Home » মতামত » শাহবাগ – একজন সক্রিয় ব্লগারের দৃষ্টিতে

শাহবাগ – একজন সক্রিয় ব্লগারের দৃষ্টিতে

আযম খান (ব্লগার “মহামান্য কহেন”)

shahbagh-movement-1৫ ফেব্রুয়ারি, সময় ৩টা বেজে ৩০ মিনিট। প্রায় পঞ্চাশ জনের মতন তরুন ছেলেমেয়ে শাহবাগ জাদুঘরের সামনে ফেসবুকের মাধ্যমে ডাক পেয়ে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছিল। তাদের চেহারায় ছিল প্রচন্ড রকমের ক্রোধ। ৩৪৪ জন মানুষ খুন করার অভিযোগ প্রমাণিত হবার পরেও কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদন্ড হল। সবার মুখে একটাই কথা, আর কতজন মানুষ খুন করলে এই রাজাকারের মৃত্যুদণ্ড হতে পারত? প্রথম সিদ্ধান্তটা ছিল ট্রাইব্যুনাল ঘেরাও করার কিন্তু খানিক পরে সিদ্ধান্ত হয় শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেয়ার। তারপরের সময়টুকুন ইতিহাসের এক মহীসোপান, এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে বাংলার আনাচে কানাচে সর্বত্র।

এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ব্লগার্স এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের সদস্যরা। জামাতকে নিষিদ্ধ করতে হবে স্লোগান উঠলেও, তা কিভাবে করতে হবে সে ব্যাপারে কোন রুপরেখা নেই। আইনমন্ত্রী তালমিলিয়ে বলে যাচ্ছেন নির্বাচন কমিশন দেখছে, কিন্তু আমরা জানি তাদের ক্ষমতা নিবন্ধন বাতিলের। অন্যদিকে, আন্দোলনের সাথে সম্পূর্ণ ব্লগাররা চাচ্ছেন জামাতকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে সংসদের মাধ্যমে আইন প্রনয়ন করে জার্মান নাৎসিদের মতন নিষিদ্ধ করা হোক। যাতে তারা পরবর্তীতেও অন্য কোন মোড়কে তাদের আদর্শ, লক্ষ্যের চর্চা অব্যাহত না রাখতে পারে।

গত ১৫ তারিখে আমরা দেখতে পাই কোন ধরণের পুর্বাভাস ছাড়াই নাসিরুদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু আন্দোলনের সময় কমিয়ে বিকেল ৩টা থেকে ১০টা পর্যন্ত নির্ধারন করে দেন। কার সাথে আলোচনা করে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন তা জানা যায়নি। ব্লগাররা যেহেতু আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সেক্ষেত্রে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রাখেন কিনা সেটাও আরেকটি বড় প্রশ্ন। যতদুর জানা যায়, তিনি আওয়ামি ঘরানার একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। উদ্দেশ্যটা খুবই স্পষ্ট ছিল, আন্দোলনের গতিকে ধীরে ধীরে স্তব্ধ করা দেয়া। উপস্থিত অনেকেই এই সিদ্ধান্তে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আসলে আমাদের প্রচলিত ধারার রাজনীতির জন্য এই আন্দোলন একটি বড় হুমকি। মানুষের মধ্যে চেতনার উন্মেষ হচ্ছে, বহুদিন পরে তারা আবার উপলব্ধি করতে পারছেন তাদের গায়ে কি পরিমানের অসীম শক্তি এবং তারা চাইলেই যেকোন অশুভ শক্তিকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারেন। তার কিছুক্ষনের মধ্যেই খবর আসে ব্লগার থাবা বাবার জামাতশিবিরের হাতে নির্মম হত্যাকান্ডের, উপস্থিত সমবেত জনতা এর প্রতিবাদ করেন এবং সিদ্ধান্ত জানান তারা বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন না। এ থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয় যে, এই আন্দোলনের ভাগ্যনিয়ন্তা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনতাই।

