Home » আন্তর্জাতিক » তেল গ্যাস লুট দেশে দেশে – ১

তেল গ্যাস লুট দেশে দেশে – ১

লুণ্ঠনের প্রেক্ষাপট

ফারুক চৌধুরী

chevronখনিজ সামগ্রী বললে, লোহা, কালা, সোনা, রূপা, ইত্যাদির কথা আমাদের মাথার মধ্যে সহজেই ঘুরপাক খায়। কিন্তু খনিজ সামগ্রীর জগত আরো ব্যাপক ও বিস্তৃত। আবার এটাও খেয়াল রাখা দরকার যে, এক হিসেবে বাংলাদেশে কয়লাকে খনিজ দ্রব্য হিসেবে গণ্য করা হয় না। গুরুত্বের বিচারে লোহা, সোনা, রূপা, কয়লার গুরুত্ব একেবারেই কম নয়। কিন্তু খনিজ সামগ্রীর বিস্তৃত যে জগত, সেখানে অন্যান্য খনিজ দ্রব্যের গুরুত্বও অনেক। উদাহরণ দেয়া যাক, একটি বাড়ি তৈরি হবে। তাই দরকার হবে ইট, সিমেন্ট, বালি, রড, কাঠ, লোহা। যদি বাড়িটি দেয়াল ইটে তৈরি না হয়ে মাটির তৈরি হয়, যদি বাড়িটির ছাদ হয় টিনের, তাহলে প্রয়োজন হবে কাদা ও টিন। আর ইট তৈরি হচ্ছে মাটি দিয়ে। অর্থাৎ বাড়িটির জন্য দরকার হচ্ছে কয়েকটি খনিজ দ্রব্য : মাটি, লোহা, টিন, ইত্যাদি। পেরেক, স্ক্রু, সিমেন্ট, বল্টু, নাট, ঢেউ টিন, জলের পাইপ, বিদ্যুৎ তার, জানালার কাঁচ, ইত্যাদির প্রতিটিতে রয়েছে কোনো না কোনো খনিজ দ্রব্য। বাড়িতে ব্যবহৃত কোনো কোনো ধাতব সামগ্রী তৈরি হয় ক্রোমিয়াম দিয়ে। আর ক্রোমিয়াম আরো ক্রামাইট নামের খনিজ দ্রব্য থেকে। কাঁচ তৈরি হয় অভ্র এবং অন্যান্য সামগ্রি মিশিয়ে। অভ্র খনিজ দ্রব্য, বালিও কোথাও কোথাও খনিজ দ্রব্য। জলের নল বা পাইপ আগে তৈরি করা হতো শিসা দিয়ে। সেটি বিষাক্ত। তাই এখন তৈরি হয় তামা বা প্লাস্টিক দিয়ে। শিসা পাওয়া যায় গ্যালেনা নামের খনিজ দ্রব্য থেকে। বিদ্যুৎ তার তৈরি হয় তামা দিয়ে। পেরেক, নাট, বল্টু তৈরি হয় ইস্পাত দিয়ে। আর ইস্পাত তৈরি হয় লোহা দিয়ে। পেরেক, নাট, বল্টুতে যাতে মরিচা না ধরে সে উদ্দেশ্য এ সবের গায়ে লেপে দেয়া হয় দস্তা বা এ ধরনের খনিজ দ্রব্য। সিমেন্ট তৈরি হয় কাদার সাথে চুনাপাথর এবং জিপসাম ও কয়েকটি খনিজ দ্রব্য মিশিয়ে। খেয়াল রাখা দরকার, কাদাও খনিজ দ্রব্য। এসব তথ্য জানাচ্ছে, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্টরি বা প্রাকৃতিক ইতিহাসের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যাদুঘর।

