Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমদ

সাক্ষাৎকার – আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমদ

জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে সরকার

এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি আইনমন্ত্রী

Law minister-1ব্যারিস্টার শফিক আহমদ, বর্তমান সরকারের আইনমন্ত্রী। জামায়াতশিবিরকে নিষিদ্ধ করার দাবি, সরকারের সিদ্ধান্ত, যুদ্ধাপরাধ বিচারে আপিল আইন সংশোধন, শাহবাগের আন্দোলনসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন।

আমাদের বুধবার: কয়েকজন মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় নেতা বলেছেন, জামায়াতশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে সরকার ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। আইনমন্ত্রী হিসেবে এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি?

শফিক আহমদ: জামায়াতশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে সরকার এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এ ব্যাপারে কোনো আলোচনাও হয়নি। যারা নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়ার ব্যাপারে বক্তব্য দিয়েছেন, আমি জানি না, এটা ব্যক্তিগত কিনা। এখনও কিন্তু এই ধরনের আলোচনা মন্ত্রিসভা বা কোনো পরিসরে হয়নি। এক কথায়, এ ব্যাপারে কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হয়নি। হয়তো নিজে নিজে বা কারো সঙ্গে আলাপ করে, তারা বলতে পারেন। তবে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে আমি জানি না।

আমাদের বুধবার: নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত আছে কিনা?

শফিক আহমদ: আমার জানা মতে, কোনো সিদ্ধান্ত নেই।

আমাদের বুধবার: তাহলে যে দাবি উঠেছে, জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে, সেক্ষেত্রে আপনার বক্তব্য কি?

শফিক আহমদ: শাহবাগ চত্বরসহ সর্বত্র একটা দাবি উঠেছে, জামায়াতশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। সে সম্পর্কে আমি ব্যক্তিগতভাবে যতোটুকু জানি, সরকারি মহলে বা কোনো পর্যায়ে এ ব্যাপারে আলোচনা আসেনি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো বিষয় উঠেনি।

আমাদের বুধবার: এ দাবি আপনাদের কতোটা ভাবিয়ে তুলেছে?

শফিক আহমদ: আমাদের ১৯৭২ সালের যে সংবিধান ছিল, তার ৩৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে, ধর্মীয় নামযুক্ত কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠন হতে পারবে না। ১৯৭৫ সালের সামরিক শাসন জারির পর ১৯৭৭ সালে ৩৮ অনুচ্ছেদের বিধিনিষেধটি বাদ দেয়া হয়। আর সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে যেখানে ধর্ম নিরপেক্ষতার জন্য সরকার কী কী করবে বা করবে না, তাও বাদ দেয়া হয়। এ প্রেক্ষিতে জামায়াত পরবর্তীকালে আবার রাজনীতি করার সুযোগ পায়। এখন আবার সংবিধান পরিমার্জিত হয়েছে এবং যে আরপিও আছে, সেখানেও কিন্তু বিধান আছে, যে সব রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত হতে চায় বা আছে, তাদের সংগঠনের আদর্শউদ্দেশ্য যদি সংবিধানের সঙ্গে সাংর্ঘষিক হয়, তাহলে সে সব সংগঠনের নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের আছে। নির্বাচন কমিশন আইনটিকে পরীক্ষানিরীক্ষা করছে বলে সংবাদ মাধ্যমের কাছ থেকে জানতে পেরেছি।

আমাদের বুধবার: তাহলে, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো যাতে রাজনীতি করতে না পারে, সে রকম চিন্তাভাবনা আপনারা করছেন কিনা?

শফিক আহমদ: না, আমি তো বলেছি, নানা দিক থেকে একটা দাবি উঠেছে। আমার জানা মতে, সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বা আলোচনায় আসেনি।

আমাদের বুধবার: চিন্তার মধ্যে কী আছে?

শফিক আহমদ: জামায়াতশিবির যে তাণ্ডব করে যাচ্ছে এবং তা যে সন্ত্রাসী রূপ যেভাবে ধারণ করছে, তাতে করে কোনো এক সময় সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। কারণ, কোনো রাজনৈতিক দলকে এভাবে মানুষের জীবনকে বিপন্ন করা, সম্পত্তি নষ্ট করা, গাড়ি বা বাসে আগুন দেয়া, মানুষকে মেরে ফেলা এগুলোকে কখনই আইনের শাসন আশ্রয়প্রশ্রয় দিতে পারে না, এটা আইনের শাসনবিরোধী।

আমাদের বুধবার: শাহবাগের আন্দোলনে দুটি অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি এবং অন্যদিকে জামায়াতশিবিরের রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে। যেহেতু জামায়াতশিবিরের রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি, তাহলে কী শাহবাগে সমবেতরা আশাহত হবে না?

