Home » অর্থনীতি » পুঁজিবাদের একটি ভুতুরে গল্প – ১

পুঁজিবাদের একটি ভুতুরে গল্প – ১

অরুন্ধতী রায়

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

arundhati-2এটা বাড়ি না বাসা? নতুন ভারতের মন্দির না কি এর প্রেতাত্মাদের গুদামঘর? মুম্বাইয়ের অ্যালতামন্ট রোডে অন্টিলায় পৌঁছানোর পর চুইয়ে পড়া রহস্য আর চাপা আতঙ্কে কোনো কিছুই আর আগের মতো ছিল না। ‘এই আমাদের স্থান,’ যে বন্ধুটি আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল সে বলল, ‘আমাদের নতুন শাসকের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করো।’

অন্টিলা, ভারতের সবচেয়ে ধনী মানুষ মুকেশ আম্বানির বাড়ি। এযাবতকালের সবচেয়ে দামি বাড়িটি সম্পর্কে আমি অনেক কিছু পড়েছি : ২৭টি ফ্লোর, তিনটি হেলিপ্যাড, ৯টি লিফট, ঝুলন্ত বাগান, বলরুম, ওয়েদার রুম, জিমনেশিয়াম, পার্কিংয়ের জন্য ছয়টি তলা আর ছয় শ’ চাকর। বিশাল ধাতব তারজালির সঙ্গে লাগানো ২৭ তলা উঁচু ঘাসের খাড়া দেয়ালে তৈরি লনটি দেখার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। কোনো কোনো জায়গায় ঘাস শুকিয়ে সুন্দর আয়তক্ষেত্রের মতো ঝরে পড়েছে। বোঝাই যাচ্ছে, ওপর থেকে পানি দেওয়ার যে ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তা ঠিকমতো কাজ করেনি।

তবে উত্থান তো অবশ্যই ছিল। কারণ ১২০ কোটি মানুষের দেশ ভারতে সবচেয়ে ধনী ১০০ জন জিডিপির একচতুর্থাংশ সমান সম্পদের মালিক।

পথেঘাটে শোনা যায় (এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসে), এত চেষ্টা আর বাগবাগিচা বানানোর পরও আম্বানিরা অন্টিলায় বাস করেন না। কেউই নিশ্চিত জানে না। লোকজন এখনো ভূতপ্রেত আর দুর্ভাগ্য, ‘বাস্তু ও ফেং সুই’য়ের কথা বলে। হয়তো এর পুরো দোষই কার্ল মার্কসের। তিনি বলেছেন, (সব ধরনের ঝামেলা সৃষ্টিকারী) পুঁজিবাদ ‘এত বিশাল পরিমাপের উৎপাদন ও বিনিময় পদ্ধতি উদ্ভাবন করে যে, সেটা হয়ে পড়ে সেই জাদুকরের মতো যে মন্ত্র পড়ে নরক থেকে এমন শক্তিকে ডেকে আনে, কিন্তু পরে তাকে সে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।’

ভারতে আইএমএফ ‘সংস্কার’উত্তর নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীভুক্ত (বাজার) আমরা ৩০ কোটি মানুষ নরকের ভূত, মৃত নদী, শুকনো কূপ, নিষ্পত্র পর্বত, বিরান বনভূমির উপদ্রব সৃষ্টিকারী ভূত, ঋণে জর্জরিত হয়ে আত্মহত্যাকারী আড়াই লাখ কৃষকের প্রেতাত্মা; আমাদের জন্য রাস্তা করে দিতে দরিদ্র হয়ে পড়া এবং উচ্ছেদ হওয়া ৮০ কোটি লোকের সঙ্গে বসবাস করি। আমাদের সঙ্গে তারাও টিকে আছে এমনসব লোক যাদের দিনে আয় ২০ রুপিরও কম।

