Home » মতামত » রাজনীতিবিদদের প্রতি সতর্কবাণী

রাজনীতিবিদদের প্রতি সতর্কবাণী

শাহদীন মালিক

shahdin malik-2-শাহবাগে যে নবজাগরণ গত সপ্তাহ দুয়েক ধরে দেখা যাচ্ছে, তা বাংলাদেশের অতীতের সব আন্দোলন থেকে ভিন্ন। এই ভিন্নতার কারণ বেশ কয়েকটি। প্রথমত. এটা ঠিক অতীত ইতিহাস দিন তারিখ দিয়ে বলা যাবে না, তবে শুরুটা ইন্টারনেটের মাধ্যমে আলাপআলোচনা, তর্কবিতর্ক, বিশ্লেষণের মধ্যদিয়েই গড়ে উঠেছে। দ্বিতীয়ত. এতে অংশগ্রহণকারীরা স্বভাবতই অন্যান্যদের থেকে আলাদা অর্থাৎ আধুনিক প্রযুক্তি শুধু ব্যবহারই করেন না, এ বিষয়ে বেশ পারদর্শী। তৃতীয়ত. তারা রাজনৈতিক ভাবে সচেতন, কিন্তু তাদের অনেকেরই কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রথাগত অর্থে সম্পৃক্ততা নেই। চতুর্থত. একটি দাবিতেই শুরু হয়েছে তাদের আন্দোলন এবং একটি দাবি মুখ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু আমার ধারণা, এর পেছনে তাদের অনেকগুলো অভিযোগ আছে। এই অভিযোগগুলো হচ্ছে, প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া, নানা কারণে অসন্তুষ্টি এবং দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ব্যাপারে তাদের সন্দেহ। এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাদের সন্দেহ, প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া বা তাদের চাওয়াপাওয়ার বিষয়টি রাজনীতিতে না পাওয়া এগুলোরই বিস্ফোরণ ঘটেছে এই আন্দোলনের মাধ্যমে।

মনে হয়, তারা ফেসবুক, ব্লগের মাধ্যমে যে বাংলাদেশের প্রত্যাশা করেছিলেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির মাধ্যমে সেই বাংলাদেশের গড়ে ওঠা, তৈরি হওয়া বা পাওয়ার ব্যাপারে তারা হতাশ ছিলেন। এই হতাশাগুলো এসেছে রাজনীতির পঙ্কিলতা, সুস্থ মূল্যবোধের অভাব এবং রাজনীতি রাজনীতিকদের জন্য একটা লাভালাভের বিষয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ায়। আর এর চেয়েও বড় বিষয়টি হচ্ছে, তাদের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং স্বাধীনতার মূল্যবোধগুলো রাজনীতি থেকে ক্রমান্বয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছিল। অর্থাৎ এ দুটো দিক তাদের বেশি মাত্রায় পীড়িত করেছে এবং কাদের মোল্লার রায়টি এসব ক্ষোভেরই কেন্দ্রীভূত বহিঃপ্রকাশ। আর এ রায়ের মাধ্যমে অন্যান্য যে না পাওয়াগুলো, সে জন্য তারা ফুঁসে উঠেছেন।

এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ভিন্ন, শুরুটা ভিন্ন এবং যেভাবে চলছে তাও ভিন্ন। ভিন্ন এই অর্থে যে, দুই সপ্তাহ ধরে অসংখ্য মানুষের অংশগ্রহণ ও তাদের উপস্থিতি। কারণ দাবিদাওয়াগুলো রাজনৈতিকভাবে খুবই প্রখর এবং চূড়ান্ত দাবি। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, রাজনীতির এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি এবং যে দাবির প্রতি তারা সবাই নিবেদিত, এমন একটি বিষয় নিয়ে তারা আন্দোলন করছেন। আবার এখানে একটি উৎসবমুখর পরিবেশও রয়েছে। দাবিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এটা তাদের পুরোপুরি ভাবে আচ্ছন্ন করছে না। এটাই হচ্ছে অসামান্য ব্যাপার। এখানে এটাও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, তারা তাদের প্রত্যয়, প্রতিজ্ঞা, দৃঢ়তার ব্যাপারে একচুলও নড়ছেন না। আন্দোলনকারীরা এ দুটো দিককে বজায় রাখতে পেরেছেন বলে তাদের আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততার বৃদ্ধি ঘটছে।

