Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – রাশেদ খান মেনন

সাক্ষাৎকার – রাশেদ খান মেনন

 জামায়াতের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হলে তা হবে আত্মঘাতী

menon-1রাশেদ খান মেনন, মহাজোটের শরীক দল ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে ঢাকার শাহবাগে তীব্র প্রতিবাদ, তরুণদের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ, সরকারের ভূমিকাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন, আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার: জাতীয় সংসদে জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার রায়ের ব্যাপারে হতাশা ব্যক্ত করে আপনি বলেছিলেন, সাপের মুখে চুমু দিতে নেই। সুযোগ পেলে সাপ ছোবল দেবে। আপনি কি মনে করেন, সরকার জামায়াতের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে?

রাশেদ খান মেনন: প্রশ্নটি ওই জায়গা থেকে এসেছে যে, বিচারের রায়ে ৬টি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে আদালত রায় দিয়েছে। কিন্তু আদালত সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড দেয়নি। ফলে এক ধরনের হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা বিস্মিত হলাম এ কারণে যে, সরকার হঠাৎ করে জামায়াতের ব্যাপারে সহনশীল আচরণ শুরু করেছে। তাদেরকে দুই বছর পরে প্রকাশ্যে সভাসমাবেশ করার সুযোগ দেয়া হয়। আর তারাও এই সুযোগ নিয়ে পুলিশকে দিনে রজনী গন্ধা দিচ্ছে, আবার রাতের বেলায় ককটেল দিয়ে মানুষ মারছে। এতে জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি না হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। এটা আত্মঘাতী হবে এ কারণে যে, জামায়াতকে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে অদ্যাবধি দেশদ্রোহী ও গণবিরোধী। সুতরাং আমরা বরাবর এটা দেখেছি যে, জামায়াত খোলস পরিবর্তন করে বিভিন্ন সময়ে কারো না কারো কাঁধে সওয়ার হওয়ার চেষ্টা করেছে। সামরিক সরকারগুলোর সময়ে জামায়াত ভালো ভাবেই সওয়ার হয়েছিল। জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার যে প্রশ্ন সে বিষয়ে বলতে চাই, জামায়াতের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হলে তা হবে সরকারের জন্য আত্মঘাতী। তবে কোনো সমঝোতা আছে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এক ধরনের সংশয়, এক ধরনের দ্বিধার প্রশ্ন তো রয়েছেই। রায়ের ব্যাপারে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি তো হয়েছেই।

আমাদের বুধবার: সমঝোতা হলে তা সরকারের বিপক্ষে কি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে?

রাশেদ খান মেনন: আমি সরকারকে সতর্ক করেছি এবং বলেছি যে, এ ধরনের কোনো মনোভাব কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরঞ্চ আমার মনে হয়েছে, যে দৃঢ়তা নিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, সে ক্ষেত্রে কোন অভাব আছে বলে আমার মনে হয় না। প্রসিকিউশন, ইনভেস্টিগেশন টিমের দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এটা আমরা বার বার বলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সরকার এ বিষয়টিকে আমলে নেয়নি। এ ধরনের দুর্বলতাগুলো জনগণ কখনই সহজভাবে নেয় না।

আমাদের বুধবার: আপনি বলছিলেন যে, জামায়াতকে বিশ্বাস করা যায় না। তাহলে কি আপনার ধারণা, জামায়াত তার বর্তমান অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে?

রাশেদ খান মেনন: জামায়াতের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। জামায়াত স্পষ্টই বুঝতে পারছে যে, তাদের পেছানের কোনো পথ নেই। আবার সরকারেরও পেছানের কোনো পথ নেই। এখানে সাময়িক সময় ক্ষেপণের সুযোগ নিতে পাওে, কিন্তু জামায়াত ভালো করে জানে, এই বিচারের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই।

আমাদের বুধবার: রাযের পরে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গিযেছে, তার প্রভাব রাজনীতিতে কতোটা পড়বে বলে আপনি মনে করেন?

রাশেদ খান মেনন: এটা রাজনীতিকে তো এগিয়ে দিল। রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে মানুষকে এই জায়গায় নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছিল, কিন্তু হচ্ছিল না। মানুষের মনের মধ্যে যখন ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, তখন তার প্রকাশ তারা ঘটিয়েছে। এই ক্ষোভ যুদ্ধাপরাধ বিরোধী রাজনীতিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।

আমাদের বুধবার: সরকার কতোটুকু নমনীয় বলে আপনার কাছে মনে হচ্ছে?