এবার একটি বাড়ির দিক থেকে চোখ ফেরানো যাক কোনো একটি দেশের দিকে। একটি দেশে মানুষের বেঁচে থাকার কতো কিছুই না লাগে। অর্থনীতি সচল রাখতেও একই ব্যাপার। রাজনীতির ঘটনা প্রবাহিত হয় এসব ঘিরেই। দেশে থাকে কতো বাড়ি, কতো সড়ক, কতো কল, কতো গাড়ি? অনেক, সুই, লাঙ্গলের ফলা (সে লাঙ্গল কাঠের হোক বা কলের হোক, ইস্পাতের তৈরি ফলা লাগবেই), পেরেক, খাড়ির চাকা, গাড়ির যন্ত্রপাতি, কারখানার কলকজ্বা, বিমানের যন্ত্রপাতি সবজি কাটার জন্য রান্নাঘরে বটি, ফল কাটার জন্য ছুরি, অস্ত্রোপাচারের ছুরি, বিকলাঙ্গ মানুষের চলার জন্য হুইল চেয়ার বা চাকা চেয়ার, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ঘড়ি, দুর্বৃত্ব মোকাবেলায় পুলিশের রাইফেল, সে রাইফেলে ব্যবহৃত বুলেট, চশমা, বিদ্যুৎ তার, সড়ক নির্মাণের সরঞ্জাম এভাবে লিস্ট বা তালিকা দীর্ঘ হতেই থাকবে।

এ সবে দরকার হচ্ছে নানা ধরনের খনিজ দ্রব্য। যদি বাড়ি, গাড়ি, ছুরি, কাঁচি, লাঙ্গলের সংখ্যা হয় লাখ লাখ, যদি সড়কের দৈর্ঘ্য হয় হাজার হাজার কিলোমিটার, যদি বিমানের সংখ্যা হয় হাজার হাজার, যদি কামান, বন্দুক, হেলিকপ্টার, বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র, কলকারখানা, বাণিজ্য জাহাজ, যুদ্ধ জাহাজ, মহাকাশযান, উপগ্রহ, ডুবোজাহাজ, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বাঁধ, এভাবে একের পর এক গণ্য করা হয়, তাহলে কতো ধরনের ও কতো পরিমাণে খনিজ দ্রব্য লাগবে? এসব ক্ষয় হয়, ধ্বংস হয়, নষ্ট হয়, ফুরিয়ে যায়। তাই খনিজ দ্রব্যও লাগতেই থাকবে।

যদি দেশটি হয় বিশাল, যদি দেশটির জনসংখ্যা হয় বিপুল, যদি দেশটির অধিবাসীদের জীবনধারা হয় খুব বেশি যন্ত্র নির্ভর, তাহলে কতো পরিমাণ খনিজ দ্রব্য দরকার হবে? স্রেফ কাটা চামচের কথাই ধরা যাক। আফ্রিকার বা এশিয়ার যে সব দেশের বাসিন্দারা খাওয়ার সময় কাঁটা চামচ, ছুরি ব্যবহার করেন না, তাদের ব্যবহৃত ধাতব পদার্থের পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি ধাতব পদার্থ ব্যবহৃত হয় যারা কাঁটা চামচ, ছুরি ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে। (এ উদাহরণের ক্ষেত্রে কাঁটা চামচ ব্যবহারের ভালো মন্দ দিক নির্দেশ করা হচ্ছে না) একই কথা প্রযোজ্য গাড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে, পর্যটনের ক্ষেত্রে, বাড়ির ক্ষেত্রে এবং অর্থনৈতিক জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে।

এবার খেয়াল করা যাক, যদি এমন দেশের সংখ্যা কয়েকটি হয় তাহলে ব্যবহৃত খনিজ পদার্থের পরিমাণ হবে আরো বেশি।

যদি এসব কয়েকটি দেশ অবশিষ্ট পৃথিবীকে নিজ নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্দেশ্যে সমরাস্ত্র, যুদ্ধবিগ্রহ, আগ্রাসনে সব সময় নিয়োজিত থাকে, তাহলে খনিজ পদার্থের প্রয়োজন আরো বেশি হবে। কারণ অস্ত্র, বিমান ইত্যাদির জন্য কোনো কোনো খনিজ দ্রব্য দরকার হয়। এ সব যুদ্ধাস্ত্র যত বেশি তৈরি করা হবে, ওই সব খনিজ পদার্থ ততো বেশি দরকার হবে।

সেক্ষেত্রে এ সব খনিজ পদার্থ যে জায়গাগুলোতে পাওয়া যায় সে সব স্থান নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চালাবে সমরাস্ত্র উৎপাদনকারী দেশগুলো।

