Home » মতামত » যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও শাহবাগ গণজাগরণ – ২

যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও শাহবাগ গণজাগরণ – ২

আনু মুহাম্মদ

Anu_Mohammad-2স্বতঃস্ফূর্ততা আসলে স্বতঃস্ফূর্ত নয়, এর পেছনে থাকে বহুদিনের নানা স্পষ্টঅস্পষ্ট টান। থাকে নানা ঘটনা, স্মৃতি, হতাশা, ক্ষোভ, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ। পরম্পরা আর অলক্ষ্যে গড়ে ওঠা সামষ্টিক চেতনা দুটো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান কাজ করে স্বত:স্ফূর্ততার পেছনে। একটি নির্দিষ্ট সময়ে যাকে স্বত:স্ফূর্ত মনে হয়, অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে তার পেছনে পরম্পরায় বয়ে আসা কোনো তাগিদ কাজ করছে, সামষ্টিক চেতনার মধ্য দিয়ে যা প্রবাহিত হয়। সবসময় তা স্পষ্ট বা প্রকাশিত থাকে না।

বস্তুত তরুণদের নেতৃত্বে এই গণজাগরণ সরকার, প্রধান রাজনৈতিক দল, এবং তাদের ভোটের রাজনীতির প্রতি অনাস্থারই বহি:প্রকাশ। দুই আশংকা মানুষের মধ্যে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার অনুভূতি দিয়েছে। প্রথমত, ভোটের হিসাবনিকাশ করতে গিয়ে অতীতের মতো সরকার জামায়াতের সাথে আবারো যেকোনো ধরনের আপোষরফায় বা আঁতাতে চলে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, যদি শুধু কারাদন্ড হয় তাহলে সরকার পরিবর্তনে বা কোনো চাপে এরা আবার ছাড়া পেয়ে যেতে পারে।

ফেসবুকের মধ্য দিয়ে গত কয়েক বছরে অনেক প্রতিবাদ কর্মসূচি সংগঠিত হয়েছে, অনেক মত তৈরি হয়েছে, অনেক বিতর্ক পরিণত আকার নিয়েছে। এই খোলা মাধ্যম অনেকভাবে অপব্যবহার হচ্ছে ঠিক, কিন্তু এই মাধ্যম যে ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশের পাশাপাশি পরিণত রাজনৈতিক মত গঠন, তথ্য সরবরাহ, সীমান্ত অস্বীকার করে দেশে দেশে মানুষের লড়াইকে সূত্রবদ্ধ করতে পারে তার প্রমাণ তৈরি হয়েছে ,অন্য অনেক দেশের মতো এই বাংলাদেশেও।

যারা এই তরুণ প্রজন্ম সম্পর্কে জানেননা তাদের কাছে তাই শাহবাগ এক বিস্ময় কিংবা হঠাৎ ঘটা কোনো ঘটনা। যাদের দেখে তরুণদের সম্পর্কে তারা হতাশা ও নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতেন, তারা এখনও কিন্তু সেরকমই আছে। যখন শাহবাগের তারুণ্যের নতুন ভাষা ও জননন্দিত জোয়ারে সারাদেশ নতুনভাবে আশাবাদী হয়ে ওঠেছে, যখন রাষ্ট্র ও রাজনীতির নতুন বিশ্লেষণের তাগিদ অনুভব করছেন দেশ বিদেশের বিশেষজ্ঞরা, তখনও সরকারি ছাত্র সংগঠনের রামদা বাহিনী বা চাঁদাবাজদের তৎপরতা বন্ধ হয়নি। শাহবাগ চত্ত্বরের উজ্জল খবরের পাশাপাশি সমাজের ক্ষমতাবান দখলদার সন্ত্রাসীদের ব্যবহৃত এই তরুণদের অপতৎপরতার খবরও ঠিকই প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকায়।

