Home » অর্থনীতি » ইউরোপেই ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনার শঙ্কা

ইউরোপেই ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনার শঙ্কা

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

Public domain image, royalty free stock photo from www.public-domain-image.comবিশ্ব এখন পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এ ধরণের বিপদের আশঙ্কা অনেক বেশি। মেইঞ্জের ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর কেমিস্ট্রির বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে চেরনোবিল ও ফুকুশিয়ার মতো পারমাণবিক দুর্ঘটনা। এমনকি আগে যেমনটা আশা করা হয়েছিল, বিপদের ঝুঁকি তার চেয়ে ২০০ গুণেরও বেশি। গবেষকেরা আরো দেখিয়েছেন, এ ধরণের ভয়াবহ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তেজষ্ক্রিয় সিজিয়াম১৩৭এর অর্ধেক পারমাণবিক চুল্লি থেকে এক হাজার কিলোমিটার দূরবর্তী এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাদের সমীক্ষা অনুযায়ী, পশ্চিম ইউরোপ প্রায় প্রতি ৫০ বছরে একবার করে বিপজ্জনক মাত্রায় পারমাণিক দূষণের শিকার হতে পারে।

মেইঞ্জের ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, আগে যতটুকু মনে করা হতো, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা তার চেয়ে অনেক বেশি। ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও গবেষক দলটির প্রধান জস লেলিভেল্ড বলেন, ‘ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর এর পুনরাবৃত্তির আশঙ্কার সৃষ্টি হয় এবং আমাদের পারমাণবিক মডেলে তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ে পরীক্ষা করতে শুরু করি।’ সমীক্ষায় দেখা যায়, বিশ্বে এখন যতগুলো পারমাণবিক চুল্লি সক্রিয় রয়েছে, তার একটিতে ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে একবার দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে ৪৪০টি পারমাণবিক চুল্লি সক্রিয় রয়েছে, এবং আরো ৬০টি পরিকল্পনায় আছে।

পারমাণবিক চুল্লির মূল উপাদান গলে যাওয়ার আশঙ্কা নির্ণয় করতে গবেষকেরা সাধারণ হিসাব প্রয়োগ করেন। তারা একেবারে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বে যতগুলো বেসামরিক পারমাণবিক চুল্লি প্রথম থেকে যত ঘণ্টা সক্রিয় রয়েছে, সেই সংখ্যাকে যতগুলোতে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা দিয়ে ভাগ করেন। দেখা যায়, সবগুলো চুল্লির মোট সক্রিয়া থাকার ঘণ্টা হচ্ছে ১৪,৫০০ বছর। আর চুল্লি বিপর্যয়ের সংখ্যা চারটিএগুলোর একটি চেরনোবিল এবং অপর তিনটি ফুকুশিমায়। ইন্টারন্যাশনাল নিউক্লিয়ার ইভেন্ট স্কেলের (আইএনইএস) মতে, এর অর্থ দাঁড়ায় প্রতি ৩,৬২৫ বছরে একটি বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এমনকি, এই ফলাফলকে আমরা খুব কড়াকড়িভাবে হিসাব করি, তবে প্রতি ৫,০০০ চুল্লি বছরে একটি বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। ১৯৯০ সালে ইউএস নিউক্লিয়ার রেগুলেটরি কমিশন দুর্ঘটনার যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, এটা তার চেয়ে ২০০ গুণ বেশি। ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা অবশ্য চুল্লির বয়স ও ধরণটি চিহ্নিত করেননি। কিংবা তারা যেসব অঞ্চলে চুল্লিগুলো অবস্থিত সেখানে ভূমিকম্প হওয়ার হিসাবটাও ধরেননি। সর্বোপরি কেউই জাপানে চুল্লি বিপর্যয়ের কথা কল্পনা করেননি।

দুর্ঘটনার হিসাব বের করার পর গবেষকেরা কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটার কত দূরে তেজষ্ক্রিয় গ্যাস ও উপাদান ছড়িয়ে পড়তে পারে তার একটা চিত্রও প্রকাশ করেন। এতে দেখা যায়, চুল্লি বিপর্যয়ের পর সিজিয়াম১৩৭এর মাত্র ৮ শতাংশ চুল্লি এলাকার ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে সীমিত থাকে। প্রায় ৫০ শতাংশ চুল্লির এক হাজার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের বাইরে জমা হয়। আর প্রায় ২৫ শতাংশ দুই হাজার কিংবা তার চেয়েও দূরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, চুল্লি দুর্ঘটনার পর তেজষ্ক্রিয় দূষণ ওই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর ছড়িয়ে পড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু জ্বালানি সংস্থার (আইএইএ) মতে, কোনো এলাকায় প্রতি বর্গমিটারে ৪০ কিলোবেককুইরেল (তেজষ্ক্রিয়তা পরিমাপের আন্তর্জাতিক পদ্ধতি) সিজিয়াম১৩৭ থাকলে সেটাকে দূষিত হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।

ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, পশ্চিম ইউরোপেই পারমাণবিক চুল্লির ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। ফলে সেখানে প্রতি ৫০ বছরে একবার করে বর্গমিটারপ্রতি ৪০ কিলোবেককুইরেল) সিজিয়াম১৩৭ সৃষ্টি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে আরো দেখা গেছে, বিশ্বে জার্মানির দক্ষিণপশ্চিমাংশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাটির তেজষ্ক্রিয় দূষণে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও জার্মান সীমান্তের চুল্লিগুলো সব দুর্ঘটনা আর বায়ুপ্রবাহের কারণে সেখানে ঝুঁকি অনেক বেশি।

পশ্চিম ইউরোপে একটি পারমাণবিক চুল্লিতে দুর্ঘটনা ঘটলেই ২৮ মিলিয়ন লোকের বর্গমিটার প্রতি ৪০ কিলোবেককুইরেলে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ঘনবসতি ব্যাপক হওয়ায় সেখানে আরো বেশি লোকের পারমাণবিক দূষণের শিকার হওয়ার বিপদ রয়েছে। সেখানে বড় ধরণের পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটলে ৩৪ মিলিয়ন লোক আক্রান্ত হতে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্র ও পূর্ব এশিয়ায় সংখ্যাটি হতে পারে ১৪ থেকে ২১ মিলিয়ন।

জস লেলিভেল্ড বলেন, জার্মানি পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচি থেকে বের হয়ে আসায়, জাতীয়ভাবে তাদের তেজষ্ক্রিয় দূষণে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পাবে। তবে জার্মানির প্রতিবেশীরাও তাদের চুল্লিগুলো বন্ধ করে দিলে, ঝুঁকি আরো বেশি কমবে। তিনি পারমাণবিক দুর্ঘটনার আশঙ্কার বিষয়টি মাথায় রেখে পরমাণু শক্তি ব্যবহার নিয়ে নতুন করে চিন্তা ভাবনা করার জন্য আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

(ওয়েবসাইট অবলম্বনে)