Home » শিল্প-সংস্কৃতি » ডোরেমন বন্ধ – স্বাগতম, ভারতীয় সিরিয়ালের কি হবে?

ডোরেমন বন্ধ – স্বাগতম, ভারতীয় সিরিয়ালের কি হবে?

ফ্লোরা সরকার

doremonজাপানের লেখক ফুজিকো এফ ফুজিওর লেখা “ডোরেমন” নামক টিভি কার্টুনটি প্রথম পর্যায়ে কমিকস বই আকারে প্রথম ছাপা শুরু হয় ১৯৬৯ সালে জাপানের ছয়টি বিভিন্ন মাসিক ম্যাগাজিনে। মোট ১৩৪৪ টি গল্প নিয়ে জাপানের শোগাকুকান পাবলিশার এর হাত ধরে তা ছাপা শুরু হয়। ভি.আই.জেড মিডিয়া (যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোয় অবস্থিত একটি জাপানি এন্টারটেইনমেন্ট কোম্পানি, যার মালিক যৌথভাবে শোগাকুকান ও গুইশা পাবলিশার্স) শোগাকুকান প্রডাকশান থেকে কার্টুনের লাইসেন্স কিনে ১৯৯০ সালের দিকে এই কার্টুনের ইংরেজি অনুবাদ যুক্তরাষ্ট্রে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করলে এক অজানা কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৮ সালের নভেম্বরে ওয়াশিংটন ডিসিতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইংরেজি অনুবাদে কার্টুনের একটি টিভি সিরিজ প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্ব স্ব মাতৃভাষায় ডোরেমন সিরিজ প্রদর্শিত হতে থাকে। যেমন হংকং এবং থাইল্যান্ডে এ ১৯৮২ থেকে এর প্রদর্শন শুরু হয়। তারপর ধীরে ধীরে চায়না ও ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৯১ এ, তাইওয়ানে ১৯৯৫, ভারত ও বাংলাদেশে ২০০৫ (হিন্দি ভাষায়), এর প্রদর্শন এবং জনপ্রিয়তা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়। এসব দেশসহ প্রায় ১১ টি দেশ ছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যও পর্যন্ত তা ছড়িয়ে যায়। জাপানের বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জানা যায়, এই কার্টুন ছবি পৃথিবীময় ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে জাপান সরকারের দুটো উদ্দেশ্য কাজ করেছে . পৃথিবীর মানুষ জাপানি কার্টুন সম্পর্কে যাতে উন্নত একটা ধারণা নিতে পারে এবং ২. আরও গভীর উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর মানুষের কাছে জাপানি সংস্কৃতি তুলে ধরা। জাপানের বৈদেশিক মন্ত্রণালয় নিশ্চিত হয়েছে যে ‘ডোরেমন’ জাপানি সংস্কৃতির একটি প্রতিমা স্বরূপ পৃথিবীর কাছে ইতিমধ্যে স্থিরীকৃত হয়ে গেছে। অর্থাৎ “ডোরেমন” এর মধ্যে দিয়ে জাপান শুধু পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই নিজের পরিচিতি তুলে ধরেনি সেই সঙ্গে তার সংস্কৃতির একটি রূপরেখা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।

অতি সম্প্রতি জনপ্রিয় এই কার্টুনটি বাংলাদেশের সরকার থেকে বন্ধ করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে শিশুদের লেখাপড়ার কথা চিন্তা করেই এটি বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো কেন এই উদ্যোগ? এর দুটো অন্তর্নিহিত কারণ থাকতে পারে . সিরিয়ালটি হিন্দি ভাষায় প্রচারিত হচ্ছিল। ২.ডোরেমনের নবিতা চরিত্রটি অত্যন্ত প্রাণবন্ত একটি চরিত্র হলেও ভবঘুরের মতো সারাদিন সে শুধু খেলাধুলা নিয়ে অধিকাংশ সময় মেতে থাকে, যা শিশুমনে বিরূপ প্রভাব ফেলতে বাধ্য। হিন্দি ভাষায় প্রচারিত হওয়ায় একদিকে শিশুরা যেমন তাদের মাতৃভাষা চর্চ্চা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অন্যদিকে “খেলার সময় খেলা, পড়ার সময় পড়া” প্রবাদটি থেকে দূরে সরে যাওয়ায়, শিশুমনে পড়ার চেয়ে খেলার প্রাধান্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিরিয়ালটি নিয়ে ইতিমধ্যে অভিভাবকেরা অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। তাই আমরা সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।

কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদের মনে আরেকটি প্রশ্ন উঁকি দেয়, আর তা হলো শিশুমন থেকে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি দূর করা গেলেও (উল্লেখ্য ভিন্ন ভাষা বা সংস্কৃতি গ্রহণে কোন আপত্তি নেই যদি তা নিজের ভাষা বা সংস্কৃতির কোন বিপত্তি না ঘটায়। কিন্তু ডোরেমন বা হিন্দি সিরিয়ালের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি বলেই আমাদের আপত্তি) বয়স্কদের মন থেকে তা আমরা এখনও দূর করতে সক্ষম হচ্ছি না। অবশ্যই এখানে হিন্দি সিরিয়ালের কথা বলা হচ্ছে।

নব্বইয়ের দশকে আকাশ সংস্কৃতির হাত ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিশেষত ভারতের বিভিন্ন চ্যানেলের সঙ্গে এদেশের মানুষের পরিচিতি ঘটতে শুরু করে। “গ্লোবাল ওয়ার্ম” এর উত্তাপে প্রথম প্রথম সবাই সেটাকে সানন্দে স্বাগত জানিয়েছিলেন। নতুন শতাব্দীর প্রারম্ভে অর্থাৎ দুই হাজার সালের শুরুতে ‘ঘার ঘার কা কাহানী’, ‘সাঁস কি কাভি বাহু থি’ ‘কুমকুম’, ‘কাসটি জিন্দেগি’ র মতো সিরিয়ালগুলো চোখ বড় বড় করে বাড়ির বড়রা বসে বসে দেখতেন। সেই থেকে তাদের রিমোট কন্ট্রোল জি টিভি, জি সিনেমা, জি বাংলা, সনি, ইটিভি বাংলার মতো আরও বহু বহু ভারতীয় চ্যানেলের ভেতর ঘোরঘুরি করেছে। বাংলাদেশের চ্যানেলের সংখ্যাবৃদ্ধিতেও সেসব চ্যানেল দর্শনের সংখ্যা আজও কমেনি, বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ সেসব চ্যানেলের বিশেষত হিন্দি এবং বাংলা সিরিয়ালগুলো পারিবারিক পর্যায়ের কুটবুদ্ধি এমন নিখুঁত, নিপুণ আর পরিপাটি করে উপস্থাপন করা হয় যে দর্শক মুগ্ধ না হয়ে পারেন না। ‘টেনশান’ বা ‘উত্তেজনা’ যে কোন গল্প, উপন্যাস, সিনেমা বা নাটকের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি পুঁজি। যে পুঁজির ওপর ভর করে গল্প বা নাটক এগিয়ে যায়। হিন্দি সিরিয়ালের মোহময় আকর্ষণের মূলে এই ‘টেনশান’ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহারের ফলে সিরিয়ালের গতি তর তর করে এগিয়ে যায়। সেসব সিরিয়ালগুলো একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে প্রতিটি এপিসোড বা পর্বের প্রতিটি বাক্যেও ভেতর ‘টেনশান’ এর টান টান ভাবটা অত্যন্ত সার্থক ভাবে রূপায়িত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সেখানে কোন্ ধরণের টেনশান আমরা দেখতে পাই? তা কি কোন ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বা সংগ্রামি জীবনের কোন উত্তেজনা থাকে? না। সেসব নিয়ে এসব সিরিয়ালের কোন মাথা ব্যথা নেই। স্রেফ সস্তা বস্তাপচা উচ্চ শ্রেণীর পরিবারের শ্বাশুড়িবউ, ননদভাবি বা অর্থবিত্ত আর প্রতিপত্তির টেনশান। যা সমাজজীবনে কোন কাজে তো লাগেই না বরং দর্শককে এই মেসেজ দেয় যে, কীভাবে কুটবুদ্ধি ও নিম্নমানের কার্যক্রম করলে পরিবারের অশান্তি বেশি মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। প্রতিটি সিরিয়ালে দেখা যায় সেই মধ্যযুগীয় সময়ের একজন অত্যন্ত ফেরেস্তারূপী কোন চরিত্র থাকবে এবং তার বিপরীতে খলনায়করূপী বিপরীত থাকবে আরেকটি চরিত্র। যেসব চরিত্রের কেন্দ্রে অবশ্যই কোন না কোন ‘নারী’ থাকবে। একজন নারী শোষণে নিষ্পেষিত হচ্ছে, বিপরীতে আরেক নারী যে নিষ্পেষণ করে আনন্দ পাচ্ছে। অর্থাৎ এখানে শুধু সস্তা সেন্টিমেন্টই থাকে না, সেই সঙ্গে নারীকে স্থুল বা কদর্য করে দেখাবার একটি প্রবণতাও কাজ করে। এসব সিরিয়ালের শেষ ফলাফল তাহলে কোথায় যেয়ে শেষ হয়? এক কথায় পারিবারিক কুটবুদ্ধিতে। যে কুটবুদ্ধি সমাজকে আরো কলুষিত করতে উৎসাহিত করে।