মুকেশ আম্বানির সম্পদের মূল্য ২০ বিলিয়ন ডলার। তিনি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (আরআইএল) নিয়ন্ত্রণকারী অধিকাংশ শেয়ারের অধিকারী। ৪৭ বিলিয়ন ডলার বাজার মূলধনের এই কোম্পানিটি পেট্রোকেমিক্যালস, তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস পলিস্টার ফাইবার, বিশেষ অর্থনৈতিক জোন, মাছ প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, হাই স্কুল, লাইফ সায়েন্সেস গবেষণা ও স্টেম সেল স্টোরেজ সার্ভিসেসের মতো বৈশ্বিক ব্যবসায় জড়িত। রিলায়েন্স সম্প্রতি ইনফোটেলের ৯৫ শতাংশ শেয়ার কিনেছে। এই টিভি কনসোর্টিয়ামটি যে ২৭টি টিভি খবর ও বিনোদন চ্যানেল নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সিএনএনআইবিএন, আইবিএন লাইভ, সিএনবিসি, আইবিএন লকম্যাট এবং প্রায় প্রতিটি ভাষায় ইটিভি। ইনফোটেল ৪জি ব্রডব্যান্ডের একমাত্র জাতীয় লাইসেন্সটির মালিক। উচ্চ গতিসম্পন্ন ‘ইনফোরমেশন পাইপলাইন’ নামের এই প্রযুক্তিটি যদি কাজ করে তবে এটাই হবে তথ্য বিনিময়ের ভবিষ্যৎ। মি. আম্বানি একটি ক্রিকেট দলেরও মালিক।

মুষ্টিমেয় যে কয়েকটি করপোরেশন ভারত পরিচালনা করে তাদের অন্যতম রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (আরআইএল)। অন্যগুলোর মধ্যে রয়েছে টাটা, জিনদাল, বেদান্ত, মিত্তাল, ইনফোসি, এসার এবং মুকেশের ভাই অনিলের মালিকানাধীন অন্য রিলায়েন্স (এডিএজি)। তাদের প্রবৃদ্ধির দৌড় ইউরোপ, মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাতিন আমেরিকা জুড়ে বিস্তৃত। তাদের জাল বিপুল বিস্তৃত; তারা দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান, প্রকাশ্য এবং সেইসঙ্গে গোপনও। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, টাটারা ৮০টি দেশে শতাধিক কোম্পানি চালায়। তারা ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম প্রাইভেট সেক্টর বিদ্যুৎ কোম্পানি। তারা খনি, গ্যাসক্ষেত্র, স্টিল প্লান্ট, টেলিফোন, ক্যাবল টিভি ও ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কের মালিক এবং পুরো টাউনশিপও পরিচালনা করে। তারা গাড়ি, ট্রাক বানায়। তাজ হোটেল চেইন, জাগুয়ার, ল্যান্ড রোভার, দেউয়ু, টেটলি টি, একটি প্রকাশনা কোম্পানি, একটি চেইন বুকস্টোর, আয়োডাইজ লবণের একটি বড় ব্র্যান্ড এবং কসমেটিকস জায়ান্ট ল্যাকমির মালিক। তাদের বিজ্ঞাপনী ট্যাগলাইন হতে পারে : ‘আপনি আমাদের ছাড়া বাঁচতে পারবেন না।’

উত্থানের মূলমন্ত্র অনুযায়ী, আপনার যত আছে, তত বেশি চাইতে পারেন।

সবকিছু বেসরকারিকরণের এই যুগে ভারতীয় অর্থনীতি বিশ্বের অন্যতম দ্রুততম। তবে যেকোনো আদর্শ ঐতিহ্যবাহী ঔপনিবেশের মতো এর প্রধান রফতানি পণ্য হলো এর খনিজ সম্পদ। ভারতের নতুন মেগা করপোরেশনগুলোটাটা, জিনদাল, এসার, রিলায়েন্স, স্টারলিটমাটির গভীর থেকে টাকা বের করে আনার ছিপিটির দখল নিতে সক্ষম হয়েছে। এটা ব্যবসায়ীদের না কিনেই বিক্রি করতে সক্ষম হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হওয়ার মতো।