আর এ সবের কোনোটিই চলক্ষে না, যদি কলের চাকা না ঘোরে। কলের চাকা ঘোরায় মানুষের মেহনত আর অন্যান্য শক্তি, যার মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস। উদাহরণ দেয়া যাক। সড়ক নির্মাণে অত্যাধুনিক, বড় যন্ত্রের কথা যদি একপাশে সরিয়ে রেখে কেবল স্টিম রোলারের কথা ধরা হয়, তাহলে দেখা যাবে, স্টিম রোলার চালায় কয়েকটি যন্ত্র আর চালান মানুষ। স্টিম রোলারের যন্ত্রগুলো চলে তেলের শক্তিতে। স্টিম রোলার তৈরি হয় একটি বা কয়েকটি কারখানায়। স্টিম রোলার তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ধাতব পদার্থ প্রক্রিয়া করতে, অর্থাৎ ঢালাই মেশানো ছাঁচে ঢালা, পেটানো, ইত্যাদি কাজও হয় কারখানায়। এসব ধাতব পদার্থ সংগ্রহ হয় খনি থেকে। এ সবের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োজন হচ্ছে শক্তি, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস, ইত্যাদি। আর যে মানুষটি স্টিম রোলার চালান, স্টিম রোলার তৈরির কারখানাগুলো চালান যে মানুষরা, তারা খাদ্য না পেলে ওই সব চালানোর মতো দৈহিক বল পেতেন না। এ খাদ্য তৈরিতেও দরকার হয় শক্তি, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ইত্যাদি।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, খনিজদ্রব্য খুব দরকারি। একইভাবে দরকারি হচ্ছে শক্তি। একে সহজভাবে বুঝতে পারার জন্য ইন্ধন বা জ্বালানি শব্দগুলোও এ লেখায় ব্যবহার করা হচ্ছে, যদিও প্রকৃত বিশ্লেষণে এ সবের মধ্যে বেশ পার্থক্য রয়েছে। খনিজ পদার্থ সংগ্রহে শক্তি প্রয়োজন হয়। আবার শক্তি সংগ্রহে খনিজ পদার্থ দরকার হয়। আর খনিজ পদার্থ ও শক্তি ছাড়া আজকের পৃথিবীর কথা কল্পনাও করা যায় না।

শক্তি আসে নানা উৎস থেকে। এ সবের অন্যতম তেল ও গ্যাস। সূর্যের আলো, জলস্রোত, বায়ু প্রবাহ, ঢেউ, ভূগর্ভের তাপ, ইত্যাদিও শক্তি যোগায়। এ সব ইন্ধন হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে, এখন পর্যন্ত প্রযুক্তির যে মাত্রা, সে বিচারে তেল ও গ্যাস সহজলভ্য।

এ দিকগুলোর সাথে যদি যোগ হয় এমন অর্থনীতি যে অর্থনীতির চাকা ঘোরে কেবল মুনাফার জন্য, তখন খনিজ পদার্থই হোক বা তেল গ্যাসই হোক, সে সব সংগ্রহের তাগিদ বেড়ে যায়। যদি এমন সংগ্রহকারী কয়েকজন হয় পড়েন, তখন দেখা দেয় প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতা আবার তৈরি করে কৌশল, কূটকৌশল। যখন কৌশল কূটকৌশলে কাজ হয় তা তখন দেখা দেয় হানাহানি। আর হানাহানি রক্তপাত ঘটায়। যখন হানাহানিতে ব্যস্ত প্রতিযোগিরা হয় শক্তিধর, তখন প্রতিযোগিতার মীমাংসা করার চেষ্টা করা হয় যুদ্ধ মারফত। ফিরে যাওয়া যাক খনিজ পদার্থের প্রসঙ্গে। অনেক খনিজ দ্রব্রের কোনো কোনো বা কয়েকটি খনিজ দ্রব্যকে গুরুত্বপূর্ণ গণ্য করা হয়। এই গুরুত্ব বিচার একেকটি দেশের ক্ষেত্রে একেক রকম। কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য, শিল্প, বাণিজ্য, চিকিৎসা বা সামরিক বাহিনীর জন্য কোনো কোনো খনিজ পদার্থ গুরুত্বপূর্ণ। অন্য আরেকটি দেশের ক্ষেত্রে গুরুত্ব বিচার অন্য হতে পারে। সে দেশটির বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থ হতে পারে প্রথমোক্ত দেশটি থেকে ভিন্ন। তবে ব্যাপকতর অর্থে এবং বিশ্বের প্রধান দেশগুলোর বিবেচনায় গুরুত্বপুর্ণ খনিজ পদার্থগুলো প্রায় একই। কেবল বাণিজ্যিক অথবা কেবল প্রতিরক্ষা , সমর বা নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে খনিজ দ্রব্যের গুরুত্ব গণ্য হয় না। এটি গণ্য হওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি দিক বিবেচ্য হয়। আবার কোনো দেশের অর্থনীতি হয়ে পড়েছে যুদ্ধ বা অস্ত্র তৈরি নির্ভর। ফলে সে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও সমর স্বার্থ বৃহত্তর, অর্থে একীভূত হয়ে পড়েছে।