কৌতুহলের বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে এসব হিন্দি সিরিয়ালের বিস্ময়কর সাফল্য দেখে বেশ কয়েক বছর ধরে বেশ কিছু সুযোগ সন্ধানী নাট্যপরিচলকবৃন্দ হুবহু এসব সিরিয়ালে কপিপেস্টের একটি মহা উৎসবে মেতে উঠেছে। সিরিয়ালের গল্প,সংলাপ, ক্যামেরার কাজ, অভিনেতাঅভিনেত্রীদের অভিব্যক্তি, মেকআপ, সেট ডিজাইন, কস্টিউম মোট কথা হিন্দি সিরিয়ালের হুবহু নকল করে, এসব সুযোগ সন্ধানী পরিচালকবৃন্দ এদেশে সিরিয়ালি একের পর এক সিরিয়াল নির্মাণ করে যাচ্ছেন, নিরীহ দর্শকস্রোতা আর সরকারের নাকের ডগার ওপর। ছোট ছোট গল্পকে অযথা টেনে টেনে দীর্ঘ করে তোলার এক অপপ্রয়াস ছাড়া আর কিছু না। খামোখা কারণে পরিবারে কোন স্থুলো জটিলতা সৃষ্টি দিয়ে কাহিনীল শুরু করে সেই জটিলতাকে টেনে নিয়ে যাওয়া। খামোখা কারণে একই অভিব্যক্তির ওপর বার বার একই শটের ক্লান্তিকর বিন্যাস। এই ক্লান্তিকর বিন্যাস রীতিমতো বর্তমান সিরিয়ালের একটা ফ্যাশানে পরিণত হয়ে গেছে। এই বিন্যাস ছাড়া আমাদের তথাকথিত সিরিয়াল মেকাররা অন্য কোন বিন্যাসের কথা যেন ভাবতেই পারেন না। যেখানে প্রয়োজন নেই সেখানেও নাট্যকুশলীর অতি মেকআপে নিজেদের গ্ল্যামারাস করে তোলার এক কৃত্রিম প্রচেষ্টা যা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু মনে হয়। সিরিয়ালের শেষে মনে হয় কোন কৃত্রিম গল্পের কৃত্রিম রোবটদের দ্বারা কৃত্রিম কিছু একটা দেখা হলো। এই ‘কৃত্রিম কিছু একটা’ না নাটক, না জীবন, কোন জায়গাতেই শেষ পর্যন্ত দাঁড়াতে পারে না। কিন্তু এতো সুযোগসন্ধান করেও আমাদের এসব নকলবীশ সিরিয়ালগুলো আমাদের দর্শকদের দেখার কোন সুযোগ করে দিতে পারছে না। দর্শকের দৃষ্টি,মন, প্রাণ পড়ে থাকে অপরদেশের অপরসিরিয়ালের ওপর। এর একমাত্র কারণ আমরা এখনও সৃষ্টিশীলতা দূরে থাক ভালো করে নকলও করতে পারিনা। ফলে বাংলাদেশের সিরিয়ালগুলো না হয় বাংলাদেশী, না হয় ভারতীয়। নিজের মাটি থেকে উঠে আসা দুর্গন্ধও সুগন্ধ হয়ে ওঠে যদি তা নিজের হয়। ভিন্ন মাটির সুগন্ধ দিয়ে কোনদিনও নিজের মাটিতে সুগন্ধী নির্মাণ করা যায় না। অনেকে মনে করেন আমাদের লেখক, পরিচালক, ক্যামেরাম্যান, মেকআর্টিস্ট, নাট্যশিল্পী দুর্বল, তাই নকলের পেছনে এভাবে ছুটে চলা। কিন্তু কথা হচ্ছে দুর্বল হলেই অসুবিধা কোথায়? দুর্বল থেকেই তো মানুষ ধীরে ধীরে সবল হয়। এই সহজ অংকটা কষতে না পারার দরুণ মরিচিকার মতো অন্যের সবলতাকে নিজের সবলতা বলে মনে করে সস্তা হিন্দি সিরিয়ালের কপিপেস্টের পেছনে অযথা দৌঁড়ে হয়রান হবার কোন যথার্থতা নেই। খোদ হিন্দি সিরিয়ালের ভেতরেই তো কোন সার নেই, তাহলে কেন সারহীন এসব সিরিয়ালের পেছনে অযথা ছুটে চলা?

