Home » আন্তর্জাতিক » ভারতে বাতিল হলে এ দেশে কেন?

ভারতে বাতিল হলে এ দেশে কেন?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু (খুলনা থেকে)

coal power-1ভারত সরকারের বিদ্যুৎ সচিব উমা শংকর যতই আশ্বস্ত করুন কিংবা বাংলাদেশ সরকারের জ্বালানী উপদেষ্টা ড. তৌফিকএলাহী চৌধুরী যতই বলুন স্বপ্ন বাস্তবায়নের কথাবাস্তবতা হচ্ছে, রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদু্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হলে দক্ষিনপশ্চিমাঞ্চলের ভয়াবহ বিপর্যয় এড়ানো যাবে না। এই সাথে সুন্দরবনের অনিবার্য ধ্বংসের আশংকাও উড়িয়ে দিতে পারছেন না পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। আর পারছেন না জমি হারানো দিশেহারা আড়াই হাজার পরিবার, যাদের ভবিষ্যত এখনই অনিশ্চিত গন্তব্যে। রামপালে মেগা সাইজের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের সূচনায় ভারতীয় বিদ্যুৎ সচিবের এই আশ্বস্তকরণে প্রশ্ন জেগেছে, তার দেশে বিপর্যয়ের আশংকায় কেন এরকম প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে? অন্যদিকে, জ্বালানি উপদেষ্টা কোন্ ‘স্বপ্ন’ বাস্তবায়নের কথা বলছেন, সেটিই এখন এ অঞ্চলের জনগণের মুখ্য প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০১২ সালে ভারতের মধ্য প্রদেশের নরসিংহপুর জেলার ঝিকলি ও তুমরা গ্রামে এনটিপিসি ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট নির্মানের প্রস্তাব দেয়। ভারতীয় পরিবেশ মন্ত্রনালয়ের এক্সপার্ট এ্যাপ্রাইজাল কমিটি পরীক্ষানিরীক্ষার পরে ঐ এলাকায় প্রস্তাবিত এই প্রকল্প বাতিল করে দেয়। কমিটির যুক্তি ছিলো প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহনকৃত ১ হাজার একর জমি কৃষিপ্রধান এবং দোফসলী। তারা মনে করেন, এই প্রস্তাব সম্পূর্ন অগ্রহণযোগ্য। কমিটি আরো মনে করে যে, এধরনের প্রকল্প নদীবনভূমি এবং মনুষ্য বসবাস এলাকায় মোটেই উপযোগী নয়।

সে সময় কমিটির এক সভায় বলা হয়, প্রকল্পটি গাদাওয়ারা শহরের নিকটবর্তী এবং সংলগ্ন নর্মদা নদী থেকে ৩২ কিউসেক পানি আহরন মোটেই বাস্তবসম্মত হবে না, যা নদী শাসন এবং পরিবেশের ওপর অত্যন্ত বিরুপ প্রভাব ফেলবে। ২০১৩ সালের ২৯ জানুয়ারি রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত এলাকা পরিদর্শনের সময় ভারতীয় বিদ্যুৎ সচিব এই সত্যটি লুকিয়ে রেখে আশ্বস্ত করতে চেয়েছেনঃ এ ধরনের প্রকল্প সুন্দরবনের ‘তেমন’ ক্ষতি করবে না।

প্রকল্প এলাকা থেকে মূল সুন্দরবনের দুরত্ব মাত্র ১৪ কিলোমিটার। অথচ ভারতীয় পরিবেশ আইনে কোন সংরক্ষিত বনের ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোন ধরনের তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন বা নির্মান করা যাবে না। ভারতীয় বিদ্যুৎ সচিব এবং বাংলাদেশের জ্বালানী উপদেষ্টা এসব বাস্তবতার ধার ধারছেন না। একই ধরনের প্রকল্প যা ভারত সরকার বাতিল করে দিয়েছে, সে রকম একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন বাংলাদেশের ভেতরে করার ব্যাপারে তাদের অতি আগ্রহ সকলের মধ্যে অনেক প্রশ্ন এবং রহস্যের জন্ম দিয়েছে। কোনরকম পরিবেশপ্রতিবেশগত বিবেচনা ছাড়াই সুন্দরবনের কোলের ভেতর গড়ে তোলা হচ্ছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র।

