Home » রাজনীতি » আতঙ্কে মানুষ, ভয়াবহ সঙ্কটে দেশ

আতঙ্কে মানুষ, ভয়াবহ সঙ্কটে দেশ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

politics-1-দীর্ঘসময় ধরে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যকার সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে মানুষ এতদিন ভয়ের মধ্যে ছিল, ছিল তাদের মধ্যে নানা শঙ্কা এবং উৎকণ্ঠা। কিন্তু বর্তমানে এসে এই ভয় রূপ নিয়েছে ভয়াবহ আতঙ্কে। শঙ্কা, উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা পরিণত হয়েছে অনেক বড় প্রশ্নে। কারণ রাজনীতির মাঠ এখন আর শান্ত নয়, দারুনভাবে অশান্ত। জামায়াতশিবিরের ঝটিকা মিছিল, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, মৃত্যু এসব এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এ সব সংঘর্ষে সাধারণ মানুষ নিহত এবং সম্পদহানির ঘটনার কারণে আতঙ্ক বেড়েছে। আতঙ্ক বেড়েছে বিবাদমান পরিস্থিতির কারণে। শাহবাগের সমাবেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্লগার রাজিব হায়দারের মৃত্যু এবং তরুণদের ইচ্ছার কারণে সমাবেশ দীর্ঘায়িত হয়েছে। সব মিলিয়ে আতঙ্ক, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তার এমন পরিস্থিতি সাধারণ মানুষ দীর্ঘকাল প্রত্যক্ষ করেনি। এ কারণে সবার মুখে এখন একই প্রশ্ন, একই উচ্চারণ আসলে কী হচ্ছে? আমরা কোথায় যাচ্ছি? সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সবার মনের গভীরে আছে, তাহলো, দেশের ভবিষ্যত কী? বর্তমান পরিস্থিতি বিরাজমান এবং অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তাই এখন প্রধান বিবেচ্য। তবে এ কথা হলফ করে বলা যায়, আমজনতা তো বটেই, যারা রাজনীতির কুশীলব তারাও কি বলতে পারবেন, দেশ কোন পথে যাচ্ছে?

ক্ষমতাসীনদের দিক থেকে বিবেচনা করা হচ্ছে যে, তারা লাভবান হয়েছেন। তাদের এই বিবেচনার ভিত্তিটা হচ্ছে, রায়ের বিপক্ষে তরুণসহ বহু মানুষকে সমবেত করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শ্লোগানকে আরো উচ্চকিত করার মধ্যদিয়ে তারা আগামী নির্বাচনে লাভবান হবেন এমন আশা। এই লাভের বিষয়টি তারা শেষ পর্যন্ত ধরে রাখার চেষ্টা শুরু করে দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে তারা রাজনীতির মেরুকরণের যে চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে যাচ্ছিলেন এবং কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিলেন, তাদের ধারণা, তাতে তারা সফল হয়েছেন। তাদের মতে, যুদ্ধাপরাধের রায়ের মধ্যদিয়ে তাদের এই কাজটি তরুণ সমাজ খুব সহজেই করে দিয়েছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হচ্ছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধের বিচার, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের যে প্রতিশ্র“তি তারা দিয়েছিলেন, তখন তরুণরা যতোটা সহজে বিষয়টিকে বিশ্বাস করেছিলেন, বশীভূত হয়ে ভোট দিয়েছিলেন, এবারের বিষয়টি ততোটা সহজ নয়। তবে তরুণরা যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিটিকে যে সামনে নিয়ে আসতে পেরেছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই আন্দোলন তরুণদের কাছে মনোজগতে বহুমাত্রিক হলেও, বিক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছে রায়ের মধ্যদিয়ে। এখানে আরেকটি বিষয় বলতেই হবে তরুণদের ক্ষোভের সূচনা কিন্তু ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আতাতসমঝোতার মতো একটি বড় সন্দেহ, শঙ্কাকে ঘিরে। আওয়ামী লীগ প্রথম দুই তিন দিনে, এ কারণে শাহবাগের ধারে কাছে ঘিষতে না পারলেও, শেষ পর্যন্ত তারা ওই সমাবেশকে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করেছে এবং খানিকটা যে সফল হয়নি তা নয়। তবে ২০০৮ এবং ২০১৩ তরুণদের কাছে এক না হলেও, বিএনপির ভূমিকার কারণে তারা আগামী নির্বাচনে কি করবেন, এটি একটি প্রশ্ন হিসেবেই থেকে যাচ্ছে।

