Home » অর্থনীতি » সরকারের ব্যর্থ পানি কূটনীতি (দ্বিতীয় পর্ব)

সরকারের ব্যর্থ পানি কূটনীতি (দ্বিতীয় পর্ব)

. ইনামুল হক

inamul-huq-2-বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের মণিপুর রাজ্যে নির্মিতব্য টিপাইমুখ ড্যাম নিয়েও বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভীর বিগত ১৩ ডিসেম্বর ২০১১ টিপাইমুখ ড্যাম নিয়ে পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ লিখে নিবেদন করেন যে, বিষয়টি নিয়ে আবেগ ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির উর্দ্ধে থেকে যুক্তিপূর্ণ এবং বৈজ্ঞানিক আলোচনা হওয়া দরকার।

টিপাইমুখ স্থানটি ভারতের মিজোরাম রাজ্যের কোলাশিব জেলা এবং মণিপুর রাজ্যের চূড়াচাঁদপুর জেলার সীমানায় অবস্থিত, যেখানে টিপাই নদী বরাক নদে এসে মিশেছে। এখানে বরাক নদ উত্তর পূর্বের কালা নাগা এলাকার ভেতর দিয়ে এসে একটি উল্টো বাঁক নিয়েছে। টিপাই নদীর উৎপত্তি মিয়ানমারে, যা’ দক্ষিণ দিক থেকে এসে এই বাঁকে এসে পড়েছে। বরাক এরপর ভূবন পাহাড় উপত্যকার ভেতর দিয়ে আসামের কাছাড় জেলার দিকে প্রবাহিত হয়েছে। পাহাড় ও সমতলের ভেতর দিয়ে এই নদটি আরও ১৮০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে অমলশিদের কাছে বাংলাদেশের সীমানা স্পর্শ করেছে। এখানে নদটি সুরমা ও কুশিয়ারা নামের দ’ুটি নদীতে ভাগ হয়ে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করেছে।

ভারত টিপাইমুখ ড্যামের মাধ্যমে ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করার কথা বলে যা’ একটি অতি আশাবাদী হিসাব। বরাক নদটির জলসংগ্রহ এলাকা ১২,০০০ বর্গ কিলোমিটার, যার বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১৫০০ মিলিমিটার। বাংলাদেশের কাপ্তাই ড্যামের একই সমান জল সংগ্রহ এলাকা আছে, তবে গড় বৃষ্টিপাত দ্বিগুন এবং তাই জলাধার এলাকাও দ্বিগুন; কিন্তু এই ড্যামের মাধ্যমে ৪৫০ মেগাওয়াটের বেশী জলবিদ্যুত উৎপাদন সম্ভব নয়। টিপাইমুখে ড্যাম নির্মিত হলে তা’ গ্রীষ্মকালে কিছু আগাম বন্যার পানি রোধ করতে পারবে, কিন্তু বর্ষাকালে জলাধার পূর্ণ থাকায় বন্যাপ্রবাহ রোধ করতে পারবে না। ড্যামের জলাধারের জল দিয়ে বরাক নদীর ভাটিতে হেমন্ত, শীত ও বসন্তের শুকনা মাসগুলিতে পানি বাড়ানো যাবে। কিন্তু এই নদীগুলিতে পানি বাড়ানোর ফলে হাওর এলাকাগুলি নিষ্কাশিত না হয়ে ফেব্র“য়ারী পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকবে। বিজ্ঞানী এবং বিশেষজ্ঞরা যাই যুক্তি দিন না কেন, একটি জলবিদ্যুত উৎপাদনের জন্য নির্মিত ড্যাম সবসময় পূর্ণ করে রাখার চেষ্টা থাকে যাতে সর্বোচ্চ পরিমাণ বিদ্যুত উৎপাদন করা যায়। ড্যামের ডিজাইন অনুযায়ী অতি বৃষ্টিতে পানি স্পিলওয়ের মাধ্যমেই কেবল উপচে ভাটিতে যায়। তাই বর্ষার বন্যা কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। উল্লেখ্য যে, ২০১২ সালে দামোদর উপত্যকার বর্ধমান, বাঁকুড়া, হুগলি ও হাওড়া জেলায় ভয়াবহ বন্যা হয়েছে যার পানি ঐ উপত্যকার পাঞ্চেত, বরাকর, মাইথন ও তিলাইয়া ড্যাম উপচে এসে ভাসিয়েছে। গওহর রিজভী ঠিকই জেনেছেন যে, একটি ড্যাম শুকনার সময় নদীর পানি বাড়াতে পারে এবং বর্ষার সময় কমাতে পারে। এই ধরনের ব্যবস্থাপনা রংপুর বিভাগের জেলাগুলির জন্য সুখবর হতে পারতো। কিন্তু সিলেট বিভাগের জেলাগুলি জন্য তা’ বিপদ সংবাদ।