আন্দোলনকে রাজনীতিকীকরণের এইরকম অনেক প্রচেষ্টাই হচ্ছে,তবে শেষ পর্যন্ত জনতার চাপে তা করতে দেয়া যাচ্ছে না। আন্দোলনে প্রথমদিকে ব্লগারদের উপস্থিতি থাকলেও, এখন তারা অনেকটাই ব্রাত্য হয়ে পড়েছেন। দুইএকজন ব্লগার, যাদের গায়ে রাজনৈতিক সিল স্পষ্ট, তারা ছাড়া অন্যরা কেউই মূল মঞ্চের ধারেকাছেও যেতে পারছেন না। সেখানে ছাত্রলীগের উপস্থিতি বেশ লক্ষ্যনীয়, আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রন করাই এর একমাত্র কারণ হতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে এবং তাদের প্রতিবাদী ভূমিকার কারণে আন্দোলন গণমানুষের হাতেই রয়ে গেছে। আন্দোলন নিয়ন্ত্রন কেউ করতে চাইলে সাধারণ মানুষ যে নিয়ন্ত্রিত হবেন না তা গত ১৫ ফেব্রুয়ারীতেই স্পষ্ট হয়ে গেছে।

এ ছাড়া জামাতশিবির এই আন্দোলনকে এখন রীতিমত তাদের জন্য কফিনের শেষ পেরেক ঠূকে দেয়া মনে করছে। তাই তারা অনলাইন সহ নানা জায়গায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নানানভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তারা বলে যাচ্ছে, শাহবাগে ইসলামের বিরুদ্ধে নাস্তিকদের ষড়যন্ত্র চলছে, সেখানে মদগাজা সেবনসহ নানান প্রকারের অশ্লীল কার্যকলাপ চলছে। কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, ভোর বেলায় অসংখ্য ধর্মপরায়ণ মানুষ নামাজ পড়ে মাথায় টূপি, হাতে তসবিহ নিয়ে শাহবাগে প্রবেশ করছেন এবং স্লোগান দিচ্ছেন, গলা মিলিয়ে জাতীয় সংগীত গাইছেন। তারপরে বেলা বাড়তেই দেখা যাচ্ছে স্কুলকলেজের ইউনিফর্ম পরা ছেলেমেয়েরা শাহবাগ মোড়ে চলে আসছে। মূলত এইখানেই জামাতশিবিরের ভয়ের জায়গাটা। উঠতি ছেলেমেয়েদের মধ্যে একাত্তরের চেতনার ধারণ করার প্রবনতা এত দ্রুত বাড়ছে যে, তারা শংকিত, কারণ এই বয়সী ছেলেমেয়েরাই শিবিরের মূল লক্ষ্য। কিন্তু সাধারণ মানুষের সচেতনতা আর আন্দোলন ছড়িয়ে পরার গতির কাছে স্রোতের মতন ভেসে যাচ্ছে কোটি টাকা খরচ করে তৈরী করা এসব প্রোপাগান্ডা।

সবচাইতে আনন্দের ব্যাপার, সাধারণ মানুষ অবশেষে পথে নেমেছে। বিগত দুই দশকে আমরা মানুষের মধ্যে রাজনীতি থেকে দূরে থাকার যে মানসিকতা দেখেছি, তা পরিবর্তিত হয়েছে। জনগণ বুঝতে পেরেছে আসলে দিনশেষে রাজনীতিই তার অধিকার এবং জীবনের মৌলিকত্ব নিয়ন্ত্রন করে। এ জাগরন শুরু হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবীতে এবং জামাতশিবিরকে বাংলার মাটি হতে চিরতরে উচ্ছেদের জন্য। আমরা সফল হব, সে ব্যাপারে কিছুটা অনিশ্চয়তা নানান জাগতিক কারণে থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের মধ্যে যে জাগরনের সৃষ্টি হয়েছে সে ব্যাপারে কোন মতদ্বৈততা নেই। তবে ইঙ্গিতটা স্পষ্ট যে কোন কিছুর যেমন শুরু আছে তেমনি তার শেষও আছে। আমরা অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছি।।

(নাগরিক ব্লগের নিয়মিত লেখক এবং শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক)