Home » বিশেষ নিবন্ধ » ভাষা আন্দোলনের আসল প্রেক্ষাপট

ভাষা আন্দোলনের আসল প্রেক্ষাপট

হায়দার আকবর খান রনো

21-১৯৫২এর একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতির জীবনে যে একটা মাইলফলক, তা সকলেই স্বীকার করবেন। এমনকি এটাও প্রায় সকলেই মানবেন যে, ২১এর সংগ্রাম থেকেই বাঙালি জাতির জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, যার পরিণতিতে এসেছিল ৭১এর মহান সশস্ত্র সংগ্রাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশ।

কিন্তু একুশের তাৎপর্য তার চেয়েও বেশি। শুধুমাত্র ভাষার সংগ্রাম বা জাতীয় সংগ্রাম বললে তাকে রাজনৈতিক ভাষায় বুর্জোয়া বা পেটিবুর্জোয়া সংগ্রাম বলেই চিহ্নিত করতে হয়। আমার মনে হয়, একুশের সংগ্রামের মধ্যে অথবা একুশের চেতনার মধ্যে বাম উপাদান অনেক বেশি ছিল। এবং একুশের সংগ্রাম অথবা ভাষা আন্দোলন যারা তৈরি করেছিলেন, তাদের মধ্যে কমিউনিস্টরাই নেতৃত্বে ছিলেন। নেতৃত্বের প্রধান অংশই ছিলেন বাম ও কমিউনিস্টরা।

১৯৪৮ সালেই প্রথম মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তদানীন্তন পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক আইন পরিষদে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলেছিলেন। মওলানা ভাসানীকে ’৪৭ পরবর্তী বাংলাদেশের বাম ধারার পুরোধা পুরুষ বলে গণ্য করতে হবে, যদিও তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন না। ভাষা আন্দোলনে ভাসানীর প্রভাবকে মোটেও ছোট করে দেখা চলে না।

ভাষা আন্দোলনকে ধাপে ধাপে অগ্রসর করে নেবার ক্ষেত্রে তদানীন্তন গোপন কমিউনিস্ট পার্টিরও বিরাট ভূমিকা ছিল, যেটা সাধারণত তেমনভাবে আলোচনায় আসে না। ভাষা আন্দোলনের প্রথমসারির নেতা ছিলেন, আবদুল মতিন, গাজীউল হক, মহম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, মহম্মদ সুলতান প্রমুখ। একমাত্র অলি আহাদ বাদে অন্যরা হয় তখন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন অথবা পরবর্তীতে পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। অলি আহাদ অবশ্য কখনই কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য ছিলেন না। কিন্তু প্রথম জীবনে তিনি যে বামপন্থী ছিলেন, তা কি অস্বীকার করা যাবে? আওয়ামী লীগের মধ্যে তিনি তরুণ প্রজন্মের বামধারার প্রতিনিধিত্ব করতেন। পরবর্তীকালে ভাসানী ন্যাপের মতো বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে অবস্থান করতেন। আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ হয়ে সমগ্র আন্দোলনকে পেছন থেকে পরিচালনা করেছেন, শক্তি যুগিয়েছেন যারা তাদের মধ্যে অন্যতম সাদেক খান ও শহিদুল্লাহ কায়সার। সাদেক খান তখন গোপন কমিউনিস্ট পার্টির ঢাকা জেলা কমিটির সদস্য ছিলেন। শহীদুল্লাহ কায়সার পরবর্তীতে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। শহীদুল্লাহ কায়সার লেখক হিসাবেও পরিচিত, যিনি ১৯৭১এর ১৪ ডিসেম্বর আল বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন। মহম্মদ তোয়াহা, আবদুল মতিন, মহম্মদ সুলতান (পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি) যে কমিউনিস্ট নেতা ছিলেন, তা নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। এক কথায়, ভাষা আন্দোলন মূলত বাম ও কমিউনিস্টদের দ্বারাই তৈরি হয়েছিল।

তবে ভাষা আন্দোলনকে কোন একক দলের কৃতিত্ব বলে দাবি করা ঠিক নয়, যেমন সঠিক হবে না ১৯৭১এর মহান মুক্তিযুদ্ধকে কোন একক দল বা ব্যক্তির কৃতিত্ব বলে দাবি করা। যেকোনো প্রকৃত গণআন্দোলনের মধ্যে বিচিত্র ধরণের মানুষের সমাবেশ ঘটে। বিভিন্ন ধরণের ধারাও থাকে। তবে আমি যেটা জোরের সঙ্গে বলতে চাই, তা হলো, প্রধান প্রবণতাটি ছিল বামমুখী।