শফিক আহমদ: দাবি এসেছে, এটা নিয়ে হয়তো আলাপআলোচনা হবে। তাদের দাবিকে আমরা নাকচও করছি না, গ্রহণও করছি না। এটা সময়ের ব্যাপার বলে আমার কাছে মনে হয়।

আমাদের বুধবার: আপিল আইন সংশোধনে রেস্ট্রোস্পেকটিভ এফেক্ট (ভূতাপেক্ষ) দেয়া হয়েছে। এটি আইনে কতোটা যুক্তিযুক্ত?

শফিক আহমদ: ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো ২১ ধারা মতে যেখানে আপিলের বিধান ছিল, তাকে আংশিক সংশোধন করা হয়েছে। এখন যে সংশোধনী, তাতে সমতায়ন করা হলো। সমতাটি হলো এই যে, যদি কোনো অভিযুক্ত দণ্ডিত হয়, তাহলে আগে আপিলের অধিকার ছিল না, কিন্তু এখন আপিলের ক্ষমতা থাকছে। সরকার বা সংক্ষুব্ধ দু’পক্ষই এই ধরনের সুযোগ পাবে। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান সুযোগ লাভের অধিকারী, যা ২৭ অনুচ্ছেদ বা অন্যান্য মৌলিক অধিকারে বলা আছে। কাজেই এ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের কোনো সুযোগ নেই। আমরা সুযোগটা দিয়েছি যে দন্ডিত হবে তাকেও। কাজেই রেস্ট্রোস্পেকটিভ এফেক্ট (ভূতাপেক্ষ)-এ কোনো অসুবিধা নেই। যে আইন বিদ্যমান এবং আপিল আইন সংশোধনের মাধ্যমে সমান সুযোগ দেয়া হয়েছে। আইনের সমতা সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হয়, এটাই আমরা করছি। কাজেই কোনো বৈষম্যে বা কারো অধিকার খর্ব করা বা ক্ষুন্ন করার প্রশ্নই আসে না।

আমাদের বুধবার: যেখানে আপনারাই বলছেন, জামায়াতশিবিরকে নিষিদ্ধ করার দাবি শাহবাগসহ সারাদেশ থেকেই উঠেছে। কিন্তু বলছেন যে, আপনাদের এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেই

শফিক আহমদ: না, এটা সময়ই বলে দেবে কী করা, কী না করা সেটাই আমি বলতে চাইছি। আমরা তো নাকচ করে দিচ্ছি না। আমরা বলছি, সময় নিশ্চয়ই বলে দেবে।

আমাদের বুধবার: এ সময়টি কবে আসবে?

শফিক আহমদ: এটা নির্ভর করে। এটা নির্ভর করছে, অনেক কিছুর উপরে। এ নিয়ে বসতে হবে, সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এটা একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এর সঙ্গে অনেক বিষয়ই জড়িয়ে আছে। দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত আসতে পারে, পরে মন্ত্রিসভায় আসতে পারে। সব কিছু মিলিয়ে এটা সময়ের ব্যাপার। আমি বলবো, ওয়েট অ্যান্ড সি।

আমাদের বুধবার: শাহবাগ আন্দোলনকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

শফিক আহমদ: শাহবাগ আন্দোলন জনগণের একটি প্রত্যাশা। প্রত্যাশাটা হলো, ১৯৭১ সালে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, অর্থাৎ গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, এক কোটিরও বেশি মানুষকে গৃহহারা করে বন্ধু ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিল্ল­­­, সে সব অপরাধীদের বিচার করাটা প্রত্যেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেরই একটি দায়িত্ব। কারণ, তা না হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। আর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে, গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে না। আবার ক্ষতিগ্রস্তরাও সুবিচার থেকে বঞ্চিত হবে। যদি এটা না করা হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে, আমরা মাফ করে দেয়ার সংস্কৃতি লালন করছি। দেশেবিদেশেও আমরা বলে আসছি, এতোদিন পরে হলেও বিচার কাজের যুক্তিকতা কী? বিদেশিরাও মেনে নিয়েছেন যে, যারা অপরাধ করেছে অপরাধীদের মাফ করে দেয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।

আমাদের বুধবার: রায় সম্পর্কে শাহবাগসহ যারা বিচার চান তারা এবং অপরদিকে জামায়াতও বলছে, তারা রায় মানেন না। এ সম্পর্কে আপনি কি বলবেন?

শফিক আহমদ: এটা হলো আদালতের বিষয়। আদালত রায় দিয়েছে। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আপিলের বিধান রাখা হয়েছে। চূড়ান্ত রায় সেখান থেকেই আসবে। আর সেটা সবাইকে মানতেই হবে, সেটা যেদিকেই যাক।

আমাদের বুধবার: কবে নাগাদ যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শেষ হবে?

শফিক আহমদ: এটা একটা চলমান বিচার প্রক্রিয়া। নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় যে, ওই দিন, ওই মাস বা ওই বছরে এ কাজ শেষ হবে। বিচার কাজ নিরপেক্ষভাবে, পরিষ্কার, স্বচ্ছতার সঙ্গে চলছে। সম্পূর্ণ আইনি বিধান মেনেই বিচার কাজ চলছে। কাজেই, সময় তো দিতেই হবে।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।