রাশেদ খান মেনন: এখন পর্যন্ত কোনো নমনীয়তা দেখছি না, তবে দুর্বলতা আছে। ট্রাইব্যুনাল গঠন, প্রসিকিউশন, সাক্ষী সুরক্ষা, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে দুর্বলতা বা জনজমায়েতের ক্ষেত্রে মনোযোগী না হওয়ার দুর্বলতা আছে। কিন্তু বিচারের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা রয়েছে।

আমাদের বুধবার: রায়ের ব্যাপারে যে প্রতিবাদ দেখানো হয়েছে ট্রাইব্যুনালের উপরে এর কি প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে?

রাশেদ খান মেনন: আমার ধারণা, আদালত পাবলিক সেন্টিমেন্টকে ভালো ভাবে বুঝতে পারবেন। তারা মানুষকে নিয়েই কাজ করেন এবং জনগণের ভাবাবেগ, চেতনাবোধকে তাদের বিবেচনার মধ্যে নিতে হবে। শুধু মাত্র আইনকে আক্ষরিক ব্যাখ্যাটাই যথেষ্ট নয়।

আমাদের বুধবার: যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে তরুণদের আঙ্খাকার প্রতি সরকার কতোটা সুবিচার করতে পেরেছে?

রাশেদ খান মেনন: এটা আপেক্ষিক বিষয়। তরুণরাও তো এতদিন বিভিন্ন বিষয়ে নির্লিপ্ত মনোভাব দেখিয়েছিল। একটা ঘটনা তাদের মধ্যে ত্বড়িৎ ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে ঠিকই, কিন্তু এতোদিন যে প্রক্রিয়াগুলো ছিল তাতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল তা নয়। তারা এবারে মানসিকভাবে আঘাত পাওয়াতে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তবে আমি আশা করবো, রায় নিয়ে তরুণদের যে প্রতিবাদ বিক্ষোভ, তা থেকে সরকার শিক্ষা নেবে।

আমাদের বুধবার: এই প্রতিবাদে সরকারের প্রতি কতোটা চাপ সৃষ্টি হলো বলে আপনি মনে করেন?

রাশেদ খান মেনন: তরুণদের প্রতিবাদে সরকারের উপরে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তরুণদের বিক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ সরকারকে আরো দৃঢ় হতে সাহায্য করবে।

আমাদের বুধবার: রায়ের পরে তরুণরা যে রাজপথে নেমে আসবে এটা কি সরকারের কাছে প্রত্যাশিত ছিল বলে আপনি মনে করেন?

রাশেদ খান মেনন: না, প্রত্যাশিত ছিল না। তরুণ সমাজ ২০০৮ সালের নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। কিন্তু তারা যে এভাবে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে রায়ের ব্যাপারে এগিয়ে আসবে, তা হিসেবের বাইরে ছিল।

আমাদের বুধবার: আপনি কি মনে করেন তরুণদের সঙ্গে সরকারের মানসিক দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে?

রাশেদ খান মেনন: একটু তো হয়েছে বটেই। কিন্তু এই তরুণদের প্রতিবাদ সরকারকে সুদৃঢ় হতে সাহায্য করবে। তবে তরুণদের মধ্যে স্বপ্নভঙ্গ বা মোহোমুক্তির সৃষ্টি হয়েছে তা বলা যাবে না, তবে তাদের মধ্যে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

আমাদের বুধবার: বিএনপি’র ভূমিকাকে আপনি কিভাবে দেখেন?

রাশেদ খান মেনন: খুবই খারাপ। কারণ তারা তো এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়াই ব্যক্ত করেনি। তারা যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আমার ধারণা, বিএনপি জামায়াতের কাছ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না? বিএনপি এখন জামায়াতের লেজে পরিণত হয়েছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

আমাদের বুধবার: একজন মন্ত্রী বলেছেন, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে আইন কানুন দেখা হচ্ছে। আপনার বক্তব্য কি?

রাশেদ খান মেনন: আমাদের অবস্থান সব সময় একই। আমরা চাই জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হোক। আমি পার্লামেন্টেও এই ব্যাপারে বলেছি। তবে সে দাবি বাস্তবায়িত হবে কি হবে না, তা একটি ভিন্ন প্রসঙ্গ।

আমাদের বুধবার: জনমনে একটা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে যে, সরকারের সঙ্গে জামায়াতের সমঝোতা হয়েছে। এটা কি দূর হবে?

রাশেদ খান মেনন: এটা ঘটনাবলীর মধ্যদিয়েই দূর হবে। ইতোমধ্যে কিছুটা দূর হয়েছে। তবে রায় নিয়ে সংশয় সন্দেহ তো আছে এবং থাকবে। অবশ্য এমনভাবে প্রচার প্রচারণাও চলছে। একদিকে বিএনপি, জামায়াত, অন্যদিকে কিছূ উগ্রতাত্ত্বিক বোদ্ধারা রয়েছেন, যারা সব সময় এমন প্রচারে লিপ্ত।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।