্থার পতন কামনা করি, ঠিক এখন, আমরা এটাকে অন্তত মাত্রার মধ্যে রাখতে বলি। আমি মাত্রা রাখার পক্ষপাতী, সংযত রাখার পক্ষপাতী। আমাদের কয়েকটি বিষয়ে কথা বলা দরকার : একটি হলো, কোনো ব্যক্তিই অসীম পরিমাণ সম্পদ রাখতে পারবে না। কোনো করপোরেশনেরই সীমাহীন অর্থ থাকতে পারবে না। এই ধরনের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবসা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।

ভারতে টাটা হলো বৃহত্তম কোম্পানি। তারা লোহা আকরিক খনি, স্টিল প্রস্তুতকারী প্ল্যান্ট, আয়োডাইজড লবণ ও টেলিভিশন জোগানদাতার মালিক। তারা ট্রাক বানায়, তারা মানবাধিকার কর্মীদের তহবিল দেয়, তারা সবকিছুই করে। তাদের লোহা আকরিক ও স্টিল কোম্পানিকে বলা হয় জিন্দাল। তাদের সিইও পার্লামেন্ট সদস্য। তিনি ন্যাশনাল ফ্ল্যাগ ফাউন্ডেশন দিয়েও শুরু করেছিলেন, কারণ তিনি তার বাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়ানোর অধিকার অর্জন করেছিলেন। তারা দিল্লির বাইরে আন্তর্জাতিক আইন স্কুল পরিচালনা করে, যা কল্পনাতীত আবর্জনার মধ্যে স্ট্যানফোর্ড ক্যাম্পাসের মতো। তাদের ফ্যাকাল্টিতে বিপুল বেতনে সারা বিশ্ব থেকে লোকেরা ছুটে আসে। তারা স্টেইনলেস স্টিলে দক্ষ শিল্পীদের কাজ দেয়। সম্প্রতি তাদের একটি প্রতিবাদ কর্মশালাও হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বিমানে করে অবিশ্বাসী বিলাসপূর্ণ ক্যাম্পাসে গিয়ে প্রতিবাদী কবিতা লেকে, প্রতিবাদী স্লোগান দেয়। তাদের সবকিছুই আছেতাদের প্রতিরোধশক্তি আছে, খনি আছে, পার্লামেন্ট আছে, পতাকা আছে, সংবাদপত্র আছে। তারা কিছুই হাতছাড়া করতে চায় না। এই সাদামাটা জিনিসগুলোই বন্ধ করতে হবে। বারলুসকোনি পরোক্ষভাবে ইতালির ৯০ ভাগ মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন; তাহলে তিনি যদি প্রধানমন্ত্রী না হন তবে কী আসে যায়?

এটা এক ধরনের উন্মাদরোগ, এর কিছু সাধারণ প্রতিষেধকও আছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সন্তানেরা তাদের পিতামাতার বিপুল সম্পদের উত্তরাধিকারী হতে পারবে না। আমাদের এ ধরনের কোনো সাদামাটা সমাধান পেতে হবে, যা সঠিক দিক নির্দেশনা দেবে। (শেষ)