অর্থনীতিবিদ এবং পরিবেশবিদরা জানিয়েছেন, এই চুক্তির মূল সমস্যা হচ্ছে, প্রকল্পের ৭০ ভাগ অর্থ আসবে বিদেশী ঋন থেকে, ১৫ ভাগ দেবে ভারত, ১৫ ভাগ দেবে বাংলাদেশ। বিদেশ থেকে প্রাপ্ত ৭০ ভাগ ঋনের সুদ এবং ঋন পরিশোধের দায়িত্বও বাংলাদেশের। মাত্র ১৫ ভাগ বিনিয়োগ করে ভারতের মালিকানা থাকবে ৫০ ভাগ। এটি হচ্ছে সমঅংশীদারিত্বের চুক্তির নমুনা। বিদ্যুৎকেন্দ্রের যেকোন ক্ষয়ক্ষতির দায় বাংলাদেশের। চুক্তিতে পরিস্কার নয় উৎপাদিত বিদ্যুৎতের ভাগ ভারত পাবে, নাকি টাকা? অর্থনীতিবিদ এবং পরিবেশবিদদের ভাষায়, এ ধরনের অস্বচ্ছ এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকান্ড সরকারের পরিহার করা উচিত।

গত ৩১ জানুয়ারির সফরে ভারতীয় বিদ্যুৎ সচিবে’র আশ্বাস কিংবা সরকারের জ্বালানী উপদেষ্টা’র স্বপ্ন প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন হলে, পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের পরিবেশপ্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। নির্মাণাধীন কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কাগজেকলমে সুন্দরবনের মাত্র ১৪ কি.মি. দুরে স্থাপিত হচ্ছে । রামপালের সাপমারীকাটাখালীতে প্রাথমিক পরিবেশগত সমীক্ষার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ইতিমধ্যেই অবস্থানগত ছাড়পত্র দেওয়া হলেও তাতে উল্লেখ রয়েছে ঃ প্রকল্প এলাকা সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার মধ্যে অবস্থিত।

২৭ নভেম্বর, ২০১১ সালে এ প্রকল্প স্থাপনকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রীট পিটিশন দায়ের করেন আইনজীবী ড. জিয়াউর রহমান। হাইকোর্ট এ বিষয়ে সরকারের প্রতি রুলনিশি জারি করে। অন্যদিকে, বিদেশী বিনিয়োগ ফেরত যাওয়ার আশংকা দেখিয়ে আদালতের কাছ থেকে মামলা চলাকালীন সময়ে প্রকল্প বিষয়ক সাময়িক কার্যক্রম চালানোর অনুমতি নিয়েছে সরকারের পক্ষে সংশ্লিষ্ট সংস্থা পিডিবি। রীটটি অদ্যাবধি শুনানীর অপেক্ষায়ই আছে। জাতিসংঘের রামসার কনভেনশন’র সচিবালয় থেকে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

১৯৯৯ সালের ৩০ আগষ্ট, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের জারীকৃত প্রজ্ঞাপন থেকে জানা যাচ্ছে, সরকার চিহ্নিত সুন্দরবনের সংরক্ষিত বন এলাকার চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকা পরিবেশগত সংকটনাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হবে। ঐ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে উল্লেখিত এলাকায় বেশকিছু কার্যাবলী নিষিদ্ধ করা হয়। যা মধ্যে রয়েছেপ্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল ধ্বংস বা সৃষ্টিকারী সকল প্রকার কার্যকলাপ;ভূমি এবং পানির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট বা পরিবর্তন করতে পারে এমন সকল কাজ; মাটি, পানি, বায়ু এবং শব্দ দূষণকারী শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণির ক্ষতিকারক যে কোন প্রকার কার্যাবলী। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, প্রস্তাবিত কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি উপর্যুক্ত সকল বিপর্যয়ের উৎস হয়ে দাঁড়াবে।

