Home » বিশেষ নিবন্ধ » মানুষের বিভেদ ও ঐক্য – সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গ – ৫

মানুষের বিভেদ ও ঐক্য – সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গ – ৫

আনু মুহাম্মদ

Anu_Mohammad-2দখলদার বা আক্রমণকারীরা কোথাও কোথাও যেমন দলনির্বিশেষে মুসলমান হয়ে যায়, আবার যেখানে শিকার জাতিগত সংখ্যালঘু,সেখানে দলনির্বিশেষে হয়ে যায় বাঙালি। পার্বত্য চট্টগ্রামে তাই জাতিগত সহিংসতা, সামরিকীকরণ, নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ, জমিপাহাড় দখল ইত্যাদিতে কখনও বাঙালি কখনও মুসলমান হবার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির ঐক্য ঠিকই টিকে থাকে।

মুসলিম সমাজের মধ্যে ভিন্ন বিশ্বাসের কারণে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেকার বিভিন্ন সংখ্যালঘুদের সামাজিক নানা নিপীড়ন ও চাপের কাহিনী সমাজের মনোযোগ না পেলেও এর তিক্ত অভিজ্ঞতায় বহু পরিবারই বিপর্যস্ত। আহমদিয়াবিদ্বেষ এবং তাদের ওপর আক্রমণ এদিক থেকে সবচাইতে উচ্চকিত। প্রকাশ্যে ওয়াজে, রাজনৈতিক বক্তৃতায় ‘ধর্মদ্রোহী’ ঘোষণা করে তাদের নির্মূলের কিংবা তাদের বিরুদ্ধে জেহাদের ঘোষণা আসে।

.

সাম্প্রদায়িকতা একটা বিভেদ ঘৃণা আর গ্লানিকর মন আর তৎপরতার নাম। সাধারণভাবে ধর্মীয় এক সম্প্রদায়ের প্রতি অন্য সম্প্রদায়ের ঘৃণা, বিদ্বেষ, বৈষম্য, সহিংসতা বোঝাতেই এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। তবে আগেই বলেছি, সম্প্রদায়ের পরিচয় কেবল ধর্ম দিয়ে হয় না। জাতি, ভাষা, বর্ণ, অঞ্চল নানাভাবে একটি সম্প্রদায় পরিচিত হতে পারে। এরকম কি কোনো সমাজ আমরা পাবো যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ে সংঘাত হচ্ছে, কিন্তু অন্যান্য জাতি, ধর্ম, ভাষা বা লিঙ্গীয় পরিচয়ে ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোন সংঘাত বা বৈষম্য নাই? বা শ্রেণীগত শোষণ নিপীড়ন নাই? না, এরকম পাওয়া যাবে না। বৈষম্যের শেকড় যদি সমাজে থাকে,তা বহুভাবে প্রকাশিত হয়। বৈষম্য ঘৃণা, বিদ্বেষ, ডালপালা ছড়ায়। এক বৈষম্য ঢাকতে গিয়ে অন্য বৈষম্য বা বিভেদ সামনে আনতে সবসময়ই তৎপর থাকে, এই বিভেদ বা বৈষম্য থেকে সুবিধাভোগী ক্ষমতাবানরা।

সম্প্রদায়গত বোধ মানুষের থাকেই। একজন ব্যক্তি এককভাবে চলতে পারে না, সবসময় সমষ্টিকে খোঁজে। শ্রেণী, ভাষা, জাতীয়তা, বর্ণ, লিঙ্গ, গোত্র, অঞ্চল, দেশ, ধর্মবিশ্বাস ইত্যাদি নানা পরিচয়ে মানুষ আরও অনেকের সঙ্গে নিজের যুক্ততা বোধ করে। কিন্তু সবপরিচয় একসাথে একইধরনের সামষ্টিক বোধ তৈরি করে না বলে পারিপার্শ্বিকতার কারণে, একটাকে ভেদ করে অন্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনটি সমাজে প্রাধান্য বিস্তার করবে তা নির্ভর করে, ঐ সমাজের রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক চেতনা ও সক্রিয়তার ওপর। সমাজ ও রাষ্ট্রে যারা ক্ষমতাবান তাদের জন্য ধর্ম, জাতি, বর্ণগত এমনকি আঞ্চলিক বিভেদ বা সংঘাত প্রায়ই একেকটি সুযোগ হিসেবে কাজ করে। নিপীড়িত মানুষের মুক্তির লড়াইকে মোকাবিলা করতে গিয়ে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে, বিভিন্ন দেশে তারা এসব বিভেদকে উস্কানি দিয়েছে, ঢাল হিসেবেও ব্যবহার করেছে। শ্রেণী লিঙ্গ তো বটেই, জাতি ধর্ম পরিচয়ে কেউ নির্যাতিত হলে, তার বিরুদ্ধে লড়াই আর নিপীড়নের জন্য জাতি ধর্ম পরিচয়কে উস্কানি দিয়ে সংঘাত তৈরি করা এককথা নয়।

মানুষের মধ্যে কোনো কোনো পার্থক্য বিভেদ বা বৈষম্য তৈরি করে। আবার কোনো কোনো পার্থক্য আনে বৈচিত্র। পার্থক্য বা বৈচিত্র মানেই তা বৈষম্যের কারণ হতে পারে না। প্রাকৃতিক ভাবে বা জন্মগতভাবে মানুষ যেসব পরিচয় লাভ করে অর্থাৎ গায়ের রং, গঠন, লিঙ্গ, ধর্মবিশ্বাস, জাতি, ভাষা, সংস্কৃতি ইত্যাদিতে একজন ব্যক্তির কোনো হাত নাই, এসব ক্ষেত্রে পার্থক্য মানুষের মধ্যে বৈচিত্র আনে। এই বৈচিত্র সমাজকে সমৃদ্ধ করে।

কিন্তু পার্থক্যকে ভর করে কোনো সম্প্রদায়ের যদি অধিকার ও ক্ষমতা সংকোচন করা হয়, তাহলে এই পার্থক্যই বৈষম্যের আকার নেয়। আবার একই ভাষাভাষী বা ধর্ম বা লিঙ্গের মধ্যেও বৈষম্য আসতে পারে। মালিকানা, সম্পদের ওপর অধিকার, শিক্ষা চিকিৎসা জীবন ও জীবিকা, স্বাধীনতা, সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ক্ষমতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে যখন সমাজে গভীর পার্থক্য তৈরী হয় তখনই দেখা দেয় শ্রেণীগত বৈষম্য। এসব বৈষম্য যখন থেকে তৈরি হয়েছে,তখন থেকে এর বিরোধী লড়াইও সমাজের অবিচ্ছেদ্য ভাষায় পরিণত হয়েছে, যা তৈরি করে মানুষের মানবিক সংহতি, নারী পুরুষ ধর্ম জাতি ভাষাগত পার্থক্য সাথে নিয়েই। বৈষম্য নিপীড়ন আধিপত্য বিরোধী সেই সংহতি সম্প্রদায়গত সংহতি থেকে মৌলিকভাবেই ভিন্ন এক বিকশিত ঐক্য, যা অপ্রযোজনীয় বিভেদকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়। সাম্প্রদায়িকতার ঘৃণ্য মন ও অপশক্তি পরাজিত করতে মানুষের সেই ঐক্য ও সংহতির বিকাশে রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শিক সক্রিয়তাই একমাত্র রক্ষাকবজ হতে পারে। এক্ষেত্রে যেদেশে যারা ধর্মীয় বা জাতিগতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ তাদেরই দায়িত্ব বেশি।।