দুই

ভাষার সঙ্গে শ্রেণীর সম্পর্ক আছে। ভাষা আন্দোলনেরও শ্রেণী বৈশিষ্ট আছে। এ কথা ঠিক যে, মুখের ভাষা সকলেরই এক। তবু অভিজাত শ্রেণীর জন্য ভিন্ন ভাষা এবং সাধারণ গরিব শ্রমজীবীর ভিন্ন ভাষা এটা আমাদের ইতিহাসের অভিজ্ঞতার মধ্যে আছে। ভারতবর্ষের ইতিহাসেও সেই সাক্ষ্য পাওয়া যায়। এমনকি ইউরোপের ইতিহাসেও। বহু শতাব্দী পর্যন্ত লাতিন ছিল তেমন অভিজাত ভাষা যে ভাষায় ধর্মগ্রন্থ রচিত, যে ভাষায় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা হতো। নিউটনের ইতিহাস বিখ্যাত গ্রন্থ ‘প্রিনসিপিয়া ম্যাথামেতিকা’ লাতিন ভাষা লেখা হয়েছিল, ইংরেজিতে নয়। বাইবেল ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে অনেক পরে। বাংলায় কোরআন শরীফের অনুবাদ হয়েছে একই ভাবে অনেক পরে। প্রাচীন ভারতে যে সংস্কৃত ভাষায় বিদ্যাচর্চা ও রাজকর্ম চলতো, তা কিন্তু সাধারণের কথা ভাষা ছিল না। কবি কালিদাসের সংস্কৃত নাটকে দেখা যায় যে, অভিজাত নয়, এমন সাধারণ শ্রমজীবীরা প্রকৃত ভাষায় কথা বলছেন।

মোগল আমলে রাজভাষা ছিল ফার্সি। সেই ভাষায় রাজপুরুষরা কথা বলতেন। কিন্তু তা সাধারণের বোধগম্যতার মধ্যে ছিল না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্বের সময়ও ফার্সি ছিল আদালতের ভাষা। পরবর্তীতে ইংরেজ শাসন আমলে ইংরেজি ছিল রাষ্ট্রীয় ভাষা। আজকের ভারতবর্ষ প্রসঙ্গেও বিখ্যাত নাট্যকার ও নাট্য শিল্পী প্রয়াত উৎপল দত্ত অভিযোগ করেছিলেন যে, উত্তর ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা হিন্দুস্থানীকে বিকৃত করে, তার সঙ্গে জোর করে সংস্কৃত শব্দ যোগ করে যে হিন্দিভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা হয়েছে, তাও সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষা নয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভাষার প্রশ্নে জাতিগত নিপীড়নের দিকটি ছিল প্রকট ভাবে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগেও অভিজাত মুসলমান পরিবারের মধ্যে উর্দুর চল ছিল, যা তাদের কাছে গর্বের বিষয়ও ছিল। বাংলা যেন নিচু শ্রেণীর মানুষের ভাষা। ভাষা হিসাবে বাংলা অবশ্যই যথেষ্ট উন্নত ছিল। সাহিত্য হিসাবে ভারতবর্ষের মধ্যে বাংলাই যে সবার উপরে ছিল, এই দাবি তো মিথ্যা নয়। তবু বাংলার অভিজাত মুসলিম পরিবার উর্দুতে কথা বলতো। মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা ঢাকা নবাব পরিবার (স্যার সলিমুল্লা অথবা পরবর্তীতে খাজা নাজিমউদ্দিন) উর্দুতে কথা বলতেন। এমনকি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পরিবার উর্দুতে কথা বলতেন।

ইংরেজ আমলে ইংরেজির কদর ছিল সর্বাধিক। ইংরেজির সেই কদর এখনো আছে। কিন্তু মুসলিম অভিজাত্যের লক্ষণ ছিল উর্দু ভাষা। বাংলাকে হয় হিন্দুর ভাষা অথবা ইতরজনের ভাষা হিসাবে গণ্য করা হতো।

চল্লিশের দশকে প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তান আন্দোলনের স্রোতে ভেসে গিয়েছিল বাংলার মধ্যবিত্ত এবং শ্রমজীবী মুসলিম জনগণ। জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হলো পাকিস্তান। পূর্ব বাংলা (বা আজকের বাংলাদেশ) পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলো।

