Home » আন্তর্জাতিক » সরকারের ব্যর্থ পানি কূটনীতি (প্রথম পর্ব)

সরকারের ব্যর্থ পানি কূটনীতি (প্রথম পর্ব)

. ইনামুল হক

inamul-huq-2-বাংলার সমভূমি বিগত ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দু’টি রাষ্ট্রে ভাগ হয়ে গেলে এর অনেক নদনদীর প্রবাহপথ দুই দেশের সীমানা ভেদ করে যায়। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ হয় এবং ৫৪টি অন্তর্দেশীয় নদী ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের পর্যবেক্ষণের আওতায় পড়ে। ১৯৭৪ সালে গঙ্গা নদীর উপর ভারত ফারাক্কা ব্যারেজ চালু করেছিলো। তখন থেকেই বাংলাদেশকে পানি কূটনীতির আশ্রয় নিতে হয়েছে। ফারাক্কা ব্যারেজের ডাইভারশন খালের মাধ্যমে ৪০,০০০ কিউসেক পানি পশ্চিম বঙ্গের ভাগিরথী নদীতে প্রত্যাহার করা সম্ভব। ব্যারেজ চালূ হবার আগেই এ বিষয়ে ১৬ জুলাই ১৯৭৩ দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। ১৬ মে ১৯৭৪ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে স্বাক্ষরিত এক সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে ভারতকে ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে ১১,০০০ থেকে ১৬,০০০ কিউসেক প্রত্যাহারের অনুমতি দেয়। ঐ সমঝোতায় পানি প্রত্যাহরের সময় বাংলাদেশকে ন্যূনপক্ষে ৪৪,০০০ কিউসেক পানি দেবার নিশ্চয়তা ছিলো। এই সমঝোতার মেয়াদ ৩১ মে ১৯৭৫ উত্তীর্ণ হয়ে যায়।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নিহত হবার পর ভারত ফারাক্কা ব্যারেজকে পুরোপুরি চালু করে পূর্ণোদ্দমে পানি প্রত্যাহার শুরু করে। ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মেরারজি দেশাইয়ের সাথে গঙ্গার পানি বন্টন নিয়ে যখন দ্বিতীয় সমঝোতা চুক্তি হয়, তখন ভারত তার প্রত্যারের পরিমাণ বাড়িয়ে ন্যূনতম ২০,৫০০ কিউসেকে তুলে নেয়। ঐ চুক্তিতে বাংলাদেশকে ন্যূনতম ৩৪,৫০০ কিউসেক পানি দেবার নিশ্চয়তা দেয়া ছিলো। এই সমঝোতাকে গঙ্গার প্রথম পানি বন্টন চুক্তি বলা হয়, যার মেয়াদ ছিলো পাঁচ বছর। ৩০ মে ১৯৮১ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হবার পর এই চুক্তি বলবৎ থাকলেও ১৯৮২ সালে তা’ তামাদি হয়ে যায়। এরপর এরশাদের আমলে ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালের জন্য প্রথম সমঝোতা হয়। কিন্তু ১৯৮৫ সালে কোন সমঝোতা ছিল না। ১৯৮৬, ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালেও দ্বিতীয় সমঝোতার পর কোন সমঝোতা নেই। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার আমলেও গঙ্গার পানি বন্টন নিয়ে কোন সমঝোতা চুক্তি হলো না। বাংলাদেশের অংশে হার্ডিঞ্জ ব্রীজের কাছে ৩০ মার্চ ১৯৯৬ গঙ্গার পানি প্রবাহ কমে ৯,২১৮ কিউসেকে এসে দাঁড়ায় (বাংলাদেশ অবজারভার. ০৯.০৯.১৯৯৬)। ঐ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ভারতের সাথে গঙ্গা নদীর দ্বিতীয় পানি বন্টন চুক্তি করে।

১২ ডিসেম্বর ১৯৯৬ ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী দেব গৌড়া এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরকৃত ঐ চুক্তিতে বাংলাদেশের ভাগে ন্যূনতম প্রবাহ বরাদ্দ হলো ২৭,৬৩৩ কিউসেক। চুক্তিতে বাংলাদেশকে ঐ পরিমাণ পানি দেবার নিশ্চয়তাও দেয়া নেই। কিন্তু ভারতের ভাগে ন্যূনতম বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়ালো ২৫,৯৯২ কিউসেক। এ সত্বেও বলা হলো, যেহেতেু কোন চুক্তি ছিলো না, সেহেতু এই ধরণের চুক্তিও আমাদের জন্যে ভালো হয়েছে। চুক্তির মেয়াদ হলো ৩০ বছর। আশা করা হলো, এবার বাংলাদেশে গঙ্গার পানির যখন অধিকার পাওয়া গেছে, তখন আমাদের অংশেও বহু প্রতীক্ষিত গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে যাবে। সাফল্য যাই হোক, এরপর আর আওয়ামী লীগ পানি কূটনীতিতে এগুতে পারেনি।