এই আন্দোলনের ভবিষ্যত নিয়ে যদি বলা যায়, তাহলে বলতে হবে, দুটো স্পষ্ট দাবি নিয়েই তারা মাঠে নেমেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও চরম শাস্তি ছাড়া তারা ঘরে ফিরে যাবেন না এবং প্রথাগত রাজনৈতিক দলের দ্বারা তারা প্রভাবান্বিত হবেন না। এটা অবশ্যই রাজনৈতিক আন্দোলন তো বটেই, সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনও। এই আন্দোলনকে তারা প্রথাগত রাজনীতির দ্বারা প্রভাবান্বিত হতে দিতে নারাজ। আর এটা বজায় রাখার প্রবল চেষ্টা তাদের মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে ভালো উদ্দেশ্য হোক বা ষড়যন্ত্রমূলকভাবে হোক, দাবিদাওয়ার পরিধি বিস্তৃত করার ব্যাপারে তাদের উপর চাপ আসছে। এখানে তারা খুবই বিচক্ষণতার সঙ্গে তাদের প্রধান দাবি থেকে মোটেও সরে যাচ্ছেন না। মনে হয়, তারা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ। চাপ সত্ত্বেও তারা যে জায়গায় থেকে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, সে জায়গার মধ্যে রাখতে এখনো পর্যন্ত পূর্ণভাবে সমর্থ হয়েছেন এবং ধারণা করা যায়, এটা তারা বজায় রাখতে পারবেন। এক্ষেত্রে এ আন্দোলনকে বৃহত্তর আন্দোলন অর্থাৎ প্রথাগত আন্দোলনে পরিণত করার যে সব চেষ্টা আছে, তাতে প্রভাবান্বিত না হয়ে, তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি থেকে বিচ্যুত হবেন না বলেই মনে হচ্ছে।

বিদ্যমান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যেকার যে বিবাদ সংঘাতে জড়িয়ে না পরে বা কোন পক্ষের অঙ্গ হিসেবেও তারা ব্যবহৃত হবেন না এটাই প্রত্যাশা। তাদের দাবি এবং অবস্থানে তারা দৃঢ় থাকবেন এবং কোনো দলীয়করণের চেষ্টায় কোনো লাভ হবে না। এর মধ্যদিয়ে শাহবাগের আন্দোলনকারীরা সুস্থ মূল্যবোধের পক্ষে একটা বড় চাপ সৃষ্টিকারী গ্র“প হিসেবে কাজ করবেন।

এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, বড় দুই রাজনৈতিক দলের জন্য এই আন্দোলন একটা চাপ সৃষ্টি করেছে। ক্ষমতাসীন দল স্বাভাবিক ভাবেই উৎকণ্ঠিত তো থাকবেই, আর এর সঙ্গে সঙ্গে তাদের প্রচেষ্টাও থাকবে, যাতে এই আন্দোলন সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ না নেয়। এবং এই আন্দোলনকে যাতে তারা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে পারে। সরকার প্রথমদিকে তাদের প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রদর্শনের কারণে, বাস্তবতা বুঝতে পেরে, অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে। আর বিরোধী দল এই আন্দোলনকে নিকট ভবিষ্যতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ দিতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ এই আন্দোলনের ব্যাপারে তারা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে বিরোধীদলের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা এবং পরিস্থিতি মূল্যায়নের সক্ষমতার অভাবগুলো ফুটে উঠেছে। বিরোধী দল বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এই আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জামায়াত। তাদের এই ধকল কাটিয়ে উঠতে বহু সময় লেগে যাবে।

তবে সবমিলিয়ে বলা যায়, এই আন্দোলনে রাজনৈতীবিদরা লাভবান হননি। এটা তাদের জন্য একটি সতর্কবাণী।।