এখানে আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শাহবাগ আন্দোলনে যে তরুণেরা প্রথম থেকেই দিনরাত্রি লেগে থেকে একে ঐতিহাসিক গনজোয়ারে পরিণত করেছেন, তাদের বড় অংশের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এটাই প্রথম নয়। এরা হঠাৎ করে মাঠে নেমে এসেছেন তাও নয়। কেউ কেউ নিজেদের অঙ্গীকার বোধ থেকে ব্লগকেই লড়াই এর মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন প্রথম থেকেই। কেউ যুদ্ধাপরাধীর বিচার, কেউ জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলন, কেউ রাজনীতি, কেউ সাহিত্য, কেউ জাতিগত নিপীড়ন, কেউ নারীর নতুন পরিচয় কিংবা সব নিয়েই লেখালেখি করতেন। এদের মধ্যে কারও কারও ফেসবুক ব্লগ আর মাঠের লড়াইএ একইসঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা আছে। গত দশ বছরে এদের অনেককেই মিছিলে দেখেছি, সরকারি বাহিনী মোকাবিলা করতে দেখেছি, গুলি টিয়ারগ্যাস গ্রেফতার নির্যাতন পাত্তা না দিয়ে দৃঢ়তা নিয়ে জনগণের স্বার্থে কাজে লেগে থাকতে দেখেছি। বাংলাদেশ থেকে গ্যাসসম্পদ ভারতে রফতানির জন্য মার্কিনভারতবিশ্বব্যাংকএডিবিইউনোকালকমিশনভোগীদের সব আয়োজন প্রতিহত করতে ঢাকা বিবিয়ানা লংমার্চে অংশ নিয়েছিলেন যারা, যারা চট্টগ্রাম বন্দর মার্কিনীদের হাতে তুলে দেবার বিরুদ্ধে লংমার্চ করেছিলেন, যারা ফুলবাড়ী গণঅভ্যুত্থানে গুলির মুখে দাঁড়িয়েছিলেন, যারা সুনেত্র রামপাল আড়িয়াল রূপগঞ্জ রূপপুর নিয়ে নানা চক্রান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, যারা বঙ্গোপসাগরেও সম্পদ ও দেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধী চুক্তি মোকাবেলা করতে মাঠ নেমেছেন, তাদের প্রায় সবাইকে তো দেখেছি শাহবাগে কিংবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গণজাগরণ মঞ্চে।

আজ যারা যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে টালবাহানা বুঝতে পেরে প্রতিরোধের এক নতুন ধরনের যাত্রা শুরু করেছেন, তাদের অনেককেই আমরা বিভিন্ন মাত্রায় নারী নির্যাতন, গার্মেন্টস শ্রমিক হত্যা ও নির্যাতন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিকীকরণ, ক্রসফায়ার, গুমখুন, বিশ্বজিৎ হত্যা, সরকারি ছাত্র সংগঠনের রামদা উৎসব, সীমান্ত হত্যা, টিপাইমুখ বাঁধ ইত্যাদির বিরুদ্ধেও ব্লগে ফেসবুকে লিখতে দেখেছি, বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সামনের সারিতে পেয়েছি। কেউ মাঠে শ্লোগানে, কেউ লেখায়, কেউ ছবি আঁকায়, কেউ গানে, কেউ নাটকের মধ্য দিয়ে গত দশ বছরে নতুন এক শক্তির জাগরণ ঘটিয়েছেন। গত কিছুদিনে কনোকো ফিলিপসএর সাথে চুক্তির মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের সম্পদ ও দেশের সার্বভৌমত্ব তুলে দেবার বিরুদ্ধে, ফুলবাড়ীতে দেশের ‘জল জমি জন’ এর সর্বনাশ করে কয়লা সম্পদ বিদেশে রফতানির নতুন নতুন চক্রান্ত হামলা মামলা, লুটেরা গোষ্ঠীর স্বার্থে আইএমএফ এর নির্দেশে তেল গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে বাড়িয়ে জীবন অর্থনীতির ভয়ংকর দিকে ঠেলে নেবার বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনীর গ্রেফতার, লাঠিচার্জ, মরিচের গুড়া, টিয়ারগ্যাস এবং সরকারি দলের সন্ত্রাসীদের মোকাবেলা করে যারা কাজ করেছেন, তাদের মধ্যেও এই তরুণেরাই ছিলেন প্রধান। জাতীয় কমিটির আন্দোলনের প্রধান শক্তিই ছিলো আছে এই তরুণেরা। এদের মধ্যে বিভিন্ন বাম ছাত্র সংগঠনের সদস্য, বিভিন্ন পাঠচক্র, চলচ্চিত্র সংসদ, আবৃত্তি সংগঠন, পাঠাগারের সদস্য, আবার একদমই ব্যক্তি তরুণেরা, প্রধানত শিক্ষার্থী, কোন সংগঠন করে না, কিন্তু দেশের জন্য কাজ করতে আগ্রহীএরকম।

যে তরুণেরা দেশ ও দেশের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের মানুষের প্রতি দায় অনুভব করে তারা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন বলেই, অতীতের কলঙ্কমোচন করায় আজ সকল সক্রিয়তা আর সৃজনশীলতা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। অতীতের কলঙ্কমোচন করতে গেলে বর্তমান ও ভবিষ্যতের যাত্রাপথের প্রশ্নও আসে। অতীতের ভার থেকে মুক্ত না হলে ভবিষ্যতে আগ্রসর হওয়া যায় না। ৪২ বছরে ১৯৭১ এর রাজাকারের বিচারহীনতায় তৈরি হয়েছে অনেক নব্য রাজাকার। একটি থেকে অন্যটি বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব।

দেশ ও দেশের সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে আমরা সবসময়ই মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্ব বলেছি। শাহবাগ থেকেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনকে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ বলা হয়েছে। এখানে দুই লক্ষ্য: একটি অতীতের দায় থেকে মুক্তিলাভ, অন্যটি ভবিষ্যতের মানুষের বাসযোগ্য মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