সুরমা ও কুশিয়ারা নদী দু’টি সিলেট বিভাগের হাওরগুলির ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এরা বর্ষার সময় হাওরগুলি জলপূর্ণ করে, শীতে নিস্কাশন করে। এই বিভাগের ভূমির উচ্চতা টাঙ্গুয়ার হাওরের দিকে ক্রমশঃ নেমে গেছে যার চারপাশে ভূমি গড়ে সমুদ্রতল থেকে মাত্র ৩ মিটার উঁচু। সুরমা নদী গারো, খাসিয়া ও জৈন্তিয়া পাহাড় এলাকা থেকেও জল সংগ্রহ করে। আগাম বন্যা আসে এপ্রিল মাসে যখন বরাক উপত্যকায় আগাম বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু টিপাইমুখ ড্যাম জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করবে ও হেমন্ত, শীত ও বসন্তের মাঝামাঝি পর্যন্ত নদীতে জল ছাড়বে। এর ফলে হাওর এলাকার এক ফসলী জমিগুলি ডিসেম্বর থেকে ফেব্র“য়ারী মাস পর্যন্ত জলে ডুবে থেকে জাগতে পারবে না ও বোরো ধান লাগানো যাবে না। বাংলাদেশ এর ফলে প্রতিবছর ২০০০ কোটি টাকার ধান থেকে বঞ্চিত হবে। এভাবে ড্যামটির ফলে যে জলাধার হবে, তাতে বিস্তর এলাকা ডুবে যাবে, লোকজন বাস্তুচ্যুত হবে, জনগণের জীবিকার মাধ্যম ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বন্যপ্রাণী তাদের বসবাস এলাকা হারাবে, ইত্যাদি। যদিও তা’ ভারতের ভূমিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, বাংলাদেশে হবে অন্য ধরনের ক্ষতি, হাওরের শস্য থেকে বঞ্চিত হওয়া ছাড়াও। ভারত টিপাইমুখ ড্যামের মাধ্যমে মধ্যবসন্ত থেকে গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত নদীর তলানি প্রবাহ আটকে রাখবে। এর ফলে বাংলাদেশের ভেতরে কুশিয়ারা নদীর তলানি প্রবাহের পরিমান কমে গিয়ে জল পরিবেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে। এতসব ক্ষতি সত্বেও গওহর রিজভী ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র হয়ে বলে গেছেন, ‘ভারত টিপাইমুখ ড্যাম নিয়ে এমন কিছু করবে না যা’তে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়।’

টিপাইমুখ ড্যামের মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা ও শুকনা মৌসুমে পানি ছাড়ার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস অনেক সুখবর হতো যদি তা তিস্তা নদীর বেলায় হতো। সিকিমে যদিও পানি অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হচ্ছে না, কিন্তু সেখানে নির্মিত ’লো ফ্লো ড্যাম’ গুলির মাধ্যমে শুকনা মৌসুমের পানি আটকে রাখা হচ্ছে; যার ফলে গজলডোবা ব্যারেজের উজানে তিস্তা নদীর পানি কমে গিয়েছে। একই রকম পরিস্থিতি গ্রীষ্মকালে বরাক নদের বেলাতেও হবে, যদিও ভারত হয়তো একটি ব্যারেজ নির্মাণ করে সেচ বা অন্য কাজে পানি সরিয়ে নেবে না। বাংলাদেশকে টিপাইমুখ প্রকল্পে লগ্নি করে অংশীদার করা ও তাদের উৎপাদিত বিদ্যুুতের ভাগ নেবার ভারতীয় প্রস্তাব মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর ফলে ভবিষ্যতে টিপাইমুখ ড্যামের ক্ষতিকর প্রভাবের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আর কিছুই বলার থাকবে না। বাংলাদেশের সাথে টিপাইমুখ ড্যাম বিষয়ে তথ্য বিনিময় ও বাংলাদেশে সাথে যৌথ সমীক্ষা দল গঠনের জন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া প্রস্তাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ এবং বিজ্ঞানীদের অবশ্যই এর সুযোগ নেয়া দরকার।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালে গঙ্গা নদীর পানি বন্টন নিয়ে চুক্তি হলেও তিস্তা নদীর পানি বন্টন নিয়ে বিরোধ মীমাংসা এখনও হয়নি। যদিও ভারত ও বাংলাদেশ উভয় সরকারের তরফ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, তিস্তা চুক্তি শীগগীরই হতে যাচ্ছে। একই সাথে ভারত পশ্চিম বঙ্গের উত্তর দিনাজপুরে মহানন্দার পানি, দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় আত্রাই ও পুনর্ভবা নদীর পানি, মুর্শিদাবাদে ভৈরব নদীর পানি, এবং উত্তর চব্বিশ পরগণায় বেতনা ও কোদলা নদীর পানি বাঁধ দিয়ে প্রত্যাহার করে যাচ্ছে। ভারত ফেনী নদীর পানি পাম্প দিয়ে তুলে, গোমতি নদীর পানি ড্যামের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে, বিজনী, খোয়াই, মনু এবং বরাক নদের কিছু উপনদীর পানি জলকাঠামো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেচ ও শহরে জল সরবরাহের জন্য প্রত্যাহার করছে। ফেণী নদী পানি বন্টন নিয়ে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকারের কূটনীতি নতজানুমূলক বলেই প্রতীয়মান হয়।। minamul@gmail.com