Home » অর্থনীতি » বন্ড – বড় ধরনের ঋণ এবং সুদের দুষ্টজাল

বন্ড – বড় ধরনের ঋণ এবং সুদের দুষ্টজাল

সাইদুল ইসলাম

money-1-সম্প্রতি পত্রিকার খবর থেকে জানা গেছে, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে রেকর্ড পরিমান ঋণ গ্রহনের পর এবার সরকার বিদেশী উৎস থেকে ঋণগ্রহনের উদ্যোগ নিয়েছে। দেশীয় ব্যাংকগুলোতে তারল্য তীব্র হওয়ায় রাষ্ট্রকে গ্যারান্টি দিয়ে সরকার উচ্চ সুদে ৫০ কোটি ডলার ঋণ নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এজন্য সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বন্ডের মেয়াদ, সুদের হার নির্ধারণসহ একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য তিনটি বিদেশী ব্যাংক এইচএসবিসি, সিটি ব্যাংক এনএ ও স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সাথে অভিজ্ঞতা বিনিময় করা হয়েছে। সরকারী সূত্র বলছে, দাতা দেশ এবং সংস্থাগুলো থেকে কাঙ্খিত ঋণ না পাওয়ার কারনে সরকার বন্ড ছাড়ার দিকে ঝুঁকেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সার্বভৌম বা সভরেন বন্ড ছাড়ার কৌশল প্রণয়ন করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নরকে আহবায়ক করে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার জন্য একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ কৌশলপত্রের মধ্যে থাকবে বন্ডের মেয়াদ কত দিনের হবে, কী হারে ক্রেতা দেশকে সুদ দেয়া হবে এসব বিষয়।

জানা গেছে, মোট ৫০ কোটি ডলারের সার্বভৌম বন্ড ছাড়তে পারে বাংলাদেশ সরকার। এর পক্ষে এবং বিপক্ষে অনেকেই অনেক ধরণের যুক্তি দিচ্ছেন । এর পক্ষে যুক্তি হলো, দাতা সংস্থার ঋণের শর্তের চাপ বহন করার চাইতে সার্বভৌম ঋণ নিয়ে দেখা যেতে পারে। আর এর বিপক্ষে যুক্তি হলোএই মুহূর্তে যখন সুদের হার বেশী তখন বন্ড ছাড়া আদৌ জরুরী কিনা ।

উল্লেখ্য, সার্বভৌম বন্ড একটি বিশেষ ধরণের বন্ড যা সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক পুঁজি বাজারে বিক্রি করার অধিকার রাখে এবং এর মধ্যে দিয়ে প্রাপ্ত অর্থ ব্যালেন্স অফ পেমেন্ট ঘাটতি মোকাবেলা করতে কাজে লাগায় । সরকারের আয়ের চাইতে ব্যয় বেশি হয়ে গেলে অনেক দেশ সার্বভৌম বন্ড চালু করে, সাধারণত এর মাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ যোগায়। পৃথিবীর অনেক দেশ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সার্বভৌম বন্ড আন্তর্জাতিক পুঁজি বাজারে ছেড়ে তার ব্যয়ের জন্য অর্থ যুগিয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, আর্জেন্টিনা, গ্রীস, এবং সম্প্রতি দক্ষিন এশিয়ার মধ্যে শ্রীলংকা ও পাকিস্তান।

কিন্তু আমরা যদি দেখি যে, এসব দেশ কোন পরিস্থিতিতে বন্ড ছেড়েছে তাহলে ভ্রান্তিÍ কিছুটা দুর হতে পারে। যেমন ২০০৪ সনে সুনামিতে ক্ষতিগ্রস্ত হবার পর শ্রীলংকা আশা করেছিল পর্যাপ্ত বিদেশী সাহায্য পাওয়া যাবে। কিন্তু তা না হওয়ায় শ্রীলংকা বন্ডের শরণাপন্ন হয়। ২০০৫ এ প্রথম দেশটি অভ্যন্তরীণ বাজারে ডেভেলপমেন্ট বন্ড ছাড়ে। এছাড়া ২০০৭ সালে প্রথম সার্বভৌম বন্ড আন্তর্জাতিক বাজারে ছাড়ে দেশটি। তারপর যথাক্রমে ২০০৯ সালে, ২০১০ সালে, এবং ২০১১ সালে শ্রীলংকা যথাক্রমে ৫০ কোটি, ১০০ কোটি একং ১০০ কোটি ডলার মূল্যের বন্ড বাজারে ছাড়ে। আপাত দৃষ্টিতে শ্রীলংকার বন্ড ভাগ্য ভালো হয়েছে মনে করা হলেও বাস্তবে তা হয়নি। কারন ২০০৫ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত শ্রীলংকার বিদেশী ঋণ বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ। এখন শ্রীলংকা তাদের বিদেশী ঋনের কিস্তি শোধ করতে আবারো ঋণ করতে নেমেছে। এছাড়া, সাম্প্রতিককালে গ্রীসের অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, দেশটি কিভাবে ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে দেশের জনগনকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে । গত কয়েক বছর ধরে গ্রীস অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। গ্রীসের সাধারণ মানুষ নেমে এসেছে রাস্তায়। কারণ, এত দিন তারা ঋনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও যেই মুহূর্তে তাদের পায়ের নীচে থেকে মাটি সরে গেলো তখন তারা বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারলো।

