Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – আকবর আলি খান

সাক্ষাৎকার – আকবর আলি খান

ভয় হয়, এখন যে সংঘাত চলছে এবং তা যদি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সংক্রমিত হয়, তাহলে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে

akbar ali khanআকবর আলি খান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং সমাজ বিশ্লেষক। দেশের বিদ্যমান সংঘাতময় পরিস্থিতি, শাহবাগের আন্দোলন, আগামী নির্বাচন, গণতন্ত্রের ভবিষ্যতসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার: বর্তমানে যে সংঘাত, বিবাদ ও সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি চলছে, তাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

আকবর আলি খান: বর্তমানে যে বিষয়টি নিয়ে সংঘাত চলছে, এ বিষয়টি নিয়ে কিন্তু বাংলাদেশে গত চল্লিশ বছর ধরেই সংঘাত অব্যাহত আছে। এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর যেসব দেশে বিপ্লব ঘটেছে, সে সব দেশেই বিপ্লবী এবং প্রতিবিপ্লবী শক্তির মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়। এখানে বার বার বিপ্লবী চেতনাই ফিরে আসে। ফরাসী বিপ্লব ১৭৯৮ সালে ঘটেছিল, এরপর আবার ১৮৩০, ১৮৪৮, ১৮৭০এর দশক এবং ১৯৬০এর দশকে বিভিন্নভাবে এই বিপ্লবী চেতনা বারবার ফিরে আসে। শাহবাগে তরুণদের যে সমাবেশ ঘটেছে, তাকে আমার কাছে সেই বিপ্লবী চেতনার প্রত্যাবর্তন বলেই মনে হচ্ছে। যেখানেই বিপ্লবী চেতনা রয়েছে, সেখানে কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিও থাকে। বাংলাদেশে এই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ও বিপ্লবী চেতনার মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। এর ফলে সামগ্রিক রাজনৈতিক, সামাজিক পরিস্থিতি ব্যাপক ভাবে সঙ্কটময় অবস্থার সম্মুখীন হচ্ছে। সঙ্কটময় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক এই কারণে যে, বাংলাদেশের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ, জাতীয়তাবাদ আমাদের কাছে পবিত্র, তেমনি গণতন্ত্রও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শক্তি। তবে যখনই অগণতান্ত্রিক শক্তি পুরো মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, তখন ওই শক্তিকে দমন করতে গেলে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা ও বিচ্যুতি দেখা দেয়। আজকের যে সমস্যা তা সরকারকে দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে এমনভাবে মোকাবেলা করতে হবে, যাতে মানবাধিকার বিপন্ন না হয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অটুট থাকে। এ কাজটি বলা সহজ কিন্তু করা অত্যন্ত কঠিন। ইতিহাসে যা দেখা গেছে, এই ধরনের বিপ্লবী চেতনার বহিঃপ্রকাশের ফলে অনেক সময় গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ দুর্বল হয়ে যায়। সুতরাং আমরা চাই, একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই এই সংঘাতের যেন সমাধান করা যায়।

আমাদের বুধবার: যখনই এই ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তখন ষড়যন্ত্রকারীরা তাকে একটি উত্তম পথ, পন্থা ও সময় হিসেবে বেছে নেয়। আপনার কি মনে করেন?

আকবর আলি খান: অগণতান্ত্রিক শক্তি তো সব সময়ই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে। এরা নতুনভাবে কিছু করে না। কিন্তু যখনই সংঘাতময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়, তখন তারা পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করার চেষ্টা করে। এতে পরিস্থিতি আরো সঙ্কটাপন্ন হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের বুধবার: যত দিন যাচ্ছে, ততই সমাজে বিভাজন বাড়ছে। এই বিভাজনকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

আকবর আলি খান: বিভাজন কিন্তু বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের সমাজে দেখা যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিপক্ষের শক্তি, ধর্ম নিরপেক্ষতার পক্ষেরবিরোধী শক্তি, আবার অন্যদিকে, যে বিভাজন অর্থাৎ ধনী দরিদ্র্যের বিভাজন সেগুলোও সমাজে বাড়ছে। কাজেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তার যে চারটি স্তম্ভ আছে, সেগুলো কিন্তু আমরা সমানভাবে বাস্তবায়ন করতে পারিনি। কাজেই যখন ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন উঠবে, সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্রের প্রশ্নও উঠবে। আমি মনে করি, এই চারটি স্তম্ভের মধ্যে সমন্বয়ের সাধক হলো গণতন্ত্র। কাজেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যদি বিপন্ন হয়, তাহলে ধর্ম নিরপেক্ষতা বিপন্ন হবে, জাতীয়তাবাদী শক্তি দুর্বল হবে এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা দুঃস্বপ্ন হিসেবেই থাকবে। এই পরিস্থিতিতে যা প্রয়োজন তাহলো, গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। এ বিষয়টি শক্ত, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। শক্ত সমস্যার শক্ত সমাধানই আছে, সহজ সমাধান হবে বলে মনে হয় না।

আমাদের বুধবার: আগামীতে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। আর এ নিয়েও সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে

আকবর আলি খান: অবশ্যই। নির্বাচন আমাদের করতেই হবে। কারণ, নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের নির্যাস এবং সরকারের বৈধতা রক্ষার জন্য অবশ্যই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন করতে হবে। কিন্তু ভয় হয়, এখন যে সংঘাত চলছে এবং তা যদি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সংক্রমিত হয়, তাহলে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কাজেই সরকারের কঠিন দায়িত্ব হলো, যেকোনো মূল্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।

আমাদের বুধবার: এক্ষেত্রে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন কিনা?

আকবর আলি খান: এখন পর্যন্ত সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। আর প্রধান দুই দলের মধ্যে সমঝোতা না হওয়াটা আমাদের জন্য উদ্বেগের কারণ। যদি প্রধান দুই দলের মধ্যে সমঝোতা না হয়, তাহলে আরো বড় সঙ্কট দেখা দিতে পারে।

আমাদের বুধবার: বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণ কতোটা শঙ্কিত এবং আতঙ্কিত বলে আপনি মনে করেন?

আকবর আলি খান: অবশ্যই। সাধারণ মানুষ বিদ্যমান সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত। জনগণের যে দাবিদাওয়া সেগুলো নির্বাচনের সময় উঠে আসবে বলে বিশ্বাস করি। আমি মনে করি, দেশের রাজনীতিবিদরা দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে অগণতান্ত্রিক শক্তিসমূহকে যেমন প্রতিহত করবেন, তেমনি সমঝোতার মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগী হবেন।

আমাদের বুধবার: কিন্তু সমঝোতা কি সম্ভব?

আকবর আলি খান : সমঝোতা অসম্ভব তা বলবো না, কিন্তু দূরূহ তা আমি স্বীকার করবো।

আমাদের বুধবার : এই পরিস্থিতিতে গণতন্ত্রের ভবিষ্যতকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

আকবর আলি খান: আমরা গণতন্ত্রের সাধনায় কিছু কিছু সাফল্য অর্জন করেছি। কিন্তু বার বার গণতন্ত্র বিপন্ন হচ্ছে, এই অবস্থাতে আমি উদ্বিগ্ন। কিন্তু আমি আশাবাদী যে, এদেশের মানুষ সৃজনশীল। তারা অনেক কঠিন সমস্যার মোকাবেলা এবং শেষ পর্যন্ত সমাধানও করতে পেরেছেন। তবে সমঝোতাই হচ্ছে বড় পথ ও পন্থা।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।