পৃথিবীতে কেউ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় না। সবার কাছ থেকে আমরা শিখে চলি অবিরাম। এই শিক্ষাক্রম কোথাও থেমে থাকে না। বহতা নদীর মতো তা প্রবাহমান। কিন্তু অন্যের কাছ থেকে কিছু শেখা আর অন্যকে নকল করা এক বিষয় না। আমরা কোনকিছু শিখতে উদ্যোগী না হলেও নকল প্রবণতা প্রবল। কিন্তু শিল্পকর্ম এমনই এক মহান বিষয় যেখানে নকলের কোন স্থান নেই। নকল করে দর্শকদৃষ্টিকে ধোঁকা দেয়া হয়তো যায় কিন্তু স্থায়ী আসন এমনকি সামান্য প্রশংসা প্রাপ্তি পর্যন্ত ঘটে না। আর যার নকল করা হচ্ছে তা যদি হয় অপ্রয়োজনীয় তাহলে তো কথাই নেই। কাজেই এসব অপ্রয়োজনীয় হিন্দি সিরিয়াল থেকে কিছু শেখা দূরে থাক, অপ্রয়োজনীয় এসব সিরিয়াল থেকে অপ্রয়োজনীয় নকল সিরিয়াল নির্মাণ করে সিরিয়ালের স্তূপই শুধু নির্মিত হবে।

কাজেই ‘ডোরেমন’ বন্ধের মতো হিন্দি ও ভারতীয় সিরিয়ালও যদি এখানে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে একদিকে যেমন নকলপ্রবণতা থেকে আমরা মুক্ত হবো, তেমনি মুক্ত হবো কূটবুদ্ধি ও নিম্নমানের সস্তা সিরিয়াল নির্মাণের সিরিজ থেকে। সমাজের জন্যে যা মন্দ, তা অবশ্যই পরিত্যজ্য। এসব হিন্দি সিরিয়াল শুধু আমাদের মিডিয়ার ক্ষতি করছে না, আমাদের পারিবারিক পরিবেশের ওপরও যথেষ্ট প্রভাব ফেলছে। পরিবার থেকেই যেখানে সমাজের উৎপত্তি সেই পরিবারই যদি কলুষিত হয়ে পড়ে, তাহলে গোটা সমাজও একদিন কলুষিত হবে। কাজেই নকল সিরিয়াল নয় মৌলিক সিরিয়াল, কুটবুদ্ধি নয়, নীতিসুলভ সুস্থ নাটক নির্মাণের প্রত্যাশা রেখে আমরা আশা করবো বাংলাদেশ সরকার যেন হিন্দি সিরিয়ালও বন্ধ করার ব্যবস্থা করেন।।

১টি মন্তব্য