কিন্তু এর মধ্যেই আন্দোলন নিয়ে নানা সংশয় তৈরি করা হচ্ছে। আন্দোলনকে গিলে ফেলার জন্য সরকার একদিকে তৎপর, অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধের বিচারের সপক্ষ শক্তির গায়ে নানা কালিমা লিপ্ত করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে।

গত সপ্তাহে ফেসবুক ও ইমইেলে বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে চিঠি পেয়েছিলাম। তাঁরা যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি দাবি করেন, কিন্তু রাজীবের নামে প্রচারিত বিছু লেখা নিয়ে তাঁরা ক্ষুব্ধ। কেউ কেউ আশংকা প্রকাশ করেছেন, এরকম লেখার কারণে শাহবাগ আন্দোলন সম্পর্কে ভুল ধারণা সৃষ্টি হবে। তাঁরাই পাঠালেন লেখাগুলো, সবিস্তারে প্রকাশিত হয়েছে ‘আমার দেশ’ পত্রিকায়। পড়বার চেষ্টা করলাম, পড়া গেলো না। আমি ধর্ম নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা ও বিতর্কের সুযোগ সমাজে থাকা জরুরি মনে করি। কিন্তু এসব লেখার ভাষা, উপস্থাপন ভঙ্গী, বিদ্বেষী শব্দমালা অরুচিকর, কোথাও কোথাও কদর্য। এগুলোতে ধর্মপ্রাণ মানুষ তো বটেই যে কোন ধর্ম বা মতের সুস্থ মানুষই বিরক্ত ক্ষুব্ধ হবেন। কয়েকদিনের মধ্যে দেখলাম কীভাবে এই লেখাগুলো যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হলো। লক্ষ লক্ষ কপি ছাপা হয়ে দেশের সর্বত্র গেলো এবং পুরো যুদ্ধাপরাধী বিরোধী অন্দোলনকেই কলঙ্কিত করবার জন্য প্রচারও শুরু হলো সাথে সাথে। কার লেখা এগুলো? রাজিব খুন হয়েছে, ওর জবাব দেবার উপায় নেই। ওর বন্ধুরা এবং ওর বাবা বলছেন এগুলো রাজীবের নয়।

যেই লিখুক এই ধরনের লেখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বা সমর্থনযোগ্য নয়। এরকম লেখা শুধু যে সমাজে ধর্ম নিয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা বিতর্কের পথ রুদ্ধ করে দেয় তাই নয়, সকল অগণতান্ত্রিক অপশক্তিই এগুলো থেকে ফায়দা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। প্রচারণার ঘোরে আচ্ছন্ন না হলে সকল মানুষই নিশ্চয়ই খেয়াল করবেন যে, যারা এসব লেখা লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে তাদেরকে ক্ষেপিয়ে তুলে সারা দেশে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে, তারা ধর্মকে সম্মান করছে না; তারা খুনি লুটেরা ধর্ষক যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করছে। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ২২ তারিখ অনেক সহিংসতা হল। পাক বর্বর বাহিনী শহীদ মিনার ভেঙেছিলো, এই শহীদ মিনারও সেদিন আক্রান্ত হল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলনকে টার্গেট করে বক্তব্য ও আক্রমণ পরিচালনা শুরু হল জোরদারভাবে। কারা সরল কিশোর তরুণ মাদ্রাসা ছাত্রদের খুনি ধর্ষকদের স্বার্থে ব্যবহার করে? যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলনকে ‘ইসলাম বিরোধী’ বলে প্রচার করে ,তারা কি ইসলাম ধর্মের সম্মান রক্ষা করে না, তাকে কলঙ্কিত করে এগুলোই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত কয়েকদিনে সহিংসতায় ১০জনেরও বেশি নারীপুরুষ নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন সংবাদপত্রের ভাষ্যে এরজন্য দায়ী হিসেবে পুলিশ, জামায়াত শিবির, আওয়ামী লীগ যুবলীগ, পরিচয়হীন সন্ত্রাসীর কথা এসেছে। এসবের পেছনে কি কারণ? অতিউৎসাহ না উস্কানি, নৈরাজ্য সৃষ্টি বা মূল ইস্যু ঢাকা দেয়ার অপচেষ্টা? এগুলো পরিষ্কার করা, দায়ী ব্যক্তিদের সনাক্ত করা, গণজাগরণের অনাস্থা দূর করা সরকারেরই দায়িত্ব। কিন্তু সরকার খুবই রহস্যজনক আচরণ করছে। যুদ্ধাপরাধী বিচারের আন্দোলনকে পুঁজি করে দেশ বিদেশের বিভিন্নমুখি চক্রান্তের আশংকা তৈরি হয়েছে।।

(চলবে)