কিছুদিন আগ পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক সাংর্ঘষিক পরিস্থিতি বড় দুই দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন এই সাংর্ঘষিক পরিস্থিতি ত্রিমুখী অর্থাৎ জামায়াত এখানে যুক্ত হয়েছে। তবে জামায়াতের সংযুক্ত হওয়ার বিষয়টি ভিন্ন। তাদের সংযুক্তি শুধু যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দ্বিদলীয় ব্যবস্থা বিদ্যমান। দুই বড় দলকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে দুটি ধারা। যুদ্ধাপরাধের রায়ের মধ্যদিয়ে এই মেরুকরণ আরো স্পষ্ট এবং দৃশ্যমাণ হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বিএনপি বিদ্যমান রাজনীতিতে পিছিয়ে পড়েছে, বিশেষ করে তরুণদের কাছ থেকে। বিএনপির ভূমিকা নিয়ে তরুণদের মনে একটি প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির পক্ষে এই প্রশ্নটির মীমাংসা খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না। যুদ্ধাপরাধের রায়ের পরে শাহবাগের সমাবেশকে বিএনপি প্রথমে বিবেচনার মধ্যেই নেয়নি। সাত দিন পরে তরুণদের শুভেচ্ছা জানানোর বিবৃতিটি বিফলে গেছে। যেমন বিফলে গেছে ১২ দিন পরে তরুণদের সজাগ থাকার পরামর্শ দিয়ে খালেদা জিয়ার বিবৃতিটিও। এই বিবৃতি যদি প্রথম দুই একদিনের মধ্যে দেয়া হতো, তাহলে বিএনপির সঙ্গে তরুণদের দূরত্বের সৃষ্টিটা এমন হতো না। বিএনপি শাহবাগের ঘটনার পরে জামায়াতকে নিয়ে জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করার ক্ষেত্রেও বেশ বড় এক ঝামেলায় পড়েছে। আন্দোলননির্বাচনে জামায়াতকে সঙ্গে নেয়া বিএনপির পক্ষে এখন অসম্ভব একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীন এবং তাদের বন্ধুরা দীর্ঘকাল ধরে জামায়াতকে বিএনপি থেকে আলাদা করে চাইছিল নানা পথে, নানা কৌশলে। সাম্প্রতিক ঘটনায় তারা বেশ সফল হয়েছে বলে মনে হয়। কিন্তু এ কথাও ঠিক যে, তরুণদের চাপে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাত ও সমঝোতা যে ভেস্তে গেছে, সেক্ষেত্রে অবশ্য বিএনপি লাভবান হয়েছে।

বর্তমানে যে একটি সাংর্ঘষিক পরিস্থিতি রয়েছে এবং এই পরিস্থিতি রাজনীতির মূল সঙ্কটকে আরো সঙ্কটাপন্ন করে ফেলেছে। যদিও আওয়ামী লীগ মনে করছে, যতো কিছুই হোক আওয়ামী লীগ লাভবান হয়েই আছে। আগামী নির্বাচন দলের অধীনে হবে বলে আওয়ামী লীগ অনঢ় অবস্থানে রয়েছে। আওয়ামী লীগ মনে করছে, যুদ্ধাপরাধের রায় নিয়ে সৃষ্ট সাংর্ঘষিক পরিস্থিতি যতো দীর্ঘায়িত হবে, ততোই নির্বাচন নিয়ে আলাপআলোচনা এবং সঙ্কটের প্রশ্নটি ধামাচাপা পড়ে থাকবে। বাস্তব অবস্থাটি কিন্তু সে রকম নয়। নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে, না নির্দলীয় ভিত্তিতে হবে, সে নিয়ে বড় দুই দলের চলমান যে বিবাদ, সংঘাত তা ভবিষ্যতে একটি বড় বিষয় হিসেবে উঠবেই। এটিকে এড়ানোর কোনো পথ নেই। কারণ এই প্রশ্নের মীমাংসা ছাড়া দেশ পরিচালনার মূল রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান হবে না। এমনটা অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে, অন্তত মার্চ মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ক সঙ্কট প্রশ্নে একটি আলাপআলোচনা, তা প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে হোক, সূচনা হবে। কিন্তু তা অনির্দিষ্টকালের জন্যে পিছিয়ে গেছে। এতে বিদ্যমান সঙ্কট আরো গভীরতর হলো। এখন হয়তো ক্ষমতাসীনরা বিষয়টিকে কূটকৌশলের কারণে এড়িয়ে যাচ্ছে বা সব সঙ্কটের উত্তরণ হয়েছে বলে মনে করছে। কিন্তু এড়িয়ে গেলেই যে সঙ্কটের ইতি ঘটবে তা নয়। বরং এর মধ্যদিয়ে ভবিষ্যতের জন্য তারাই তাদের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সঙ্কট জমা করে রাখলো। সঙ্গে সঙ্গে গভীর সঙ্কটের মধ্যে ফেলে দেয়া হলো দেশকে এবং দেশের ভবিষ্যত রাজনৈতিক ধারাকে। দীর্ঘমেয়াদে এতে ক্ষতির মুখে পড়লো দেশের মানুষ এবং পুরো দেশ।

কিন্তু নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান করতেই হবে। কিন্তু এ বিষয়টি এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ক্ষমতাসীনদের মনে রাখতে হবে, শেষ বছরে এসে এ বিষয়টি অমীমাংসিত রেখে সঙ্কট উত্তরণের কোনো পথ নেই।

বর্তমান পরিস্থিতি, নির্বাচন নিয়ে অমীমাংসিত প্রশ্ন, জনমানুষের দিনযাপনের সঙ্কট সব মিলিয়ে জনমনে আতঙ্ক আছে। আর এই আতঙ্কের মধ্যদিয়ে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে নানা শঙ্কার। সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে, তাহলো, যে গভীর সঙ্কটে দেশ পড়েছে, তা থেকে উত্তরণের উপায় কি? সঙ্কট উত্তরণে এখনই পদক্ষেপ না নিলে দেশের ভবিষ্যত, রাজনীতি, গণতন্ত্রসহ সার্বিকভাবে পরিস্থিতি কি দাঁড়াবে তা নিয়ে সবাই চিন্তিত। মনে রাখতে হবে, ষড়যন্ত্রকারীরা সঙ্কটকালীন সময়কেই তাদের জন্য উত্তম সময় হিসেবে মনে করে।।