স্ববিরোধিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের সমস্ত শর্তাবলী লংঘন করে সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তরই কয়লাভিত্তিক এই বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে দেয়া অব্স্থানগত ছাড়পত্রে সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার উপর কোন আলোকপাত করেনি। আইন অনুযায়ী কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র একটি ‘লাল ক্যাটাগরি’র (সবচেয়ে বেশী দূষণ প্রবণ) শিল্প কেবল মাত্র শিল্প এলাকা বা শিল্প সমৃদ্ধ এলাকা ছাড়া এটি নির্মাণের কোন সুযোগই নেই। অথচ এটি নির্মিত হচ্ছে সুন্দরবনের পাশেই কৃষি ও মৎস্য চাষের স্বর্গভূমিতে। প্রসঙ্গতঃ পরিবেশ অধিদপ্তর দূষণের হার নির্দিষ্ট করতে শিল্প স্থাপনাসমুহকে দুষনের মাত্রানুযায়ী সবুজ, হলুদ, লাল ক্যাটাগরি হিসেবে চিহ্নিত করে।

পরিবেশবিদদের মতে, সুন্দরবনের পাশে এরকম লাল ক্যাটাগরির একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে উঠলে বনের পরিবেশ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ এলাকার সকল জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়বে। পাশাপাশি সমগ্র এলাকার মাটির গুণগত মান নষ্ট, প্রাণীদের হরমোনজনিত সমস্যা, প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস, নদী দূষণ, ভূমির উর্বরতা হ্রাস এবং উদ্ভিদের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে। এই বিুদ্যৎ কেন্দ্র স্থাপনে বনবিভাগ আপত্তি তুললেও তা বিবেচনায় নেয়া হয়নি। নিয়মানুযায়ী, বন অধিদপ্তরের মতামত এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাধান্য পাওয়ার কথা। লিখিত আপত্তিতে অধিদপ্তর সরকারকে জানিয়েছিল,কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হলে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ সমস্ত জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রাথমিক পরিবেশগত সমীক্ষা চালায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল এন্ড জিয়োগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিস (সিইজিআইএস)। এই প্রতিষ্ঠানটি রামপালের ক্ষেত্রে পশুর নদীর অগভীরতা সমস্যা হিসাবে দেখানো হলেও কয়লা পরিবহনের সুবিধা থাকায় রামপালকে সমীক্ষায় অগ্রাধিকার দেয়া হয়।

এখানেই প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশবিদরা। তাঁরা জানতে চেয়েছেন, সিইজিআইএস কিসের ভিত্তিতে এই পরিবেশগত সমীক্ষা করেছে। রামপালের সমস্যা হিসেবে পশুর নদীর অগভীরতা চিহ্নিত করলেও সুন্দরবনের বিষয়টি তারা আমলে নেয়নি। এ ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিবেশের জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে তার হিসেব অবশ্য সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সুন্দরবনের সন্নিকটে হওয়ায় বনের উপর এর কি প্রভাব পড়বে সেটি কোথাও বলা হয়নি। এই সমীক্ষার শুভঙ্করের ফাঁকিটি এখানেই। ফলে বলার অপেক্ষা রাখে না ,এটি একটি পক্ষপাতদুষ্ট সমীক্ষা। বিষয়টি এখন স্পষ্ট যে, সিইজিআইএস সমীক্ষায় সুন্দরবন প্রসঙ্গটি কৌশলে এড়িয়ে গেছে। অথচ এর উপর ভিত্তি করেই অবস্থানগত ছাড়পত্র পেয়েছে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি ড. এমএ মতিন বলেছেন, গোটা সমীক্ষাটি জাতির সাথে এক ধরনের প্রতারণা। তাঁদের প্রতিবেদনে সেটি স্পষ্ট। প্রতিষ্ঠানটি সরকারী হুকুম তামিল করতে গিয়ে তাদের নামের প্রতি অবিচার করেছে।

সুন্দরবনের মত গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বনের কাছে এ ধরনের স্থাপনা গোটা এলাকায় ভয়াবহ পরিবেশপ্রতিবেশগত বিপর্যয় ঘটাবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বনডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, মার্কারী বা পারদ, আর্সেনিক, সীসা, ক্যাডমিয়ামসহ পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন উপাদান নির্গত হয়।