আওয়ামী লীগের পর বিএনপি আমলে পানি কূটনীতির কিছুই হলো না। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে পুনর্বার ক্ষমতায় এলে তিস্তা নদীর পানি বন্টনের বিষয়টি চলে আসে। ভারত ১৯৮২ সালে গজলডোবার কাছে তিস্তা নদীর উপর ব্যারেজ নির্মাণ করে ও পরবর্তীতে শিলিগুড়ি শহরের দক্ষিণ পাশ ঘেঁেষ একটি ডাইভারশন খাল কেটে মহানন্দা নদীতে পানি সরিয়ে নিচ্ছে। তা’ছাড়া উত্তরবঙ্গের কুচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদহ জেলার ৯.২২ লক্ষ হেক্টর জমিতে তিস্তার পানি দিয়ে সেচ দেবার জন্য ভারতের বিশাল পরিকল্পনা আছে। বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে দোয়ানীর কাছে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ করেছে, যার আওতায় বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়া জেলার ৬.৩২ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচ দেবার পরিকল্পনা আছে। বাংলাদেশে নির্মিত তিস্তা ব্যারেজের কাছে ঐতিহাসিকভাবে তিস্তা নদীর সর্বাধিক গড় প্রবাহ ছিলো ২,৮০,০০০ কিউসেক এবং সর্বনিম্ন গড় প্রবাহ ছিলো ১০,০০০ কিউসেক। এর উজানে ক্রমবৃদ্ধি হারে পানি সরিয়ে নেয়ার কারণে বাংলাদেশে এর প্রবাহ এখন ১,০০০ কিউসেকে এসে দাড়িয়েছে, এমনকি খরার সময় তা ৫০০ কিউসেক হয়ে যায়।

বিগত মার্চ ২০১০ দিল্লীতে বাংলাদেশ ভারত যৌথ নদী কমিশনের ৩৭তম বৈঠকের সময় বাংলাদেশের পানি সম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র রায় তিস্তার পানি গজলডোবা পয়েন্টে ৫০৫০ হারে ভাগাভাগির দাবী তুলেছিলেন। ঐসময় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আমরা না চাইতেই ৩,৫০০ কিউসেক পানি পাচ্ছি, আলাপের মাধ্যমে আরও বেশী পাবো। জানুয়ারী ২০১১ ঢাকায় সচিব পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ ৮,০০০ কিউসেক ও ভারত ২১,০০০ কিউসেক পানির পাওয়ার দাবী তোলে। এই দুই মিলে ২৯,০০০ কিউসেক হয়, কিন্তু তিস্তার গড় ন্যুনতম প্রবাহ ছিলো ১০,০০০ কিউসেক! ঐতিহাসিকভাবে, তিস্তার পানি আসে হিমালয়ের হিমবাহগুলো থেকে যার সাথে যোগ দেয় এর গতিপথের ঝর্ণা ও উপনদীগুলির প্রবাহ। এই প্রবাহ বসন্ত আসার সাথে বাড়তে থাকে যখন তাপবৃদ্ধির কারণে তুষার ও হিমবাহগুলি গলতে শুরু করে। বর্ষার অতিবৃষ্টি (সারা সিকিমে বাৎসরিক গড় বৃষ্টিপাত ২৭৪০ মিলিমিটার) অনেক সময় ভাটির ডুয়ার্স সমতলে বন্যা সৃষ্টি করে। ভারতের পানি বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র তিস্তার পানি প্রসঙ্গে লিখেছেন, এন্ডারসন সেতুর তলায় এই প্রবাহ অনেক সময় ৯০ কিউমেকে (৩১৭৭ কিউসেক) নেমে আসে। [১ কিউমেক (কিউবিক মিটার প্রতি সেকেন্ডে)=৩৫.৩ কিউসেক (কিউবিক ফিট প্রতি সেকেন্ড)]। এই সেতুটি দার্জিলিং কালিমপং সড়কে অবস্থিত যার ২৫ কিলোমিটার ভাটিতে সিভক শহরের কাছে তিস্তা নদী ডুয়ার্সের সমতলে প্রবেশ করেছে। তারও ১৫ কিলোমিটার ভাটিতে গজলডোবা ব্যারেজ নির্মিত। গজলডোবার ২৫ কিলোমিটার ভাটিতে দোমোহনি রেল/সড়ক সেতু, যার উজানে ডুয়ার্স অঞ্চলের ধরলা নদী এসে মিশেছে। শীতে তিস্তা নদীতে এই নদীর যোগান ১০ কিউমেকের বেশী হবে না। গজলডোবার ৬৫ কিলোমিটার ভাটিতে তিস্তা নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশের কাউনিয়া রেল সেতুর কাছে আমরা গড়ে ২০০ কিউসেক ন্যুনতম প্রবাহ পেয়েছি।