বাংলাদেশ পরিস্থিতি

এবার আসা যাক বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে। একটি দেশের আপদকালীন ব্যয় মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা মজুদ রাখতে হয়। সাধারণত: তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটাতে পারলেই এ বৈদেশিক মূদ্রার মজুদকে নিরাপদ মনে করা হয়। বর্তমানে পণ্য আমদানির প্রবাহ অনুযায়ী তিন মাসের আপদকালীন ব্যয় মেটানোর জন্য প্রয়োজন হয় ৯০০ কোটি ডলার। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে এখন রেকর্ড পরিমাণ এক হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ রয়েছে, যা দিয়ে আপদকালীন ব্যয় মেটানোর পরেও ৪০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত থাকবে। তাহলে বন্ড ছেড়ে বিদেশ থেকে ঋণ নেয়া কেন? বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন উর্ধতন কর্মকর্তার সাথে কথা বললে তিনিও জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ থাকার পরেও সার্বভৌম বন্ড ছেড়ে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করা কতটুকু যুক্তিসংগত হচ্ছে ? । তবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফসহ দাতাসংস্থা থেকে বৈদেশিক ঋণ কাঙ্খিত হারে অবমুক্ত হচ্ছে না। এজন্য বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ঋণের ওপর অধিকমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

এবার পর্যালোচনা করা যাক বন্ডের মাধ্যমে সরকারকে ঋণ নিতে হচ্ছে কেন? সাধারনত মনে করা হয়ে থাকে যে, সরকার যখন অন্য কোন উৎস থেকে ঋণ না পায় তখন বন্ডের মাধ্যমে ঋণ নিয়ে থাকে। যেমন শ্রীলংকা, স্পেন, গ্রীস এ পথটি বেছে নিয়েছে। কোন কোন দেশ নিজেকে দেউলিয়াপনার হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে বন্ডের মতো এরকম একটি ব্যয়বহুল ঋনের দিকে ঝুকেছে। বাংলাদেশের অবস্থা কি একই হয়েছে? বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্নকথা। বাংলাদেশের হাতে এখন যে বৈেিদশিক মূদ্রার মজুদ রয়েছে তা একবারেই দেশের আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত। এরপরও সরকার ঋন নিচ্ছে কেন? এক্ষেত্রে অনেকে পদ্মাসেতুর বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছেন।

একসময়, বাংলাদেশের কোন উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়ন হতো না দাতাদেশ ও সংস্থাগুলোর সহায়তা ছাড়া। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। সিংহভাগ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে সরকারের রাজস্বের অর্থ দিয়ে। এরপরও সরকার তার ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ঠিক রাখার জন্য আন্তর্জাতিক মূদ্রা তহবিল (আইএমএফ)থেকে ঋণ গ্রহণ করে থাকে। এসব ঋণ আপাত দৃষ্টিতে কম সুদের বলে অনেকের কাছে তা আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু একটু ভেতরে গেলে অনেকের কাছে বিষয়টি পরিস্কার হবে। এসব ঋন পেতে গেলে সরকারকে দাতাদের কিছু শর্ত মানতে হয়। এসব শর্ত মানতে গেলে অনেক সময় সরকার অনেক সময় অর্থনীতির খেই হারিয়ে ফেলে। যেমন, আইএমএফ থেকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে সরকার যেসব শর্ত ইতিমধ্যে মেনে নিয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোজ্বালানী তেলের দাম বাড়ানো, গ্যাসের দাম সমন্বয় করা ইত্যাদি। এতে করে দেশে উৎপাদিত অনেক জিনিষের দাম ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। কিন্তু আরো কয়েকটি শর্ত মানা হয়নি বলে এখনো সরকারের একাউন্টে সে ঋনের টাকা জমা হয়নি।

এখন প্রশ্ন হলো, এত শর্ত দিয়ে আমরা এসব ঋণ নেবো কিনা? তাহলে উপায় আর কি? আর একটা প্রশ্ন সবার সামনে এসেছে তা হলো দেশে বৈদেশিক মূদ্রার পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও সরকার বন্ডের মাধ্যমে কেন ঋণ সংগ্রহ করছে। বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, পদ্মাসেতুর ঋণ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সাথে যে ঝামেলা তার রেশ কাটতে না কাটতে সরকার বন্ডের মাধ্যমে যে ঋণ গ্রহনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাতে দুটি উদ্দেশ্য আছে। এর একটি হচ্ছেবিশ্বব্যাংকের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটিকে এমন বার্তা দেয়া যাতে তারা মনে করে বিশ্বব্যাংক ছাড়াও সরকারের অর্থ সংগ্রহের জন্য অন্য উৎস আছে। আর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছেবর্তমান সরকারের মেয়াদকালেই পদ্মাসেতু নির্মান কাজ শুরু করা। যেহেতু, এ সেতু নির্মানে সরকারকে বিদেশ থেকে কেনাকাটা করতে হবে তার জন্য চাই প্রচুর বৈদেশিক মূদ্রা। তবে এ কাজটি সরকার সুচারু রূপে করতে পারবে কিনা তা নিয়ে অনেকে সন্দিহান। আর যদি এ উদ্যোগ সফল করতে হয় তাহলে সরকারকে বন্ডের বিপরীতে উচ্চ হারে সুদ দিতে হবে। বছর বছর বন্ডের মুনাফা (সুদ) দিতে হবে বিনিয়োগকারীদের। আর এ সুদ মেটাতে হবে বৈদেশিক মূদ্রায়। তখন বৈদেশিক মূদ্রার পর্যাপ্ত যোগান না থাকলে সরকারকে আবারো ধার করতে হবে। সব মিলিয়ে সরকার ঋণ এবং এর বিপরীতে বড় ধরনের সুদের দুষ্টজালে আটকা পড়বে।।