এ সব খনিজ পদার্থ দরকার হয় প্রধানত যে দেশগুলোর, তাদের নিজ দেশে এগুলোর খনি নেই বা খনিতে এগুলো ফুরিয়ে গেছে। তাই এ এদেশগুলোকে মরিয়া হয়ে সংগ্রহ করতে হচ্ছে এ সব খনিজ দ্রব্য। খনি দখল করে হোক বা কিনে হোক, এ সব সংগ্রহ করতে হচ্ছে এ দেশগুলোকে। কেবল তাই নয়। ভবিষ্যতে যাতে এ সব খনিজ পদার্থের উৎস বা খনি এ দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকে সে উদ্দেশ্যেও এসব দেশকে নানা চেষ্টা করতে হয়। এ চেষ্টাগুলোর মধ্যে থাকে প্রয়োজনীয় খনি আছে, এমন দেশে অনুগত শাসকদের ক্ষমতায় বসানো। এ উদ্দেশ্যে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ, সামরিক হস্তক্ষেপ, আগ্রাসন, দখল, সশস্ত্র দল উপদল গঠন, সশস্ত্র সংঘাত তৈরি করা, কলহনৈরাজ্য বিচ্ছিন্নতাবাদ গৃহযুদ্ধ তৈরি করা এবং এ সব নিয়ন্ত্রিত করা।

বিভিন্ন তথ্য থেকে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত খনিজ সামগ্রী অন্য স্থান বা দেশ থেকে সংগ্রহ করতেই হবে। এ কারণে এদের মধ্যে প্রতিযোগিতারপ্রতিদ্বন্দ্বিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন এ ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে যোগ দিচ্ছে চীন।

কেবল বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তাগত দিকের প্রতি দৃষ্টি রেখে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ দ্রব্যের পূর্ণ তালিকা তৈরি করা সম্ভব নয়। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এই কয়েকটি কারণের মধ্যে দুটি কারণ হচ্ছে : জাতীয় নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহারের ফর্মুলা বা সূত্র ও প্রক্রিয়া।

একটি উদাহরণ বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করবে। সাধারণভাবে, এখন পর্যন্ত ৯৩টি খনিজ পদার্থকে গুরুত্বপূণৃ গণ্য করা হয়। এ সবের অধিকাংশ পাওয়া যায় আফ্রিকা মহাদেশে ও আফগানিস্তানে। এবার এই মহাদেশটিতে ও এই দেশটিতে ঘটনা প্রবাহ, সংঘাত, হানাহানি, যুদ্ধবিগ্রহ, গৃহযুদ্ধ, অস্থিরতা, ইত্যাদি খেয়াল করলে কি ‘চমৎকার’ একটি সম্পর্ক দেখতে পাওয়া যায় না?

এ সবের সাথে তের ও গ্যাস যোগ করলে বা মিলিয়ে দেখলে, তেল ও গ্যাসের ওপরে করা নজর অথবা তেল ও গ্যাস কেন প্রলুব্ধ করে, তা বুঝতে পারা যায়।।