বাংলাদেশ ভারত যৌথ নদী কমিশনের ৩৭তম বৈঠকের পর বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকার তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালায়। ৭ সেপ্টেম্বর ২০১১ ঢাকায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠকে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে এটাই জোর খবর হয়। ঐ বৈঠকে বাংলাদেশের আশেপাশের ভারতীয় রাজ্যগুলির সকল মুখ্যমন্ত্রীর থাকবেন এটাও বলা হলো। পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী আসেননি বলে তিস্তা নদীর পানি বন্টন চুক্তি হয়নি। ৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েস বলেন, ‘তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি চূড়ান্ত হয়েই আছে। বাংলাদেশ তার অবস্থান থেকে এক বিন্দুও ছাড় দেবে না।’ আসলে তিস্তা পানি চুক্তির বিপরীতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তার উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যসমূহে যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের কাছে করিডোর চাইছিল। বাংলাদেশ সংলগ্ন অন্য চারটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের স্বার্থে বিষয়টি জরুরী ছিলো। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, দেশীয় বাধ্যবাধকতা পালন করে কাস্টম ছাড় ও শুল্ক প্রদান সাপেক্ষে বাংলাদেশ বন্ধুপ্রতিম দেশের মালামাল গমনাগমনের সুযোগ দিতেই পারে। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কি তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে যথেষ্ট প্রস্তুত ছিলো, নাকি একটি লোক দেখানো চুক্তি সই করার ব্যাপারে ভারতের চাপের মুখে ছিলো?

বিগত ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১২ কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় ’মমতার শর্ত মেনে তিস্তাজট খুলতে উদ্যোগী মনমোহন’ শীর্ষক একটি খবরে প্রকাশিত হয়েছে। তা’তে বলা হয়েছে, মমতা বন্দোপাধ্যায়ের তীব্র আপত্তিতে মুখ থুবড়ে পড়েছিল তিস্তা চুক্তি। পশ্চিমবঙ্গ পানি থেকে বঞ্চিত হবে, এই অভিযোগ তোলায় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকা সফরে গিয়েও সেই চুক্তি বাস্তবায়ন করতে পারেননি। মমতা নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রকে তিস্তার পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখে রিপোর্ট জমা দিতে বলেন। মমতার কথা বাংলাদেশকে ২৫% শতাংশের বেশী পানি দেয়া যাবে না। কিন্তু খসড়া চুক্তিতে সেই কথা ছিলো না। সিকিম যে তিস্তা নদীর উপনদীগুলিতে জলবিদ্যুত উৎপাদনের জন্য জলাধার নির্মাণ করে তিস্তার তলানি প্রবাহ আটকে ফেলছে, সে ব্যাপারে সিকিমের মুখ্যমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে। মমতার কথা ’তিস্তায় এখন জল নেই’ বলেই চুক্তির প্রয়োজন হচ্ছে। তবে এই চুক্তি অন্তর্বত্তীকালীন, দশ বছরের প্রবাহ দেখে স্থায়ী চুক্তি করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

তিস্তা নদীর পানি বন্টন নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যর্থতার পেছনে বাস্তব সত্য এই যে, ভারত এখনই তার আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনার অধীনে তিস্তার প্রায় সবটা পানি গজলডোবা ব্যারেজ থেকে ডাইভারশান খালের মাধ্যমে বিহারের মেচী নদীতে সরিয়ে নিচ্ছে। কল্যাণ রুদ্র বিগত ৬ সেপ্টেম্বর কলকাতাতে বলেন, গজলডোবা ব্যারেজের কাছে তিস্তার ন্যুনতম প্রবাহ হলো ৩৫০০ থেকে ৪০০০ কিউসেক। কল্যাণ রুদ্র আরও বলেন, সিকিমে প্রস্তাবিত ২৩টি ‘খড়ি ঋষড়’ি ফধসং নির্মিত হলে পানি আরও কম পাওয়া যাবে। বাস্তবে ১৯৮২ সালে গজলডোবা ব্যারেজ চালু করার আগে থেকেই সেচের জন্য তিস্তা নদী থেকে পানি উত্তোলন করায় এবং সিকিমে নির্মিত পর্যটন ও জলবিদ্যুত জলাধারগুলিতে পানি আটকে রাখায় প্রবাহ কমতে থাকে। তিস্তা অববাহিকায় ৫টি নির্মিত, ৪টি নির্মীয়মান ও ৩১ টি প্রস্তাবিত ড্যাম প্রকল্প আছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, গজলডোবা ব্যারেজের কাছে আসা ৩৫০০ থেকে ৪০০০ কিউসেক পানি কোথায় যাচ্ছে? কারণ ভাটিতে দোয়ানীর কাছে আমরা মাত্র ১০০০ থেকে ৪০০ কিউসেক পানি পাচ্ছি। এর উত্তর পেতে আমাদেরকে তেতুলিয়া থেকে বাংলাবান্ধা সড়কে যেতে হবে, যার পাশ দিয়ে মহানন্দা নদী প্রবাহিত। তিস্তার পানি এই নদী দিয়ে যাচ্ছে বিহারের মেচী নদীতে, সেখান থেকে ফুলহার নদের মাধ্যমে ফারাক্কার উজানে।।

(চলবে…)