করপোরেট সম্পদের আরেকটি উৎস হচ্ছে তাদের ভূমিব্যাংক। বিশ্বজুড়ে দুর্বল, দুর্নীতিগ্রস্ত স্থানীয় সরকারগুলো ওয়াল স্ট্রিট ব্রোকার, অ্যাগ্রোবিজনেস করপোরেশন ও চীনা বিলিয়নিয়ারদের বিপুল ভূমি সংগ্রহ করতে সহায়তা করছে। (পানির মালিকানা লাভের ক্ষেত্রেও এটা সত্য)। ভারতে কোটি কোটি মানুষের ভূমি অধিগ্রহণ করে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন, অবকাঠামো প্রকল্প, ড্যাম, মহাসড়ক, গাড়ি কারখানা, কেমিক্যাল হাব ও ফরমুলা ওয়ান রেসিংয়ের মতো ‘জনস্বার্থ’মূলক কাজের জন্য বেসরকারি করপোরেশনগুলোকে দেওয়া হয়ে থাকে। (বেসরকারি সম্পত্তির পবিত্রতা কখনো দরিদ্রদের জন্য প্রযোজ্য হয় না।) সব সময়ই স্থানীয় লোকজনকে বলা হয়, তাদের ভূমি থেকে তাদের স্থানচ্যুতি এবং তাদের মালিকানাধীন সবকিছু কেড়ে নেওয়ার আসল কারণ, চাকরি সৃষ্টি। কিন্তু এখন আমরা জানি, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও চাকরির মধ্যকার যোগসূত্রটি স্রেফ একটি মিথ। ‘প্রবৃদ্ধির’ ২০ বছর পরও ভারতের ৬০ শতাংশ কর্মীবাহিনী স্বনিয়োজিত, ভারতের শ্রমশক্তির ৯০ শতাংশ অসংগঠিত খাতের।

স্বাধীনতাপরবর্তীকালেঠিক ১৯৮০এর দশক পর্যন্তনক্সালি থেকে জয়প্রকাশ নারায়ণের ‘সম্পূর্ণ ক্রান্তি’র মতো গণআন্দোলনগুলো ছিল ভূমি সংস্কার, সামন্ততান্ত্রিক ভূস্বামীদের জমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে পুনঃবণ্টনের লড়াই। বর্তমানে ভূমি বা সম্পদ পুনঃবণ্টনের যেকোনো আলোচনা কেবল অগণতান্ত্রিকই নয়, পাগলামি বলেও বিবেচিত হয়। এমনকি সবচেয়ে জঙ্গি আন্দোলনগুলোও, লোকজনের মালিকানায় যে সামান্য ভূমিটুকু আছে সেটা ধরে রাখার লড়াইয়ে নেমে এসেছে। কোটি কোটি ভূমিহীন মানুষ, যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ দলিত ও আদিবাসীনিজ নিজ গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়ে ছোট ছোট শহর বা মেগা সিটিগুলোর বস্তিতে বাস করছেএমনকি চরমপন্থী আন্দোলনেও হিসাবে আসে না।

উত্থানের ফলে সম্পদ উজ্জ্বল পিনের মাথায়, যার ওপর বিলিয়নিয়ারা ভর করে থাকে, জড়ো হতে থাকায় অর্থের বিশাল স্রোত আদালত, পার্লামেন্ট এবং সেইসঙ্গে মিডিয়ার মতো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে হুড়মুড় করে নেমে আসে, এগুলো যে কাজের জন্য উপযোগী বলে ধারণা করা হয়ে থাকে, সেগুলোর সঙ্গে ভয়াবহভাবে আপস করে। নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্ট কার্নিভালের হৈচৈ যত বাড়ে আমাদের গণতন্ত্রের অস্তিত্ব সম্পর্কে তত আস্থা কমে।

ভারতে যখনই নতুন কোনো দুর্নীতিসংক্রান্ত কেলেঙ্কারির খবর আগেরটি তত বেশি কম গুরুত্বপূর্ণ তত ভীরু মনে হয়। ২০১১ সালে ২জি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশিত হয়। আমরা জানতে পারলাম, করপোরেশনগুলো তাদের প্রতি বন্ধুপ্রতীম এক লোককে টেলিযোগাযোগবিষয়ক মন্ত্রী পদে বসিয়ে, যিনি ২জি টেলিকম স্পেকট্রাম লাইসেন্সের মূল্য অত্যন্ত কম ধরেছিলেন এবং তার ইয়ারদোস্তদের মধ্যে অবৈধভাবে বিলিবণ্টন করে দিয়েছিলেন, ৪০ বিলিয়ন ডলার তুলে নিয়েছিল। মিডিয়ায় প্রকাশিত টেলিফোনের আড়িপাতা সংলাপে দেখা যায়, প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘঠিত এই ডাকাতিতে শিল্পপতি, তাদের কোম্পানি, মন্ত্রীবর্গ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা এবং একজন টিভি অ্যাংকর মিলে এই অপকর্ম করেছে। অনেক আগে লোকজনের মনে যে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল, এই সংলাপ ছিল, আসলে সেটা সঠিক প্রমাণ করার এমআরআই।

টেলিকম স্পেকট্রামের বেসরকারিকরণ ও অবৈধভাবে বিক্রির সঙ্গে যুদ্ধ, উচ্ছেদ ও প্রতিবেশগত বিপর্যয়ের সম্পৃক্ততা নেই। তবে ভারতের পর্বতরাজি, নদী আর বনবনানীর বেসরকারিকরণের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। সম্ভবত এর সঙ্গে সোজাসাপ্টা অজটিল স্বচ্ছতা, হিসাবগত নগ্ন কেলেঙ্কারি না থাকায়, কিংবা হয়তো এর সবই ভারতের ‘অগ্রগতি’র জন্য হওয়ায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে একই ধরনের অনুনাদ সৃষ্টি করে না।

ছত্তিশগড়, উড়িষ্যা ও ঝাড়খণ্ডের রাজ্য সরকার ২০০৫ সালে নামমাত্র মূল্যে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের বক্সাইট, লোহার আকরিক ও অন্যান্য খনিজসম্পদ হস্তান্তরের জন্য বেশ কয়েকটি বেসরকারি করপোরেশনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে। এমনকি মুক্ত বাজারের পক্ষপাতদুষ্ট যুক্তিকেও পদদলিত করে এসব করা হয়। সরকারি রয়্যালিটি ধরা হয় ০.৫ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ।

ছত্তিশগড় সরকার টাটা স্টিলের সঙ্গে বাস্তারে একটি সমন্বিত স্টিল প্লান্ট নির্মাণের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কয়েক দিন পরই সালওয়া জুদাম নামে একটি সদাতৎপর মিলিশিয়া গঠন করা হয়। সরকার জানাল, বনে মাওবাদী গেরিলাদের ‘উৎপীড়নে’ অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয় জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই বাহিনী গড়ে তুলেছে। সরকারের তহবিল ও অস্ত্রে এবং খনি করপোরেশনগুলোর সহযোগিতায় এই বাহিনী শেষ পর্যন্ত ভূমি পরিষ্কারকরণ কাজে নেমে পড়ে। অন্যান্য রাজ্যে নানা নামে বিভিন্ন মিলিশিয়া গড়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করলেন, মাওবাদীরা ‘ভারতের একক বৃহত্তম নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ’। এটা ছিল যুদ্ধ ঘোষণা।

প্রতিবেশী উড়িষ্যা রাজ্যের কালিঙ্গনগরে টাটা স্টিলের আরেকটি প্লান্টের নির্ধারিত স্থানে ২০০৬ সালের ২ জানুয়ারি সম্ভবত সরকারি উদ্দেশ্যের ব্যাপকতা আঁচ পেয়ে ১০ প্ল­াটুন পুলিশ নামে। স্থানীয় গ্রামবাসী তাদের ভূমির পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার প্রতিবাদে সরব হয়ে ওঠলে, পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায়। এক পুলিশসহ ১৩ জন নিহত ও ৩৭ জন আহত হয়। ছয় বছর পরও গ্রামগুলো সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী দিয়ে অবরুদ্ধ রয়েছে, কিন্তু প্রতিবাদ থামেনি।

এ দিকে ছত্তিশগড়ে সালওয়া জুদাম বনাঞ্চলীয় গ্রামগুলোতে অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও খুনের মাধ্যমে ৬০০ গ্রাম খালি করে, ৫০ হাজার লোককে পুলিশ ক্যাম্পে আসতে বাধ্য করে, সাড়ে তিন লাখ লোককে পালিয়ে যায় । মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করলেন, যারা বন থেকে বের হয়ে আসবে না, তাদেরকে ‘মাওবাদী সন্ত্রাসী’ বিবেচনা করা হবে। এর মাধ্যমে আধুনিক ভারতের অংশবিশেষে জমি চাষ করা আর বীজ বোনাকে সংজ্ঞায়িত করা হলো সন্ত্রাসী কার্যক্রম হিসেবে। পরিণতিতে সালওয়া জুদামের নৃশংসতা প্রতিরোধ আন্দোলন জোরদার করে এবং মাওবাদী গেরিলার সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। ছত্তিশগড়, উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গে দুই লাখ আধা সামরিক সৈন্য মোতায়েন করতে হলো।

