Home » রাজনীতি » বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কে সন্দেহ-অবিশ্বাস

বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কে সন্দেহ-অবিশ্বাস

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রশ্নে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে গত কিছুদিন ধরে। এই দূরত্ব আরো বেড়েছে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার রায়ের পরে। রায়ের পরে জামায়াত আশা করেছিল যে, বিএনপি এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানাবে। বরং কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং এর আগে জামায়াতকে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করতে দেয়াসহ বিভিন্ন কারণে, বিএনপির মধ্যে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহঅবিশ্বাস এবং এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছে। বিএনপি মনে করে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পুরো বিষয়টি সম্পন্ন হবার পরেই বিএনপি জামায়াতের ভূমিকা সম্পর্কে স্পষ্ট বুঝতে পারবে। কাদের মোল্লার রায়ের প্রাক্কালে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম ‘আমরা যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালের বিপক্ষে নই। তবে এই বিচার কাজ হতে হবে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে।’ তরিকুল ইসলামের এই বক্তব্যকে জামায়াত ভালোভাবে নেয়নি। বিএনপি কাদের মোল্লার রায়ের সাত দিন পরে যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তাতে তার রায়ের বা যুদ্ধাপরাধের বিচারে জামায়াতের পক্ষে কোনো কথা নেই। এই প্রতিক্রিয়াটি জানানো হয়েছে, শাহবাগের প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভ নিয়ে। বিএনপি তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, ‘এ সব ঘটনার মধ্যদিয়ে ১৯৭৫এর একদলীয় ফ্যাসিবাদের সুস্পষ্ট প্রতিধ্বনি পাওয়া যাচ্ছে।’

এদিকে, শেষ পর্যন্ত বিএনপি আন্দোলনরত তরুণদের স্বাগত জানিয়ে মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেছে, তরুণ প্রজন্ম অন্যায়, অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলবে, অবস্থান নেবে এবং প্রয়োজনে আন্দোলনে নামবে এটাই স্বাভাবিক। আমরা বিশ্বাস করি, তরুণতরুনীরা সকল ধরণের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধারণ করবে এবং এদেশে সংগঠিত মানবতাবিরোধী সকল অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে।

জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির সন্দেহ অবিশ্বাসের সৃষ্টি মাত্র কয়েকদিনের ঘটনা নয়। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া মাস দুইয়েক আগে কক্সবাজারের এক সমাবেশে সরকারকে উদ্দেশ্য করে জামায়াত সম্পর্কে ‘তলে তলে আঁতাত’এর ইঙ্গিত দিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা জামায়াত পছন্দ করেনি। ওই বক্তব্যে জামায়াতের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হবার পরে জামায়াত আশা করেছিল, বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুতে সর্বাত্মক সমর্থন দেবে। বিএনপির একটি অংশ এমনটা চাইলেও, শেষ পর্যন্ত বিএনপি ‘বিচার কাজ স্বচ্ছ হতে হবে’ জাতীয় বক্তব্য দিতে থাকে। এতে জামায়াত সন্তুষ্ট হতে পারেনি। এক পর্যায়ে, জামায়াত যুদ্ধাপরাধী ইস্যুতে ১৮ দলের মধ্যে থেকে আলাদা অর্থাৎ, এই প্রশ্নে একলা চলো নীতি গ্রহণ করে। জামায়াতের যে হরতালগুলো সাম্প্রতিককালে হয়ে গেল, তাতেও তারা বিএনপির অংশগ্রহণ বা সক্রিয় সমর্থন কামনা করলেও, বিএনপি প্রথমদিকে নৈতিক সমর্থন দিয়ে ক্ষ্যান্ত থেকেছে। কিন্তু কাদের মোল্লার ব্যাপারে ডাকা হরতালে বিএনপি কোনো বক্তব্যই দেয়নি।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের আন্দোলন প্রশ্নে জামায়াতের নেতারা বলছেন, এ মুহূর্তে, অন্য কোনো ইস্যু তাদের কাছে মুখ্য নয়। তাদের একমাত্র দাবি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রতিহত করা। কিন্তু এই প্রশ্নে বিএনপি নিশ্চুপ। বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে প্রথমদিকে যতোটা সক্রিয় ছিল, জামায়াতের কার্যক্রমে সে অবস্থান থেকে সরে এসে, নিশ্চুপ থাকার পথ বেছে নিয়েছে।

বিএনপি তরুণদের আন্দোলনের সঙ্গেও নেই, আবার জামায়াতের সঙ্গেও যুদ্ধাপরাধ প্রশ্নে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার ব্যাপারে সন্ধিহান। এমন একটা পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে বিএনপি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ যেখানে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে যুদ্ধাপরাধ ইস্যুকে সামনে নিয়ে সুফল পেতে চাইছে, সেক্ষেত্রে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে আছি, আবার নেই এমন পরিস্থিতিতে, রাজনৈতিক কৌশলগত দিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। ঠিক এই মুহূর্তে জামায়াত, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের জন্য যতোটা না ‘সম্পদ’ তার চাইতে বেশি বড় ‘দায়’ হিসেবে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পেরেছে এবং জামায়াতও যে কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে তাতে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করা, ভবিষ্যতে বিএনপির জন্য কতোটা সুফল বয়ে আনবে তা প্রশ্ন সাপেক্ষ বিষয়।

তবে বিএনপির অনেক নেতাই মনে করেন, শাহবাগ একটা ‘সাময়িক ক্ষোভ এবং উত্তেজনা মাত্র।’ কাদের মোল্লার মামলার রায় এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নটি সামনে আসায়, বর্তমান সরকারের গত চার বছরের যে সীমাহীন অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন, দুর্নীতি, কেলেঙ্কারিসহ সব ইস্যু ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে এবং অনেক আওয়ামী লীগ নেতা মনে করেন, এক্ষেত্রে তারা সফল হয়েছেন। তবে বিএনপির ধারণা, ওই সব ইস্যুই আগামী নির্বাচনে প্রাধান্য পাবে।

১৮ দল ভেঙ্গে যায়নি, তবে জামায়াত সক্রিয় নয়। এখন জোটের এবং ভোটের রাজনীতিতে মেরুকরণ কি হবে, সে ব্যাপারেও বিএনপি নিশ্চিত নয় এবং চিন্তার দিক থেকে অগোছালো। কারণ, বিএনপির অনেকের মধ্যে এই মুহূর্তে জামায়াত সম্পর্কে সন্দেহ, অবিশ্বাসের প্রশ্নটি বেশি মাত্রায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে বিএনপি এখনও যে একলা চলো নীতি গ্রহণ করেছে তা নয়, কারণ তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে আন্দোলন এবং আগামী নির্বাচন নিয়ে নানা হিসাব নিকাষ করছে। সেক্ষেত্রে বিএনপির পক্ষে জামায়াতকে বিয়োগ করে কতোটা এগোনো সম্ভব, তাও তারা বিবেচনা করছে দেখছে। কিন্তু দূরত্বেও যে একটা সৃষ্টি হয়েছে তাতো কোনো সন্দেহ নেই।

অন্যদিকে, তরুণদের প্রতিবাদ জামায়াতকে নিদারুণ এক রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এখন তারা পরিপূর্ণভাবে একা।।