গরিব মানুষের প্রতি জিন্নাহর কখনই কোন শ্রদ্ধাবোধ ছিল না। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাস করতেন পূর্ব বাংলায়, যারা বাংলা ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু জিন্নাহ জোর করে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে। ভাষা আন্দোলন ছিল এরই বিরুদ্ধে। মর্মবস্তুর দিক থেকে, এই আন্দোলন ছিল জাতীয় আন্দোলন যা ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতি তত্ত্বকে অস্বীকার করেছিল। এই আন্দোলনের আরেকটি শ্রেণী চরিত্র আছে। তাহলো জোর করে চাপিয়ে দেয়া অভিজাত শ্রেণীর ভাষাকে মানতে অস্বীকার করা। তাহলে, এই আন্দোলনের এটি সামন্ত বিরোধী চরিত্রও আছে।

তবে ভাষা আন্দোলনের মধ্যে উর্দু বিদ্বেষ দেখা যাবে না। এই ব্যাপারে গোপন কমিউনিস্ট পার্টি খুব সচেতন ছিলো। কমিউনিস্টরা আন্তর্জাতিকতাবাদী। তাই আত্মগোপনে থাকা কমিউনিস্ট নেতৃত্ব খুব সচেতন ছিলেন, যাতে এই আন্দোলন উগ্র জাতীয়তাবাদে রূপ না নেয়। তাই ভাষা আন্দোলনের দাবি ছিল উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হোক। (যদিও উর্দু পাকিস্তানের কোন প্রদেশের কথ্য ভাষা নয়)

তিন

চল্লিশের দশকে পাকিস্তান আন্দোলন যে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল, তার মধ্যে শ্রেণীর বিষয়টি ছিল। বাংলাদেশের অধিকাংশ জমিদার ছিলেন হিন্দু। আর কৃষকের অধিকাংশ ছিলেন মুসলমান। বাংলার মুসলমান কৃষক আশা করেছিলেন যে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠান হলে তারা জমিদারী শোষণ থেকে মুক্ত হবেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কৃষক পরিবারের সন্তানরা অধিক পরিমাণে উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পায়। ’৫২ সালের দিকে দেখা গেল যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অধিকাংশ গ্রাম থেকে আসা কৃষক পরিবারের সন্তান এবং তারা হচ্ছেন, সেই প্রথম প্রজন্ম যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছেন।

প্রখ্যাত কমিউনিস্ট এবং ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম নেতা অমল সেন ও তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন এইভাবে – ’৫২এর ২১ ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রের ওপর গুলি হয়েছে, এই সংবাদ কৃষকসহ জনগণকে দারুণভাবে বিচলিত ও ক্ষুব্ধ করেছিল। এই প্রথম তাদের সন্তানরা ঢাকায় উচ্চ শিক্ষা লাভ করতে শুরু করেছে, তাদের সেই সন্তানদের ওপর গুলি চলেছে, এটা তারা আর সহ্য করতে রাজি ছিলেন না।

ভাষা আন্দোলনে সাড়া দিয়েছিল বাংলার কৃষক সমাজ। অন্যথায় এই আন্দোলন এতো জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারতো না। ১৯৫৪এর নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবিও হতো না।

ভাষা আন্দোলন জাতীয় আন্দোলনের সূচনা করেছিল। বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলমান তার জাতীয় পরিচয় খুঁজে পেয়েছিলেন বাঙালি হিসেবে। সেই হিসেবে ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য বিরাট। ফলে সঙ্গে সঙ্গে এটা কৃষকের আন্দোলনও বটে, যদিও সরাসরি কৃষকের অর্থনৈতিক দাবির বিষয়টি যুক্ত ছিল না।

স্তালিন বলেছিলেন যে, জাতীয় আন্দোলন মূলত কৃষকের আন্দোলন। ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষকের অংশগ্রহণ ছাড়া কোন জাতীয় আন্দোলন সফল হতে পারে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাইই। তখনকার দিনে টেলিভিশন ছিল না। সংবাদপত্রও গ্রামে কম পাওয়া যেতো। তবু মুখে মুখে ঢাকায় ছাত্র হত্যার সংবাদ পৌঁছে গিয়েছিল প্রত্যন্ত গ্রামে। আগুনের মতো তা চারদিকে ছড়িয়ে গিয়েছিল। তবে সবটাই স্বতঃস্ফূর্ত নয়। কৃষকের কাছে ভাষার দাবি এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা সংগঠিতভাবে তুলে ধরেছিলেন কমিউনিস্ট কর্মীরা, যারা কৃষকের মধ্যে লেগে পড়ে থেকে কাজ করতেন।

ভাষা আন্দোলনে বামপন্থীদের ভূমিকা এই ভাবেই মূল্যায়ন করতে হবে। একইভাবে আন্দোলনের শ্রেণী তাৎপর্যকেও বুঝতে হবে। অন্যথায় এই আন্দোলনের ইতিহাসকে যথাযথভাবে চিত্রিত করা যাবে না।।