তিন বছরের ‘স্বল্প মাত্রার সঙ্ঘাতের’ পরও বন থেকে বিদ্রোহীদের ‘ফ্লাশ’ করতে না পারায় কেন্দ্রীয় সরকার ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনী মোতায়েন করার কথা ঘোষণা করে। ভারতে আমরা একে যুদ্ধ বলি না। আমরা একে বলি ‘সুষ্ঠু বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি’। হাজার হাজার সৈন্য ঘোষণার আগেই চলে এসেছিল। একটি ব্রিগেড সদরদফতর ও বিমান ঘাঁটি প্রস্তুত করা হলো। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ একটি সেনাবাহিনী এখন বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র, সবচেয়ে ক্ষুধার্ত ও সবচেয়ে অপুষ্টিতে ভোগা লোকজনের কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা কেবল আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট (এএফএসপিএ) ঘোষণার অপেক্ষায় আছি, যা সেনাবাহিনীকে ‘সন্দেহের বশে’ যে কাউকে হত্যা করার আইনগত সুরক্ষা ও অধিকার দেবে। কাশ্মীর, মনিপুর ও নাগাল্যান্ডের লাখ লাখ অচিহ্নিত কবর, অজ্ঞাত চিতা সৃষ্টি করে এই সেনাবাহিনী সত্যিকার অর্থেই নিজেকে খুবই সন্দেহজনক সেনাবাহিনী হিসেবে প্রমাণ করেছে।

সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতির মধ্যেই মধ্য ভারতের বনজঙ্গলগুলো অবরুদ্ধ রয়ে গেছে। এসব এলাকার গ্রামবাসী বের হতে কিংবা খাবার বা ওষুধ কিনতে বাজারে যেতে ভয় পায়। নির্মম, অগণতান্ত্রিক আইনের অধীনে মাওবাদী হওয়ার অভিযোগ এনে শত শত লোককে জেলে ঢোকানো হয়েছে। আদিবাসী লোকজনে কারাগারগুলো ভর্তি। এসব লোকের অনেকে জানেও না তাদের অপরাধ কী। সম্প্রতি শনি সুরি নামের বাস্তারের এক আদিবাসী স্কুল শিক্ষিকাকে গ্রেফতার করে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি যে মাওবাদী বার্তাবাহক ছিলেন, সেকথা ‘স্বীকার’ করে নিতে তার যোনিদেশ দিয়ে পাথর ঢোকানো হয়। কলকাতার হাসাপাতালে তার দেহ থেকে পাথরগুলো অপসারণ করা হয়েছিল। ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে তার মেডিক্যাল চেকআপের জন্য তাকে সেখানে পাঠানো হয়েছিল। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে শুনানিকালে অ্যাকটিভিস্টরা একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে করে বিচারকদের সামনে পাথরগুলো উপস্থাপন করেন। তাদের এই উদ্যোগের ফলাফল হলো এই যে, শনি সুরি এখনো জেলেই রয়ে গেছেন, আর অঙ্কিত গার্গ নামের যে পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন তাকে প্রজাতন্ত্র দিবসে সাহসিকতার জন্য রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদকে ভূষিত করা হয়।।

(জেডনেট থেকে) (চলবে)

১টি মন্তব্য

  1. এটা একটি অসাধারণ লিখা। এর ২ য় অংশ অনুবাদ হলে অন্তত একটি ই-মেল প্রত্যাশা করছি। আর যিনি অনুবাদ করেছেন তাঁর অনুবাদ করার ধরন প্রশংসার দাবী রাখে নিশ্চয়ই। ধন্যবাদ আবার একটি চমৎকার লিখা অনুবাদ করার জন্য।