Home » মতামত » কাঠামো টিকিয়ে রাখার পক্ষের শ্রেণীর ভূমিকা প্রসঙ্গে

কাঠামো টিকিয়ে রাখার পক্ষের শ্রেণীর ভূমিকা প্রসঙ্গে

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর

titumir-1শাহবাগের চত্বরে মানুষের সমবেত হওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এ বিষয়ে কেউ কেউ বিশ্লেষণ করতে যেয়ে, আবেগী বক্তব্য উপস্থাপন করছেন। কেউবা কোনো কোনো ’ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ খোঁজার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ এ সমাবেশের মধ্যে ম্যাকিভেলিয়ান কায়দায় ’ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ আবিস্কারের চেষ্টা করছেন। তবে এর একটি নৈর্ব্যক্তিক আলোচনা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রধান প্রশ্ন হওয়া প্রয়োজন: শাহবাগের জনসমাবেশ একটি রাজনৈতিক আন্দোলন কিনা? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে নির্ধারক হতে পারে এমন কয়েকটি বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে। কেন শুরু হলো এ আন্দোলন? মূলত: তিনটি কারণে শাহবাগের চত্বরে জনসমাবেশ ঘটেছে। প্রথমত: বাংলাদেশে বিশেষ করে ৯০এর দশক পরবর্তী সময়ে স্ট্যাবিলাইজেশন শ্রেণী অর্থাৎ যারা শাসনব্যবস্থায় বিদ্যমান কাঠামোকে স্থিতিবস্থা বা টিকিয়ে রাখার পক্ষের শ্রেণী বা শক্তি, তারা আর্বিভূত হয়েছে এবং তারাই ক্ষমতার ভাগাভাগি করছে। বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এই কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার পক্ষের শ্রেণীর নেতৃত্বে আছে। মনে রাখা প্রয়োজন, এই শ্রেণীর ক্ষমতার ভাগাভাগির নিশ্চিতি ও কুক্ষিগত থাকায় সমাজের একটি বড় অংশ রাজনৈতিকভাবে এক্সক্লুডেড বা সকল ধরণের অধিকার বঞ্চিত। দ্বিতীয়ত: সিভিল সোসাইটি নামে অভিহিত বর্গটি প্রধানত বর্তমান অবস্থাকে জারি রাখার জন্য ধারনা এবং কার্যকর দিকটি তৈরির কাজে নিয়োজিত। তারা ওই অধিকার বঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করছে না এবং স্পেস (অধিকার প্রতিষ্ঠার স্থান না দেয়া) তৈরি করতে চাইছে না। তারা বিদ্যমান আর্থসামাজিকরাজনৈতিক কাঠোমোকে টিকিয়ে রাখতে চাইছে। যেকোনো প্রক্রিয়াকে বিরাজনীতিকরণের দিকে নিয়ে যাওয়ার একটা চেষ্টাও তাদের পক্ষ থেকে করা হয়ে থাকে। তৃতীয়ত: বাংলাদেশে যে শ্রেণী কাঠামো গড়ে উঠেছে, তা পশ্চিমা বিশ্বে যেভাবে বিভাজন অর্থাৎ বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত যে পরিস্কার ভাগ হয়েছে, ঐ কায়দায় গড়ে ওঠেনি। এখানে মধ্যবর্তীশ্রেণীসমূহ তৈরি হয়েছে। এ কারণে এখানকার শ্রেণী চরিত্রের মধ্যে ’ক্লাস ইন ইটসেলফ’ থাকলেও ’ক্লাস ফর ইটসেলফ’ তৈরি হয়নি। যার ফলে এখানে ক্লাস একশন দেখা দেয়া না। প্রোলেতালিয়াত হিসেবে বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে বা অধিকার আদায় করতে হবে, এ ধরণের উদ্যোগ দেখা যায় না। মধ্যবর্তী শ্রেণীসমূহ বিদ্যমান কাঠামোকে বজায় রাখার চেষ্টা করছে। কারণ মধ্যবর্তীশ্রেণীসমূহ সম্পদের বিশেষ করে প্রিমিটিভ একুমুলেশণের কিছু ভাগ পায়। সম্পদ ভাগাভাগির মাধ্যমে কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার পক্ষের শ্রেণী তাদের কর্তৃত্ব বজায় রাখছে। ফলে অধিকাংশ মানুষ স্বল্পসংখ্য মানুষ দ্বারা অধিকার বঞ্চিত হচেছ।

কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার পক্ষের শ্রেণী প্রতিনিয়ত নিজেকে রক্ষা করতে চায়। এ কারণে তারা সম্পদ ভাগাভাগি করে নিচ্ছে। জবরদস্তি বা রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতার মাধ্যমে ওই শ্রেণী সম্পদ দখল করছে। অন্যদিকে, মধ্যবর্তী শ্রেণীসমূহকে লুটপাটের কিছু অংশ দিয়ে তাদের পক্ষে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। অধিকাংশ মানুষ কিন্তু এসবের বাইরে। অর্থাৎ লুটপাট বা সম্পদে তার কোনো জায়গা নেই। বঞ্চিত মানুষ সংগঠিত হতে চায়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন স্বাধীনতা যুদ্ধ। এর মাধমে সামাজিকঅর্থনৈতিকরাজনৈতিক সুযোগ বঞ্চিতরা সমবেত হতে পারে। এ কারণেই শাহবাগের সমাবেশ দলীয় নয়, তবে রাজনৈতিক। সুযোগ বঞ্চিত মানুষ জড়ো হয়ে বঞ্চনার কথাটি ব্যক্ত করতে চায়। প্রশ্ন হলো, কতদিন পর্যন্ত সমাবেশ নিজস্ব চরিত্র বজায় রাখতে পারবে। কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার পক্ষের শ্রেণী খুবই শক্তিশালী এবং ক্ষমতার তাদের মূল ভিত্তি। এরা তাদের স্বার্থ রক্ষায় সবকিছুকে কোনো না কোনো ভাবে দখলের চেষ্টা করে। সেই দখল একেক সময় একেক রকম হতে পারে। এখানে প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে কি এ ধরণের আকাঙ্খা এবং প্রত্যাশা শেষ হয়ে যাবে। না, তা ঘটবে না। এমন সমাবেশ বিভিন্ন কায়দায় বিভিন্ন জায়গায় সংঘটিত হবে। তা’ সংঘটিত হতে পারে তেলগ্যাস রক্ষায়, তা’ হতে পারে নারী সহিংসতা প্রতিরোধে। বঞ্চিত মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় আন্দোলন বাড়তে থাকবে এবং এক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিকসামাজিক বাস্তবতা হিসেবে আর্বিভূত হবে।

সুযোগসুবিধা বঞ্চিত শ্রেণী কোনো না কোনোভাবে সংঘটিত হওয়ার চেষ্টা করেছে এবং করবে। কিন্তু স্ট্যাবিলাইজিং শ্রেণী এটিকে প্রতিহত করছে এবং করবে। স্ট্যাবিলাজিং শ্রেণী রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে বিধায় যেকোন প্রতিবাদ দখলের একটি প্রচেষ্টা তাদের মধ্যে থাকে। শাহবাগের সমাবেশকে অনেকেই তরুণদের আন্দোলন হিসেবে অভিহিত করছেন। অনেকে বলছেন, ফেসবুক জেনারেশন বলে ভুল করেছি এখন মাফ চাই বা এ ধরণের কথা। এটা এক ধরণের পিট চাপড়িয়ে দেয়া। বঞ্চিত মানুষকে আপনি স্বীকার করছেন না বরং তাকে একটি তকমা লাগিয়ে দিয়ে বলা হচ্ছে, তুমি চালিয়ে যাও। এক্ষেত্রে তারা যদি অংশগ্রহণকারীও হন তথাপি তারা কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার পক্ষের শ্রেণীই এক ধরণের বর্ধিতাংশ।

কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার পক্ষের শ্রেণী নানা অজুহাতে বা সুযোগ তৈরির মাধমে দখলের চেষ্টা করবে, কিন্তু মানুষের বঞ্চনার মাত্রা এত বেড়ে গেছে যে, তারা বার বার সক্রিয় হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গড়ে ছয় শতাংশ হারে হচ্ছে। কিন্তু এখনো প্রতি তিনজনে একজন দরিদ্র। বৈষম্য বেড়ে যাচ্ছে বিরাট আকারে। প্রতিবছর যে পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়োজন তা হচ্ছে না। সব গবেষণায় বলা হচ্ছে চাকুরির সংকট তৈরি হবে। রাজনৈতিক বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দুটো উপাদান মিলে বিভিন্ন কায়দায় বিভিন্ন প্রতিবাদ বা সমাবেশ সংঘটিত হবে আগামীতে। সেক্ষেত্রে কোন কোন ক্ষেত্রে কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার পক্ষের শ্রেণীর সঙ্গে বঞ্চিত শ্রেণীর সাংঘর্ষিক অবস্থার তৈরি হবে। কোনো কোনো জায়গায় এটি সমঝোতার চরিত্রও নেবে। ক্ষমতাসীনরা কোনো জায়গায় আন্দোলন দমনে নিপীড়ন করবে, আবার কোনো জায়গায় সহাবস্থান করবে। এগুলো কিন্তু আমরা অতীতেও দেখেছি।