কয়লা পুড়ে ছাই তৈরি হয় এবং ধোঁয়ার পরে পানির সাথে মিশে তৈরী হয় আরেকটি বর্জ্য কোল স্লাজ বা স্লারি বা তরল কয়লা বর্জ্য। উভয় বর্জ্যই বিষাক্ত, কারণ এর মধ্যে আর্সেনিক, পারদ, ক্রোমিয়াম, এমনকি তেজষ্ক্রিয় ইউরোনিয়াম বা থোরিয়াম থাকে। ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন এই কেন্দ্র চালাতে প্রতিদিন বিশাল পরিমাণ কয়লা পোড়াতে হবে। বর্তমানে বড় পুকুরিয়ায় এ ধরনের কেন্দ্র চালু রাখতে প্রতিদিন ২৪০০ মে. টন কয়লা পোড়াতে হচ্ছে। এর বর্জ্য হচ্ছে ৩০০ মে. টন। এই হিসেবে রামপালে প্রতিদিন কয়লা পুড়বে ১৩০০০ মে. টন এবং বর্জ্য হবে ১৬০০ মে. টন।

এছাড়াও, এ ধরনের কেন্দ্র থেকে নিঃসরিত কঠিন ও তরল বর্জ্য বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে, কয়লা সংরক্ষণ আধার চুঁয়ে ভূগর্ভস্থ ও উপরিভাগের পানির সাথে মিশে দূষণ ঘটাবে। ফলে জলজ উদ্ভিদ ও মাছসহ পানিতে বসবাসকারী জীবচক্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে ভয়াবহ শব্দ দূষণের কারণে জীবন যাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. প্রফেসর আব্দুর সাত্তারের নেতৃত্বে একটি দল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনের পরে সুন্দরবনের ২৩ ধরনের ক্ষতির কথা উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন সরকারের বরাবরে প্রদান করেছে। টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, এটি এ যাবৎ নেয়া সরকারের সবচেয়ে হঠকারী সিদ্ধান্ত। সরকারের উচিত অবিলম্বে এই প্রকল্প স্থানান্তর করা।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রচুর মিষ্টি পানির প্রয়োজন হয়। জানা গেছে, নির্মাণাধীন এই কেন্দ্রের পানি আসবে সংলগ্ন পশুর নদী থেকে। সেখানকার পানি লবনাক্ত, ফলে প্রয়োজন পড়বে লবনাক্ত মুক্তকরণ প্য­ান্ট বসানোর । পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, পশুর নদী এমনিতেই হারাচ্ছে গভীরতা । ফলে বিপুল পরিমান পানি সংগ্রহ নদীর উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর সেচ কাজ, মৎস্য আহরন, নৌ পরিবহন বিঘিœত করবে। অন্যদিকে, নদীটি শুকিয়ে গেলে এর উপর নির্ভরশীল জীবনপ্রবাহ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পরিনামে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সমুদ্র বন্দর মংলার আনুষ্ঠানিক মৃত্যু ঘটবে। যা হবে দেশের অর্থনীতির ওপর মারাত্মক আঘাত।

২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি বন অধিদপ্তর বিরল প্রজাতির গাঙ্গেয় ডলফিন ও ইরাবতি ডলফিন সংরক্ষণ এবং বংশ বৃদ্ধির জন্য ৫০৭ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করে। এখানেই সরকারের দ্বিমুখী নীতি পরিস্কার হয়ে উঠেছে যে, একদিকে বন অধিদপ্তর জীব বৈচিত্র্য রক্ষায় জমি অধিগ্রহণ করছে অনদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর বনের মধ্যে সবচেয়ে দূষণপ্রবণ শিল্প নির্মাণের ছাড়পত্র দিচ্ছে।

এই প্রকল্প বাস্তাবয়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই জলাশয় ভরাট, কার্বন নির্গমন, বন ক্ষতিগ্রস্তকরণ, বিশ্ব ঐতিহ্য বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত করাসহ মোট ৫টি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন লংঘন করেছেন বলে বিশষজ্ঞরা মনে করছেন। সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিচ্ছে। কার্বন নির্গমনের একটি দায় হিসেবে এ অর্থ দিলেও এই প্রকল্পের মধ্য দিয়ে সরকার নিজেই বিপুল পরিমাণ কার্বন নির্গমনের পথে এগোচ্ছে। যা আগামীতে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত জলবায়ু তহবিলের উপরে আঘাত হিসেবে দেখা দেবে।