আন্দোলনের সূত্রপাতের বিষয়গুলো এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের দিকে দৃষ্টি দিলে অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে উঠবে। এখানে বঞ্চিত মানুষেরা রাজনীতিতেও সুযোগ পাচ্ছে না। কাঠামোকে ধরে রাখার জন্য এবং এটি ভাঙার জন্য তাদের সংগ্রাম অব্যহত রয়েছে। এমন শোষণবঞ্চিত শ্রেণীর ভাষা তো এমনিই হবে। আন্দোলনের ধরণটা কেমন হবে, তা’ নির্ভর করবে ক্ষমতাসীনরা কীভাবে একে দেখবে তার ওপর। আগেই বলেছি, কোথাও এটাকে বাধা দেয়া হবে, আবার কোথাও মেনে নেয়া হবে। ছোটবড় বিভিন্নভাবে মানুষের বঞ্চনার বর্হিপ্রকাশ ঘটবে এবং তা চলতেই থাকবে।

সমাজের একটি বড় অংশের মানুষ রাষ্ট্রীয় সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত এবং কোনো কিছুতেই তারা অংশগ্রহণও করতে পারছে না। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কোনো ক্ষেত্রেই তার স্থান নেই যেখানে সে নাগরিক হিসেবে তার অধিকারকে রক্ষা করবে এবং অধিকার ভোগ করবে। কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার পক্ষের শ্রেণী কেন আন্দোলন দখল করতে চায়, তা’ বিশ্লেষণ করতে হবে। জাতীয় মুক্তির আকাংঙ্খা ও জাতীয়তাবাদ কিন্তু এক নয়। বাংলাদেশে দুটো বিষয়কে মিলিয়ে ফেলা হয়েছে। জাতীয় মুক্তির আঙ্কাখা থেকে জাতি গঠনের প্রয়োজন ছিল। তা কখনো করা হয়নি। এটাকে বহুজাতিক রাষ্ট্র হিসেবে কখনো মানা হয়নি, অর্থাৎ নাগরিকদের রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এখনও গড়ে ওঠেনি। জাতীয়তাবাদকে ভিত্তি করে রাজনীতি করলে ফ্যাসিবাদও জন্ম নিতেই পারে। জাতীয় মুক্তির আকাংঙ্খা ও বাস্তবায়ন হচ্ছে বড় বিষয়। কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার পক্ষের শ্রেণী নাগরিকদের দমিয়ে রাখতে চেয়েছে, নাগরিক অধিকার প্রদানে ভূমিকা রাখেনি। বহুজাতিক নাগরিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ গড়ে ওঠেনি বলে বঞ্চিত মানুষের সংখ্যাও বেড়ে উঠেছে।

সুযোগসুবিধা বঞ্চিত মানুষের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন সে তার গর্বকে সামনে এনে তার প্রতিবাদ জোরালো করার চেষ্টা করে। কাজের দাবিতেও আন্দোলন হতে পারে আগামীতে। এসব আন্দোলনকে কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার পক্ষেও শ্রেণী কীভাবে দেখবে, তার ওপর বিক্ষোভের গতিপ্রকৃতি নির্ভর করবে। সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বাস্তবতা। রাজনৈতিক দল এটি করছে, সিভিল সোসাইটি নামধারীরা এতে সহায়তা জুগিয়ে যাচ্ছে। নাগারিক রাষ্ট্র গড়ে না ওঠায়, আদিম কায়দায় রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় সম্পদ গড়ে উঠছে। ফলে আন্দোলন সংঘটিত হচ্ছে এবং হবে।

আমাদের এখানে আরেকটি সমস্যা হলো, স্বল্পমেয়াদী লাভ নিয়ে চিন্তিত থাকায়, দীর্ঘমেয়াদী বিষয় চাপা পড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের যারা ক্ষমতায় থাকেন বা আগে ছিলেন তারা ভবিষ্যৎ দেখেন না। কারণ তারা দেখেন স্বল্পমেয়াদে তার লাভ হচ্ছে কিনা। কিন্তু পরে দেখা যায়, ঐ বিষয়টি তাদের জন্যই বুমেরাং হয়। অধিকাংশের রাজনীতি না হয়ে সংখ্যালঘুর সুবিধা জোগাতে রাজনীতি পরিচালিত হলে, তার পরিণতি এমনটি হওয়াই স্বাভাবিক।।

লেখক চেয়ারপারসন, উন্নয়ন অন্বেষণ