এতসব কিছুর পরে সরকার তার অবস্থানে অনড় রয়েছে। সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিসহ দায়িত্বশীলরা রামপালকেই কয়লাবিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে দাবি করছেন। মূলতঃ সরকার পক্ষ সুন্দরবনের পাশে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ৩টি যুক্তি দাড় করিয়েছে। প্রথমত: পরিবেশগত ক্ষতি হবে না, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। এ প্রসঙ্গে পরিবশে বিজ্ঞানী ড. আব্দুস সাত্তার বলেছেন, সুন্দরবনের কাছে যদি এ ধরনের প্রকল্প স্থাপিত হয় তাহলে এই ম্যানগ্রোভ ধ্বংস হতে সময় লাগবে না। পরিবেশ দূষণকারী কার্বন ও মিথেন উৎপাদনের জন্য উন্নত বিশ্বকে দায়ী করে সরকার নিজেদের বিশ্ব ঐতিহ্য ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করার প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

দ্বিতীয়ত: সরকারের অন্য যুক্তিটি হচ্ছেএটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ১৪ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু বাপা সভাপতি ড. এমএ মতিন বলেছেন, আমরা নিজেরা গিয়ে দেখেছি এটি সুন্দরবন থেকে মাত্র সাড়ে নয় কিলোমিটার দূরে। যা কিনা সংরক্ষিত বন এলাকার মধ্যেই পড়েছে এবং এটি বনেরই অংশ। ড. জিয়াউর রহমানের মতে, আইন অনুযায়ী এখানে কোন শিল্প করার নিয়ম নাই। অথচ এখানেই গড়ে উঠছে সবচেয়ে বিপদজনক লাল ক্যাটাগরির শিল্প।

জিপিএস সিস্টেম ব্যবহার করে পরিবেশ বিজ্ঞাণীরা জানিয়েছেন প্রকল্পটি স্ন্দুরবনের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার মধ্যে পড়ে। জিপিএস কোঅর্ডিনেট এক্সঃ ৮৯.৬৯১৬০ এবং ওয়াই ঃ ২২.৪২৭৭৫ নেয়া হয়েছে পশুর নদীর প্রান্ত থেকে, যেখানে লাল ক্যাটাগরির এ প্রকল্পের সীমানা শুরু হয়েছে। এই পয়েন্ট থেকে সুন্দরবনের দূরত্ব মাত্র ২.০৯ কিলোমিটার। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভেতর থেকে নেয়া আরেক হিসেবে বনের দূরত্ব সেখান থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার।

তৃতীয় যুক্তি ঃ সুপারক্রিটিকাল প্রযুক্তি ব্যবহার প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রভাব যাচাই (ইআইএ) কমিটির সদস্য ড. ইজাজ হোসেনের মতে, কি প্রযুক্তি ব্যবহার হবে এবং কি ধরনের কয়লা ব্যবহার হবে তার উপর নির্ভর করছে অনেক কিছুই। এ বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বা কি প্রযুক্তি ব্যবহার হবে তা নিশ্চিত করে বলার সময় আসেনি। তাঁর মতামত থেকে বোঝা যাচ্ছে, একনো অনেক বিষয় অমীমাংসিত।

যে প্রযুক্তিই আসুক তা কি পারবে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে? এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রকৌশলী বিডি রহমতুল্লাহ সরকারের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার প্রসঙ্গে বলেন, ভারতের কাছে তো আধুনিক প্রযুক্তিই নেই। গত কোপেনেহেহেগন সম্মেলনে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বিশ্ব নেতৃত্ব তাদের সতর্ক করে দিয়েছিল।

ভারত তার নিজের প্রযুক্তি ব্যবহার করেই এখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করবে। পরিবেশের ক্ষতি হবে না এমনভাবে করা হবে, যাতে পরিবেশের ক্ষতি হবে নাএসব অর্থহীন বা অর্বাচীন কথা মানুষকে শুনতে হচ্ছে। উপদেষ্টা, মন্ত্রী, আমলা, বিদেশী কনসালটেন্ট এবং চিহ্নিত কিছু বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে। যার সঙ্গে বাস্তবতার কোন সম্পর্ক নেই। পরিবেশের ক্ষতি হবে বলেই ভারতে এমন প্রকল্প বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, ভারতে করলে ক্ষতি হবেবাংলাদেশে করলে হবে না!

১টি মন্তব্য

  1. শীলব্রত বড়ুয়া (Shilabrata Barua)

    সুন্দরবন আমাদের জাতীয় সম্পদ । এর জীববৈচিত্র ধ্বঙস হতে পারে এমন কোন প্রকল্প গ্রহন দেশের স্বার্থ বিরোধী কাজ হবে ।